স্বাস্থ্যে ৩২,৭৩১ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রস্তাব
jugantor
মহামারি মোকাবিলা
স্বাস্থ্যে ৩২,৭৩১ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রস্তাব

  যুগান্তর প্রতিবেদন  

০৪ জুন ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

কোভিড-১৯ মহামারি মোকাবিলাসহ অন্যান্য প্রয়োজনে নতুন বাজেটে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ খাতে ৩২ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।

চলতি অর্থবছরের বাজেটে বরাদ্দের পরিমাণ ২৯ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা। সে তুলনায় নতুন অর্থবছরে বরাদ্দ বাড়তে যাচ্ছে ৩ হাজার ৪৮৬ কোটি টাকা।

বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট উত্থাপন করেন। তিনি বলেন, এবারও স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা গবেষণা খাতে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

এছাড়া মহামারির সময় জরুরি প্রয়োজন মেটাতে বাজেটে এবারও ১০ হাজার কোটি টাকা থোক বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংক থেকে করোনা টিকা কিনতে ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ও লজিস্টিক সাপোর্টের জন্য ১৪ দশমিক ৮৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পাওয়া গেছে, যা ইতোমধ্যে ব্যবহার হচ্ছে।

জরুরি প্রয়োজনে রাখা হচ্ছে ১০ হাজার কোটি টাকা : করোনাভাইরাসের প্রকোপ কমাতে টিকাদানে অধিক গুরুত্ব দিয়ে মহামারিকালে জরুরি প্রয়োজন মেটাতে বাজেটে এবারও ১০ হাজার কোটি টাকা থোক বরাদ্দের প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। তিনি বলেন, আগামী ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে বেশ কিছু অগ্রাধিকারের মধ্যে টিকাদান কর্মসূচি অন্যতম। সরকার দেশের সব নাগরিককে বিনামূল্যে টিকা প্রদান করবে। এজন্য যত টাকাই লাগুক সরকার তা ব্যয় করবে। সে লক্ষ্যে বাজেটে পর্যাপ্ত বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

এই বরাদ্দের বাইরে টিকা কিনতে বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা থেকে দেড় বিলিয়ন ডলারের ভ্যাকসিন সাপোর্ট পাওয়ার আশার কথা জানান অর্থমন্ত্রী। জাতীয় জীবনে করোনাভাইরাস ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আগামী বাজেটের ক্ষেত্রে কাঠামোগত পরিবর্তন আনা হয়েছে। কোভিড-১৯ মোকাবিলায় স্বাস্থ্য খাতকে সর্বাপেক্ষা অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। দেশের ৮০ শতাংশ মানুষকে টিকার আওতায় আনতে ভাগ ভাগ করে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। টিকা সংগ্রহে চলতি অর্থবছরে ইতোমধ্যে বিশ্বব্যাংক ৩ হাজার কোটি টাকা এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ৭০০ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে। কোভিড-১৯ সংক্রমণ থেকে জনগণকে রক্ষায় বিশ্বে বিনামূল্যে টিকা প্রদানকারী দেশগুলোর অন্যতম বাংলাদেশ।

কোভিড-১৯ ভ্যাকসিনেশন কৌশল, ব্যবস্থাপনা ও পদক্ষেপ : অর্থমন্ত্রী বলেন, বিশ্বব্যাংক থেকে কোভিড-ভ্যাকসিন কিনতে ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ও লজিস্টিক সাপোর্টের জন্য ১৪ দশমিক ৮৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যবহৃত হচ্ছে। টিকা কিনতে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক থেকে ৯৪০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পাওয়ার লক্ষ্যে ঋণচুক্তি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। পাশাপাশি, ইউরোপিয়ান ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক এবং এআইআইবি হতে ভ্যাকসিন কেনার জন্য সহায়তা পাওয়া যেতে পারে। মোট ৮০ শতাংশ মানুষকে টিকার আওতায় আনার জন্য ভাগ ভাগ করে পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগণকে টিকা দেওয়া হবে এবং প্রতিমাসে ২৫ লাখ করে টিকা দেওয়া হবে।

অর্থমন্ত্রী দেশে এই পর্যন্ত টিকা আসা ও কেনার সর্বশেষ পরিস্থিতি জানিয়ে বলেন, চলতি বছর ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে দেশে জাতীয়ভাবে টিকা দেওয়া শুরু হয়। এখন পর্যন্ত অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ১ কোটি ২ লাখ ডোজ, চীনের সিনোফার্মের পাঁচ লাখ ডোজ এবং কোভ্যাক্স থেকে ফাইজার-বায়োএনটেকের ১ লাখ ৬২০ ডোজ টিকা এসেছে। ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটে তৈরি অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার কোভিশিল্ড প্রয়োগের মাধ্যমে এই কার্যক্রম শুরু হয়।

