আর্থিক গোয়েন্দা কার্যক্রম বাড়ানো হবে
jugantor
নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা উপলক্ষ্যে গভর্নর
আর্থিক গোয়েন্দা কার্যক্রম বাড়ানো হবে

  যুগান্তর প্রতিবেদন  

৩০ জুলাই ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. ফজলে কবির বলেছেন, আর্থিক খাতে দুর্নীতি প্রতিরোধ ও টাকা পাচার বন্ধে আর্থিক গোয়েন্দা কার্যক্রম বাড়াতে ব্যাপক উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে করোনার নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলায় ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের অপব্যবহার বন্ধে করা হবে বিশেষ তদন্ত। প্রণোদনার ফলে অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়েছে তা জানতে চালানো হবে বিশেষ সমীক্ষা। চলমান প্যাকেজ ও নীতি-সহায়তা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি নতুন প্যাকেজও ঘোষণা দেওয়া হবে।

চলতি অর্থবছরের নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণার সময় লিখিত বক্তব্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির এসব কথা বলেছেন। বৃহস্পতিবার বিকালে কেন্দ্রীয় ব্যাংক চলতি অর্থবছরের জন্য সম্প্রসারণ ও সংকুলানমুখী মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে। এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে মজুত মুদ্রা কমিয়ে বাজারে ঋণের প্রবাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগের মতো চলতি অর্থবছরের মুদ্রানীতিতেও বাজারে ঋণের প্রবাহ বাড়ানোর নীতি অনুসরণ করা হবে। ঋণের জোগান সবচেয়ে বেশি বাড়ানো হবে উৎপাদন ও ব্যবসা খাতে। নতুন শিল্প স্থাপনেও বিনিয়োগ বাড়ানোর নীতি অনুসরণ করা হবে। করোনার কারণে অধিকতর ক্ষতিগ্রস্ত অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, পরিবহণ শ্রমিক, হোটেল-রেস্টুরেন্ট কর্মচারী ও বেসরকারি শিক্ষা খাতে জড়িতদের জন্য নতুন করে বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন স্কিম চালু হবে। গুরুত্ব দেওয়া হবে মানসম্মত কর্মসংস্থান, নতুন উদ্যোগ, নারী উদ্যোক্তাদের ঋণ প্রদানে। গ্রামের মানুষকে ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনতে গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে খোলা হবে উপ-শাখা। প্রণোদনা প্যাকেজগুলোর সফল বাস্তবায়নে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরদারি আরও বাড়ানো হবে। নতুন উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঘোষিত ৫০০ কোটি টাকার তহবিল ও ব্যাংকগুলোর পরিচালন মুনাফার কমপক্ষে ১ শতাংশ নিয়ে স্টার্টআপ ফান্ডের আকার আরও বাড়ানো হবে। কুটির, ক্ষুদ্র, মাঝারি শিল্প খাতের বিশেষ করে হালকা প্রকৌশল, ক্লাস্টার অ্যান্ড ভ্যালু চেইন ও নারী উদ্যোক্তাদের ঋণ দিতে ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিমের আওতা আরও বাড়ানো হবে।

গভর্নর বলেছেন, করোনার প্রভাব মোকাবিলা করতে ব্যাংকিং খাতে টাকার প্রবাহ বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু ঋণ প্রবাহ সেইভাবে না বাড়ার ফলে অতিরিক্ত তারল্যের চাপ বেড়েছে। এসব অর্থ অনুৎপাদনশীল খাতে গিয়ে যাতে মূল্যস্ফীতির হার বাড়াতে না পারে সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি রাখা হবে। এসব অর্থ উৎপাদন খাতে ঋণ বিতরণের উৎসাহিত করা হবে। প্রয়োজন হলে বাজার থেকে তুলে নিয়ে মুদ্রা সরবরাহ ব্যবস্থায় ভারসাম্য আনা হবে।

তিনি আরও বলেন, প্রণোদনার ঋণের টাকার অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সতর্ক রয়েছে। প্রণোদনা প্যাকেজের অর্থের অপব্যবহার রোধে সরেজমিন তদন্ত করা হবে। একই সঙ্গে প্যাকেজ ব্যবহার করে অর্থনীতিতে কি ধরনের প্রভাব পড়েছে তা জানতে বিশেষ সমীক্ষা করা হবে। করোনার দ্বিতীয় ঢেউ অর্থনীতিতে আতঙ্কময় পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে।

সূত্র জানায়, বিভিন্ন সংস্থার জরিপে দেশ থেকে টাকা পাচারের ঘটনা উঠে আসছে। আর্থিক খাতে বড় বড় দুর্নীতিও ঘটছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে এবারের মুদ্রানীতিতেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর প্রথমবারের মতো ঘোষণা দিয়েছেন, আর্থিক খাতে দুর্নীতি ও টাকা পাচার বন্ধে বাংলাদেশ আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের মাধ্যমে আর্থিক গোয়েন্দা কার্যক্রম বাড়াতে ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ অব্যাহত রয়েছে।

মুদ্রানীতিতে চলতি অর্থবছরের জুনের মধ্যে টাকার প্রবাহ বা ব্যাপক মুদ্রা সরবরাহ ১৫ শতাংশ বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত জুনে ছিল ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ। গত জুনে মজুত মুদ্রা বা রিজার্ভ মানি ছিল ২২ দশমিক ৪ শতাংশ। ডিসেম্বরে তা ১৪ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। জুনের মধ্যে তা আরও কমিয়ে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা হবে। ঋণ বিতরণ কম হওয়ায় বর্তমানে মজুত মুদ্রার পরিমাণ বেড়ে গেছে। এ অর্থ থেকে ঋণ প্রবাহ বাড়িয়ে এর হার কমিয়ে আনা হবে।

জুনে অভ্যন্তরীণ ঋণ প্রবাহ বেড়েছিল ১০ দশমিক ৩ শতাংশ। ডিসেম্বরে তা বাড়িয়ে ১৪ দশমিক ১ শতাংশে নেওয়া হবে। জুনের মধ্যে তা আরও বাড়িয়ে ১৭ দশমিক ৮ শতাংশে নিয়ে যাওয়া হবে। এর মধ্যে সরকারি খাতে ৩২ দশমিক ৬ শতাংশ এবং বেসরকারি খাতে ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। জুনে সরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ বেড়েছিল ২১ দশমিক ২ শতাংশ এবং বেসরকারি খাতে ৮ দশমিক ৪ শতাংশ।

এ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, মুদ্রানীতির লক্ষ্যগুলো ভালো। তবে বাস্তবতার নিরিখে এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা বড় চ্যালেঞ্জ। কেননা করোনার কারণে নতুন বিনিয়োগ হচ্ছে না। সরকারি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের গতিও শ্লথ। এ অবস্থায় ঋণ প্রবাহ বাড়ানো কঠিন হবে। বেসরকারি খাতে তো চাহিদাই নেই। নতুন উদ্যোগে ব্যাংকগুলো ঝুঁকি নিয়ে ঋণ দিচ্ছে না।

তিনি আরও বলেন, তবে প্রণোদনা প্যাকেজগুলোর অপব্যবহার রোধে গৃহীত পদক্ষেপ ও দুর্নীতি এবং টাকা পাচার বন্ধে গৃহীত পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন হলে আর্থিক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হবে।

ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি আবুল কাসেম খান বলেন, মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ বাড়ানোর যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে তা ইতিবাচক। তবে ঋণ প্রবাহ বাড়াতে বেসরকারি খাতকে সহায়তা দিতে হবে। ব্যাংকগুলোকে ঝুঁকি নিয়ে ঋণ বিতরণ করতে হবে। তাহলে বেসরকারি খাত ঋণ গ্রহণে এগিয়ে আসবে। পাশাপাশি নতুন উদ্যোগে বেশি ঋণ দিতে হবে।

মুদ্রানীতিতে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এর প্রভাবে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ জুনের মধ্যে বেড়ে ৫ হাজার ২০০ কোটি ডলারে দাঁড়াবে। যা দিয়ে ৭ মাসেরও বেশি আমদানি ব্যয় মেটানো যাবে। বর্তমানে রিজার্ভের পরিমাণ ৪ হাজার ৬০০ কোটি ডলার।

করোনার প্রভাব মোকাবিলা করতে ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ ও নীতি সহায়তা অব্যাহত রাখার নীতি অনুসরণ করা হবে। ব্যাংকিং খাতের অতিরিক্ত তারল্য অনুৎপাদনশীল খাতে নয়, উৎপাদন খাতে নেওয়া হবে। এতে মূল্যস্ফীতির হার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।

ঢাকা চেম্বারের প্রতিক্রিয়া : ঘোষিত মুদ্রানীতিকে ধারাবাহিক হিসাবে অভিহিত করে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) বলেছে, করোনার নেতিবাচক প্রভাব থেকে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারে ছাড় দেওয়া হয়েছে।

বেসরকারি খাতের চেয়ে সরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বেশি বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রাকে তারা অসামঞ্জস্যমূলক হিসাবে বর্ণনা করেছে।

বৃহস্পতিবার মুদ্রানীতি ঘোষণার পর ঢাকা চেম্বার এক বিবৃতিতে এ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। বিবৃতিতে তারা আরও বলেছে, ঘোষিত মুদ্রানীতি সম্প্রসারণমূলক ও সঙ্কুলানমুখী করা হয়েছে। অর্থাৎ বাজারে ঋণের প্রবাহ বাড়ানো হবে। তবে তা সব খাতে নয়। চাহিদা অনুযায়ী। বিশেষ করে উৎপাদনমুখী খাতে। এ ধরনের কৌশলকে তারা ইতিবাচক হিসাবে মনে করে। কেননা, এতে ঋণের প্রবাহ উৎপাদন খাতে যাবে। যা করোনা পরবর্তী অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারে সহায়তায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

এতে আরও বলা হয়, মুদ্রানীতিতে সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩২ দশমকি ৬ শতাংশ। বেসরকারি খাতে ধরা হয়েছে ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ। এ ধরনের লক্ষ্যমাত্রাকে তারা অসামঞ্জস্য হিসাবে মনে করে। কেননা, দেশের জিডিপিতে সরকারি খাতের চেয়ে বেসরকারি খাতের অবদান বেশি। এ কারণে সরকারি খাতের চেয়ে বেসরকারি খাতেই ঋণ প্রবাহ বেশি বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা হওয়া উচিত ছিল। সরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ বেশি ধরায় বেসরকারি খাতে ঋণের জোগান বাড়াতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো চাপ অনুভব করবে কম।

বিদায়ী অর্থবছরে বেসরকারি খাতে রেকর্ড পরিমাণে কম ঋণ বিতরণ হয়েছে বেসরকারি খাতে। এ হার ৮ দশমকি ৪ শতাংশ। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হচ্ছে বেসরকারি খাতের ব্যবসা পরিবেশ দুর্বল। একই সঙ্গে করোনার বিধিনিষেধের কারণে সরবরাহ ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে বিনিয়োগ কম হচ্ছে। ফলে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি কম হচ্ছে। এতে ৯০ শতাংশ কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প তাদের সক্ষমতা কমিয়েছে। কমেছে বিনিয়োগ।

এদিকে সরকারের বৈদেশিক মুদ্রার চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত বেড়েছে। রেকর্ড রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় বাড়ার কারণে এমনটি হয়েছে। এটি ইতিবাচক।

নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা উপলক্ষ্যে গভর্নর

আর্থিক গোয়েন্দা কার্যক্রম বাড়ানো হবে

 যুগান্তর প্রতিবেদন 
৩০ জুলাই ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. ফজলে কবির বলেছেন, আর্থিক খাতে দুর্নীতি প্রতিরোধ ও টাকা পাচার বন্ধে আর্থিক গোয়েন্দা কার্যক্রম বাড়াতে ব্যাপক উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে করোনার নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলায় ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের অপব্যবহার বন্ধে করা হবে বিশেষ তদন্ত। প্রণোদনার ফলে অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়েছে তা জানতে চালানো হবে বিশেষ সমীক্ষা। চলমান প্যাকেজ ও নীতি-সহায়তা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি নতুন প্যাকেজও ঘোষণা দেওয়া হবে।

চলতি অর্থবছরের নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণার সময় লিখিত বক্তব্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির এসব কথা বলেছেন। বৃহস্পতিবার বিকালে কেন্দ্রীয় ব্যাংক চলতি অর্থবছরের জন্য সম্প্রসারণ ও সংকুলানমুখী মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে। এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে মজুত মুদ্রা কমিয়ে বাজারে ঋণের প্রবাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগের মতো চলতি অর্থবছরের মুদ্রানীতিতেও বাজারে ঋণের প্রবাহ বাড়ানোর নীতি অনুসরণ করা হবে। ঋণের জোগান সবচেয়ে বেশি বাড়ানো হবে উৎপাদন ও ব্যবসা খাতে। নতুন শিল্প স্থাপনেও বিনিয়োগ বাড়ানোর নীতি অনুসরণ করা হবে। করোনার কারণে অধিকতর ক্ষতিগ্রস্ত অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, পরিবহণ শ্রমিক, হোটেল-রেস্টুরেন্ট কর্মচারী ও বেসরকারি শিক্ষা খাতে জড়িতদের জন্য নতুন করে বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন স্কিম চালু হবে। গুরুত্ব দেওয়া হবে মানসম্মত কর্মসংস্থান, নতুন উদ্যোগ, নারী উদ্যোক্তাদের ঋণ প্রদানে। গ্রামের মানুষকে ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনতে গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে খোলা হবে উপ-শাখা। প্রণোদনা প্যাকেজগুলোর সফল বাস্তবায়নে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরদারি আরও বাড়ানো হবে। নতুন উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঘোষিত ৫০০ কোটি টাকার তহবিল ও ব্যাংকগুলোর পরিচালন মুনাফার কমপক্ষে ১ শতাংশ নিয়ে স্টার্টআপ ফান্ডের আকার আরও বাড়ানো হবে। কুটির, ক্ষুদ্র, মাঝারি শিল্প খাতের বিশেষ করে হালকা প্রকৌশল, ক্লাস্টার অ্যান্ড ভ্যালু চেইন ও নারী উদ্যোক্তাদের ঋণ দিতে ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিমের আওতা আরও বাড়ানো হবে।

গভর্নর বলেছেন, করোনার প্রভাব মোকাবিলা করতে ব্যাংকিং খাতে টাকার প্রবাহ বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু ঋণ প্রবাহ সেইভাবে না বাড়ার ফলে অতিরিক্ত তারল্যের চাপ বেড়েছে। এসব অর্থ অনুৎপাদনশীল খাতে গিয়ে যাতে মূল্যস্ফীতির হার বাড়াতে না পারে সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি রাখা হবে। এসব অর্থ উৎপাদন খাতে ঋণ বিতরণের উৎসাহিত করা হবে। প্রয়োজন হলে বাজার থেকে তুলে নিয়ে মুদ্রা সরবরাহ ব্যবস্থায় ভারসাম্য আনা হবে।

তিনি আরও বলেন, প্রণোদনার ঋণের টাকার অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সতর্ক রয়েছে। প্রণোদনা প্যাকেজের অর্থের অপব্যবহার রোধে সরেজমিন তদন্ত করা হবে। একই সঙ্গে প্যাকেজ ব্যবহার করে অর্থনীতিতে কি ধরনের প্রভাব পড়েছে তা জানতে বিশেষ সমীক্ষা করা হবে। করোনার দ্বিতীয় ঢেউ অর্থনীতিতে আতঙ্কময় পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে।

সূত্র জানায়, বিভিন্ন সংস্থার জরিপে দেশ থেকে টাকা পাচারের ঘটনা উঠে আসছে। আর্থিক খাতে বড় বড় দুর্নীতিও ঘটছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে এবারের মুদ্রানীতিতেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর প্রথমবারের মতো ঘোষণা দিয়েছেন, আর্থিক খাতে দুর্নীতি ও টাকা পাচার বন্ধে বাংলাদেশ আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের মাধ্যমে আর্থিক গোয়েন্দা কার্যক্রম বাড়াতে ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ অব্যাহত রয়েছে।

মুদ্রানীতিতে চলতি অর্থবছরের জুনের মধ্যে টাকার প্রবাহ বা ব্যাপক মুদ্রা সরবরাহ ১৫ শতাংশ বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত জুনে ছিল ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ। গত জুনে মজুত মুদ্রা বা রিজার্ভ মানি ছিল ২২ দশমিক ৪ শতাংশ। ডিসেম্বরে তা ১৪ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। জুনের মধ্যে তা আরও কমিয়ে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা হবে। ঋণ বিতরণ কম হওয়ায় বর্তমানে মজুত মুদ্রার পরিমাণ বেড়ে গেছে। এ অর্থ থেকে ঋণ প্রবাহ বাড়িয়ে এর হার কমিয়ে আনা হবে।

জুনে অভ্যন্তরীণ ঋণ প্রবাহ বেড়েছিল ১০ দশমিক ৩ শতাংশ। ডিসেম্বরে তা বাড়িয়ে ১৪ দশমিক ১ শতাংশে নেওয়া হবে। জুনের মধ্যে তা আরও বাড়িয়ে ১৭ দশমিক ৮ শতাংশে নিয়ে যাওয়া হবে। এর মধ্যে সরকারি খাতে ৩২ দশমিক ৬ শতাংশ এবং বেসরকারি খাতে ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। জুনে সরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ বেড়েছিল ২১ দশমিক ২ শতাংশ এবং বেসরকারি খাতে ৮ দশমিক ৪ শতাংশ।

এ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, মুদ্রানীতির লক্ষ্যগুলো ভালো। তবে বাস্তবতার নিরিখে এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা বড় চ্যালেঞ্জ। কেননা করোনার কারণে নতুন বিনিয়োগ হচ্ছে না। সরকারি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের গতিও শ্লথ। এ অবস্থায় ঋণ প্রবাহ বাড়ানো কঠিন হবে। বেসরকারি খাতে তো চাহিদাই নেই। নতুন উদ্যোগে ব্যাংকগুলো ঝুঁকি নিয়ে ঋণ দিচ্ছে না।

তিনি আরও বলেন, তবে প্রণোদনা প্যাকেজগুলোর অপব্যবহার রোধে গৃহীত পদক্ষেপ ও দুর্নীতি এবং টাকা পাচার বন্ধে গৃহীত পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন হলে আর্থিক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হবে।

ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি আবুল কাসেম খান বলেন, মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ বাড়ানোর যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে তা ইতিবাচক। তবে ঋণ প্রবাহ বাড়াতে বেসরকারি খাতকে সহায়তা দিতে হবে। ব্যাংকগুলোকে ঝুঁকি নিয়ে ঋণ বিতরণ করতে হবে। তাহলে বেসরকারি খাত ঋণ গ্রহণে এগিয়ে আসবে। পাশাপাশি নতুন উদ্যোগে বেশি ঋণ দিতে হবে।

মুদ্রানীতিতে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এর প্রভাবে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ জুনের মধ্যে বেড়ে ৫ হাজার ২০০ কোটি ডলারে দাঁড়াবে। যা দিয়ে ৭ মাসেরও বেশি আমদানি ব্যয় মেটানো যাবে। বর্তমানে রিজার্ভের পরিমাণ ৪ হাজার ৬০০ কোটি ডলার।

করোনার প্রভাব মোকাবিলা করতে ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ ও নীতি সহায়তা অব্যাহত রাখার নীতি অনুসরণ করা হবে। ব্যাংকিং খাতের অতিরিক্ত তারল্য অনুৎপাদনশীল খাতে নয়, উৎপাদন খাতে নেওয়া হবে। এতে মূল্যস্ফীতির হার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।

ঢাকা চেম্বারের প্রতিক্রিয়া : ঘোষিত মুদ্রানীতিকে ধারাবাহিক হিসাবে অভিহিত করে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) বলেছে, করোনার নেতিবাচক প্রভাব থেকে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারে ছাড় দেওয়া হয়েছে।

বেসরকারি খাতের চেয়ে সরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বেশি বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রাকে তারা অসামঞ্জস্যমূলক হিসাবে বর্ণনা করেছে।

বৃহস্পতিবার মুদ্রানীতি ঘোষণার পর ঢাকা চেম্বার এক বিবৃতিতে এ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। বিবৃতিতে তারা আরও বলেছে, ঘোষিত মুদ্রানীতি সম্প্রসারণমূলক ও সঙ্কুলানমুখী করা হয়েছে। অর্থাৎ বাজারে ঋণের প্রবাহ বাড়ানো হবে। তবে তা সব খাতে নয়। চাহিদা অনুযায়ী। বিশেষ করে উৎপাদনমুখী খাতে। এ ধরনের কৌশলকে তারা ইতিবাচক হিসাবে মনে করে। কেননা, এতে ঋণের প্রবাহ উৎপাদন খাতে যাবে। যা করোনা পরবর্তী অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারে সহায়তায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

এতে আরও বলা হয়, মুদ্রানীতিতে সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩২ দশমকি ৬ শতাংশ। বেসরকারি খাতে ধরা হয়েছে ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ। এ ধরনের লক্ষ্যমাত্রাকে তারা অসামঞ্জস্য হিসাবে মনে করে। কেননা, দেশের জিডিপিতে সরকারি খাতের চেয়ে বেসরকারি খাতের অবদান বেশি। এ কারণে সরকারি খাতের চেয়ে বেসরকারি খাতেই ঋণ প্রবাহ বেশি বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা হওয়া উচিত ছিল। সরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ বেশি ধরায় বেসরকারি খাতে ঋণের জোগান বাড়াতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো চাপ অনুভব করবে কম।

বিদায়ী অর্থবছরে বেসরকারি খাতে রেকর্ড পরিমাণে কম ঋণ বিতরণ হয়েছে বেসরকারি খাতে। এ হার ৮ দশমকি ৪ শতাংশ। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হচ্ছে বেসরকারি খাতের ব্যবসা পরিবেশ দুর্বল। একই সঙ্গে করোনার বিধিনিষেধের কারণে সরবরাহ ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে বিনিয়োগ কম হচ্ছে। ফলে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি কম হচ্ছে। এতে ৯০ শতাংশ কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প তাদের সক্ষমতা কমিয়েছে। কমেছে বিনিয়োগ।

এদিকে সরকারের বৈদেশিক মুদ্রার চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত বেড়েছে। রেকর্ড রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় বাড়ার কারণে এমনটি হয়েছে। এটি ইতিবাচক।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন