মাদকে নাস্তানাবুদ নতুন প্রজন্ম
jugantor
মাদকে নাস্তানাবুদ নতুন প্রজন্ম

  মাহমুদুল হাসান নয়ন  

১২ জুন ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

শহর থেকে গ্রাম সর্বত্রই এখন হাতের নাগালে মাদক। করোনা মহামারিতে এর বিস্তার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এতে একদিকে যেমন আর্থিক ও শারীরিক ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে রুদ্ধ হচ্ছে সুন্দর চিন্তার পথ। আন্তর্জাতিক মাদক চক্রের সহায়তায় দেশীয় শক্তিশালী সিন্ডিকেটের হাত ধরে জীবন ধ্বংসকারী এসব দ্রব্যের প্রসার ঘটছে।

মাদকে অভ্যস্ত হচ্ছে ছিন্নমূল শিশু থেকে শুরু করে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ। সেবনকারীরা অর্থের জোগানে একসময়ে জড়িয়ে পড়ছে ব্যবসায়। এলাকাভিত্তিক গ্যাং গড়ে তুলে করছে ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ। অপরাধ জগত নিয়ন্ত্রণে জড়িয়ে পড়ছে রক্তক্ষয়ী সংঘাত-সংঘর্ষে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সবচেয়ে ভয়ের জায়গা তৈরি হয়েছে স্কুল-কলেজের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মাদক গ্রহণে অভ্যস্ততা নিয়ে। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য শিক্ষার্থীদের মাদক পরীক্ষা বা ডোপ টেস্ট চালুরও চিন্তাভাবনা করতে হয়েছে। ২০১৯ সালে ভর্তি পরীক্ষার অংশ হিসাবে এ টেস্ট চালুর প্রস্তাব করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি।

জানা গেছে, সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আরেক বৈঠকেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। ডোপ টেস্টের বিষয়টি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সংশ্লিষ্টদের অবগত করা হয়েছে। এ অবস্থায় মাদকে নাস্তানাবুদ প্রজন্ম রক্ষায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতার প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

মাদকের বিস্তারের চিত্র পাওয়া যায় মাদক উদ্ধারের চিত্র দেখলেই। গত এক যুগে মাদকদ্রব্য উদ্ধারকারী পাঁচটি সংস্থা প্রতি বছর গড়ে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার মাদকদ্রব্য উদ্ধার করেছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, পুলিশ, বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড (বিজিবি), র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) ও বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের এ হিসাব শুধু দেশে অধিক প্রচলিত নয়টি মাদক উদ্ধারের। এর বাইরে আরও অন্তত ১৬ ধরনের মাদক উদ্ধার হয়েছে বাংলাদেশে।

তবে মাদক নিয়ে কাজ করা ব্যক্তি ও সংগঠনগুলো মনে করে, উদ্ধার হওয়া এ মাদক কোনোভাবেই মোটের তুলনায় ২০-২৫ শতাংশের বেশি নয়। বর্তমানে মাদকসেবীরা প্রতিদিন গড়ে ২০ কোটি টাকার মাদক সেবন করছে। বছরের হিসাবে মাদকের পেছনে খরচ হয় আনুমানিক ৭ হাজার ২০০ কোটি টাকা। প্রতি বছরই এর পরিমাণ বাড়ছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, মাদকের পেছনে ব্যয় হওয়া অর্থের বড় একটি অংশই পাচার হচ্ছে দেশের বাইরে।

জানতে চাইলে মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থার (মানস) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং জাতীয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের উপদেষ্টা সদস্য অধ্যাপক ড. অরুপ রতন চৌধুরী বলেন, ক্রমশই বাড়ছে মাদকের চাহিদা ও বিস্তার। করোনাকালে মাদক মাফিয়া চক্র আরও মরিয়া হয়ে উঠেছে। যেহেতু করোনায় মানুষের কাজকর্ম সেভাবে নেই, ছেলেমেয়েদের স্কুল-কলেজ বন্ধ সেজন্য তারা এটিকে মোক্ষম সময় হিসাবে বেছে নিয়েছে। ফলে প্রতিনিয়ত মা-বাবারা আমাদের কাছে আসছেন ছেলেমেয়েদের সমস্যা নিয়ে। অলিতে-গলিতে, গ্রামে-গঞ্জে, পাড়া-মহল্লায় কোথায় এখন মাদক নেই? ঘরে ঘরে এখন ইয়াবা। যেটা ধরা পড়ে সেটা খুবই সামান্য। বেশিরভাগই থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। সেবনকারীরাও অর্থ জোগাড়ে এক সময়ে ব্যবসা করছে। একজন মাদকাসক্ত দুই বছরে আরও পাঁচজন তৈরি করছে।

বিভিন্ন পরিসংখ্যান উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, দেশে মাদকসেবীর সংখ্যা এখন ২ কোটি হবে। এর মধ্যে দেড় কোটি নিয়মিত। ৫০ লাখের মতো অনিয়মিত। দেশে মাদকসেবীরা গড়ে প্রতিদিন অন্তত ২০ কোটি টাকার মাদক সেবন করে। এসব অর্থের বড় অংশ পাচার হয়ে যায়। তিনি বলেন, অপরাধের জনক হচ্ছে মাদক। ধর্ষণ, হত্যা, ছিনতাই, রাহাজানিসহ যত রকমের অপরাধ হয় সবকিছুর মূলেই এর প্রভাব থাকে।

পাঁচ বছরে মাদক উদ্ধারের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০০৯-২০ সাল পর্যন্ত ইয়াবা, হেরোইন, কোকেন, আফিম, গাঁজা, ফেনসিডিল, বিদেশি মদ, বিয়ার ও ইনজেকটিং ড্রাগের ব্যবহার ক্রমশই বেড়েছে। এ ১২ বছরে শুধু এই নয়টি মাদক যে পরিমাণে উদ্ধার হয়েছে প্রচলিত দাম অনুযায়ী টাকার অঙ্কে তার পরিমাণ দাঁড়ায় আনুমানিক ১৪ হাজার ৩১৩ কোটি ৭৯ লাখ ৬২ হাজার ১৩০ টাকা।

পাঁচ সংস্থার মাদক উদ্ধারের ঘটনায় এক যুগে ৭ লাখ ৯৩ হাজার ৩৮২টি মামলা হয়। সর্বোচ্চ মামলা হয় ২০১৯ সালে ১ লাখ ২৪ হাজার ৯৮টি এবং সর্বনিম্ন হয় ২০০৯ সালে ২৭ হাজার ৪৪১টি। মোট মামলায় আসামি করা হয় ১০ লাখ ১০ হাজার ৭১৮ জনকে। ২০১৯ সালে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৬২ হাজার ৮৪৭ জন আসামি হন এবং ২০০৯ সালে সর্বনিম্ন ৩৪ হাজার ৩১৫ জন আসামি হন।

উদ্ধারকৃত মাদকের চিত্র বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, ক্রমশই এর বিস্তার বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০০৯ সাল থেকে ইয়াবা ৪০ হাজারের বেশি গুণ বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৯ সালে ৫ কোটি ৩০ লাখ ৪৮ হাজার ৫৪৮ পিস হয়েছে। ২০১৭ সাল থেকে মাদক উদ্ধারের ঘটনায় মামলা ১ লাখ ছাড়ানো শুরু হয়েছে। এরপর আর তা লাখের নিচে নামেনি।

একইভাবে এসব মামলায় আসামির তালিকাও ২০১৭ সাল থেকে এক লাখের উপরে গিয়েছে। তালিকা ক্রমশই বড় হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাদকের বিস্তার বৃদ্ধি পাওয়ায় উদ্ধারও বেড়েছে।

জানতে চাইলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ আহসানুল জব্বার যুগান্তরকে বলেন, মাদকের ব্যবহার ক্রমশই বাড়ছে। সেটা শুধু করোনার জন্যই নয়, সামগ্রিকভাবেই বাড়ছে। আমরা সব ধরনের চেষ্টা করছি মাদক নিয়ন্ত্রণে। যেসব সীমাবদ্ধতা রয়েছে সেগুলো নিরসনে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে উদ্ধারকারী সংস্থাগুলোর পাশাপাশি মাদক নিয়ন্ত্রণে সামাজিক সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই মাদক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।

এক সাক্ষাৎকারে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার একেএম হাফিজ আক্তার যুগান্তরকে বলেন, মাদক নিয়ন্ত্রণ একটি মাল্টি অরগানাইজেশনাল টাস্ক। এটা নিয়ে আরও বেশি কাজ করতে হবে। আরও মনোযোগী হয়ে কঠোর অ্যাকশনে গেলে সম্ভব। মাদকের প্রভাব অপরাধেও পড়ছে। একটি প্রজন্ম ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এটা সমাজের জন্য বিষফোঁড়া।

মাদককে কেন্দ্র করে কিশোর গ্যাং গঠনসহ বিভিন্ন অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। ৫ জুন গাজীপুরের টঙ্গীতে দুই পরিবারের সদস্যদের ওপর নৃশংস হামলার ঘটনায় জড়িত মো. রাজিব চৌধুরী বাপ্পি ওরফে লন্ডন বাপ্পিসহ ১২ কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব-১। এ সময় তাদের কাছ থেকে ২টি বিদেশি পিস্তল, ২টি চাপাতি, একটি ছুরি উদ্ধার করা হয়।

র‌্যাব জানায়, এ গ্যাং গড়ে ওঠার পেছনেও কাজ করেছে মাদক সেবন ও বাণিজ্য। গ্যাং সদস্যদের প্রতিদিন ৩০০-৪০০ করে টাকা দেওয়া হতো। যা খরচ হতো মাদক সেবনে। আবার মাদক বিক্রি করে এ অর্থের বড় একটি অংশ আসত।

জানতে চাইলে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন যুগান্তরকে বলেন, দেশে মাদকের চাহিদা আছে বলেই এটা আসছেও বেশি। মাদকের বিস্তার প্রতিরোধে পারিবারের ভূমিকা সবচেয়ে মুখ্য। মাদক যে শুধু শারীরিক সমস্যা তৈরি করছে তা নয়, বরং গ্যাং কালচারসহ অন্যান্য অপরাধের মূলেও রয়েছে মাদক। কিশোর গ্যাং পরিচালনা করতে গিয়ে মাদক গ্রহণ ও ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছে অনেকে। গাজীপুরের ঘটনা যার অন্যতম প্রমাণ।

মাদকে নাস্তানাবুদ নতুন প্রজন্ম

 মাহমুদুল হাসান নয়ন 
১২ জুন ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

শহর থেকে গ্রাম সর্বত্রই এখন হাতের নাগালে মাদক। করোনা মহামারিতে এর বিস্তার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এতে একদিকে যেমন আর্থিক ও শারীরিক ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে রুদ্ধ হচ্ছে সুন্দর চিন্তার পথ। আন্তর্জাতিক মাদক চক্রের সহায়তায় দেশীয় শক্তিশালী সিন্ডিকেটের হাত ধরে জীবন ধ্বংসকারী এসব দ্রব্যের প্রসার ঘটছে।

মাদকে অভ্যস্ত হচ্ছে ছিন্নমূল শিশু থেকে শুরু করে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ। সেবনকারীরা অর্থের জোগানে একসময়ে জড়িয়ে পড়ছে ব্যবসায়। এলাকাভিত্তিক গ্যাং গড়ে তুলে করছে ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ। অপরাধ জগত নিয়ন্ত্রণে জড়িয়ে পড়ছে রক্তক্ষয়ী সংঘাত-সংঘর্ষে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সবচেয়ে ভয়ের জায়গা তৈরি হয়েছে স্কুল-কলেজের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মাদক গ্রহণে অভ্যস্ততা নিয়ে। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য শিক্ষার্থীদের মাদক পরীক্ষা বা ডোপ টেস্ট চালুরও চিন্তাভাবনা করতে হয়েছে। ২০১৯ সালে ভর্তি পরীক্ষার অংশ হিসাবে এ টেস্ট চালুর প্রস্তাব করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি।

জানা গেছে, সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আরেক বৈঠকেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। ডোপ টেস্টের বিষয়টি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সংশ্লিষ্টদের অবগত করা হয়েছে। এ অবস্থায় মাদকে নাস্তানাবুদ প্রজন্ম রক্ষায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতার প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

মাদকের বিস্তারের চিত্র পাওয়া যায় মাদক উদ্ধারের চিত্র দেখলেই। গত এক যুগে মাদকদ্রব্য উদ্ধারকারী পাঁচটি সংস্থা প্রতি বছর গড়ে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার মাদকদ্রব্য উদ্ধার করেছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, পুলিশ, বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড (বিজিবি), র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) ও বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের এ হিসাব শুধু দেশে অধিক প্রচলিত নয়টি মাদক উদ্ধারের। এর বাইরে আরও অন্তত ১৬ ধরনের মাদক উদ্ধার হয়েছে বাংলাদেশে।

তবে মাদক নিয়ে কাজ করা ব্যক্তি ও সংগঠনগুলো মনে করে, উদ্ধার হওয়া এ মাদক কোনোভাবেই মোটের তুলনায় ২০-২৫ শতাংশের বেশি নয়। বর্তমানে মাদকসেবীরা প্রতিদিন গড়ে ২০ কোটি টাকার মাদক সেবন করছে। বছরের হিসাবে মাদকের পেছনে খরচ হয় আনুমানিক ৭ হাজার ২০০ কোটি টাকা। প্রতি বছরই এর পরিমাণ বাড়ছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, মাদকের পেছনে ব্যয় হওয়া অর্থের বড় একটি অংশই পাচার হচ্ছে দেশের বাইরে।

জানতে চাইলে মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থার (মানস) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং জাতীয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের উপদেষ্টা সদস্য অধ্যাপক ড. অরুপ রতন চৌধুরী বলেন, ক্রমশই বাড়ছে মাদকের চাহিদা ও বিস্তার। করোনাকালে মাদক মাফিয়া চক্র আরও মরিয়া হয়ে উঠেছে। যেহেতু করোনায় মানুষের কাজকর্ম সেভাবে নেই, ছেলেমেয়েদের স্কুল-কলেজ বন্ধ সেজন্য তারা এটিকে মোক্ষম সময় হিসাবে বেছে নিয়েছে। ফলে প্রতিনিয়ত মা-বাবারা আমাদের কাছে আসছেন ছেলেমেয়েদের সমস্যা নিয়ে। অলিতে-গলিতে, গ্রামে-গঞ্জে, পাড়া-মহল্লায় কোথায় এখন মাদক নেই? ঘরে ঘরে এখন ইয়াবা। যেটা ধরা পড়ে সেটা খুবই সামান্য। বেশিরভাগই থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। সেবনকারীরাও অর্থ জোগাড়ে এক সময়ে ব্যবসা করছে। একজন মাদকাসক্ত দুই বছরে আরও পাঁচজন তৈরি করছে।

বিভিন্ন পরিসংখ্যান উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, দেশে মাদকসেবীর সংখ্যা এখন ২ কোটি হবে। এর মধ্যে দেড় কোটি নিয়মিত। ৫০ লাখের মতো অনিয়মিত। দেশে মাদকসেবীরা গড়ে প্রতিদিন অন্তত ২০ কোটি টাকার মাদক সেবন করে। এসব অর্থের বড় অংশ পাচার হয়ে যায়। তিনি বলেন, অপরাধের জনক হচ্ছে মাদক। ধর্ষণ, হত্যা, ছিনতাই, রাহাজানিসহ যত রকমের অপরাধ হয় সবকিছুর মূলেই এর প্রভাব থাকে।

পাঁচ বছরে মাদক উদ্ধারের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০০৯-২০ সাল পর্যন্ত ইয়াবা, হেরোইন, কোকেন, আফিম, গাঁজা, ফেনসিডিল, বিদেশি মদ, বিয়ার ও ইনজেকটিং ড্রাগের ব্যবহার ক্রমশই বেড়েছে। এ ১২ বছরে শুধু এই নয়টি মাদক যে পরিমাণে উদ্ধার হয়েছে প্রচলিত দাম অনুযায়ী টাকার অঙ্কে তার পরিমাণ দাঁড়ায় আনুমানিক ১৪ হাজার ৩১৩ কোটি ৭৯ লাখ ৬২ হাজার ১৩০ টাকা।

পাঁচ সংস্থার মাদক উদ্ধারের ঘটনায় এক যুগে ৭ লাখ ৯৩ হাজার ৩৮২টি মামলা হয়। সর্বোচ্চ মামলা হয় ২০১৯ সালে ১ লাখ ২৪ হাজার ৯৮টি এবং সর্বনিম্ন হয় ২০০৯ সালে ২৭ হাজার ৪৪১টি। মোট মামলায় আসামি করা হয় ১০ লাখ ১০ হাজার ৭১৮ জনকে। ২০১৯ সালে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৬২ হাজার ৮৪৭ জন আসামি হন এবং ২০০৯ সালে সর্বনিম্ন ৩৪ হাজার ৩১৫ জন আসামি হন।

উদ্ধারকৃত মাদকের চিত্র বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, ক্রমশই এর বিস্তার বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০০৯ সাল থেকে ইয়াবা ৪০ হাজারের বেশি গুণ বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৯ সালে ৫ কোটি ৩০ লাখ ৪৮ হাজার ৫৪৮ পিস হয়েছে। ২০১৭ সাল থেকে মাদক উদ্ধারের ঘটনায় মামলা ১ লাখ ছাড়ানো শুরু হয়েছে। এরপর আর তা লাখের নিচে নামেনি।

একইভাবে এসব মামলায় আসামির তালিকাও ২০১৭ সাল থেকে এক লাখের উপরে গিয়েছে। তালিকা ক্রমশই বড় হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাদকের বিস্তার বৃদ্ধি পাওয়ায় উদ্ধারও বেড়েছে।

জানতে চাইলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ আহসানুল জব্বার যুগান্তরকে বলেন, মাদকের ব্যবহার ক্রমশই বাড়ছে। সেটা শুধু করোনার জন্যই নয়, সামগ্রিকভাবেই বাড়ছে। আমরা সব ধরনের চেষ্টা করছি মাদক নিয়ন্ত্রণে। যেসব সীমাবদ্ধতা রয়েছে সেগুলো নিরসনে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে উদ্ধারকারী সংস্থাগুলোর পাশাপাশি মাদক নিয়ন্ত্রণে সামাজিক সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই মাদক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।

এক সাক্ষাৎকারে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার একেএম হাফিজ আক্তার যুগান্তরকে বলেন, মাদক নিয়ন্ত্রণ একটি মাল্টি অরগানাইজেশনাল টাস্ক। এটা নিয়ে আরও বেশি কাজ করতে হবে। আরও মনোযোগী হয়ে কঠোর অ্যাকশনে গেলে সম্ভব। মাদকের প্রভাব অপরাধেও পড়ছে। একটি প্রজন্ম ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এটা সমাজের জন্য বিষফোঁড়া।

মাদককে কেন্দ্র করে কিশোর গ্যাং গঠনসহ বিভিন্ন অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। ৫ জুন গাজীপুরের টঙ্গীতে দুই পরিবারের সদস্যদের ওপর নৃশংস হামলার ঘটনায় জড়িত মো. রাজিব চৌধুরী বাপ্পি ওরফে লন্ডন বাপ্পিসহ ১২ কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব-১। এ সময় তাদের কাছ থেকে ২টি বিদেশি পিস্তল, ২টি চাপাতি, একটি ছুরি উদ্ধার করা হয়।

র‌্যাব জানায়, এ গ্যাং গড়ে ওঠার পেছনেও কাজ করেছে মাদক সেবন ও বাণিজ্য। গ্যাং সদস্যদের প্রতিদিন ৩০০-৪০০ করে টাকা দেওয়া হতো। যা খরচ হতো মাদক সেবনে। আবার মাদক বিক্রি করে এ অর্থের বড় একটি অংশ আসত।

জানতে চাইলে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন যুগান্তরকে বলেন, দেশে মাদকের চাহিদা আছে বলেই এটা আসছেও বেশি। মাদকের বিস্তার প্রতিরোধে পারিবারের ভূমিকা সবচেয়ে মুখ্য। মাদক যে শুধু শারীরিক সমস্যা তৈরি করছে তা নয়, বরং গ্যাং কালচারসহ অন্যান্য অপরাধের মূলেও রয়েছে মাদক। কিশোর গ্যাং পরিচালনা করতে গিয়ে মাদক গ্রহণ ও ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছে অনেকে। গাজীপুরের ঘটনা যার অন্যতম প্রমাণ।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন