করোনা আতঙ্কেও ঈদ আনন্দ
jugantor
পবিত্র ঈদুল আজহা কাল
করোনা আতঙ্কেও ঈদ আনন্দ

  যুগান্তর প্রতিবেদন  

২০ জুলাই ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আগামীকাল বুধবার (১০ জিলহজ) পবিত্র ঈদুল-আজহা। বাঙালি সমাজে ‘কুরবানির ঈদ’ নামেও পরিচিত মুসলমানদের এই অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। এদিন দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলিমরা ত্যাগের মহিমায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ঈদের নামাজ শেষে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি আদায়ে পশু কুরবানি দেবেন। বিশ্বের মুসলিমরা ১০ জিলহজ পশু কুরবানি করে থাকেন। তবে ১১ ও ১২ জিলহজও পশু কোরবানি করার বিধান রয়েছে। করোনা সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় ঈদের একদিন পরই ২৩ জুলাই ভোর ৬টা থেকে ৫ আগস্ট মধ্যরাত পর্যন্ত সারা দেশে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের ঘোষণা আগেই দিয়ে রেখেছে সরকার। ফলে চলমান করোনাভাইরাসের সংক্রমণ, আক্রান্ত হওয়ার ভয় ও কঠোর বিধিনিষেধ থাকার পরও ঈদ আনন্দে ভাটা পড়েনি। কারণ নাড়ির টানে বাড়ি ফিরতে কয়েকদিন ধরে দেখা গেছে গণপরিবহণে উপচে পড়া ভিড়। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পশুর হাটেও ছিল মানুষের ঢল।

করোনাভাইরাস সংক্রমণ ঠেকাতে গত বছর ঈদগাহ মাঠ বা উন্মুক্ত স্থানে ঈদের জামাত অনুষ্ঠানে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল সরকার। এবার ঈদের জামাত মসজিদ, ঈদগাহ না খোলা জায়গায় আয়োজন করা হবে, তা জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা করে নির্ধারণ করবে স্থানীয় প্রশাসন। সরকারের পক্ষ থেকে এমন ঘোষণা দেওয়া হলেও এবারও জাতীয় ঈদগাহ মাঠে ঈদের কোনো জামাত অনুষ্ঠিত হচ্ছে না। এর পরিবর্তে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে ঈদের প্রধান জামাতসহ ৫টি জামাত অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন। ফলে রাজধানীসহ সারা দেশের মসজিদগুলোয়ই স্বাস্থ্যবিধি মেনে সবাইকে ঈদের নামাজ পড়তে হবে। নামাজ শেষে কারও সঙ্গে কোলাকুলি বা হাত মেলানো যাবে না। শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বব্যাপী চলছে করোনা মহামারির তা-ব। যার কারণে আজ (মঙ্গলবার) সীমিত আকারে অনুষ্ঠিত হচ্ছে পবিত্র হজ। সেখানে অংশ নিচ্ছেন সৌদি আরবে অবস্থানরত মাত্র ৬০ হাজার মুসল্লি। গত বছরও করোনার কারণেই হজে অংশ নিয়েছিলেন ১০ হাজার মুসল্লি। অথচ প্রতিবছর গড়ে ২০ লাখের বেশি মানুষ হজে অংশগ্রহণ করেন।

করোনার সময় উদ্যাপিত গত ঈদুলফিতরের মতো অনেকেই এবারের ঈদুল-আজহাকে ‘ঘরবন্দি মানুষ’-এর ঈদ বলে আখ্যায়িত করেছেন। কারণ ঈদের আনন্দ বলতে আমরা যা বুঝি তার অনেক কিছুই এবার করা যাবে না করোনা পরিস্থিতির কারণে। গতবারের তুলনায় এবার গ্রামে করোনায় মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যা বেশি হওয়ায় মানুষের মধ্যে বিরাজ করছে এক ধরনের আতঙ্ক। তবে মহামারির কারণে কিছুটা কম হলেও সারা দেশে বিরাজ করছে ঈদের আমেজ। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিজ নিজ কর্মস্থলেই থাকতে নির্দেশ দিয়েছে সরকার। তারপরও রাজধানী ঢাকা বা দেশের অন্য এলাকায় যারা জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে থাকেন, তারা অনেকেই বরাবরের মতো গ্রামের বাড়ি গেছেন। কষ্ট ভোগ করে লাখো মানুষ ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে স্বজনদের কাছে ছুটে গেছেন। আজও অনেকে বাড়ি যাবেন। তবে করোনা আতঙ্কের কারণে এবার গ্রামে মানুষ যাওয়ার ঢল অন্যান্য বছরের তুলনায় কিছুটা কম। রাজধানীসহ সারা দেশের মানুষের মধ্যেই করোনার আতঙ্ক বিরাজ করছে। তারপরও আল্লাহর সন্তুষ্ট লাভের আশায় তারা কষ্ট শিকার করে গ্রামে যাচ্ছেন কুরবানি দিতে। কিন্তু এই ঈদযাত্রায় অনেকেই স্বাস্থ্যবিধি মানছেন না। মাস্ক পরছেন না, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখছেন না। ফলে করোনা সংক্রমণ বাড়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ঈদুল-আজহা ইব্রাহিম (আ.) ও তার পুত্র ইসমাইল (আ.)-এর সঙ্গে সম্পর্কিত। ইব্রাহিম (আ.) স্বপ্নে আদিষ্ট হয়ে পুত্র ইসমাইলকে আল্লাহর উদ্দেশে কুরবানি করতে গিয়েছিলেন। আল্লাহর পক্ষ থেকে এ আদেশ ছিল ইব্রাহিমের জন্য পরীক্ষা। তিনি পুত্রকে আল্লাহর নির্দেশে জবাই করার সব প্রস্তুতি নিয়ে সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ। বর্ণিত আছে, নিজের চোখ বেঁধে পুত্র ইসমাইলকে বেঁধে যখন জবাই সম্পন্ন করেন, তখন চোখ খুলে দেখেন ইসমাইলের পরিবর্তে পশু কুরবানি হয়েছে, যা এসেছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে। সেই ঐতিহাসিক ঘটনার স্মৃতি ধারণ করেই ইব্রাহিম (আ.)-এর ওয়াজিব হিসাবে পশু জবাইয়ের মধ্য দিয়ে কুরবানির বিধান এসেছে ইসলামি শরিয়তে। সেই মোতাবেক প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলমানের জন্য পশু কুরবানি করা ওয়াজিব।

দেশবাসীকে ঈদুল-আজহার শুভেচ্ছা জানিয়ে বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পৃথক বাণীতে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা রওশন এরশাদ, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের প্রমুখ। এসব বাণীতে তারা দেশবাসীকে ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়ে দেশ, জাতিসহ গোটা মুসলিম উম্মাহর কল্যাণ ও বিশ্ব শান্তি কামনা করেছেন। ঈদুল আজহা উপলক্ষ্যে রাষ্ট্রীয়ভাবে সরকারি, আধাসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের ভবনগুলোয় আলোকসজ্জা করা হয়েছে। জাতীয় সংবাদপত্রগুলো বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতারসহ বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলো ঈদ উপলক্ষ্যে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা সম্প্রচার করবে। ঈদের দিন সরকারিভাবে হাসপাতাল, কারাগার, এতিমখানা ও শিশুসদনে উন্নত বিশেষ খাবার পরিবেশন করা হবে।

আগামীকাল সকালে মুসল্লিরা নিকটস্থ মসজিদে স্বাস্থ্যবিধি মেনে ঈদুল-আজহার দুই রাকাত ওয়াজিব নামাজ আদায় করবেন। খতিব নামাজের খুতবায় তুলে ধরবেন কুরবানির তাৎপর্য। রাজধানীর বায়তুল মুকাররম জাতীয় মসজিদেও প্রধান জামাত সকাল ৭টায় অনুষ্ঠিত হবে। ঈদের জামাতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে র‌্যাব ও পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সার্বক্ষণিক নজরদারিতে থাকবেন।

ঈদের জামাতে মানতে হবে ১২ নির্দেশনা : ঈদুল-আজহার নামাজের বিষয়ে কয়েকটি নির্দেশনা দিয়ে গত ১৩ জুলাই বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে ধর্ম মন্ত্রণালয়। এতে বলা হয়-করোনাভাইরাসজনিত রোগ (কোভিড-১৯) সংক্রমণ পরিস্থিতি বিবেচনায় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে কতিপয় বিধিনিষেধ আরোপ করে নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে দেশের বর্তমান কোভিড-১৯ সংক্রমণ পরিস্থিতি বিবেচনায় স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের জারি করা স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে শর্তসাপেক্ষে পবিত্র ঈদুল-আজহার নামাজের জামাত আদায়ের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ করা হলো।

নির্দেশনাগুলো হলো-১. করোনাভাইরাসের স্থানীয় পরিস্থিতি ও মুসল্লিদের জীবন-ঝুঁকি বিবেচনা করে স্থানীয় প্রশাসন কর্তৃক জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা ও সমন্বয় করে যথোপযুক্ত বিবেচিত হলে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের জারি করা স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে ঈদুল-আজহার জামাত মসজিদ, ঈদগাহ বা খোলা জায়গায় আয়োজনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন।

২. মসজিদে ঈদের নামাজ আয়োজনের ক্ষেত্রে কার্পেট বিছানো যাবে না। নামাজের আগে সম্পূর্ণ মসজিদ জীবাণুনাশক দিয়ে জীবাণুমুক্ত করতে হবে। মুসল্লিরা প্রত্যেকে নিজ নিজ দায়িত্বে জায়নামাজ নিয়ে আসবেন। ৩. প্রত্যেককে নিজ নিজ বাসা থেকে ওজু করে মসজিদ/ঈদগাহে আসতে হবে এবং ওজু করার সময় কমপক্ষে ২০ সেকেন্ড সাবান-পানি দিয়ে হাত ধুতে হবে।

৪. করোনাভাইরাস সংক্রমণরোধ নিশ্চিতে মসজিদ/ঈদগাহে ওজুর স্থানে সাবান, পানি ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার রাখতে হবে। ৫. মসজিদ/ঈদগাহ মাঠের প্রবেশদ্বারে হ্যান্ড স্যানিটাইজার/হাত ধোয়ার ব্যবস্থাসহ সাবান ও পানি রাখতে হবে। ৬. ঈদের নামাজের জামাতে আগত মুসল্লিকে অবশ্যই মাস্ক পরে আসতে হবে। মসজিদে সংরক্ষিত জায়নামাজ ও টুপি ব্যবহার করা যাবে না।

৭. ঈদের নামাজ আদায়ের সময় কাতারে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি অবশ্যই অনুসরণ করে দাঁড়াতে হবে এবং এক কাতার অন্তর কাতার করতে হবে। ৮. শিশু, বয়োবৃদ্ধ, অসুস্থ ব্যক্তি এবং অসুস্থদের সেবায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের ঈদের নামাজের জামাতে অংশগ্রহণ নিরুৎসাহিত করা হলো।

৯. সর্বসাধারণের সুরক্ষা নিশ্চিতে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণকারী বাহিনীর নির্দেশনা অবশ্যই অনুসরণ করতে হবে। ১০. করোনাভাইরাস সংক্রমণরোধ নিশ্চিতে ঈদের জামাত শেষে কোলাকুলি এবং পরস্পর হাত মেলানো পরিহার করতে হবে। ১১. করোনা মহামারির এ বৈশ্বিক মহাবিপদ থেকে রক্ষা পেতে বেশি বেশি তওবা, আস্তাগফিরুল্লাহ ও কুরআন তিলাওয়াত করতে হবে এবং আমাদের কৃত অন্যায়-অপরাধের জন্য ঈদের নামাজ শেষে মহান রাব্বুল আলামিনের দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে।

১২. খতিব, ইমাম, মসজিদ/ঈদগাহ পরিচালনা কমিটি ও স্থানীয় প্রশাসন কর্তৃক নির্দেশনাগুলোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। এসব নির্দেশনা লঙ্ঘিত হলে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণকারী বাহিনী সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস সংক্রমণরোধে স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণকারী বাহিনী, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সংশ্লিষ্ট মসজিদের পরিচালনা কমিটি উল্লিখিত নির্দেশনা বাস্তবায়ন করবেন।

পবিত্র ঈদুল আজহা কাল

করোনা আতঙ্কেও ঈদ আনন্দ

 যুগান্তর প্রতিবেদন 
২০ জুলাই ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আগামীকাল বুধবার (১০ জিলহজ) পবিত্র ঈদুল-আজহা। বাঙালি সমাজে ‘কুরবানির ঈদ’ নামেও পরিচিত মুসলমানদের এই অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। এদিন দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলিমরা ত্যাগের মহিমায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ঈদের নামাজ শেষে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি আদায়ে পশু কুরবানি দেবেন। বিশ্বের মুসলিমরা ১০ জিলহজ পশু কুরবানি করে থাকেন। তবে ১১ ও ১২ জিলহজও পশু কোরবানি করার বিধান রয়েছে। করোনা সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় ঈদের একদিন পরই ২৩ জুলাই ভোর ৬টা থেকে ৫ আগস্ট মধ্যরাত পর্যন্ত সারা দেশে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের ঘোষণা আগেই দিয়ে রেখেছে সরকার। ফলে চলমান করোনাভাইরাসের সংক্রমণ, আক্রান্ত হওয়ার ভয় ও কঠোর বিধিনিষেধ থাকার পরও ঈদ আনন্দে ভাটা পড়েনি। কারণ নাড়ির টানে বাড়ি ফিরতে কয়েকদিন ধরে দেখা গেছে গণপরিবহণে উপচে পড়া ভিড়। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পশুর হাটেও ছিল মানুষের ঢল। 

করোনাভাইরাস সংক্রমণ ঠেকাতে গত বছর ঈদগাহ মাঠ বা উন্মুক্ত স্থানে ঈদের জামাত অনুষ্ঠানে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল সরকার। এবার ঈদের জামাত মসজিদ, ঈদগাহ না খোলা জায়গায় আয়োজন করা হবে, তা জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা করে নির্ধারণ করবে স্থানীয় প্রশাসন। সরকারের পক্ষ থেকে এমন ঘোষণা দেওয়া হলেও এবারও জাতীয় ঈদগাহ মাঠে ঈদের কোনো জামাত অনুষ্ঠিত হচ্ছে না। এর পরিবর্তে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে ঈদের প্রধান জামাতসহ ৫টি জামাত অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন। ফলে রাজধানীসহ সারা দেশের মসজিদগুলোয়ই স্বাস্থ্যবিধি মেনে সবাইকে ঈদের নামাজ পড়তে হবে। নামাজ শেষে কারও সঙ্গে কোলাকুলি বা হাত মেলানো যাবে না। শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বব্যাপী চলছে করোনা মহামারির তা-ব। যার কারণে আজ (মঙ্গলবার) সীমিত আকারে অনুষ্ঠিত হচ্ছে পবিত্র হজ। সেখানে অংশ নিচ্ছেন সৌদি আরবে অবস্থানরত মাত্র ৬০ হাজার মুসল্লি। গত বছরও করোনার কারণেই হজে অংশ নিয়েছিলেন ১০ হাজার মুসল্লি। অথচ প্রতিবছর গড়ে ২০ লাখের বেশি মানুষ হজে অংশগ্রহণ করেন। 

করোনার সময় উদ্যাপিত গত ঈদুলফিতরের মতো অনেকেই এবারের ঈদুল-আজহাকে ‘ঘরবন্দি মানুষ’-এর ঈদ বলে আখ্যায়িত করেছেন। কারণ ঈদের আনন্দ বলতে আমরা যা বুঝি তার অনেক কিছুই এবার করা যাবে না করোনা পরিস্থিতির কারণে। গতবারের তুলনায় এবার গ্রামে করোনায় মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যা বেশি হওয়ায় মানুষের মধ্যে বিরাজ করছে এক ধরনের আতঙ্ক। তবে মহামারির কারণে কিছুটা কম হলেও সারা দেশে বিরাজ করছে ঈদের আমেজ। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিজ নিজ কর্মস্থলেই থাকতে নির্দেশ দিয়েছে সরকার। তারপরও রাজধানী ঢাকা বা দেশের অন্য এলাকায় যারা জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে থাকেন, তারা অনেকেই বরাবরের মতো গ্রামের বাড়ি গেছেন। কষ্ট ভোগ করে লাখো মানুষ ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে স্বজনদের কাছে ছুটে গেছেন। আজও অনেকে বাড়ি যাবেন। তবে করোনা আতঙ্কের কারণে এবার গ্রামে মানুষ যাওয়ার ঢল অন্যান্য বছরের তুলনায় কিছুটা কম। রাজধানীসহ সারা দেশের মানুষের মধ্যেই করোনার আতঙ্ক বিরাজ করছে। তারপরও আল্লাহর সন্তুষ্ট লাভের আশায় তারা কষ্ট শিকার করে গ্রামে যাচ্ছেন কুরবানি দিতে। কিন্তু এই ঈদযাত্রায় অনেকেই স্বাস্থ্যবিধি মানছেন না। মাস্ক পরছেন না, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখছেন না। ফলে করোনা সংক্রমণ বাড়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। 

ঈদুল-আজহা ইব্রাহিম (আ.) ও তার পুত্র ইসমাইল (আ.)-এর সঙ্গে সম্পর্কিত। ইব্রাহিম (আ.) স্বপ্নে আদিষ্ট হয়ে পুত্র ইসমাইলকে আল্লাহর উদ্দেশে কুরবানি করতে গিয়েছিলেন। আল্লাহর পক্ষ থেকে এ আদেশ ছিল ইব্রাহিমের জন্য পরীক্ষা। তিনি পুত্রকে আল্লাহর নির্দেশে জবাই করার সব প্রস্তুতি নিয়ে সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ। বর্ণিত আছে, নিজের চোখ বেঁধে পুত্র ইসমাইলকে বেঁধে যখন জবাই সম্পন্ন করেন, তখন চোখ খুলে দেখেন ইসমাইলের পরিবর্তে পশু কুরবানি হয়েছে, যা এসেছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে। সেই ঐতিহাসিক ঘটনার স্মৃতি ধারণ করেই ইব্রাহিম (আ.)-এর ওয়াজিব হিসাবে পশু জবাইয়ের মধ্য দিয়ে কুরবানির বিধান এসেছে ইসলামি শরিয়তে। সেই মোতাবেক প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলমানের জন্য পশু কুরবানি করা ওয়াজিব।

দেশবাসীকে ঈদুল-আজহার শুভেচ্ছা জানিয়ে বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পৃথক বাণীতে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা রওশন এরশাদ, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের প্রমুখ। এসব বাণীতে তারা দেশবাসীকে ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়ে দেশ, জাতিসহ গোটা মুসলিম উম্মাহর কল্যাণ ও বিশ্ব শান্তি কামনা করেছেন। ঈদুল আজহা উপলক্ষ্যে রাষ্ট্রীয়ভাবে সরকারি, আধাসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের ভবনগুলোয় আলোকসজ্জা করা হয়েছে। জাতীয় সংবাদপত্রগুলো বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতারসহ বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলো ঈদ উপলক্ষ্যে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা সম্প্রচার করবে। ঈদের দিন সরকারিভাবে হাসপাতাল, কারাগার, এতিমখানা ও শিশুসদনে উন্নত বিশেষ খাবার পরিবেশন করা হবে।

আগামীকাল সকালে মুসল্লিরা নিকটস্থ মসজিদে স্বাস্থ্যবিধি মেনে ঈদুল-আজহার দুই রাকাত ওয়াজিব নামাজ আদায় করবেন। খতিব নামাজের খুতবায় তুলে ধরবেন কুরবানির তাৎপর্য। রাজধানীর বায়তুল মুকাররম জাতীয় মসজিদেও প্রধান জামাত সকাল ৭টায় অনুষ্ঠিত হবে। ঈদের জামাতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে র‌্যাব ও পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সার্বক্ষণিক নজরদারিতে থাকবেন।

ঈদের জামাতে মানতে হবে ১২ নির্দেশনা : ঈদুল-আজহার নামাজের বিষয়ে কয়েকটি নির্দেশনা দিয়ে গত ১৩ জুলাই বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে ধর্ম মন্ত্রণালয়। এতে বলা হয়-করোনাভাইরাসজনিত রোগ (কোভিড-১৯) সংক্রমণ পরিস্থিতি বিবেচনায় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে কতিপয় বিধিনিষেধ আরোপ করে নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে দেশের বর্তমান কোভিড-১৯ সংক্রমণ পরিস্থিতি বিবেচনায় স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের জারি করা স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে শর্তসাপেক্ষে পবিত্র ঈদুল-আজহার নামাজের জামাত আদায়ের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ করা হলো।

নির্দেশনাগুলো হলো-১. করোনাভাইরাসের স্থানীয় পরিস্থিতি ও মুসল্লিদের জীবন-ঝুঁকি বিবেচনা করে স্থানীয় প্রশাসন কর্তৃক জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা ও সমন্বয় করে যথোপযুক্ত বিবেচিত হলে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের জারি করা স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে ঈদুল-আজহার জামাত মসজিদ, ঈদগাহ বা খোলা জায়গায় আয়োজনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন।

২. মসজিদে ঈদের নামাজ আয়োজনের ক্ষেত্রে কার্পেট বিছানো যাবে না। নামাজের আগে সম্পূর্ণ মসজিদ জীবাণুনাশক দিয়ে জীবাণুমুক্ত করতে হবে। মুসল্লিরা প্রত্যেকে নিজ নিজ দায়িত্বে জায়নামাজ নিয়ে আসবেন। ৩. প্রত্যেককে নিজ নিজ বাসা থেকে ওজু করে মসজিদ/ঈদগাহে আসতে হবে এবং ওজু করার সময় কমপক্ষে ২০ সেকেন্ড সাবান-পানি দিয়ে হাত ধুতে হবে।

৪. করোনাভাইরাস সংক্রমণরোধ নিশ্চিতে মসজিদ/ঈদগাহে ওজুর স্থানে সাবান, পানি ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার রাখতে হবে। ৫. মসজিদ/ঈদগাহ মাঠের প্রবেশদ্বারে হ্যান্ড স্যানিটাইজার/হাত ধোয়ার ব্যবস্থাসহ সাবান ও পানি রাখতে হবে। ৬. ঈদের নামাজের জামাতে আগত মুসল্লিকে অবশ্যই মাস্ক পরে আসতে হবে। মসজিদে সংরক্ষিত জায়নামাজ ও টুপি ব্যবহার করা যাবে না।

৭. ঈদের নামাজ আদায়ের সময় কাতারে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি অবশ্যই অনুসরণ করে দাঁড়াতে হবে এবং এক কাতার অন্তর কাতার করতে হবে। ৮. শিশু, বয়োবৃদ্ধ, অসুস্থ ব্যক্তি এবং অসুস্থদের সেবায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের ঈদের নামাজের জামাতে অংশগ্রহণ নিরুৎসাহিত করা হলো।

৯. সর্বসাধারণের সুরক্ষা নিশ্চিতে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণকারী বাহিনীর নির্দেশনা অবশ্যই অনুসরণ করতে হবে। ১০. করোনাভাইরাস সংক্রমণরোধ নিশ্চিতে ঈদের জামাত শেষে কোলাকুলি এবং পরস্পর হাত মেলানো পরিহার করতে হবে। ১১. করোনা মহামারির এ বৈশ্বিক মহাবিপদ থেকে রক্ষা পেতে বেশি বেশি তওবা, আস্তাগফিরুল্লাহ ও কুরআন তিলাওয়াত করতে হবে এবং আমাদের কৃত অন্যায়-অপরাধের জন্য ঈদের নামাজ শেষে মহান রাব্বুল আলামিনের দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে।

১২. খতিব, ইমাম, মসজিদ/ঈদগাহ পরিচালনা কমিটি ও স্থানীয় প্রশাসন কর্তৃক নির্দেশনাগুলোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। এসব নির্দেশনা লঙ্ঘিত হলে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণকারী বাহিনী সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস সংক্রমণরোধে স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণকারী বাহিনী, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সংশ্লিষ্ট মসজিদের পরিচালনা কমিটি উল্লিখিত নির্দেশনা বাস্তবায়ন করবেন।
 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন