বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন
jugantor
বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন

  ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম  

০৪ জুন ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সাধারণত বাজেটের ৩টি দিক মূল্যায়ন করা হয়। আয়, ব্যয় ও ঘাটতি। এবারের ব্যয়ের লক্ষ্য মোটামুটি ঠিক আছে।

কিন্তু বাস্তবায়ন কঠিন। কারণ গত কয়েক বছরের হিসাবে দেখা গেছে, ব্যয়ের সক্ষমতা খুব কম। চলতি অর্থবছরের বাজেটে যেসব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল, বেশ কয়েকটি খাতে তার অধিকাংশ বাস্তবায়ন হয়নি।

দ্বিতীয়ত, রাজস্ব আদায়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) ৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা আয় করার লক্ষ্য দেওয়া হয়েছে। এটি অবাস্তব। ফলে ঘাটতি আরও অনেক বাড়বে।

এটি অসম্ভব। কারণ করোনায় মানুষের আয় কমে গেছে। বহু মানুষ বেকার হয়েছে। ফলে আগে থেকে আমরা বলে আসছি, আয় বাড়ানো কঠিন। ঘাটতির দিক খুব বেশি বড় নয়। কিন্তু অর্থায়ন কঠিন। ফলে বাজেট সম্পর্কে আমার সামগ্রিক মূল্যায়ন হলো বাস্তবায়ন কঠিন। আর বাস্তবায়ন করতে পারলে তা ইতিবাচক।

সবচেয়ে অবাস্তব লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে জিডিপি প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে। সরকার বলছে, আগামী অর্থবছরে ৭ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হবে। কিন্তু এটি সম্ভব নয়। কারণ প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি যেসব দিয়ে বোঝা যায়, সেগুলোর মধ্যে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি, বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি এবং শিল্পের কাঁচামাল আমদানি অন্যতম।

কিন্তু এর কোনোটিই বাড়ছে না। ফলে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা আমাদের কাছে যৌক্তিক মনে হয়নি। আর বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান না বাড়লে মধ্যবিত্ত তেমন উপকার পাবে বলে মনে হয় না।

বাজেট বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সংস্কারের বিষয়টিও পরিষ্কার নয়। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি ধরা হয়েছে ২ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা।

এটিও বাস্তবায়নের সম্ভাবনা কম। পুরোনো অভিজ্ঞতা বলছে, আমাদের ব্যয়ের সক্ষমতা কম। আমাদের দুর্বলতাগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো বাস্তবায়নের হার কম। প্রতিবছরই বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা, সংশোধিত বাজেটে তা কমানো হয়। আর বাস্তবায়ন হয় তার চেয়েও কম। অন্যদিকে উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর গুণগত মান খুবই নিম্ন। রাস্তা নির্মাণের পর তিন থেকে ৬ মাসের মধ্যে তা নষ্ট হয়ে যায়। ফলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রকল্প নির্বাচন, পর্যাপ্ত বরাদ্দ দেওয়া, যথাসময়ে বাস্তবায়ন এবং গুণগত মান নিশ্চিত করা জরুরি।

এছাড়া ব্যাংক ও আর্থিক খাতের সংস্কারে তেমন কোনো পদক্ষেপ দেখিনি। বিদেশি ঋণ বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। কিন্তু রাজস্ব আয় না হলে ঘাটতি আরও বাড়বে। এবার ব্যয়ের ক্ষেত্রে আমাদের প্রত্যাশা ছিল, সম্প্রসারণমূলক পদক্ষেপ।

এক্ষেত্রে স্বাস্থ্য, কৃষি, শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান গুরুত্ব পাওয়া জরুরি ছিল। কিন্তু খাতগুলোতে ওইভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। স্বাভাবিকভাবেই করোনার কারণে অনেক লোক চাকরি হারিয়েছে। নিম্নমধ্যবিত্ত অনেক মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে এসেছে।

এসব মানুষকে খাইয়ে-পরিয়ে বাঁচিয়ে রাখার জন্য বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ থাকা জরুরি ছিল। এই সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি কেবল গ্রামকেন্দ্রিক নয়, এবার শহরেও আনতে হবে।

এছাড়া প্রবাসী অনেকে চাকরি হারিয়ে দেশে ফিরেছেন। তাদের দিকেও বিশেষ নজর দেওয়া জরুরি। এছাড়া কৃষিতেও স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি বরাদ্দ দেওয়া প্রয়োজন। কারণ এ সময়ে খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মধ্যে না পড়ে।

লেখক : অর্থ উপদেষ্টা সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকার

বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন

 ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম 
০৪ জুন ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সাধারণত বাজেটের ৩টি দিক মূল্যায়ন করা হয়। আয়, ব্যয় ও ঘাটতি। এবারের ব্যয়ের লক্ষ্য মোটামুটি ঠিক আছে।

কিন্তু বাস্তবায়ন কঠিন। কারণ গত কয়েক বছরের হিসাবে দেখা গেছে, ব্যয়ের সক্ষমতা খুব কম। চলতি অর্থবছরের বাজেটে যেসব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল, বেশ কয়েকটি খাতে তার অধিকাংশ বাস্তবায়ন হয়নি।

দ্বিতীয়ত, রাজস্ব আদায়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) ৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা আয় করার লক্ষ্য দেওয়া হয়েছে। এটি অবাস্তব। ফলে ঘাটতি আরও অনেক বাড়বে।

এটি অসম্ভব। কারণ করোনায় মানুষের আয় কমে গেছে। বহু মানুষ বেকার হয়েছে। ফলে আগে থেকে আমরা বলে আসছি, আয় বাড়ানো কঠিন। ঘাটতির দিক খুব বেশি বড় নয়। কিন্তু অর্থায়ন কঠিন। ফলে বাজেট সম্পর্কে আমার সামগ্রিক মূল্যায়ন হলো বাস্তবায়ন কঠিন। আর বাস্তবায়ন করতে পারলে তা ইতিবাচক।

সবচেয়ে অবাস্তব লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে জিডিপি প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে। সরকার বলছে, আগামী অর্থবছরে ৭ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হবে। কিন্তু এটি সম্ভব নয়। কারণ প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি যেসব দিয়ে বোঝা যায়, সেগুলোর মধ্যে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি, বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি এবং শিল্পের কাঁচামাল আমদানি অন্যতম।

কিন্তু এর কোনোটিই বাড়ছে না। ফলে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা আমাদের কাছে যৌক্তিক মনে হয়নি। আর বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান না বাড়লে মধ্যবিত্ত তেমন উপকার পাবে বলে মনে হয় না।

বাজেট বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সংস্কারের বিষয়টিও পরিষ্কার নয়। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি ধরা হয়েছে ২ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা।

এটিও বাস্তবায়নের সম্ভাবনা কম। পুরোনো অভিজ্ঞতা বলছে, আমাদের ব্যয়ের সক্ষমতা কম। আমাদের দুর্বলতাগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো বাস্তবায়নের হার কম। প্রতিবছরই বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা, সংশোধিত বাজেটে তা কমানো হয়। আর বাস্তবায়ন হয় তার চেয়েও কম। অন্যদিকে উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর গুণগত মান খুবই নিম্ন। রাস্তা নির্মাণের পর তিন থেকে ৬ মাসের মধ্যে তা নষ্ট হয়ে যায়। ফলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রকল্প নির্বাচন, পর্যাপ্ত বরাদ্দ দেওয়া, যথাসময়ে বাস্তবায়ন এবং গুণগত মান নিশ্চিত করা জরুরি।

এছাড়া ব্যাংক ও আর্থিক খাতের সংস্কারে তেমন কোনো পদক্ষেপ দেখিনি। বিদেশি ঋণ বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। কিন্তু রাজস্ব আয় না হলে ঘাটতি আরও বাড়বে। এবার ব্যয়ের ক্ষেত্রে আমাদের প্রত্যাশা ছিল, সম্প্রসারণমূলক পদক্ষেপ।

এক্ষেত্রে স্বাস্থ্য, কৃষি, শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান গুরুত্ব পাওয়া জরুরি ছিল। কিন্তু খাতগুলোতে ওইভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। স্বাভাবিকভাবেই করোনার কারণে অনেক লোক চাকরি হারিয়েছে। নিম্নমধ্যবিত্ত অনেক মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে এসেছে।

এসব মানুষকে খাইয়ে-পরিয়ে বাঁচিয়ে রাখার জন্য বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ থাকা জরুরি ছিল। এই সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি কেবল গ্রামকেন্দ্রিক নয়, এবার শহরেও আনতে হবে।

এছাড়া প্রবাসী অনেকে চাকরি হারিয়ে দেশে ফিরেছেন। তাদের দিকেও বিশেষ নজর দেওয়া জরুরি। এছাড়া কৃষিতেও স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি বরাদ্দ দেওয়া প্রয়োজন। কারণ এ সময়ে খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মধ্যে না পড়ে।

লেখক : অর্থ উপদেষ্টা সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকার

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : বাজেট ২০২১-২২