তিন কোটি ডোজ টিকা কিনতে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চুক্তি হয়েছিল। তবে মহামারির দ্বিতীয় ঢেউয়ে ভারত বিপর্যস্ত হয়ে পড়লে সরকারের রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার কারণে সেরাম ইনস্টিটিউট দুই চালানের পর আর টিকা পাঠাতে পারেনি। এতে দেশে টিকাদান কর্মসূচি বড় ধরনের হোঁচট খেলে নতুন উৎস থেকে টিকা কিনতে তৎপর হয় সরকার।

এর অংশ হিসাবে চীনের সিনোফার্ম ও রাশিয়ার স্পুটনিক-ভি টিকা পেতে জোরালো পদক্ষেপ নেওয়া হয়। ইতোমধ্যে সিনোফার্মের কাছ থেকে টিকা কেনার প্রস্তাবও সরকারের অনুমোদন পেয়েছে। উপহার হিসাবে চীনের কাছ থেকে পাওয়া এই টিকা দেশে প্রয়োগও শুরু হয়েছে। রাশিয়ার কাছ থেকে স্পুটনিক-ভি কেনার জন্য সরকারি পর্যায়ে আলোচনা চলছে। আর ফাইজার-বায়োএনটেকের তৈরি এক লাখ ৬২০ ডোজ টিকা বাংলাদেশ পাচ্ছে কোভ্যাক্স থেকে। সর্বশেষ যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি ফাইজার ও জার্মান জৈবপ্রযুক্তি কোম্পানি বায়োএনটেকের তৈরি করা করোনাভাইরাসের টিকা বাংলাদেশে জরুরি ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর। এ নিয়ে বাংলাদেশ করোনাভাইরাসের মোট চারটি টিকা অনুমোদন পেল। এর আগে কোভিশিল্ড, স্পুটনিক-ভি ও সিনোফার্মের তৈরি টিকার অনুমোদন দেওয়া হয়।

মহামারি মোকাবিলায় জরুরি কার্যক্রম বাস্তবায়ন : অর্থমন্ত্রী তার বক্তৃতায় বলেন, কোভিড-১৯ মোকাবিলায় স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে কিছু প্রকল্প বাস্তবায়ন চলতি অর্থবছরে শুরু হয়েছে এবং আগামী অর্থবছরেও তার বাস্তবায়ন অব্যাহত থাকবে।

বিশ্বব্যাংক থেকে ৬০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক থেকে ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ও এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) থেকে ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থায়নে প্রকল্পের বাস্তবায়ন চলমান রয়েছে। বিশ্বব্যাংক ও এআইআইবির অর্থায়নে কোভিড-১৯ ইমার্জেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড পেনডেমিক প্রিপিয়ার্ডনেস প্রকল্প চলমান রয়েছে।

এ প্রকল্প থেকে টিকা ক্রয়, অক্সিজন লাইন স্থাপন, আইসিইউ/সিসিইউ স্থাপন ও অন্যান্য কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। কোভিড-১৯ মহামারি মোকাবিলায় বাংলাদেশের সক্ষমতা বৃদ্ধিসহ সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ, চিকিৎসা ব্যবস্থা উন্নতকরণ এবং জরুরি প্রস্তুতি শক্তিশালী করতে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সহায়তায় কোভিড-১৯ রেসপন্স ইমার্জেন্সি অ্যাসিসটেন্স প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। এর মাধ্যমে আইসিইউ শয্যা, ভেন্টিলেটর ও পিসিআর মেশিন ক্রয় এবং ১৯টি প্রতিষ্ঠানে আধুনিক মাইক্রোবায়োলজি পরীক্ষাগার সম্প্রসারণসহ অন্যান্য কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের সব পয়েন্ট অব এন্ট্রি, যথা বিমান, স্থল ও নৌবন্দর দিয়ে আসা যাত্রীদের স্ক্রিনিং কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। এ পর্যন্ত দেশের ৩টি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, ২টি সমুদ্রবন্দর, ২টি রেলস্টেশন এবং ২৩টি স্থলবন্দর দিয়ে প্রায় ২২ দশমিক ২২ লাখ আন্তর্জাতিক যাত্রীকে স্ক্রিনিং করা হয়েছে। সরকারিভাবে ঢাকায় ৭২টি ও ঢাকার বাইরে ৪৯টিসহ মোট ১২১টি পরীক্ষাগারে কোভিড-১৯ এর নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত আরটিপিসিআর ভিত্তিতে ৫৮ দশমিক ১৯ লাখসহ মোট ৫৯ দশমিক ৪৮ লাখ মানুষের পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। দেশের সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে (৪২৩টি) এর প্রতিটিতে ৫টি করে আইসোলেশন শয্যা প্রস্তুত করা হয়েছে। যে সব জেলায় মেডিকেল কলেজ নেই, সেখানে জেলা সদর হাসপাতালগুলোতে ১০-২০টি আইসোলেশন শয্যা প্রস্তুত রয়েছে। ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত রোগীরাও যথাযথ চিকিৎসা পাচ্ছে। দায়িত্ব পালনকালীন ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুজনিত কারণে ক্ষতিপূরণ ও চিকিৎসায় নিয়োজিত ডাক্তার, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের সম্মানি বাবদ চলতি বছরে বরাদ্দকৃত ৮৫০ কোটি টাকা প্রদান কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

ঢাকায় দুটি প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিন সেন্টার চালু রয়েছে। সারা দেশে বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় মোট ৬২৯টি কোয়ারেন্টিন সেন্টার প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এ পর্যন্ত মোট ১০টি কোভিড-১৯ সম্পর্কিত জাতীয় গাইডলাইন, ২৮টি অন্যান্য নির্দেশিকা, ৪টি এসওপি এবং ১৩টি গণসচেতনতামূলক উপকরণ তৈরি করা হয়েছে। রিয়েল টাইম হসপিটাল ড্যাশবোর্ড স্থাপনের ফলে দেশের কোভিড হাসপাতালসমূহের সাধারণ ও আইসিইউ শয্যার সব তথ্য যে কোনো মুহূর্তেই পাওয়া যাচ্ছে।

স্বাস্থ্য গবেষণায় এবারও ১০০ কোটি টাকা : করোনাভাইরাস মহামারিকালে গতবারের মতো এবারও স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা গবেষণা খাতে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হচ্ছে।

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বৃহস্পতিবার ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবে এই বরাদ্দ রাখার কথা বলেছেন। সমন্বিত স্বাস্থ্য-বিজ্ঞান গবেষণা ও উন্নয়ন তহবিল থেকে করোনাভাইরাস, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়াসহ বিভিন্ন ভাইরাসের পাশাপাশি স্বাস্থ্য সেবা ও চিকিৎসা শিক্ষার বিষয়ে গবেষণার সুযোগ থাকবে। চলতি বাজেটেও এই খাতে সমপরিমাণ টাকা বরাদ্দ ছিল।

স্বাস্থ্যের অন্যান্য বরাদ্দ ব্যয় করতে না পারার মতো এই বরাদ্দের টাকাও ব্যয় হয়নি। এবার বাজেট প্রস্তাবে এ বরাদ্দ নিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশে গত বছর করোনাভাইরাস সংক্রমণ দেখা দেওয়ার পর স্বাস্থ্য খাতের দুর্বল দিকগুলো সামনে আসে। অবকাঠামোসহ অন্যান্য দুর্বলতার মধ্যে গবেষণায় দিকটি নিয়ে অনেক কথা হয়।

সার্বিক জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতির উন্নয়নে গবেষণায় ব্যয়ও খুবই কম। এমন প্রেক্ষাপটে গত অর্থবছরও ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর আগে ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্যের গবেষণার বরাদ্দ ছিল মাত্র পাঁচ কোটি টাকা।

গত অর্থবছর বাজেটে বরাদ্দ রাখার পর গবেষণার জন্য ব্যয় করতে ‘সমন্বিত স্বাস্থ্য-বিজ্ঞান গবেষণা ও উন্নয়ন তহবিল’ নামে একটি তহবিল গঠন করে অর্থ বিভাগ। এ তহবিল থেকে গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ দেওয়া হবে। সে জন্য একটি নীতিমালা করা হয়েছে।

এর আওতায় ৯ মে ১১টি বিষয়ের ওপর গবেষণার জন্য প্রস্তাব চেয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ। আগামী ২৩ জুন পর্যন্ত গবেষকরা তাদের প্রস্তাব জমা দিতে পারবেন।

মহামারি মোকাবিলা

স্বাস্থ্যে ৩২,৭৩১ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রস্তাব

 যুগান্তর প্রতিবেদন 
০৪ জুন ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

কোভিড-১৯ মহামারি মোকাবিলাসহ অন্যান্য প্রয়োজনে নতুন বাজেটে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ খাতে ৩২ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।

চলতি অর্থবছরের বাজেটে বরাদ্দের পরিমাণ ২৯ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা। সে তুলনায় নতুন অর্থবছরে বরাদ্দ বাড়তে যাচ্ছে ৩ হাজার ৪৮৬ কোটি টাকা।

বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট উত্থাপন করেন। তিনি বলেন, এবারও স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা গবেষণা খাতে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

এছাড়া মহামারির সময় জরুরি প্রয়োজন মেটাতে বাজেটে এবারও ১০ হাজার কোটি টাকা থোক বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংক থেকে করোনা টিকা কিনতে ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ও লজিস্টিক সাপোর্টের জন্য ১৪ দশমিক ৮৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পাওয়া গেছে, যা ইতোমধ্যে ব্যবহার হচ্ছে।

জরুরি প্রয়োজনে রাখা হচ্ছে ১০ হাজার কোটি টাকা : করোনাভাইরাসের প্রকোপ কমাতে টিকাদানে অধিক গুরুত্ব দিয়ে মহামারিকালে জরুরি প্রয়োজন মেটাতে বাজেটে এবারও ১০ হাজার কোটি টাকা থোক বরাদ্দের প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। তিনি বলেন, আগামী ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে বেশ কিছু অগ্রাধিকারের মধ্যে টিকাদান কর্মসূচি অন্যতম। সরকার দেশের সব নাগরিককে বিনামূল্যে টিকা প্রদান করবে। এজন্য যত টাকাই লাগুক সরকার তা ব্যয় করবে। সে লক্ষ্যে বাজেটে পর্যাপ্ত বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

এই বরাদ্দের বাইরে টিকা কিনতে বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা থেকে দেড় বিলিয়ন ডলারের ভ্যাকসিন সাপোর্ট পাওয়ার আশার কথা জানান অর্থমন্ত্রী। জাতীয় জীবনে করোনাভাইরাস ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আগামী বাজেটের ক্ষেত্রে কাঠামোগত পরিবর্তন আনা হয়েছে। কোভিড-১৯ মোকাবিলায় স্বাস্থ্য খাতকে সর্বাপেক্ষা অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। দেশের ৮০ শতাংশ মানুষকে টিকার আওতায় আনতে ভাগ ভাগ করে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। টিকা সংগ্রহে চলতি অর্থবছরে ইতোমধ্যে বিশ্বব্যাংক ৩ হাজার কোটি টাকা এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ৭০০ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে। কোভিড-১৯ সংক্রমণ থেকে জনগণকে রক্ষায় বিশ্বে বিনামূল্যে টিকা প্রদানকারী দেশগুলোর অন্যতম বাংলাদেশ।

কোভিড-১৯ ভ্যাকসিনেশন কৌশল, ব্যবস্থাপনা ও পদক্ষেপ : অর্থমন্ত্রী বলেন, বিশ্বব্যাংক থেকে কোভিড-ভ্যাকসিন কিনতে ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ও লজিস্টিক সাপোর্টের জন্য ১৪ দশমিক ৮৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যবহৃত হচ্ছে। টিকা কিনতে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক থেকে ৯৪০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পাওয়ার লক্ষ্যে ঋণচুক্তি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। পাশাপাশি, ইউরোপিয়ান ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক এবং এআইআইবি হতে ভ্যাকসিন কেনার জন্য সহায়তা পাওয়া যেতে পারে। মোট ৮০ শতাংশ মানুষকে টিকার আওতায় আনার জন্য ভাগ ভাগ করে পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগণকে টিকা দেওয়া হবে এবং প্রতিমাসে ২৫ লাখ করে টিকা দেওয়া হবে।

অর্থমন্ত্রী দেশে এই পর্যন্ত টিকা আসা ও কেনার সর্বশেষ পরিস্থিতি জানিয়ে বলেন, চলতি বছর ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে দেশে জাতীয়ভাবে টিকা দেওয়া শুরু হয়। এখন পর্যন্ত অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ১ কোটি ২ লাখ ডোজ, চীনের সিনোফার্মের পাঁচ লাখ ডোজ এবং কোভ্যাক্স থেকে ফাইজার-বায়োএনটেকের ১ লাখ ৬২০ ডোজ টিকা এসেছে। ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটে তৈরি অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার কোভিশিল্ড প্রয়োগের মাধ্যমে এই কার্যক্রম শুরু হয়।

তিন কোটি ডোজ টিকা কিনতে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চুক্তি হয়েছিল। তবে মহামারির দ্বিতীয় ঢেউয়ে ভারত বিপর্যস্ত হয়ে পড়লে সরকারের রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার কারণে সেরাম ইনস্টিটিউট দুই চালানের পর আর টিকা পাঠাতে পারেনি। এতে দেশে টিকাদান কর্মসূচি বড় ধরনের হোঁচট খেলে নতুন উৎস থেকে টিকা কিনতে তৎপর হয় সরকার।

এর অংশ হিসাবে চীনের সিনোফার্ম ও রাশিয়ার স্পুটনিক-ভি টিকা পেতে জোরালো পদক্ষেপ নেওয়া হয়। ইতোমধ্যে সিনোফার্মের কাছ থেকে টিকা কেনার প্রস্তাবও সরকারের অনুমোদন পেয়েছে। উপহার হিসাবে চীনের কাছ থেকে পাওয়া এই টিকা দেশে প্রয়োগও শুরু হয়েছে। রাশিয়ার কাছ থেকে স্পুটনিক-ভি কেনার জন্য সরকারি পর্যায়ে আলোচনা চলছে। আর ফাইজার-বায়োএনটেকের তৈরি এক লাখ ৬২০ ডোজ টিকা বাংলাদেশ পাচ্ছে কোভ্যাক্স থেকে। সর্বশেষ যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি ফাইজার ও জার্মান জৈবপ্রযুক্তি কোম্পানি বায়োএনটেকের তৈরি করা করোনাভাইরাসের টিকা বাংলাদেশে জরুরি ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর। এ নিয়ে বাংলাদেশ করোনাভাইরাসের মোট চারটি টিকা অনুমোদন পেল। এর আগে কোভিশিল্ড, স্পুটনিক-ভি ও সিনোফার্মের তৈরি টিকার অনুমোদন দেওয়া হয়।

মহামারি মোকাবিলায় জরুরি কার্যক্রম বাস্তবায়ন : অর্থমন্ত্রী তার বক্তৃতায় বলেন, কোভিড-১৯ মোকাবিলায় স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে কিছু প্রকল্প বাস্তবায়ন চলতি অর্থবছরে শুরু হয়েছে এবং আগামী অর্থবছরেও তার বাস্তবায়ন অব্যাহত থাকবে।

বিশ্বব্যাংক থেকে ৬০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক থেকে ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ও এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) থেকে ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থায়নে প্রকল্পের বাস্তবায়ন চলমান রয়েছে। বিশ্বব্যাংক ও এআইআইবির অর্থায়নে কোভিড-১৯ ইমার্জেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড পেনডেমিক প্রিপিয়ার্ডনেস প্রকল্প চলমান রয়েছে।

এ প্রকল্প থেকে টিকা ক্রয়, অক্সিজন লাইন স্থাপন, আইসিইউ/সিসিইউ স্থাপন ও অন্যান্য কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। কোভিড-১৯ মহামারি মোকাবিলায় বাংলাদেশের সক্ষমতা বৃদ্ধিসহ সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ, চিকিৎসা ব্যবস্থা উন্নতকরণ এবং জরুরি প্রস্তুতি শক্তিশালী করতে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সহায়তায় কোভিড-১৯ রেসপন্স ইমার্জেন্সি অ্যাসিসটেন্স প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। এর মাধ্যমে আইসিইউ শয্যা, ভেন্টিলেটর ও পিসিআর মেশিন ক্রয় এবং ১৯টি প্রতিষ্ঠানে আধুনিক মাইক্রোবায়োলজি পরীক্ষাগার সম্প্রসারণসহ অন্যান্য কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের সব পয়েন্ট অব এন্ট্রি, যথা বিমান, স্থল ও নৌবন্দর দিয়ে আসা যাত্রীদের স্ক্রিনিং কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। এ পর্যন্ত দেশের ৩টি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, ২টি সমুদ্রবন্দর, ২টি রেলস্টেশন এবং ২৩টি স্থলবন্দর দিয়ে প্রায় ২২ দশমিক ২২ লাখ আন্তর্জাতিক যাত্রীকে স্ক্রিনিং করা হয়েছে। সরকারিভাবে ঢাকায় ৭২টি ও ঢাকার বাইরে ৪৯টিসহ মোট ১২১টি পরীক্ষাগারে কোভিড-১৯ এর নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত আরটিপিসিআর ভিত্তিতে ৫৮ দশমিক ১৯ লাখসহ মোট ৫৯ দশমিক ৪৮ লাখ মানুষের পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। দেশের সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে (৪২৩টি) এর প্রতিটিতে ৫টি করে আইসোলেশন শয্যা প্রস্তুত করা হয়েছে। যে সব জেলায় মেডিকেল কলেজ নেই, সেখানে জেলা সদর হাসপাতালগুলোতে ১০-২০টি আইসোলেশন শয্যা প্রস্তুত রয়েছে। ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত রোগীরাও যথাযথ চিকিৎসা পাচ্ছে। দায়িত্ব পালনকালীন ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুজনিত কারণে ক্ষতিপূরণ ও চিকিৎসায় নিয়োজিত ডাক্তার, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের সম্মানি বাবদ চলতি বছরে বরাদ্দকৃত ৮৫০ কোটি টাকা প্রদান কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

ঢাকায় দুটি প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিন সেন্টার চালু রয়েছে। সারা দেশে বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় মোট ৬২৯টি কোয়ারেন্টিন সেন্টার প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এ পর্যন্ত মোট ১০টি কোভিড-১৯ সম্পর্কিত জাতীয় গাইডলাইন, ২৮টি অন্যান্য নির্দেশিকা, ৪টি এসওপি এবং ১৩টি গণসচেতনতামূলক উপকরণ তৈরি করা হয়েছে। রিয়েল টাইম হসপিটাল ড্যাশবোর্ড স্থাপনের ফলে দেশের কোভিড হাসপাতালসমূহের সাধারণ ও আইসিইউ শয্যার সব তথ্য যে কোনো মুহূর্তেই পাওয়া যাচ্ছে।

স্বাস্থ্য গবেষণায় এবারও ১০০ কোটি টাকা : করোনাভাইরাস মহামারিকালে গতবারের মতো এবারও স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা গবেষণা খাতে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হচ্ছে।

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বৃহস্পতিবার ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবে এই বরাদ্দ রাখার কথা বলেছেন। সমন্বিত স্বাস্থ্য-বিজ্ঞান গবেষণা ও উন্নয়ন তহবিল থেকে করোনাভাইরাস, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়াসহ বিভিন্ন ভাইরাসের পাশাপাশি স্বাস্থ্য সেবা ও চিকিৎসা শিক্ষার বিষয়ে গবেষণার সুযোগ থাকবে। চলতি বাজেটেও এই খাতে সমপরিমাণ টাকা বরাদ্দ ছিল।

স্বাস্থ্যের অন্যান্য বরাদ্দ ব্যয় করতে না পারার মতো এই বরাদ্দের টাকাও ব্যয় হয়নি। এবার বাজেট প্রস্তাবে এ বরাদ্দ নিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশে গত বছর করোনাভাইরাস সংক্রমণ দেখা দেওয়ার পর স্বাস্থ্য খাতের দুর্বল দিকগুলো সামনে আসে। অবকাঠামোসহ অন্যান্য দুর্বলতার মধ্যে গবেষণায় দিকটি নিয়ে অনেক কথা হয়।

সার্বিক জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতির উন্নয়নে গবেষণায় ব্যয়ও খুবই কম। এমন প্রেক্ষাপটে গত অর্থবছরও ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর আগে ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্যের গবেষণার বরাদ্দ ছিল মাত্র পাঁচ কোটি টাকা।

গত অর্থবছর বাজেটে বরাদ্দ রাখার পর গবেষণার জন্য ব্যয় করতে ‘সমন্বিত স্বাস্থ্য-বিজ্ঞান গবেষণা ও উন্নয়ন তহবিল’ নামে একটি তহবিল গঠন করে অর্থ বিভাগ। এ তহবিল থেকে গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ দেওয়া হবে। সে জন্য একটি নীতিমালা করা হয়েছে।

এর আওতায় ৯ মে ১১টি বিষয়ের ওপর গবেষণার জন্য প্রস্তাব চেয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ। আগামী ২৩ জুন পর্যন্ত গবেষকরা তাদের প্রস্তাব জমা দিতে পারবেন।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : বাজেট ২০২১-২২