তিন দিনের রিমান্ডে হেলেনা জাহাঙ্গীর
jugantor
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা 
তিন দিনের রিমান্ডে হেলেনা জাহাঙ্গীর
আরও একাধিক মামলা প্রক্রিয়াধীন * জয়যাত্রা টিভি কার্যালয় সিলগালা * কর্মী নিয়োগের মাধ্যমে লাখ টাকা পর্যন্ত চাঁদাবাজি

  যুগান্তর প্রতিবেদন  

৩১ জুলাই ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আওয়ামী লীগের বহিষ্কৃত নেত্রী ব্যবসায়ী হেলেনা জাহাঙ্গীরকে তিন দিনের রিমান্ডে নিয়েছে গুলশান থানা পুলিশ। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের একটি মামলায় তাকে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। শুক্রবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে শুনানি শেষে ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট রাজেশ চৌধুরী রিমান্ডের এ আদেশ দেন।

এদিন রাত ৮টার দিকে হেলেনাকে আদালতে হাজির করে পাঁচ দিনের রিমান্ডের আবেদন করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা গুলশান থানার পুলিশ পরিদর্শক শেখ শাহানুর রহমান।

ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইনজীবী মো. আব্দুল্লাহ আবু, সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর হেমায়েত উদ্দিন খান হিরণ আসামির রিমান্ড চেয়ে শুনানি করেন। অপর দিকে আসামিপক্ষে রিমান্ড বাতিল চেয়ে জামিন আবেদন করা হয়।

উভয়পক্ষের শুনানি শেষে আদালত আসামির জামিন আবেদন নাকচ করে রিমান্ডের ওই আদেশ দেন। রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, আসামি ডিজিটাল প্লাটফরম ব্যবহার করে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী ও সংস্থাকে কটূক্তি করেছেন।

দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতিতে লিপ্ত ছিলেন। মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে আসামিকে রিমান্ডে নেওয়া জরুরি।

রাজধানীর গুলশান থানায় শুক্রবার সন্ধ্যায় হেলেনার বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা ছাড়াও মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইন এবং বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইন এবং বণ্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় আরও একটি মামলা করা হয়েছে।

তার বিরুদ্ধে আরও একাধিক মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের লঙ্ঘন এবং গুলশানের বাসা ও মিরপুরের ‘জয়যাত্রা আইপি টিভি’র কার্যালয় থেকে অননুমোদিত সরঞ্জাম উদ্ধারের ঘটনায় তাকে এসব মামলার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

এ ছাড়া অনুমোদন না থাকায় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে তার মালিকানাধীন ‘জয়যাত্রা আইপি টিভি’। মিরপুরে এটির কার্যালয় সিলগালা করে দিয়েছে র‌্যাব।

এদিন বিকালে কুর্মিটোলার র‌্যাব সদর দপ্তরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে হেলেনাকে গ্রেফতার ও প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্য নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক খন্দকার আল মঈন।

তিনি জানান, হেলেনা জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, বিশেষ ক্ষমতা আইন, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন ও টেলিযোগাযোগ আইনে পৃথক মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। রাজধানীর গুলশান ও পল্লবী থানায় এসব মামলা করা হবে। ইতোমধ্যে হেলেনাকে গুলশান থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।

এর আগে বৃহস্পতিবার রাতে র‌্যাবের একটি দল হেলেনার গুলশান-২ এর ৩৬ নম্বর সড়কের পাঁচ নম্বর বাসায় প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টার অভিযান শেষে তাকে আটক করে। এ সময় উদ্ধার করা হয় বিদেশি মদ, ওয়াকিটকি সেট, ফরেন কারেন্সি (বিদেশি মুদ্রা), ক্যাসিনো খেলার সরঞ্জাম এবং হরিণ ও ক্যাঙ্গারুর চামড়া।

আটকের পর তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য র‌্যাব সদর দপ্তরে নিয়ে যাওয়া হয়। সম্প্রতি ফেসবুকে ‘আওয়ামী চাকরিজীবী লীগ’ নামের একটি সংগঠনের নেতা বানানোর ঘোষণা দিয়ে ছবি পোস্ট করে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন হেলেনা।

মামলার বিষয়ে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক খন্দকার আল মঈন বলেন, ‘হেলেনা জাহাঙ্গীরের বাসায় অভিযান চালিয়ে আমরা মাদক পেয়েছি, ওয়াকিটকি সেট পেয়েছি, বন্যপ্রাণী হরিণ ও ক্যাঙ্গারুর চামড়া পেয়েছি। তার বিরুদ্ধে মাদক নিয়ন্ত্রণ আইনে ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে মামলা প্রক্রিয়াধীন।

তিনি বলেন, যেহেতু তার বাসায় ক্যাঙ্গারুর চামড়া পাওয়া গেছে এবং তা বাংলাদেশে নেই, তাই তার বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা হবে। তার বাসায় আমরা অননুমোদিত ওয়াকিটকি পেয়েছি, তাই টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইনেও মামলা হবে।

তার মিরপুরের টেলিভিশন চ্যানেলে বিটিআরসিকে (বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন) নিয়ে যে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে সেখানে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইনের যে বরখেলাপ হয়েছে সেই আইনেও মামলা প্রক্রিয়াধীন।

খন্দকার আল মঈন আরও বলেন, তিনি আইপি টিভির নামে টেলিভিশনটি পরিচালনা করলেও জয়যাত্রার ভবনে যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম ছিল স্যাটেলাইট টিভির। যেগুলো অনুমোদনবিহীন অবস্থায় পাওয়া যায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে টেলিযোগাযোগ আইন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে মামলা হবে।

আমরা জেনেছি, তিনি দেশের বিভিন্ন জেলায় তার এজেন্ট নিয়োগ করতেন। যারা তার টিভি চ্যানেলে কাজ করত তাদের থেকে ২০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করতেন। এ সংক্রান্ত বিভিন্ন কনভারসেশন আমরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখেছি। যারা প্রতারিত হয়েছে তাদের অনেকেও আমাদের জানিয়েছে।

বিদেশি মুদ্রার বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা যখন অভিযান পরিচালনা করি তখন পারিপার্শ্বিক যেসব আলামত রয়েছে সবই জব্দ তালিকায় অন্তর্র্ভুক্ত করি। পরে তা থানায় হস্তান্তর করব। তখন এর মধ্যে যদি বিদেশ যাতায়াতের জন্য বা নিয়মের মধ্যে থেকে সংগ্রহে রাখা কিছু থাকে তাহলে আবেদনের মাধ্যমে তারা তা নিয়ে যেতে পারেন।

হেলেনার অনিয়ম দুদক ও সিআইডির নজরে আনা হবে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা যা বলছি তার সবই তাকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে। মানি লন্ডারিং বা অন্যান্য যেসব ইস্যু রয়েছে তা সরকারের অন্যান্য সংস্থা রয়েছে তারা দেখবে।

আমরা যেসব বিষয় পেয়েছি তা তাদের জানাব, তাদের বিষয়গুলো আমাদের জানাবে। তারা এ সংক্রান্ত তথ্য পেলে আমলে নিয়ে ব্যবস্থা নেবে বলে আমার বিশ্বাস।

হেলেনা জাহাঙ্গীরকে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, তিনি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের মানহানি ও সুনাম নষ্ট করেছেন। এ ছাড়া তিনি মিথ্যা ও বানোয়াট তথ্য প্রচারের মাধ্যমে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছেন।

তিনি খ্যাতি লাভের আশায় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে ছবি তুলে তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেন। এতে বিভিন্ন সম্মানিত ব্যক্তি বিব্রত হয়েছেন। অনৈতিক পন্থায় নিজেকে খ্যাতনামা হিসাবে উপস্থাপন করতে চতুরতার আশ্রয় গ্রহণ করেন।

এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে তিনি একটি সংঘবদ্ধ চক্র তৈরি করেছেন। একটি উচ্চাভিলাষী উদ্দেশ্যে তিনি এ ধরনের কর্মে লিপ্ত ছিলেন।

র‌্যাব জানায়, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে ফেসবুক লাইভে এসে অযাচিত ও কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য দিতেন হেলেনা। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে বিভিন্ন সম্মানিত ব্যক্তিদের কটাক্ষ ও উত্ত্যক্ত করতেন।

পরে ফোন করেও ওইসব সম্মানিত ব্যক্তিকে হেয় প্রতিপন্ন করেছেন, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে তিনি তার অসৎ উদ্দেশ্য চরিতার্থ করেছেন। প্রবাসী আলোচিত সেফুদা, যিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ বক্তব্যের মাধ্যমে দেশবাসীর নজর কাড়তে চেষ্টা করেন।

জিজ্ঞাসাবাদে হেলেনা জানায়, তার সঙ্গে সেফুদার যোগাযোগ ও লেনদেন ছিল। সেফুদা তাকে নাতি বলে সম্বোধন করতেন বলেও জানান।

তিনি অপকৌশলের মাধ্যমে নিজেকে মাদার তেরেসা, পল্লিমাতা, প্রবাসী মাতা হিসাবে পরিচিতি পেতে জয়যাত্রা ফাউন্ডেশনকে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করেছেন। তার প্রচেষ্টায় সংঘবদ্ধ চক্রটি ভুয়া খেতাবের জন্য প্রচার চালাত।

র‌্যাব জানায়, বিভিন্ন দেশি-বিদেশি সংস্থা ও ব্যক্তিবর্গ থেকে জয়যাত্রা ফাউন্ডেশনের নামে অর্থ সংগ্রহ করতেন। যা মানবিক সহায়তায় ব্যবহারের চেয়ে হেলেনা জাহাঙ্গীরের খেতাব প্রচার-প্রচারণায় বেশি ব্যবহার হয়েছে।

গ্রেফতার হেলেনা জাহাঙ্গীর বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনে সম্পৃক্ত থেকে নিজের বিভিন্ন এজেন্ডা বাস্তবায়ন করেছেন। তার প্রায় ১২টি ক্লাবে সদস্যপদ রয়েছে।

র‌্যাব আরও জানায়, মিরপুরে হেলেনা জাহাঙ্গীরের অনুমোদনহীন ‘জয়যাত্রা টেলিভিশন’ সিলগালা করা হয়েছে এবং অবৈধ মালামাল জব্দ করা হয়েছে। ওই টেলিভিশনে বিভিন্ন কর্মী ও সাংবাদিক নিয়োগের মাধ্যমে তিনি চাঁদাবাজি করতেন বলে তারা জানতে পেরেছে।

এ ধরনের চাঁদাবাজি সংক্রান্ত ফোনালাপ ইতোমধ্যে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। অভিযানে চাঁদাবাজি সংক্রান্ত নথিও জব্দ করা হয়। ইতোমধ্যে এই টেলিভিশনের একজন জেলা প্রতিনিধিকে চাঁদাবাজি সংক্রান্ত মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছে।

যেই অপরাধে হেলেনা জাহাঙ্গীর অপরাধী এমন অন্যান্য আইপি টিভির মালিকদের বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে-এমন প্রশ্ন ছিল সাংবাদিকদের। এর জবাবে র‌্যাবের এই পরিচালক বলেন, আইপি টিভি বা অনিয়মতান্ত্রিক টিভি চ্যানেল এটি শনাক্ত করা বা লাইসেন্স কেড়ে নেওয়ার দায়িত্ব কিন্তু আমাদের নয়, বিটিআরসির।

আমরা এখানে যে অভিযান পরিচালনা করেছি তারা আমাদের সহযোগিতা করেছে। বিটিআরসি তার সম্প্রচার বন্ধের বিষয়ে উদ্যোগ নিয়েছে। যদি এমন আরও অন্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকে তাহলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হিসাবে আমরা তা দেখব। কিন্তু সম্প্রচারকেন্দ্রিক কোনো বিষয় থাকলে বিটিআরসি তা দেখভাল করবে।

এদিকে গ্রেফতারের পর হেলেনা জাহাঙ্গীরের মেয়ে দাবি করেন, তার ভাইয়ের মদের লাইসেন্স ছিল। যেসব মদ পাওয়া গেছে সেগুলো তার ভাইয়ের। এ ছাড়া অভিযানকালে র‌্যাবের এক সদস্যের ভূমিকা নিয়েও অভিযোগ করেন তিনি।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে র‌্যাবের পরিচালক বলেন, যাদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হয় তাদের সংক্ষুব্ধ থাকাটাই স্বাভাবিক। আমরা কি জানি তার ভাইয়ের কতটুকু মাদক গ্রহণের লাইসেন্স আছে? সেটা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যাচাই করবে। তিনি তার বক্তব্য দিয়েছেন।

তার বক্তব্যের মাধ্যমে এটি পরিষ্কারভাবে উঠে এসেছে যে, আমরা তাদের বাসায় যে অভিযান পরিচালনা করেছি, জব্দ করা জিনিসগুলো হেলেনা জাহাঙ্গীরের রুমেই ছিল। তিনি আরও বলেন, তাকে গ্রেফতার করে প্রাথমিকভাবে কিছু তথ্য পেয়েছি। সেগুলো নিয়ে কাজ করব।

পরে এ বিষয়ে আরও জানাব। হেলেনা জাহাঙ্গীরের সংশ্লিষ্ট যদি আরও কাউকে পাই তাহলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেব।

অর্থ পাচারের অভিযোগ থাকলে তদন্ত করবে দুদক : হেলেনা জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের অভিযোগ থাকলে তা তদন্ত করবে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

শুক্রবার সংস্থাটির কমিশনার ড. মোজাম্মেল হক খান গণমাধ্যমকে বলেন, তার বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিংয়ের কোনো অভিযোগ থাকলে দুদক তা তদন্ত করবে।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা 

তিন দিনের রিমান্ডে হেলেনা জাহাঙ্গীর

আরও একাধিক মামলা প্রক্রিয়াধীন * জয়যাত্রা টিভি কার্যালয় সিলগালা * কর্মী নিয়োগের মাধ্যমে লাখ টাকা পর্যন্ত চাঁদাবাজি
 যুগান্তর প্রতিবেদন 
৩১ জুলাই ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আওয়ামী লীগের বহিষ্কৃত নেত্রী ব্যবসায়ী হেলেনা জাহাঙ্গীরকে তিন দিনের রিমান্ডে নিয়েছে গুলশান থানা পুলিশ। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের একটি মামলায় তাকে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। শুক্রবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে শুনানি শেষে ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট রাজেশ চৌধুরী রিমান্ডের এ আদেশ দেন।

এদিন রাত ৮টার দিকে হেলেনাকে আদালতে হাজির করে পাঁচ দিনের রিমান্ডের আবেদন করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা গুলশান থানার পুলিশ পরিদর্শক শেখ শাহানুর রহমান।

ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইনজীবী মো. আব্দুল্লাহ আবু, সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর হেমায়েত উদ্দিন খান হিরণ আসামির রিমান্ড চেয়ে শুনানি করেন। অপর দিকে আসামিপক্ষে রিমান্ড বাতিল চেয়ে জামিন আবেদন করা হয়।

উভয়পক্ষের শুনানি শেষে আদালত আসামির জামিন আবেদন নাকচ করে রিমান্ডের ওই আদেশ দেন। রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, আসামি ডিজিটাল প্লাটফরম ব্যবহার করে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী ও সংস্থাকে কটূক্তি করেছেন।

দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতিতে লিপ্ত ছিলেন। মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে আসামিকে রিমান্ডে নেওয়া জরুরি।

রাজধানীর গুলশান থানায় শুক্রবার সন্ধ্যায় হেলেনার বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা ছাড়াও মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইন এবং বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইন এবং বণ্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় আরও একটি মামলা করা হয়েছে।

তার বিরুদ্ধে আরও একাধিক মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের লঙ্ঘন এবং গুলশানের বাসা ও মিরপুরের ‘জয়যাত্রা আইপি টিভি’র কার্যালয় থেকে অননুমোদিত সরঞ্জাম উদ্ধারের ঘটনায় তাকে এসব মামলার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

এ ছাড়া অনুমোদন না থাকায় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে তার মালিকানাধীন ‘জয়যাত্রা আইপি টিভি’। মিরপুরে এটির কার্যালয় সিলগালা করে দিয়েছে র‌্যাব।

এদিন বিকালে কুর্মিটোলার র‌্যাব সদর দপ্তরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে হেলেনাকে গ্রেফতার ও প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্য নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক খন্দকার আল মঈন।

তিনি জানান, হেলেনা জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, বিশেষ ক্ষমতা আইন, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন ও টেলিযোগাযোগ আইনে পৃথক মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। রাজধানীর গুলশান ও পল্লবী থানায় এসব মামলা করা হবে। ইতোমধ্যে হেলেনাকে গুলশান থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।

এর আগে বৃহস্পতিবার রাতে র‌্যাবের একটি দল হেলেনার গুলশান-২ এর ৩৬ নম্বর সড়কের পাঁচ নম্বর বাসায় প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টার অভিযান শেষে তাকে আটক করে। এ সময় উদ্ধার করা হয় বিদেশি মদ, ওয়াকিটকি সেট, ফরেন কারেন্সি (বিদেশি মুদ্রা), ক্যাসিনো খেলার সরঞ্জাম এবং হরিণ ও ক্যাঙ্গারুর চামড়া।

আটকের পর তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য র‌্যাব সদর দপ্তরে নিয়ে যাওয়া হয়। সম্প্রতি ফেসবুকে ‘আওয়ামী চাকরিজীবী লীগ’ নামের একটি সংগঠনের নেতা বানানোর ঘোষণা দিয়ে ছবি পোস্ট করে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন হেলেনা।

মামলার বিষয়ে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক খন্দকার আল মঈন বলেন, ‘হেলেনা জাহাঙ্গীরের বাসায় অভিযান চালিয়ে আমরা মাদক পেয়েছি, ওয়াকিটকি সেট পেয়েছি, বন্যপ্রাণী হরিণ ও ক্যাঙ্গারুর চামড়া পেয়েছি। তার বিরুদ্ধে মাদক নিয়ন্ত্রণ আইনে ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে মামলা প্রক্রিয়াধীন।

তিনি বলেন, যেহেতু তার বাসায় ক্যাঙ্গারুর চামড়া পাওয়া গেছে এবং তা বাংলাদেশে নেই, তাই তার বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা হবে। তার বাসায় আমরা অননুমোদিত ওয়াকিটকি পেয়েছি, তাই টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইনেও মামলা হবে।

তার মিরপুরের টেলিভিশন চ্যানেলে বিটিআরসিকে (বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন) নিয়ে যে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে সেখানে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইনের যে বরখেলাপ হয়েছে সেই আইনেও মামলা প্রক্রিয়াধীন।

খন্দকার আল মঈন আরও বলেন, তিনি আইপি টিভির নামে টেলিভিশনটি পরিচালনা করলেও জয়যাত্রার ভবনে যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম ছিল স্যাটেলাইট টিভির। যেগুলো অনুমোদনবিহীন অবস্থায় পাওয়া যায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে টেলিযোগাযোগ আইন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে মামলা হবে।

আমরা জেনেছি, তিনি দেশের বিভিন্ন জেলায় তার এজেন্ট নিয়োগ করতেন। যারা তার টিভি চ্যানেলে কাজ করত তাদের থেকে ২০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করতেন। এ সংক্রান্ত বিভিন্ন কনভারসেশন আমরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখেছি। যারা প্রতারিত হয়েছে তাদের অনেকেও আমাদের জানিয়েছে। 

বিদেশি মুদ্রার বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা যখন অভিযান পরিচালনা করি তখন পারিপার্শ্বিক যেসব আলামত রয়েছে সবই জব্দ তালিকায় অন্তর্র্ভুক্ত করি। পরে তা থানায় হস্তান্তর করব। তখন এর মধ্যে যদি বিদেশ যাতায়াতের জন্য বা নিয়মের মধ্যে থেকে সংগ্রহে রাখা কিছু থাকে তাহলে আবেদনের মাধ্যমে তারা তা নিয়ে যেতে পারেন। 

হেলেনার অনিয়ম দুদক ও সিআইডির নজরে আনা হবে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা যা বলছি তার সবই তাকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে। মানি লন্ডারিং বা অন্যান্য যেসব ইস্যু রয়েছে তা সরকারের অন্যান্য সংস্থা রয়েছে তারা দেখবে।

আমরা যেসব বিষয় পেয়েছি তা তাদের জানাব, তাদের বিষয়গুলো আমাদের জানাবে। তারা এ সংক্রান্ত তথ্য পেলে আমলে নিয়ে ব্যবস্থা নেবে বলে আমার বিশ্বাস।

হেলেনা জাহাঙ্গীরকে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, তিনি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের মানহানি ও সুনাম নষ্ট করেছেন। এ ছাড়া তিনি মিথ্যা ও বানোয়াট তথ্য প্রচারের মাধ্যমে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছেন।

তিনি খ্যাতি লাভের আশায় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে ছবি তুলে তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেন। এতে বিভিন্ন সম্মানিত ব্যক্তি বিব্রত হয়েছেন। অনৈতিক পন্থায় নিজেকে খ্যাতনামা হিসাবে উপস্থাপন করতে চতুরতার আশ্রয় গ্রহণ করেন।

এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে তিনি একটি সংঘবদ্ধ চক্র তৈরি করেছেন। একটি উচ্চাভিলাষী উদ্দেশ্যে তিনি এ ধরনের কর্মে লিপ্ত ছিলেন।

র‌্যাব জানায়, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে ফেসবুক লাইভে এসে অযাচিত ও কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য দিতেন হেলেনা। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে বিভিন্ন সম্মানিত ব্যক্তিদের কটাক্ষ ও উত্ত্যক্ত করতেন।

পরে ফোন করেও ওইসব সম্মানিত ব্যক্তিকে হেয় প্রতিপন্ন করেছেন, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে তিনি তার অসৎ উদ্দেশ্য চরিতার্থ করেছেন। প্রবাসী আলোচিত সেফুদা, যিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ বক্তব্যের মাধ্যমে দেশবাসীর নজর কাড়তে চেষ্টা করেন।

জিজ্ঞাসাবাদে হেলেনা জানায়, তার সঙ্গে সেফুদার যোগাযোগ ও লেনদেন ছিল। সেফুদা তাকে নাতি বলে সম্বোধন করতেন বলেও জানান।

তিনি অপকৌশলের মাধ্যমে নিজেকে মাদার তেরেসা, পল্লিমাতা, প্রবাসী মাতা হিসাবে পরিচিতি পেতে জয়যাত্রা ফাউন্ডেশনকে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করেছেন। তার প্রচেষ্টায় সংঘবদ্ধ চক্রটি ভুয়া খেতাবের জন্য প্রচার চালাত।

র‌্যাব জানায়, বিভিন্ন দেশি-বিদেশি সংস্থা ও ব্যক্তিবর্গ থেকে জয়যাত্রা ফাউন্ডেশনের নামে অর্থ সংগ্রহ করতেন। যা মানবিক সহায়তায় ব্যবহারের চেয়ে হেলেনা জাহাঙ্গীরের খেতাব প্রচার-প্রচারণায় বেশি ব্যবহার হয়েছে।

গ্রেফতার হেলেনা জাহাঙ্গীর বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনে সম্পৃক্ত থেকে নিজের বিভিন্ন এজেন্ডা বাস্তবায়ন করেছেন। তার প্রায় ১২টি ক্লাবে সদস্যপদ রয়েছে।

র‌্যাব আরও জানায়, মিরপুরে হেলেনা জাহাঙ্গীরের অনুমোদনহীন ‘জয়যাত্রা টেলিভিশন’ সিলগালা করা হয়েছে এবং অবৈধ মালামাল জব্দ করা হয়েছে। ওই টেলিভিশনে বিভিন্ন কর্মী ও সাংবাদিক নিয়োগের মাধ্যমে তিনি চাঁদাবাজি করতেন বলে তারা জানতে পেরেছে।

এ ধরনের চাঁদাবাজি সংক্রান্ত ফোনালাপ ইতোমধ্যে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। অভিযানে চাঁদাবাজি সংক্রান্ত নথিও জব্দ করা হয়। ইতোমধ্যে এই টেলিভিশনের একজন জেলা প্রতিনিধিকে চাঁদাবাজি সংক্রান্ত মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছে।

যেই অপরাধে হেলেনা জাহাঙ্গীর অপরাধী এমন অন্যান্য আইপি টিভির মালিকদের বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে-এমন প্রশ্ন ছিল সাংবাদিকদের। এর জবাবে র‌্যাবের এই পরিচালক বলেন, আইপি টিভি বা অনিয়মতান্ত্রিক টিভি চ্যানেল এটি শনাক্ত করা বা লাইসেন্স কেড়ে নেওয়ার দায়িত্ব কিন্তু আমাদের নয়, বিটিআরসির।

আমরা এখানে যে অভিযান পরিচালনা করেছি তারা আমাদের সহযোগিতা করেছে। বিটিআরসি তার সম্প্রচার বন্ধের বিষয়ে উদ্যোগ নিয়েছে। যদি এমন আরও অন্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকে তাহলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হিসাবে আমরা তা দেখব। কিন্তু সম্প্রচারকেন্দ্রিক কোনো বিষয় থাকলে বিটিআরসি তা দেখভাল করবে।

এদিকে গ্রেফতারের পর হেলেনা জাহাঙ্গীরের মেয়ে দাবি করেন, তার ভাইয়ের মদের লাইসেন্স ছিল। যেসব মদ পাওয়া গেছে সেগুলো তার ভাইয়ের। এ ছাড়া অভিযানকালে র‌্যাবের এক সদস্যের ভূমিকা নিয়েও অভিযোগ করেন তিনি।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে র‌্যাবের পরিচালক বলেন, যাদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হয় তাদের সংক্ষুব্ধ থাকাটাই স্বাভাবিক। আমরা কি জানি তার ভাইয়ের কতটুকু মাদক গ্রহণের লাইসেন্স আছে? সেটা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যাচাই করবে। তিনি তার বক্তব্য দিয়েছেন।

তার বক্তব্যের মাধ্যমে এটি পরিষ্কারভাবে উঠে এসেছে যে, আমরা তাদের বাসায় যে অভিযান পরিচালনা করেছি, জব্দ করা জিনিসগুলো হেলেনা জাহাঙ্গীরের রুমেই ছিল। তিনি আরও বলেন, তাকে গ্রেফতার করে প্রাথমিকভাবে কিছু তথ্য পেয়েছি। সেগুলো নিয়ে কাজ করব।

পরে এ বিষয়ে আরও জানাব। হেলেনা জাহাঙ্গীরের সংশ্লিষ্ট যদি আরও কাউকে পাই তাহলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেব।

অর্থ পাচারের অভিযোগ থাকলে তদন্ত করবে দুদক : হেলেনা জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের অভিযোগ থাকলে তা তদন্ত করবে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

শুক্রবার সংস্থাটির কমিশনার ড. মোজাম্মেল হক খান গণমাধ্যমকে বলেন, তার বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিংয়ের কোনো অভিযোগ থাকলে দুদক তা তদন্ত করবে।
 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন