সরকারের বেঁধে দেওয়া মূল্য অকার্যকর
jugantor
ট্যানারি ও আড়ত মালিকদের কারসাজি
সরকারের বেঁধে দেওয়া মূল্য অকার্যকর
মাটিতে পোঁতাসহ বাজার, রাস্তা ও নদীতে ফেলে দেওয়া হয় অনেক চামড়া * লবণে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে ৭শ টাকার বস্তা ১২শ টাকায় বিক্রি, ৫-১০ শতাংশ চামড়া নষ্টের শঙ্কা

  যুগান্তর প্রতিবেদন  

২৪ জুলাই ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ট্যানারি ও আড়ত মালিকদের কারসাজিতে সরকারের বেঁধে দেওয়া কুরবানির পশুর চামড়ার মূল্য কার্যকর হয়নি। নির্ধারিত দামের চেয়ে কমে চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য করা হয় মৌসুমি ব্যবসায়ীদের। ফলে প্রকৃত মূল্য না পেয়ে পাইকারি বাজার পোস্তার আড়তের সামনে, বগুড়ার রাস্তায় ও করোতোয়া নদীসহ অনেক স্থানে চামড়া ফেলে দেওয়া হয়।

এ সক্রিয় সিন্ডিকেটে পোস্তাসহ দেশব্যাপী আড়ত মালিকরা জড়িয়ে পড়েন। চামড়ার মূল্য কমানোর কারসাজি ধরতে চট্টগ্রামের একাধিক আড়তে অভিযান চালিয়েছে জাতীয় ভোক্তা অধিদপ্তর।

অপরদিকে কাঁচা চামড়া সংরক্ষণের প্রধান উপকরণ লবণেরও কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে বস্তা প্রতি ৫শ টাকা দাম বাড়ানো হয়। লবণের এমন সংকটে অনেক আড়তদার ঈদের দিন রাতে চামড়া কিনতে আগ্রহী না হওয়ায় এর মূল্যের আরেক দফা পতন হয়। ফলে উপায় না পেয়ে কেউ কেউ বড় ধরনের লোকসান দিয়েও চামড়া বিক্রি করেন।

এ লবণ সংকটের কারণে ৫ থেকে ১০ শতাংশ চামড়া নষ্টের আশঙ্কা করছে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএ)। অবশ্য এর দায়ে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তর। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

এদিকে লবণের সিন্ডিকেটের কারসাজি হচ্ছে কিনা, মৌসুমি ব্যবসায়ীরা সঠিক মূল্য পাচ্ছে কিনা-তা তদারকি করতে ঈদের পরের দিন সাভারের বিসিক চামড়া শিল্পনগরী পরিদর্শন করেছেন শিল্প সচিব জাকিয়া সুলতান।

কুরবানির পশুর চামড়ার সার্বিক পরিস্থিতি জানতে চাইলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের গঠিত কাঁচা চামড়া সংরক্ষণ, ক্রয়-বিক্রয় ও পরিবহণসংক্রান্ত কেন্দ্রীয় যৌথ সমন্বয় কমিটির সদস্য মো. হাফিজুর রহমান (অতিরিক্ত সচিব) যুগান্তরকে বলেন, পশুর চামড়া ঈদের দিন থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ঢাকা প্রবেশ বন্ধ রাখায় হয়। এতে পার্শ্ববর্তী দেশে পাচার যাতে না হয় সেজন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

বিশেষ করে সীমান্তবর্তী এলাকায় বিজিবি এ ব্যাপারে কঠোর দায়িত্ব পালন করছে। লবণ সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশে লবণের কোনো ঘাটতি নেই। সরবরাহ পর্যাপ্ত আছে। কতিপয় ব্যবসায়ী এ ধরনের সংকট সৃষ্টির খবর পেয়ে জাতীয় ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তর এবং বিসিকের পক্ষ থেকে হস্তক্ষেপ করায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসছে। এর জন্য অসাধু কয়েক প্রতিষ্ঠানকে জরিমানাও করা হয়েছে।

ঈদের দিন আকার ভেদে পোস্তায় প্রতি পিস গরুর চামড়া আড়ত মালিকরা কিনেছেন ২৫০ থেকে ৫৫০ টাকায়। এর মধ্যে বড় আকারের চামড়া ৫৫০ টাকা, মাঝারি ৪০০ টাকা ও ছোট চামড়ার দাম দেওয়া হয় ২৫০ টাকা। রূপগঞ্জ থেকে ট্রাকে করে ৩০০ চামড়া পোস্তায় বিক্রি করতে আসেন মৌসুমি ব্যবসায়ী মো. ফারুক। তিনি বলেন, বিগত এক বছরে সবকিছুর দাম বাড়ছে কিন্তু চামড়ার দাম বাড়েনি। সব চামড়া লোকসান দিয়ে বিক্রি করা হয়।

রায়হান নামের একজন মৌসুমি ব্যবসায়ী বলেন, আমি ঢাকার বাইরে থেকে ১৫ লাখ টাকায় আড়াই হাজার পিস চামড়া কিনে এনেছি। কিন্তু চামড়াগুলো বিক্রি করতে পারছি না। লবণ সংকটের কথা বলে কেউ দামই বলছে না।

কামাল হোসেন নামের মৌসুমি ব্যবসায়ী জানান, রাজধানীর উত্তরা থেকে ২৬০ পিস চামড়া নিয়ে বুধবার ১০টায় লালবাগে আসেন। পোস্তায় ব্যাপক যানজটের কারণে আড়তদারের কাছে পৌঁছাতে সকাল ৭টা বেজে যায়। এ কারণে চামড়ার যে দাম পাবেন আশা করেছিলেন তা পাচ্ছেন না।

এদিকে দাম না পেয়ে পোস্তা ও ঢাকেশ্বরী মন্দিরের আশপাশের বেশ কিছু আড়তের মোকামের সামনের প্রধান সড়কে শত শত চামড়া ফেলে রেখে যান মৌসুমি ব্যবসায়ীরা।

তাদের মধ্যে একজন বাদল জানান, ৩০০ থেকে ৫০০ টাকায় গরুর চামড়া সংগ্রহ করে রাত ৮টার দিকে আড়তে বিক্রি করতে যান। কিন্তু আড়তদাররা গড়ে ৩০০ টাকা করে দাম দিতে চান। এরপর দর কষাকষি করতে করতে সময় নষ্ট হয়, রাত গভীর হয়। পরে আড়তদাররা চামড়া পচে যাওয়ার অজুহাত দেখিয়ে আড়ত বন্ধ করে চলে যান। তবুও সারা রাত অপেক্ষায় ছিলাম কোনো গতি করা যায় কিনা। শেষ পর্যন্ত ভোরে এসব চামড়া আমরা রাস্তায় ফেলে দেই। আর বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার দিকেও শত শত নষ্ট চামড়া পড়ে থাকতে দেখা গেছে। পরে পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা এগুলো বর্জ্য হিসাবে নিয়ে যান।

এদিকে ‘কুরবানির পশুর বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের পর দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস জানান, মৌসুমি ব্যবসায়ীরা অনেক জায়গায় চামড়া ফেলে যাচ্ছেন। এসব চামড়া নিয়ে করপোরেশনের কর্মীরা বেকায়দায় পড়েছেন।

তিনি সাংবাদিকদের বলেন, একটা বিষয় আমরা লক্ষ্য করছি, মৌসুমি ব্যবসায়ীরা চামড়া সংগ্রহ করেছেন। সেই চামড়াগুলো হয়তো তারা বিক্রি করতে পারেননি। পরে বিভিন্ন জায়গায়, নর্দমার সামনে, নর্দমার মুখে তারা সেই চামড়াগুলো ফেলে গেছেন। এটা অত্যন্ত গর্হিত কাজ।

ছমির হানিফ অ্যান্ড সন্সের মালিক হাজী মো. ছমির উদ্দিন বলেন, ৪৬ বছর ধরে চামড়ার ব্যবসা করছি। এমন বাজার আর দেখিনি। আজকে গড়ে প্রতিটি চামড়া আমরা ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা দর দিচ্ছি।

এসএম কামাল অ্যান্ড সন্সের পক্ষে আনোয়ার বলেন, সরকার লবণযুক্ত চামড়ার দাম গত বছরের তুলনায় প্রতি বর্গফুটে ৫ টাকা বেশি নির্ধারণ করেছে। আমরা নির্ধারিত দাম থেকে ৩ থেকে ৪ টাকা কমে কিনছি। তবে পোস্তার চামড়ার আড়তদাররা এবার চামড়ার বাজার নিয়ে সন্তুষ্ট। তারা কেনা চামড়ায় লবণ লাগিয়ে ট্যানারি মালিকদের কাছে বিক্রি করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

যদিও এবার ঢাকায় লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৪০ থেকে ৪৫ টাকা, ঢাকার বাইরে ৩৩ থেকে ৩৭ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। খাসির চামড়া ১৫ থেকে ১৭ টাকা এবং বকরির চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১২ থেকে ১৪ টাকা। কিন্তু এ দাম বেচাকেনা হয়নি কোথাও।

জানতে চাইলে বিটিএর চেয়ারম্যান শাহীন আহমেদ বলেন, গতবারের চেয়ে এবার চামড়া কম সংগ্রহ হবে।

এর কারণ হিসাবে তিনি বলেন, ‘আমাদের ধারণা অনুযায়ী এবার ঢাকায় ৫ লাখ গরু এবং এক লাখ ছাগলের চামড়া পাওয়া যেতে পারে, যা গত বছরের তুলনায় এক থেকে দুই লাখ কম হতে পারে। তিনি আরও বলেন, সিন্ডিকেট করে লবণের দাম বাড়ানো হয়েছে এ বছর। এ জন্য ৫ থেকে ১০ শতাংশ চামড়া নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব টিপু সুলতান যুগান্তরকে বলেন, সরকারের বেঁধে দেওয়া দামেই চামড়া বেচাকেনা হয়েছে। আগামী সপ্তাহ থেকে আড়ত মালিকরা এসব চামড়া ট্যানারির মালিকদের কাছে বিক্রি করবে।

লবণের মূল্য বৃদ্ধি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শেষ সময়ে পোস্তায় কিছু লবণের সংকট সৃষ্টি হয়। এ খবরে অনেক দোকানি দাম বাড়িয়েছে। আর বিদ্যমান করোনার কারণে এ ঈদ মৌসুমে কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা থেকে প্রায় ২০ শতাংশ কম হবে।

কৃত্রিম সংকটে দাম ঊর্ধ্বমুখী : ঈদের দিন পোস্তায় লবণ সংকট সৃষ্টি হয়েছে। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে ৭শ টাকা লবণের বস্তা ১২শ টাকা পর্যন্ত দাম উঠে যায়। অথচ ঈদের আগে ৫শ টাকা এবং ঈদের দিন ৭৪ কেজি বস্তা লবণ ৭শ টাকার বেশি বিক্রি করার কথা নয়। বৃহস্পতিবার অসাধুরা সংকটের অজুহাতে বেশি টাকা মুনাফা করতে হঠাৎ করে লবণের দাম বাড়িয়ে দেয়। এতে প্রতি বস্তা ৭০০ টাকার লবণ বিক্রি হয় এক হাজার টাকায়।

এ দিন পুরান ঢাকার লালবাগের পোস্তা এলাকায় কুরবানির পশুর কাঁচা চামড়া ক্রয়-বিক্রয় কার্যক্রম তদারকির সময় এমন অনিয়মের প্রমাণ পায় জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের তদারকি টিম। এ সময় কারসাজি করে বেশি দামে লবণ বিক্রি করায় মেসার্স মদিনা সল্ট নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে প্রাথমিক ভাবে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। পাশাপাশি আরও দুই লবণ ব্যবসায়ীকে সতর্ক করা হয়।

জাতীয় ভোক্তা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার যুগান্তরকে বলেন, কেউ যাতে অধিক মুনাফা করতে কারসাজি না করতে পারে এজন্য অধিদপ্তরের একাধিক টিম কাজ করছে। কেউ যদি অসাধুতা করে কঠোর শাস্তির আওতায় আনা হবে।

সাভারের চামড়া শিল্পনগরী : সাভার থেকে স্টাফ রিপোর্টার জানান, সাভারের চামড়া শিল্প নগরীতে (ট্যানারি) আসতে শুরু করেছে কুরবানির পশুর চামড়া। চামড়ার মাপ যাই হোক না কেন, গড়ে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকার বেশি মূল্যে আড়তদাররা চামড়া কিনছেন না।

ঢাকা হাইড অ্যান্ড স্কিন লিমিটেডের (ট্যানারি) টেকনিক্যাল পরিচালক এটিএম রফিকুল ইসলাম জানান, লবণের স্বাভাবিক মূল্য ৮ টাকা হলেও, এখন লবণ কিনতে হচ্ছে ১২ থেকে ১৬ টাকায়। ফলে সরকারের বেঁধে দেওয়া মূল্যে চামড়া ক্রয় করলে অনেক ট্যানারি লোকসানের মধ্যে পড়বে। লবণ ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে মূল্য বাড়িয়েছেন বলে অভিযোগ করেন এ কর্মকর্তা। তিনি আরও জানান, গড়ে একটি চামড়ায় প্রায় ৮ কেজি লবণ দিতে হচ্ছে।

সাভার চামড়া শিল্প নগরীর (বিসিক) প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী জিতেন্দ্র নাথ পাল যুগান্তরকে বলেন, শুক্রবার বিকাল পর্যন্ত ট্যানারিগুলোতে প্রায় তিন লাখ ত্রিশ হাজার চামড়া ক্রয় করা হয়েছে। চামড়া ক্রয়-বিক্রয়ে সিন্ডিকেট করা হচ্ছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা চামড়া ক্রয়-বিক্রয়ে ট্যানারির তিনটি প্রবেশপথে মনিটরিং করছি। আমার জানা মতে, কোথাও সিন্ডিকেট হচ্ছে না। তবে অন্য এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, লবণ ছাড়া চামড়ার মূল্যে কিছুটা কম-বেশি হচ্ছে।

চট্টগ্রাম ব্যুরো : আড়তদারদের কারসাজিতে চট্টগ্রামে পানির দামে কুরবানির পশুর চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন কুরবানিদাতা ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। অনেক মৌসুমি ব্যবসায়ী ন্যায্যমূল্যে চামড়া বিক্রি করতে না পেরে বিপুল আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। নামমাত্র মূল্যে চামড়া বিক্রি করে চোখের পানিতে বুক ভাসিয়েছেন তারা। ৫০ টাকা থেকে ১৫০ টাকার মধ্যে চামড়া বিক্রি করেছেন অনেকে। কেউ কেউ চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলছেন।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের বর্জ্য বিষয়ক স্ট্যান্ডিং কমিটির সভাপতি কাউন্সিলর মোবারক আলী জানান, নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ফেলে দেওয়া ৩০০ পিস কাঁচা চামড়া করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা উদ্ধার করেন। পরে এগুলো একটি মাদ্রাসাকে দিয়ে দেওয়া হয়।

চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া আড়তদার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. মুসলিম উদ্দিন জানান, শুক্রবার পর্যন্ত চট্টগ্রামের শতাধিক আড়তে দেড় লাখ কুরবানির পশুর চামড়া সংগৃহীত হয়েছে। এসব চামড়া লবণ মাখিয়ে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। আর কিছু চামড়া বিভিন্ন উপজেলায় লবণ দিয়ে রাখা হয়েছে যা দু-এক দিনের মধ্যে আড়তে আসতে শুরু করবে।

বগুড়া ব্যুরো : বগুড়ায় গরিবের হক কুরবানির পশুর চামড়ার দাম নেই। তাই ছোট গরু, ছাগল ও ভেড়ার চামড়া রাস্তার পাশে ফেলে দেওয়া হয়েছে। চাহিদামতো সংগ্রহ করতে না পেরে ও লোকসানের ভয়ে অনেক সাধারণ ব্যবসায়ী ঈদের পরদিন শহরের বাদুড়তলা, চকসূত্রাপুর, চামড়া গুদাম লেন এলাকায় রাস্তার পাশে গরু, ছাগল ও গরুর মাথার চামড়া ফেলে দেন। পৌরসভার পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা স্তূপ থেকে চামড়াগুলো সংগ্রহ করে ট্রাকে তুলে শহরের বাহিরে গোকুলের ভাগাড়ে ফেলে দিয়েছেন। ফেলে দেওয়া এসব চামড়া পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। পৌরসভার পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা জানিয়েছেন, ফেলে দেওয়া অন্তত ১৪ হাজার চামড়ার মধ্যে ছাগলের চামড়া ও গরুর মাথার চামড়াই বেশি।

শহরের বাদুড়তলার চামড়া ব্যবসায়ী মোকাররম আলী, কামরুল হোসেন, সারোয়ার হোসেন প্রমুখ জানান, রাস্তার পাশে স্তূপ করে ফেলে দেওয়া চামড়ার মধ্যে কুরবানির ছাগল ও গরুর নিম্নমানের চামড়া রয়েছে। এ মৌসুমে ব্যবসায়ীরা তাদের চাহিদামতো চামড়া সংগ্রহ করতে পারেননি। ছাগলের চামড়ার চাহিদা এবারও কম। বৃহস্পতিবার বিকালে বগুড়া সদরের গোকুল এলাকায় ময়লার ভাগাড়ে গিয়ে দেখা গেছে, পৌরসভার পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা ট্রাকে আনা পচন ধরা চামড়াগুলো ফেলছেন। তারা জানান, এসব চামড়া শহরের বাদুড়তলা, চকসূত্রাপুর, চামড়াগুদাম এলাকায় পড়েছিল। তাদের হিসাবে সকাল থেকে প্রায় ১০ হাজার গরু-ছাগলের চামড়া ভাগাড়ে ফেলেন। বগুড়া চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মতিন সরকার জানান, পচে যাওয়ার কারণে নিম্নমানের গরুর চামড়া ফেলে দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া ছাগলের চামড়ার চাহিদা কম থাকলেও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা অনেক কেনেন। দাম না পেয়ে তারা ছাগলের চামড়াগুলো ফেলে দিয়েছেন। আমরা দ্রুত চামড়াগুলো অপসারণ করছি।

রাজশাহী ব্যুরো : সরকার নির্ধারিত দামে চামড়া কিনেও লোকসানের শিকার হয়েছেন রাজশাহীর ব্যবসায়ীরা। তাদের দাবি, আড়তদাররা তাদের কাছ থেকে সরকার নির্ধারিত দামে চামড়া কিনলে তাদের লাভ হতো। কিন্তু অধিক মুনাফার আশায় আড়তদাররা সিন্ডিকেট করে দাম কমিয়ে রাখেন। ফলে তাদের লোকসান হয়েছে।

রাজশাহীতে এ বছর খাসি, ভেড়া, বকরির চামড়ার তেমন চাহিদা না থাকলেও গরুর চামড়া ৩০০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। আর খাসির চামড়া ১৫-২০ টাকা, বকরি ১০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। ভেড়ার চামড়া কিনেননি ব্যবসায়ীরা। এত কম দামে চামড়া কিনেও লোকসানের কথা বলছেন ব্যবসায়ীরা।

জেলা চামড়া ব্যবসায়ী গ্রুপের সভাপতি আসাদুজ্জামান মাসুদের দাবি, চামড়ার দাম ভালোই দেওয়া হয়েছে। তারা গরুর চামড়া ৬০০-৯০০, খাসির চামড়া ৪০-৭০ এবং বকরির চামড়া ২০-৪০ টাকা দরে কিনেছেন বলেও দাবি করেন। তিনি বলেন, গত দু-তিন বছর যে দাম ছিল, সেই তুলনায় এবার চামড়ার ভালো দাম রয়েছে।

বরিশাল ব্যুরো : বরিশালে কুরবানির পশুর চামড়া ক্রয়ে অনীহা দেখা দিয়েছে চামড়া ব্যবসায়ীদের মধ্যে। গরুর চামড়ার দাম মিললেও চামড়া সংগ্রহকরা বিনামূল্যে দিয়ে যাচ্ছেন ছাগলের চামড়া। যদিও গত বছর ছাগলের চামড়ার বিপরীতে চা-সিগারেট-পানের টাকা দেওয়া হলেও এবারে কানাকড়িও মিলছে না। বরিশাল চামড়া ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সহ-সম্পাদক জিল্লুর রহমান মাসুম বলেন, গত বছরের চেয়ে এবারে চামড়ার দাম কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। কয়েক বছর ধরে ঢাকায় ট্যানারি মালিকরা ছাগলের চামড়ার জন্য ২শ টাকার বেশি দিতে চান না। অথচ ছাগলের একটি চামড়া কিনে প্রসেস করে ঢাকায় পাঠাতে কমপক্ষে ৩৫০ টাকা খরচ হয়। তাই ব্যবসায়ীরা ছাগলের চামড়া কিনছেন না। পুঁজির অভাবে স্থানীয়ভাবে চামড়ার দাম ও সংগ্রহের ওপরে প্রভাব পড়েছে।

ট্যানারি ও আড়ত মালিকদের কারসাজি

সরকারের বেঁধে দেওয়া মূল্য অকার্যকর

মাটিতে পোঁতাসহ বাজার, রাস্তা ও নদীতে ফেলে দেওয়া হয় অনেক চামড়া * লবণে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে ৭শ টাকার বস্তা ১২শ টাকায় বিক্রি, ৫-১০ শতাংশ চামড়া নষ্টের শঙ্কা
 যুগান্তর প্রতিবেদন 
২৪ জুলাই ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ট্যানারি ও আড়ত মালিকদের কারসাজিতে সরকারের বেঁধে দেওয়া কুরবানির পশুর চামড়ার মূল্য কার্যকর হয়নি। নির্ধারিত দামের চেয়ে কমে চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য করা হয় মৌসুমি ব্যবসায়ীদের। ফলে প্রকৃত মূল্য না পেয়ে পাইকারি বাজার পোস্তার আড়তের সামনে, বগুড়ার রাস্তায় ও করোতোয়া নদীসহ অনেক স্থানে চামড়া ফেলে দেওয়া হয়।

এ সক্রিয় সিন্ডিকেটে পোস্তাসহ দেশব্যাপী আড়ত মালিকরা জড়িয়ে পড়েন। চামড়ার মূল্য কমানোর কারসাজি ধরতে চট্টগ্রামের একাধিক আড়তে অভিযান চালিয়েছে জাতীয় ভোক্তা অধিদপ্তর।

অপরদিকে কাঁচা চামড়া সংরক্ষণের প্রধান উপকরণ লবণেরও কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে বস্তা প্রতি ৫শ টাকা দাম বাড়ানো হয়। লবণের এমন সংকটে অনেক আড়তদার ঈদের দিন রাতে চামড়া কিনতে আগ্রহী না হওয়ায় এর মূল্যের আরেক দফা পতন হয়। ফলে উপায় না পেয়ে কেউ কেউ বড় ধরনের লোকসান দিয়েও চামড়া বিক্রি করেন।

এ লবণ সংকটের কারণে ৫ থেকে ১০ শতাংশ চামড়া নষ্টের আশঙ্কা করছে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএ)। অবশ্য এর দায়ে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তর। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

এদিকে লবণের সিন্ডিকেটের কারসাজি হচ্ছে কিনা, মৌসুমি ব্যবসায়ীরা সঠিক মূল্য পাচ্ছে কিনা-তা তদারকি করতে ঈদের পরের দিন সাভারের বিসিক চামড়া শিল্পনগরী পরিদর্শন করেছেন শিল্প সচিব জাকিয়া সুলতান।

কুরবানির পশুর চামড়ার সার্বিক পরিস্থিতি জানতে চাইলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের গঠিত কাঁচা চামড়া সংরক্ষণ, ক্রয়-বিক্রয় ও পরিবহণসংক্রান্ত কেন্দ্রীয় যৌথ সমন্বয় কমিটির সদস্য মো. হাফিজুর রহমান (অতিরিক্ত সচিব) যুগান্তরকে বলেন, পশুর চামড়া ঈদের দিন থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ঢাকা প্রবেশ বন্ধ রাখায় হয়। এতে পার্শ্ববর্তী দেশে পাচার যাতে না হয় সেজন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

বিশেষ করে সীমান্তবর্তী এলাকায় বিজিবি এ ব্যাপারে কঠোর দায়িত্ব পালন করছে। লবণ সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশে লবণের কোনো ঘাটতি নেই। সরবরাহ পর্যাপ্ত আছে। কতিপয় ব্যবসায়ী এ ধরনের সংকট সৃষ্টির খবর পেয়ে জাতীয় ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তর এবং বিসিকের পক্ষ থেকে হস্তক্ষেপ করায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসছে। এর জন্য অসাধু কয়েক প্রতিষ্ঠানকে জরিমানাও করা হয়েছে।

ঈদের দিন আকার ভেদে পোস্তায় প্রতি পিস গরুর চামড়া আড়ত মালিকরা কিনেছেন ২৫০ থেকে ৫৫০ টাকায়। এর মধ্যে বড় আকারের চামড়া ৫৫০ টাকা, মাঝারি ৪০০ টাকা ও ছোট চামড়ার দাম দেওয়া হয় ২৫০ টাকা। রূপগঞ্জ থেকে ট্রাকে করে ৩০০ চামড়া পোস্তায় বিক্রি করতে আসেন মৌসুমি ব্যবসায়ী মো. ফারুক। তিনি বলেন, বিগত এক বছরে সবকিছুর দাম বাড়ছে কিন্তু চামড়ার দাম বাড়েনি। সব চামড়া লোকসান দিয়ে বিক্রি করা হয়।

রায়হান নামের একজন মৌসুমি ব্যবসায়ী বলেন, আমি ঢাকার বাইরে থেকে ১৫ লাখ টাকায় আড়াই হাজার পিস চামড়া কিনে এনেছি। কিন্তু চামড়াগুলো বিক্রি করতে পারছি না। লবণ সংকটের কথা বলে কেউ দামই বলছে না।

কামাল হোসেন নামের মৌসুমি ব্যবসায়ী জানান, রাজধানীর উত্তরা থেকে ২৬০ পিস চামড়া নিয়ে বুধবার ১০টায় লালবাগে আসেন। পোস্তায় ব্যাপক যানজটের কারণে আড়তদারের কাছে পৌঁছাতে সকাল ৭টা বেজে যায়। এ কারণে চামড়ার যে দাম পাবেন আশা করেছিলেন তা পাচ্ছেন না।

এদিকে দাম না পেয়ে পোস্তা ও ঢাকেশ্বরী মন্দিরের আশপাশের বেশ কিছু আড়তের মোকামের সামনের প্রধান সড়কে শত শত চামড়া ফেলে রেখে যান মৌসুমি ব্যবসায়ীরা।

তাদের মধ্যে একজন বাদল জানান, ৩০০ থেকে ৫০০ টাকায় গরুর চামড়া সংগ্রহ করে রাত ৮টার দিকে আড়তে বিক্রি করতে যান। কিন্তু আড়তদাররা গড়ে ৩০০ টাকা করে দাম দিতে চান। এরপর দর কষাকষি করতে করতে সময় নষ্ট হয়, রাত গভীর হয়। পরে আড়তদাররা চামড়া পচে যাওয়ার অজুহাত দেখিয়ে আড়ত বন্ধ করে চলে যান। তবুও সারা রাত অপেক্ষায় ছিলাম কোনো গতি করা যায় কিনা। শেষ পর্যন্ত ভোরে এসব চামড়া আমরা রাস্তায় ফেলে দেই। আর বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার দিকেও শত শত নষ্ট চামড়া পড়ে থাকতে দেখা গেছে। পরে পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা এগুলো বর্জ্য হিসাবে নিয়ে যান।

এদিকে ‘কুরবানির পশুর বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের পর দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস জানান, মৌসুমি ব্যবসায়ীরা অনেক জায়গায় চামড়া ফেলে যাচ্ছেন। এসব চামড়া নিয়ে করপোরেশনের কর্মীরা বেকায়দায় পড়েছেন।

তিনি সাংবাদিকদের বলেন, একটা বিষয় আমরা লক্ষ্য করছি, মৌসুমি ব্যবসায়ীরা চামড়া সংগ্রহ করেছেন। সেই চামড়াগুলো হয়তো তারা বিক্রি করতে পারেননি। পরে বিভিন্ন জায়গায়, নর্দমার সামনে, নর্দমার মুখে তারা সেই চামড়াগুলো ফেলে গেছেন। এটা অত্যন্ত গর্হিত কাজ।

ছমির হানিফ অ্যান্ড সন্সের মালিক হাজী মো. ছমির উদ্দিন বলেন, ৪৬ বছর ধরে চামড়ার ব্যবসা করছি। এমন বাজার আর দেখিনি। আজকে গড়ে প্রতিটি চামড়া আমরা ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা দর দিচ্ছি।

এসএম কামাল অ্যান্ড সন্সের পক্ষে আনোয়ার বলেন, সরকার লবণযুক্ত চামড়ার দাম গত বছরের তুলনায় প্রতি বর্গফুটে ৫ টাকা বেশি নির্ধারণ করেছে। আমরা নির্ধারিত দাম থেকে ৩ থেকে ৪ টাকা কমে কিনছি। তবে পোস্তার চামড়ার আড়তদাররা এবার চামড়ার বাজার নিয়ে সন্তুষ্ট। তারা কেনা চামড়ায় লবণ লাগিয়ে ট্যানারি মালিকদের কাছে বিক্রি করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

যদিও এবার ঢাকায় লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৪০ থেকে ৪৫ টাকা, ঢাকার বাইরে ৩৩ থেকে ৩৭ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। খাসির চামড়া ১৫ থেকে ১৭ টাকা এবং বকরির চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১২ থেকে ১৪ টাকা। কিন্তু এ দাম বেচাকেনা হয়নি কোথাও।

জানতে চাইলে বিটিএর চেয়ারম্যান শাহীন আহমেদ বলেন, গতবারের চেয়ে এবার চামড়া কম সংগ্রহ হবে।

এর কারণ হিসাবে তিনি বলেন, ‘আমাদের ধারণা অনুযায়ী এবার ঢাকায় ৫ লাখ গরু এবং এক লাখ ছাগলের চামড়া পাওয়া যেতে পারে, যা গত বছরের তুলনায় এক থেকে দুই লাখ কম হতে পারে। তিনি আরও বলেন, সিন্ডিকেট করে লবণের দাম বাড়ানো হয়েছে এ বছর। এ জন্য ৫ থেকে ১০ শতাংশ চামড়া নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব টিপু সুলতান যুগান্তরকে বলেন, সরকারের বেঁধে দেওয়া দামেই চামড়া বেচাকেনা হয়েছে। আগামী সপ্তাহ থেকে আড়ত মালিকরা এসব চামড়া ট্যানারির মালিকদের কাছে বিক্রি করবে।

লবণের মূল্য বৃদ্ধি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শেষ সময়ে পোস্তায় কিছু লবণের সংকট সৃষ্টি হয়। এ খবরে অনেক দোকানি দাম বাড়িয়েছে। আর বিদ্যমান করোনার কারণে এ ঈদ মৌসুমে কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা থেকে প্রায় ২০ শতাংশ কম হবে।

কৃত্রিম সংকটে দাম ঊর্ধ্বমুখী : ঈদের দিন পোস্তায় লবণ সংকট সৃষ্টি হয়েছে। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে ৭শ টাকা লবণের বস্তা ১২শ টাকা পর্যন্ত দাম উঠে যায়। অথচ ঈদের আগে ৫শ টাকা এবং ঈদের দিন ৭৪ কেজি বস্তা লবণ ৭শ টাকার বেশি বিক্রি করার কথা নয়। বৃহস্পতিবার অসাধুরা সংকটের অজুহাতে বেশি টাকা মুনাফা করতে হঠাৎ করে লবণের দাম বাড়িয়ে দেয়। এতে প্রতি বস্তা ৭০০ টাকার লবণ বিক্রি হয় এক হাজার টাকায়।

এ দিন পুরান ঢাকার লালবাগের পোস্তা এলাকায় কুরবানির পশুর কাঁচা চামড়া ক্রয়-বিক্রয় কার্যক্রম তদারকির সময় এমন অনিয়মের প্রমাণ পায় জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের তদারকি টিম। এ সময় কারসাজি করে বেশি দামে লবণ বিক্রি করায় মেসার্স মদিনা সল্ট নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে প্রাথমিক ভাবে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। পাশাপাশি আরও দুই লবণ ব্যবসায়ীকে সতর্ক করা হয়।

জাতীয় ভোক্তা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার যুগান্তরকে বলেন, কেউ যাতে অধিক মুনাফা করতে কারসাজি না করতে পারে এজন্য অধিদপ্তরের একাধিক টিম কাজ করছে। কেউ যদি অসাধুতা করে কঠোর শাস্তির আওতায় আনা হবে।

সাভারের চামড়া শিল্পনগরী : সাভার থেকে স্টাফ রিপোর্টার জানান, সাভারের চামড়া শিল্প নগরীতে (ট্যানারি) আসতে শুরু করেছে কুরবানির পশুর চামড়া। চামড়ার মাপ যাই হোক না কেন, গড়ে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকার বেশি মূল্যে আড়তদাররা চামড়া কিনছেন না।

ঢাকা হাইড অ্যান্ড স্কিন লিমিটেডের (ট্যানারি) টেকনিক্যাল পরিচালক এটিএম রফিকুল ইসলাম জানান, লবণের স্বাভাবিক মূল্য ৮ টাকা হলেও, এখন লবণ কিনতে হচ্ছে ১২ থেকে ১৬ টাকায়। ফলে সরকারের বেঁধে দেওয়া মূল্যে চামড়া ক্রয় করলে অনেক ট্যানারি লোকসানের মধ্যে পড়বে। লবণ ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে মূল্য বাড়িয়েছেন বলে অভিযোগ করেন এ কর্মকর্তা। তিনি আরও জানান, গড়ে একটি চামড়ায় প্রায় ৮ কেজি লবণ দিতে হচ্ছে।

সাভার চামড়া শিল্প নগরীর (বিসিক) প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী জিতেন্দ্র নাথ পাল যুগান্তরকে বলেন, শুক্রবার বিকাল পর্যন্ত ট্যানারিগুলোতে প্রায় তিন লাখ ত্রিশ হাজার চামড়া ক্রয় করা হয়েছে। চামড়া ক্রয়-বিক্রয়ে সিন্ডিকেট করা হচ্ছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা চামড়া ক্রয়-বিক্রয়ে ট্যানারির তিনটি প্রবেশপথে মনিটরিং করছি। আমার জানা মতে, কোথাও সিন্ডিকেট হচ্ছে না। তবে অন্য এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, লবণ ছাড়া চামড়ার মূল্যে কিছুটা কম-বেশি হচ্ছে।

চট্টগ্রাম ব্যুরো : আড়তদারদের কারসাজিতে চট্টগ্রামে পানির দামে কুরবানির পশুর চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন কুরবানিদাতা ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। অনেক মৌসুমি ব্যবসায়ী ন্যায্যমূল্যে চামড়া বিক্রি করতে না পেরে বিপুল আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। নামমাত্র মূল্যে চামড়া বিক্রি করে চোখের পানিতে বুক ভাসিয়েছেন তারা। ৫০ টাকা থেকে ১৫০ টাকার মধ্যে চামড়া বিক্রি করেছেন অনেকে। কেউ কেউ চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলছেন।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের বর্জ্য বিষয়ক স্ট্যান্ডিং কমিটির সভাপতি কাউন্সিলর মোবারক আলী জানান, নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ফেলে দেওয়া ৩০০ পিস কাঁচা চামড়া করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা উদ্ধার করেন। পরে এগুলো একটি মাদ্রাসাকে দিয়ে দেওয়া হয়।

চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া আড়তদার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. মুসলিম উদ্দিন জানান, শুক্রবার পর্যন্ত চট্টগ্রামের শতাধিক আড়তে দেড় লাখ কুরবানির পশুর চামড়া সংগৃহীত হয়েছে। এসব চামড়া লবণ মাখিয়ে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। আর কিছু চামড়া বিভিন্ন উপজেলায় লবণ দিয়ে রাখা হয়েছে যা দু-এক দিনের মধ্যে আড়তে আসতে শুরু করবে।

বগুড়া ব্যুরো : বগুড়ায় গরিবের হক কুরবানির পশুর চামড়ার দাম নেই। তাই ছোট গরু, ছাগল ও ভেড়ার চামড়া রাস্তার পাশে ফেলে দেওয়া হয়েছে। চাহিদামতো সংগ্রহ করতে না পেরে ও লোকসানের ভয়ে অনেক সাধারণ ব্যবসায়ী ঈদের পরদিন শহরের বাদুড়তলা, চকসূত্রাপুর, চামড়া গুদাম লেন এলাকায় রাস্তার পাশে গরু, ছাগল ও গরুর মাথার চামড়া ফেলে দেন। পৌরসভার পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা স্তূপ থেকে চামড়াগুলো সংগ্রহ করে ট্রাকে তুলে শহরের বাহিরে গোকুলের ভাগাড়ে ফেলে দিয়েছেন। ফেলে দেওয়া এসব চামড়া পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। পৌরসভার পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা জানিয়েছেন, ফেলে দেওয়া অন্তত ১৪ হাজার চামড়ার মধ্যে ছাগলের চামড়া ও গরুর মাথার চামড়াই বেশি।

শহরের বাদুড়তলার চামড়া ব্যবসায়ী মোকাররম আলী, কামরুল হোসেন, সারোয়ার হোসেন প্রমুখ জানান, রাস্তার পাশে স্তূপ করে ফেলে দেওয়া চামড়ার মধ্যে কুরবানির ছাগল ও গরুর নিম্নমানের চামড়া রয়েছে। এ মৌসুমে ব্যবসায়ীরা তাদের চাহিদামতো চামড়া সংগ্রহ করতে পারেননি। ছাগলের চামড়ার চাহিদা এবারও কম। বৃহস্পতিবার বিকালে বগুড়া সদরের গোকুল এলাকায় ময়লার ভাগাড়ে গিয়ে দেখা গেছে, পৌরসভার পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা ট্রাকে আনা পচন ধরা চামড়াগুলো ফেলছেন। তারা জানান, এসব চামড়া শহরের বাদুড়তলা, চকসূত্রাপুর, চামড়াগুদাম এলাকায় পড়েছিল। তাদের হিসাবে সকাল থেকে প্রায় ১০ হাজার গরু-ছাগলের চামড়া ভাগাড়ে ফেলেন। বগুড়া চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মতিন সরকার জানান, পচে যাওয়ার কারণে নিম্নমানের গরুর চামড়া ফেলে দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া ছাগলের চামড়ার চাহিদা কম থাকলেও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা অনেক কেনেন। দাম না পেয়ে তারা ছাগলের চামড়াগুলো ফেলে দিয়েছেন। আমরা দ্রুত চামড়াগুলো অপসারণ করছি।

রাজশাহী ব্যুরো : সরকার নির্ধারিত দামে চামড়া কিনেও লোকসানের শিকার হয়েছেন রাজশাহীর ব্যবসায়ীরা। তাদের দাবি, আড়তদাররা তাদের কাছ থেকে সরকার নির্ধারিত দামে চামড়া কিনলে তাদের লাভ হতো। কিন্তু অধিক মুনাফার আশায় আড়তদাররা সিন্ডিকেট করে দাম কমিয়ে রাখেন। ফলে তাদের লোকসান হয়েছে।

রাজশাহীতে এ বছর খাসি, ভেড়া, বকরির চামড়ার তেমন চাহিদা না থাকলেও গরুর চামড়া ৩০০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। আর খাসির চামড়া ১৫-২০ টাকা, বকরি ১০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। ভেড়ার চামড়া কিনেননি ব্যবসায়ীরা। এত কম দামে চামড়া কিনেও লোকসানের কথা বলছেন ব্যবসায়ীরা।

জেলা চামড়া ব্যবসায়ী গ্রুপের সভাপতি আসাদুজ্জামান মাসুদের দাবি, চামড়ার দাম ভালোই দেওয়া হয়েছে। তারা গরুর চামড়া ৬০০-৯০০, খাসির চামড়া ৪০-৭০ এবং বকরির চামড়া ২০-৪০ টাকা দরে কিনেছেন বলেও দাবি করেন। তিনি বলেন, গত দু-তিন বছর যে দাম ছিল, সেই তুলনায় এবার চামড়ার ভালো দাম রয়েছে।

বরিশাল ব্যুরো : বরিশালে কুরবানির পশুর চামড়া ক্রয়ে অনীহা দেখা দিয়েছে চামড়া ব্যবসায়ীদের মধ্যে। গরুর চামড়ার দাম মিললেও চামড়া সংগ্রহকরা বিনামূল্যে দিয়ে যাচ্ছেন ছাগলের চামড়া। যদিও গত বছর ছাগলের চামড়ার বিপরীতে চা-সিগারেট-পানের টাকা দেওয়া হলেও এবারে কানাকড়িও মিলছে না। বরিশাল চামড়া ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সহ-সম্পাদক জিল্লুর রহমান মাসুম বলেন, গত বছরের চেয়ে এবারে চামড়ার দাম কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। কয়েক বছর ধরে ঢাকায় ট্যানারি মালিকরা ছাগলের চামড়ার জন্য ২শ টাকার বেশি দিতে চান না। অথচ ছাগলের একটি চামড়া কিনে প্রসেস করে ঢাকায় পাঠাতে কমপক্ষে ৩৫০ টাকা খরচ হয়। তাই ব্যবসায়ীরা ছাগলের চামড়া কিনছেন না। পুঁজির অভাবে স্থানীয়ভাবে চামড়ার দাম ও সংগ্রহের ওপরে প্রভাব পড়েছে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন