ধানের শীষে নীরব ভোট বিপ্লব ঘটবে

হাসান সরকার

  তারিকুল ইসলাম ২৮ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকার
গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকার

গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকার বলেছেন, ভোটাররা কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেয়ার সুযোগ পেলে ধানের শীষে নীরব ভোট বিপ্লব ঘটবে। তিনি অভিযোগ করেন, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই।

প্রতিনিয়ত নির্বাচনী আইন ও বিধিমালা ভঙ্গ করছেন ক্ষমতাসীনরা। নিয়ম অনুযায়ী দুই থানায় দুটি নির্বাচনী ক্যাম্প করার কথা থাকলেও আওয়ামী লীগ প্রার্থী প্রতিটি ওয়ার্ডে ক্যাম্প করেছে। নিয়ম অমান্য করে প্রতিটি ওয়ার্ডে একাধিক মাইকও ব্যবহার করছে।

তার দাবি, পুলিশ গাড়ি নিয়ে এলাকায় ঘুরে ঘুরে বিএনপি কর্মীদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। মাস্টার প্ল্যান করে গাজীপুরকে পরিকল্পিত সুন্দর নগরী গড়ে তোলা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, তাদের নির্বাচনী ইশতেহার হবে বাস্তবায়নযোগ্য। ইশতেহারে থাকবে চমক।

শুক্রবার যুগান্তরের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে বিএনপি প্রার্থী মুক্তিযোদ্ধা হাসান উদ্দিন সরকার এসব কথা বলেন।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন হাসান উদ্দিন সরকার। ১৯৭৪ সালে টঙ্গী পৌরসভা হলে এর প্রথম চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তিনি। শ্রমিকদের দাবি আদায়ে সক্রিয় ছিলেন। কাজী জাফর আহমেদের শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গেও ছিলেন তিনি।

দু’বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানও ছিলেন। টঙ্গীর বনেদি সরকার পরিবারের সদস্য হাসান উদ্দিন সরকার।

এলাকায় অন্তত গোটা পঁচিশ স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছে তার পরিবার। টঙ্গীর খ্যাতনামা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সফিউদ্দিন সরকার একাডেমি হাসান সরকারের হাতেই তৈরি।

নির্বাচন কেমন হবে- এমন প্রশ্নের জবাবে হাসান সরকার বলেন, ‘যেদিকে যাই, হাজার হাজার মানুষ নেমে পড়ছে। মানুষের এমন উচ্ছ্বাস কল্পনা করা যায় না। আশা করি, নির্বাচন কমিশন ও সরকারের শুভ বুদ্ধির উদয় হবে।

কারণ এর পরে জাতীয় সংসদের নির্বাচন। যদি তারা এ নির্বাচন এদিক-সেদিক করে, তবে জাতীয় নির্বাচনে তার মারাÍক প্রভাব পড়বে।’

সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে তাদের কোনো ধরনের শঙ্কা আছে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কোনো আশঙ্কা এখনও করছি না। কারণ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে সরকার পরিবর্তন হয় না।

আবার এ নির্বাচনের মাধ্যমে এটিও বোঝা যায়, আগামী দিনে জনগণ কোনদিকে সিদ্ধান্ত নেবে। এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাসের পাতা খুঁজলে দেখা যাবে, শাসকের পক্ষে একশ্রেণীর তোষামদকারীর সৃষ্টি হয়। তারাই শাসক দলের ভরাডুবি ঘটায়। যদিও কিছুদিন তারা ক্ষমতায় থাকে। তবে তার পরিণামটা খুব ভয়াবহ হয়।’

নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের সহযোগিতার ব্যাপারে হাসান সরকার বলেন, ‘তারা তো মুখে অনেক কিছুই বলে। পরবর্তী সময়ে দেখা যায়, আর ঠিক থাকতে পারে না। আমি সন্দিহান, তারা কতটা করতে পারবে। একদিক থেকে মনে সাহস আছে, সবাই জানে আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা।

এই গাজীপুর থেকেই মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছিল। তা শেষও হয় গাজীপুরে। তারুণ্যে একজন সাহসী মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যুদ্ধ করেছি। দেশ স্বাধীন করেছি। এখন আমার শেষ সময়।’

নির্বিঘ্নে প্রচারণা চালানোর ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত নির্বিঘ্নে প্রচারণা চালাতে পারছি। বাধা দেয়ার মতো কারও ক্ষমতা নেই। হাজার হাজার মানুষ নেমে যাচ্ছে। যারা বাধা দেবে, তারাই বিপদগ্রস্ত হবে।’

ভোটারদের প্রতিশ্রুতির ব্যাপারে ধানের শীষের এই প্রার্থী বলেন, ‘গাজীপুরের মাটিতে আমার জন্ম। যখন বাংলাদেশে মাত্র ২১টি পৌরসভা ছিল, তখন আমি পর পর দু’বার পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছি। শিল্প এলাকায় শ্রমিকদের ভোটে নির্বাচিত হওয়া কঠিন ব্যাপার।

শ্রমিকরা দাবি আদায় এবং তাদের অধিকারের জন্য খুব সচেতন থাকে। পান থেকে চুন খসলেই তাদের চোখে ধরা পরে এই নেতা আমাদের সর্বনাশ করবে। কাজেই আমার ভূমিকা যদি ঠিক না থাকত, তাহলে দু’বার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হতে পারতাম না। এটা শিল্পসমৃদ্ধ শ্রমিক এলাকা।

আমি মনে করি, এটা আমার জন্য সুন্দর একটা পথ তৈরি করে দেবে। এখন তারা মনে করেন, এই লোকটাকে নির্বাচিত করলে তাদের অধিকার আদায় করা যাবে।’

সিটি নিয়ে তার পরিকল্পনার কথাও জানান হাসান সরকার। তিনি বলেন, ‘ইশতেহারে এ ব্যাপারে বিস্তারিত থাকবে। ইশতেহার হবে বাস্তবায়নযোগ্য, থাকবে চমক। একটা পরিকল্পিত সুন্দর নগরী যাতে একশ’ বছরে হাত দিতে না হয়, এমন একটি মাস্টার প্ল্যান করতে চাই।

দেশীয় প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী এবং বাইরের জ্ঞানীগুণীদের সমন্বয়ে একটি মাস্টার প্ল্যান করতে চাই। এ মাস্টার প্ল্যানই বলে দেবে কোনটি প্রথম প্রয়োজন। তার মধ্যে রাস্তা প্রশস্ত করা, পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা, শহরকে পরিষ্কার-পরিছন্ন রাখা- এসবের ওপরই বেশি জোর দেয়া হবে।

আরও পরিছন্নতাকর্মী নিয়োগ দিতে হবে। রাস্তার আশপাশে দোকান বসে। এজন্য রাজনৈতিক দলের যারা ক্ষমতায় থাকেন, তারা সেখান থেকে চাঁদা সংগ্রহ করেন। এতে স্থানীয় প্রশাসনও জড়িত থাকে। এর থেকে বিরত থাকতে তাদের সচেতন করতে হবে।’

প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী প্রতিনিয়ত নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গ করছেন অভিযোগ করে তিনি বলেন, ‘এ ব্যাপারে কিছু বলার নেই। তারা সরকারি দল। প্রশাসনও তা মেনে নেয়। কারণ সবারই চাকরির ভয় আছে। তবে গণমাধ্যম অত্যন্ত সচেতন, তারও দেখছে। প্

রতীক বরাদ্দের আগে থেকেই ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীর পোস্টারে সব এলাকা ছেয়ে গেছে। অথচ বিএনপি প্রতীক পাওয়ার পর থেকে কর্মকাণ্ড শুরু করেছে। নিয়ম অনুযায়ী দুই থানায় দুটি নির্বাচনী ক্যাম্প করার কথা থাকলেও আওয়ামী লীগ প্রার্থী প্রতিটি ওয়ার্ডে ক্যাম্প করেছে। প্রতিটি ওয়ার্ডে একাধিক মাইকও ব্যবহার করছে।’

নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছেন কি না- এসংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পুরোটাই চ্যালেঞ্জের। আবার তা চ্যালেঞ্জের নয়ও।

এর ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, যদি ইচ্ছাকৃতভাবে এ সিটিতে সমস্যা তৈরির চেষ্টা করা হয়, তবে কী হবে, জানি না। আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। আমি পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে লড়াই করার প্লেয়ার। আওয়ামী লীগের অনেক নেতা জানেন, হাসান সরকার কে। আমার এটা ভোটের শেষ যুদ্ধ। কী হয়ে যায়, বলা যায় না।’

নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই বলে অভিযোগ করেন বিএনপির এই প্রার্থী। তিনি বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন মুখে বলে এক কথা, অন্তরে আরেক। আসলে অন্তরে না থাকলে তো লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড হয় না। তাদের ইচ্ছা আছে; কিন্তু পারছে না।

সমানভাবে কর্মকাণ্ড চালাতে পারছে না। পুলিশের গাড়ি, ডিবির গাড়ি এলাকায় ঘুরে ঘুরে বিএনপি কর্মীদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। বিএনপি নেতাকর্মীরা মামলার আসামি। প্রত্যেক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ১৮-২০ করে মামলা আছে। এসব মিথ্যা মামলাকে পুঁজি করে পুলিশ তাদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘লড়াই তো হবে ধানের শীষ আর নৌকার সঙ্গে। গত নির্বাচনে আমরা জয়লাভ করেছি। এবার তো আরও বেশি ভোটে জয়লাভ করব। যে যা-ই ভাবুক না কেন, দেশনেত্রী খালেদা জিয়া কারাগারে। কর্মী-নেতারা উপলব্ধি করতে পারছেন এই কারাগার কোন কারাগার।

এই কারাগারের সঙ্গে হাজারও-লক্ষ মানুষের হৃদয় জড়িত। বর্তমান সরকারের নির্যাতন-নিপীড়নে বাবাহারা সন্তান, সন্তানহারা বাবা অনেক কষ্ট করছেন। অন্যদিকে রাজনৈতিক মামলায় আসামি হয়েও অনেকে অনেক কষ্ট করছেন।

তারা মনে করছেন, এই সিটি নির্বাচনে যদি একটা রেজাল্ট দিতে পারি, তাহলে সরকারের টনক নড়বে। আমাদের রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা কোনো অপরাধ করেননি।’

ভোটাররা কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেয়ার সুযোগ পেলে ধানের শীষে নীরব ভোট বিপ্লব ঘটবে বলেও মনে করেন হাসান সরকার। তিনি বলেন, ‘ভোটাররা ভোট দিতে চান। অনেকদিন ধরে তারা ভোট দেন না। ভোটাররা একটা সুষ্ঠু পরিবেশ চান। এর জন্যই আমরা সেনাবাহিনী মোতায়েন চাই। এখনও সেনাবাহিনীর প্রতি জনগণের একটা আস্থা আছে। ’

সিটি নির্বাচনে সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করছেন উল্লেখ করে বিএনপির এই প্রার্থী বলেন, ‘বর্তমান মেয়র অধ্যাপক আবদুল মান্নান অসুস্থ। তার লোকজন বা অনুসারী সবাই নির্বাচনে বড় বড় দায়িত্ব পালন করছেন। মন-প্রাণ দিয়ে তারা কাজ করছেন।’

হাসান সরকার বলেন, ‘ক্ষমতাসীন দলের লোকেরা আমাকে চিকিৎসার কথা বলেন। চিকিৎসা তো তাদের প্রয়োজন, আমার না। হাসান সরকার কেমন মানুষ, কী ধরনের মানুষ, তা গাজীপুরবাসী জানেন।’

ঘটনাপ্রবাহ : গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন ২০১৮

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
.