রিজার্ভ চুরির পেছনে ত্রুটিযুক্ত প্রিন্টার
jugantor
বিবিসির প্রতিবেদনে চাঞ্চল্যকর তথ্য
রিজার্ভ চুরির পেছনে ত্রুটিযুক্ত প্রিন্টার
হ্যাকিংয়ে জড়িত উত্তর কোরিয়ার লাজারাস গ্রুপ * টার্গেট ছিল ১০০ কোটি ডলার চুরি

  যুগান্তর ডেস্ক  

২২ জুন ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

২০১৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে অর্থ চুরির পেছনে ছিল একটি ত্রুটিযুক্ত প্রিন্টার। ওই হ্যাকিংয়ের ঘটনা ঘটিয়েছিল উত্তর কোরিয়ার লাজারাস গ্রুপ। তাদের টার্গেট ছিল ১০০ কোটি ডলার চুরি করা। তাতে পুরোপুরি সফল না হলেও ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার হাতিয়ে নিয়েছিল তারা। অর্থ সরাতে হ্যাকাররা নকল ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, দাতব্য সংস্থা, ক্যাসিনোসহ বিস্তৃত নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে। সোমবার বিবিসির এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ ব্যাংক ভবনের দশম তলায় খুবই সুরক্ষিত একটি কক্ষে ওই প্রিন্টারটি রাখা ছিল। ব্যাংকের কোটি কোটি ডলার ট্রান্সফারের তথ্য এই প্রিন্টারের মাধ্যমে ছাপানো হতো। শুরুতে কর্মকর্তাদের কাছে প্রিন্টারটি ছিল কেবলই একটি ঝামেলা। প্রযুক্তির সমস্যা ছাড়া তেমন একটা বড় ব্যাপার বলে মনে হয়নি কারও কাছে। কিন্তু এটি কোনো সাধারণ প্রিন্টার বা ব্যাংক ছিল না-বাংলাদেশ ব্যাংক হলো দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। যেটি এমন একটি দেশের মূল্যবান মুদ্রার মজুত তদারকির জন্য দায়বদ্ধ, যেখানে লাখ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করে।

এতে বলা হয়, ২০১৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি সকাল ৮টা ৪৫ মিনিটে ব্যাংকের কর্তব্যরত কর্মী লক্ষ করলেন, প্রিন্টারটি কাজ করছে না। হ্যাকিংয়ের ঘটনার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি ম্যানেজার জুবাইর বিন হুদা পুলিশকে বলেছিলেন, ‘ত্রুটিযুক্ত হওয়ার কারণে সেদিন আমরা ধরে নিয়েছিলাম প্রিন্টারটি অন্যদিনের মতোই সমস্যা করছে।’ মূলত বাংলাদেশ ব্যাংক যে নানা সমস্যায় জর্জরিত, সেটিই যেন প্রথম প্রকাশ পেয়েছিল এই ঘটনার মাধ্যমে। হ্যাকাররা এর কম্পিউটার নেটওয়ার্ক ব্যবস্থায় ঢুকে পড়েছিল। আর যা কি না এখন পর্যন্ত সর্বকালের সবচেয়ে সাহসী সাইবার হামলা ছিল।

বিবিসির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এফবিআই-এর তদন্ত অনুযায়ী, এই হ্যাকিংয়ের ঘটনা বহুদিনের পরিকল্পনার ফসল। এশিয়ার বেশ কয়েকটি হ্যাকার দল ও দালালচক্র এর পেছনে কাজ করেছে। যাদের মদদ দিয়েছে উত্তর কোরিয়া সরকার। সাইবার নিরাপত্তা ইন্ডাস্ট্রিতে উত্তর কোরিয়ার হ্যাকাররা ‘লাজারাস গ্রুপ’ নামে পরিচিত। বাইবেলে লাজারাস নামে এক ব্যক্তির উল্লেখ আছে, যিনি মৃত ব্যক্তিদের মধ্য থেকে ফিরে এসেছিলেন। এ নামকেই বেছে নিয়েছে হ্যাকাররা। এই গ্রুপটি সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য পাওয়া যায় না। এফবিআই সন্দেহভাজন এক ব্যক্তির স্কেচ করিয়েছে, যার নাম পার্ক জিন হিয়ক। ওই ব্যক্তি পার্ক জিন-হেক বা পার্ক কোয়াং-জিন নামেও পরিচিত।

ব্যাংকের কর্মীরা যখন ‘নষ্ট প্রিন্টারটি’ পুনরায় চালু করেন, তখন তারা রক্ত হিম হওয়া তথ্য পান। তারা বুঝতে পারেন, যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভে জরুরি বার্তা গেছে সেখান থেকে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার ছাড় করতে ফেডের কাছে নির্দেশনা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে দ্রুত যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে এক্ষেত্রে বাদ সাধে ‘টাইম জোন’।

হ্যাকাররা ঘটনা ঘটায় বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার রাত ৮টায়, তখন ছিল নিউইয়র্কে বৃহস্পতিবার সকাল। অর্থাৎ বাংলাদেশে ব্যাংকিং কার্যক্রম বন্ধ ছিল; কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে তখন সব সচল। অন্যদিকে, শুক্র ও শনিবার বাংলাদেশে সাপ্তাহিক ছুটি। শনিবার যখন বাংলাদেশে চুরিটি উদ্ঘাটন শুরু হয়, তখন আবার নিউইয়র্কের সাপ্তাহিক ছুটি শুরু হয়ে যায়। এখানে হ্যাকাররা আরও একটি বুদ্ধি খাটায়। একবার যখন তারা ফেড থেকে অর্থ স্থানান্তর করতে পারে, তখন তাদের এটি অন্য কোথাও পাঠানোর প্রয়োজন ছিল। তারা এই জায়গা হিসাবে ফিলিপাইনের ম্যানিলাকে বেছে নেয়। কারণ, ২০১৬ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি সোমবার ছিল লুনার ইয়ারের প্রথম দিন। এশিয়ায় ছুটির দিন। অর্থাৎ ‘টাইম জোন’ কাজে লাগিয়ে পাঁচ দিন হাতে পেয়েছিল হ্যাকাররা।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে একটি মেইল পাঠানো হয়। রাসেল আহলাম নামে এক ব্যক্তি চাকরির আবেদন করেন। মেইলে একটি সিভি যুক্ত ছিল। বাস্তবে ওই নামের কোনো ব্যক্তির অস্তিত্ব নেই। লাজারাস গ্রুপ থেকে ওই মেইল পাঠানো হয়। এফবিআই-এর তদন্তকারীরা এসব তথ্য প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো এক কর্মকর্তা লাজারাস গ্রুপের ফাঁদে পা দিয়ে মেইলে সংযুক্ত সিভি ডাউনলোড করেন। এতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কম্পিউটার সিস্টেম ভাইরাস আক্রান্ত হয়। যে ভাইরার সংযুক্ত ডকুমেন্টের সঙ্গে লুকানো ছিল। এরপর থেকে হ্যাকাররা বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিটি কম্পিউটারের তথ্য নাড়াচাড়া করতে থাকে। তারা ডিজিটাল ভল্টের দেখাও পেয়ে যায়।

এরপর তারা এক বছর নিশ্চুপ ছিল। এই এক বছরে তারা ডলার বের করে রাখার জন্য সুরক্ষিত জায়গা তৈরি করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কম্পিউটার সিস্টেমের একসেস পাওয়ার পর হ্যাকাররা ম্যানিলায় চারটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট তৈরি করে। ভুয়া ড্রাইভিং লাইসেন্স ব্যবহার করে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা হয়। প্রতিটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট গ্রাহকের কাজের ধরন এবং বেতন উল্লেখ করা ছিল একই। তবে চাকরির নিয়োগকারী কোম্পানি ছিল ভিন্ন ভিন্ন। প্রতিটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ছিল সুপ্ত। সেগুলোয় কোনো লেনদেন ছিল না।

হ্যাকিংয়ের পর বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তারা অর্থ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করেন। তারা ম্যানিলায় যান অর্থের খোঁজে। কিন্তু ততদিনে পাচার করা অর্থ ম্যানিলার বিভিন্ন ক্যাসিনোতে লগ্নি করা হয়ে গেছে। কিন্তু ক্যাসিনোগুলোকে আইনের আওতায় আনার কোনো উপায় ছিল না। কারণ ফিলিপাইনে পাচার করা অর্থ ক্যাসিনোতে ব্যবহার করা হলে ক্যাসিনোর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো নীতিমালা নেই।

বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তারা মাইডাস ক্যাসিনোর এক জুয়াড়ির কাছ থেকে মাত্র ১ কোটি ৬০ লাখ ডলার উদ্ধার করতে পেরেছিলেন। ওই জুয়াড়ির বিরুদ্ধে মামলা করা হলেও পরে সে ছাড়া পেয়ে যায়।

কে এই পার্ক জিন হিয়ক : সন্দেহভাজন পার্ক জিন হিয়ক পেশায় একজন কম্পিউটার প্রোগ্রামার। তিনি নর্থ কোরিয়ার শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক করেছেন। পরে চোসান এক্সপো নামে একটি কোম্পানিতে কাজ শুরু করেন। চীনের বন্দরনগরী দালিয়ানে কোম্পানির কার্যালয়। কোম্পানিটি সারা বিশ্বের গ্রাহকদের জন্য অনলাইন গেম ও জুয়া খেলার প্রোগ্রাম তৈরি করে।

এফবিআই জানায়, পার্ক জিন হিয়ক হলেন দিনের আলোয় প্রোগ্রামার আর রাতের অন্ধকারে দুর্র্ধর্ষ হ্যাকার। দালিয়ান শহরে থাকাকালে পার্ক জিন হিয়ক সোশ্যাল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে। ২০১৩ অথবা ২০১৪ সাল পর্যন্ত তিনি দালিয়ান শহরেই ছিলেন। এরপর থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত সারা বিশ্বে নানা ধরনের হ্যাকিং কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন জিন হিয়ক। ধরা পড়লে তার অন্তত ২০ বছরের কারাদণ্ড হবে। তবে পার্ক কিন্তু রাতারাতি একজন হ্যাকার হয়ে উঠেননি। উত্তর কোরিয়ার হাজারো হ্যাকারের একজন পার্ক। বছরের পর বছর এদেরকে লালনপালন করা হয়েছে। গণিতে দক্ষ কিশোরদের বেছে নিয়ে উত্তর কোরিয়ার রাজধানীতে পাঠানো হয়। সেখানে লেখাপড়া করানো হয়। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত তাদের নিবিড়ভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

বিবিসির প্রতিবেদনে চাঞ্চল্যকর তথ্য

রিজার্ভ চুরির পেছনে ত্রুটিযুক্ত প্রিন্টার

হ্যাকিংয়ে জড়িত উত্তর কোরিয়ার লাজারাস গ্রুপ * টার্গেট ছিল ১০০ কোটি ডলার চুরি
 যুগান্তর ডেস্ক 
২২ জুন ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

২০১৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে অর্থ চুরির পেছনে ছিল একটি ত্রুটিযুক্ত প্রিন্টার। ওই হ্যাকিংয়ের ঘটনা ঘটিয়েছিল উত্তর কোরিয়ার লাজারাস গ্রুপ। তাদের টার্গেট ছিল ১০০ কোটি ডলার চুরি করা। তাতে পুরোপুরি সফল না হলেও ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার হাতিয়ে নিয়েছিল তারা। অর্থ সরাতে হ্যাকাররা নকল ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, দাতব্য সংস্থা, ক্যাসিনোসহ বিস্তৃত নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে। সোমবার বিবিসির এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ ব্যাংক ভবনের দশম তলায় খুবই সুরক্ষিত একটি কক্ষে ওই প্রিন্টারটি রাখা ছিল। ব্যাংকের কোটি কোটি ডলার ট্রান্সফারের তথ্য এই প্রিন্টারের মাধ্যমে ছাপানো হতো। শুরুতে কর্মকর্তাদের কাছে প্রিন্টারটি ছিল কেবলই একটি ঝামেলা। প্রযুক্তির সমস্যা ছাড়া তেমন একটা বড় ব্যাপার বলে মনে হয়নি কারও কাছে। কিন্তু এটি কোনো সাধারণ প্রিন্টার বা ব্যাংক ছিল না-বাংলাদেশ ব্যাংক হলো দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। যেটি এমন একটি দেশের মূল্যবান মুদ্রার মজুত তদারকির জন্য দায়বদ্ধ, যেখানে লাখ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করে।

এতে বলা হয়, ২০১৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি সকাল ৮টা ৪৫ মিনিটে ব্যাংকের কর্তব্যরত কর্মী লক্ষ করলেন, প্রিন্টারটি কাজ করছে না। হ্যাকিংয়ের ঘটনার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি ম্যানেজার জুবাইর বিন হুদা পুলিশকে বলেছিলেন, ‘ত্রুটিযুক্ত হওয়ার কারণে সেদিন আমরা ধরে নিয়েছিলাম প্রিন্টারটি অন্যদিনের মতোই সমস্যা করছে।’ মূলত বাংলাদেশ ব্যাংক যে নানা সমস্যায় জর্জরিত, সেটিই যেন প্রথম প্রকাশ পেয়েছিল এই ঘটনার মাধ্যমে। হ্যাকাররা এর কম্পিউটার নেটওয়ার্ক ব্যবস্থায় ঢুকে পড়েছিল। আর যা কি না এখন পর্যন্ত সর্বকালের সবচেয়ে সাহসী সাইবার হামলা ছিল।

বিবিসির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এফবিআই-এর তদন্ত অনুযায়ী, এই হ্যাকিংয়ের ঘটনা বহুদিনের পরিকল্পনার ফসল। এশিয়ার বেশ কয়েকটি হ্যাকার দল ও দালালচক্র এর পেছনে কাজ করেছে। যাদের মদদ দিয়েছে উত্তর কোরিয়া সরকার। সাইবার নিরাপত্তা ইন্ডাস্ট্রিতে উত্তর কোরিয়ার হ্যাকাররা ‘লাজারাস গ্রুপ’ নামে পরিচিত। বাইবেলে লাজারাস নামে এক ব্যক্তির উল্লেখ আছে, যিনি মৃত ব্যক্তিদের মধ্য থেকে ফিরে এসেছিলেন। এ নামকেই বেছে নিয়েছে হ্যাকাররা। এই গ্রুপটি সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য পাওয়া যায় না। এফবিআই সন্দেহভাজন এক ব্যক্তির স্কেচ করিয়েছে, যার নাম পার্ক জিন হিয়ক। ওই ব্যক্তি পার্ক জিন-হেক বা পার্ক কোয়াং-জিন নামেও পরিচিত।

ব্যাংকের কর্মীরা যখন ‘নষ্ট প্রিন্টারটি’ পুনরায় চালু করেন, তখন তারা রক্ত হিম হওয়া তথ্য পান। তারা বুঝতে পারেন, যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভে জরুরি বার্তা গেছে সেখান থেকে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার ছাড় করতে ফেডের কাছে নির্দেশনা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে দ্রুত যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে এক্ষেত্রে বাদ সাধে ‘টাইম জোন’।

হ্যাকাররা ঘটনা ঘটায় বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার রাত ৮টায়, তখন ছিল নিউইয়র্কে বৃহস্পতিবার সকাল। অর্থাৎ বাংলাদেশে ব্যাংকিং কার্যক্রম বন্ধ ছিল; কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে তখন সব সচল। অন্যদিকে, শুক্র ও শনিবার বাংলাদেশে সাপ্তাহিক ছুটি। শনিবার যখন বাংলাদেশে চুরিটি উদ্ঘাটন শুরু হয়, তখন আবার নিউইয়র্কের সাপ্তাহিক ছুটি শুরু হয়ে যায়। এখানে হ্যাকাররা আরও একটি বুদ্ধি খাটায়। একবার যখন তারা ফেড থেকে অর্থ স্থানান্তর করতে পারে, তখন তাদের এটি অন্য কোথাও পাঠানোর প্রয়োজন ছিল। তারা এই জায়গা হিসাবে ফিলিপাইনের ম্যানিলাকে বেছে নেয়। কারণ, ২০১৬ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি সোমবার ছিল লুনার ইয়ারের প্রথম দিন। এশিয়ায় ছুটির দিন। অর্থাৎ ‘টাইম জোন’ কাজে লাগিয়ে পাঁচ দিন হাতে পেয়েছিল হ্যাকাররা।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে একটি মেইল পাঠানো হয়। রাসেল আহলাম নামে এক ব্যক্তি চাকরির আবেদন করেন। মেইলে একটি সিভি যুক্ত ছিল। বাস্তবে ওই নামের কোনো ব্যক্তির অস্তিত্ব নেই। লাজারাস গ্রুপ থেকে ওই মেইল পাঠানো হয়। এফবিআই-এর তদন্তকারীরা এসব তথ্য প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো এক কর্মকর্তা লাজারাস গ্রুপের ফাঁদে পা দিয়ে মেইলে সংযুক্ত সিভি ডাউনলোড করেন। এতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কম্পিউটার সিস্টেম ভাইরাস আক্রান্ত হয়। যে ভাইরার সংযুক্ত ডকুমেন্টের সঙ্গে লুকানো ছিল। এরপর থেকে হ্যাকাররা বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিটি কম্পিউটারের তথ্য নাড়াচাড়া করতে থাকে। তারা ডিজিটাল ভল্টের দেখাও পেয়ে যায়।

এরপর তারা এক বছর নিশ্চুপ ছিল। এই এক বছরে তারা ডলার বের করে রাখার জন্য সুরক্ষিত জায়গা তৈরি করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কম্পিউটার সিস্টেমের একসেস পাওয়ার পর হ্যাকাররা ম্যানিলায় চারটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট তৈরি করে। ভুয়া ড্রাইভিং লাইসেন্স ব্যবহার করে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা হয়। প্রতিটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট গ্রাহকের কাজের ধরন এবং বেতন উল্লেখ করা ছিল একই। তবে চাকরির নিয়োগকারী কোম্পানি ছিল ভিন্ন ভিন্ন। প্রতিটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ছিল সুপ্ত। সেগুলোয় কোনো লেনদেন ছিল না।

হ্যাকিংয়ের পর বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তারা অর্থ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করেন। তারা ম্যানিলায় যান অর্থের খোঁজে। কিন্তু ততদিনে পাচার করা অর্থ ম্যানিলার বিভিন্ন ক্যাসিনোতে লগ্নি করা হয়ে গেছে। কিন্তু ক্যাসিনোগুলোকে আইনের আওতায় আনার কোনো উপায় ছিল না। কারণ ফিলিপাইনে পাচার করা অর্থ ক্যাসিনোতে ব্যবহার করা হলে ক্যাসিনোর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো নীতিমালা নেই।

বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তারা মাইডাস ক্যাসিনোর এক জুয়াড়ির কাছ থেকে মাত্র ১ কোটি ৬০ লাখ ডলার উদ্ধার করতে পেরেছিলেন। ওই জুয়াড়ির বিরুদ্ধে মামলা করা হলেও পরে সে ছাড়া পেয়ে যায়।

কে এই পার্ক জিন হিয়ক : সন্দেহভাজন পার্ক জিন হিয়ক পেশায় একজন কম্পিউটার প্রোগ্রামার। তিনি নর্থ কোরিয়ার শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক করেছেন। পরে চোসান এক্সপো নামে একটি কোম্পানিতে কাজ শুরু করেন। চীনের বন্দরনগরী দালিয়ানে কোম্পানির কার্যালয়। কোম্পানিটি সারা বিশ্বের গ্রাহকদের জন্য অনলাইন গেম ও জুয়া খেলার প্রোগ্রাম তৈরি করে।

এফবিআই জানায়, পার্ক জিন হিয়ক হলেন দিনের আলোয় প্রোগ্রামার আর রাতের অন্ধকারে দুর্র্ধর্ষ হ্যাকার। দালিয়ান শহরে থাকাকালে পার্ক জিন হিয়ক সোশ্যাল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে। ২০১৩ অথবা ২০১৪ সাল পর্যন্ত তিনি দালিয়ান শহরেই ছিলেন। এরপর থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত সারা বিশ্বে নানা ধরনের হ্যাকিং কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন জিন হিয়ক। ধরা পড়লে তার অন্তত ২০ বছরের কারাদণ্ড হবে। তবে পার্ক কিন্তু রাতারাতি একজন হ্যাকার হয়ে উঠেননি। উত্তর কোরিয়ার হাজারো হ্যাকারের একজন পার্ক। বছরের পর বছর এদেরকে লালনপালন করা হয়েছে। গণিতে দক্ষ কিশোরদের বেছে নিয়ে উত্তর কোরিয়ার রাজধানীতে পাঠানো হয়। সেখানে লেখাপড়া করানো হয়। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত তাদের নিবিড়ভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন