ছোট ঋণে বড় খেলাপি
jugantor
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক
ছোট ঋণে বড় খেলাপি

  হামিদ বিশ্বাস  

৩১ জুলাই ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

কৃষকদের মধ্যে ঋণ বিতরণের জন্য জন্ম হয়েছিল সরকারি বিশেষায়িত বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের (বিকেবি)। কিন্তু প্রায় এক দশক আগে লক্ষ্যচ্যুত হওয়ায় ব্যাংকটি এখন সে মাশুল দিয়েই যাচ্ছে। অর্থাৎ বড় শিল্পে ঋণ দিয়ে খেলাপির জালে আটকা পড়েছে বিকেবি। তবে এখন কৃষকদের ঋণ দিয়ে আবার মূল লক্ষ্যে ফিরে আসছে ব্যাংকটি। আগে নেননি-এমন কৃষক খুঁজে ঋণ দিচ্ছে। নতুন আমানত ও প্রবাসী আয় সংগ্রহে জোর দিয়েছে।

কৃষি ব্যাংকের সবচেয়ে বড় গ্রাহকদের একটি পেয়ার ইয়ার্ন। প্রতিষ্ঠানটি ৩০০ কোটি টাকা ঋণ নিলেও কাক্সিক্ষত হারে পরিশোধ করেনি। ফলে বর্তমানে সুদে-আসলে ব্যাংকের পাওনা প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। যা পুরোটাই মন্দমানের খেলাপি।

এছাড়া আনিকা এন্টারপ্রাইজ প্রায় ১০০ কোটি টাকা এবং পিয়াজ এন্টারপ্রাইজের প্রায় ৬০ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ আদায় অযোগ্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য। ২০০৯, ২০১০ ও ২০১১ সালের দিকে এসব ঋণ দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ব্যাংকটির খেলাপি ২ হাজার ৪০৬ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৯ শতাংশ।

এখন শিল্প খাতে ঋণ বিতরণ বন্ধ রেখে খেলাপি ঋণ আদায় কার্যক্রম জোরদার করেছে বিকেবি। এর ফলে কৃষি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার কমে ইতোমধ্যে সিঙ্গেল ডিজিট অর্থাৎ ৯ শতাংশে নেমে এসেছে, যা পাঁচ বছর আগে ছিল ২৮ শতাংশ।

কৃষি ব্যাংকের বেশির ভাগ শাখাই গ্রামে। আর অধিকাংশ প্রবাসীও গ্রামের। সেজন্য রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় সংগ্রহে মনোযোগ দিয়েছে ব্যাংকটি। ইতোমধ্যে মানিগ্রাম, ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন, রিয়া, এক্সপ্রেস মানি, ট্রান্স ফাস্টের মতো বিদেশি এক্সচেঞ্জ হাউসগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করেছে। সেজন্য অনেক প্রবাসী এখন বিদেশ থেকে রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় পাঠাতে বেছে নিচ্ছেন বিকেবিকে।

গত ২০২০-২১ অর্থবছরে ব্যাংকটির মাধ্যমে প্রবাসী আয় এসেছে ৩ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা। এটা নিকট-অতীতে দেখা যায়নি। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এসেছিল ১ হাজার ৭ কোটি টাকার প্রবাসী আয়। ১ হাজার ৩৮টি শাখার সব কটি ইতোমধ্যে অনলাইনের আওতায় আসাটাও প্রবাসী আয় বৃদ্ধির একটি বড় কারণ।

জানতে চাইলে বিকেবির সদ্যবিদায়ী ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আলী হোসেন প্রধানিয়া বলেন, কৃষি ব্যাংককে একটা সঠিক গন্তব্যে পৌঁছে দিতে কাজ করেছি। এতে শতভাগ না হলেও উল্লেখযোগ্য সফলতা এসেছে। আগে ঋণ নেননি-এমন কৃষক খুঁজে ঋণ দিয়েছি। আবার নতুন নতুন আমানতকারী পেয়েছি। যেসব ঋণ দীর্ঘদিন আদায় হয়নি, তা আদায়ে সর্বাত্মক চেষ্টা করেছি।

তিনি আরও বলেন, এখন যা খেলাপি ঋণ রয়েছে, তার অর্ধেকই শিল্প খাতের। দীর্ঘদিনের পুরোনো এসব ঋণ আদায় করা অনেক কঠিন। কারণ ঋণগুলো সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই করে দেওয়া হয়নি। বাকি ঋণ কৃষকদের নেওয়া, যা আদায়ের চেষ্টা চলছে। আর প্রকৃত কৃষক বা উৎপাদনকারী কখনো ঋণখেলাপি হন না।

কৃষি ব্যাংক শুরু থেকে কৃষি ঋণ দিলেও ২০১০ সালের পর হঠাৎ পোশাক শিল্পে ঋণ দেওয়া শুরু করে। তা সাময়িকভাবে সুফল দিলেও দীর্ঘমেয়াদে সুখকর হয়নি। কারণ অল্প সময়েই প্রচুর ঋণখেলাপি হয়ে পড়ে। ফলে ২০১৬ সালে ব্যাংকটিতে খেলাপি ঋণ বেড়ে হয় ৪ হাজার ৮৪১ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা ঋণের ২৮ শতাংশ। তাই ব্যাংকটি শিল্পে ঋণ দেওয়া বন্ধ করে আদায়ে জোর দেয়।

তবে বিকেবি শিগগিরই মুনাফার মুখ দেখছে না। কারণ ব্যাংকটির তহবিল ব্যয় এখনো ৮ দশমিক ৬৬ শতাংশ, যা ২০১৭ সালে ছিল ৯ দশমিক ৮৮ শতাংশ। আর কৃষি ঋণের সুদহার ৮ শতাংশ। অর্থাৎ আয় থেকে ব্যয় ৬৬ শতাংশ বেশি।

জানা গেছে, বিশেষ উদ্যোগ নিয়ে গত চার অর্থবছরে প্রায় ১৬ লাখ নতুন আমানতকারী পেয়েছে ব্যাংকটি। এর ফলে আমানত বৃদ্ধি পেয়েছে ১০ হাজার ২৬১ কোটি টাকা। গত জুন শেষে ব্যাংকটিতে আমানতের অঙ্ক দাঁড়ায় ৩২ হাজার ৯৯৯ কোটি টাকা। আর আমানতকারী বেড়ে হয় ৯২ লাখ ৮৪ হাজার ৫৬৬ জন। আগে ঋণ নেননি এমন কৃষকদের গুরুত্ব দেওয়ায় তিন বছরে ৬ লাখ ২৫ হাজার ৬৫০ জন নতুন ঋণগ্রহীতা তৈরি হয়েছে।

ফলে ব্যাংকটির ঋণগ্রহীতার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৪ লাখ ১৭ হাজার ৯৮১। ২০১৭ সাল শেষে ব্যাংকটিতে খেলাপি ঋণ ছিল ৪ হাজার ৩১৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ২৪ শতাংশ। গত জুনে খেলাপি ঋণ কমে হয়েছে ২ হাজার ৪০৬ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৯ শতাংশ।

করোনাভাইরাসের প্রভাব মোকাবিলায় সরকারের দেওয়া আর্থিক প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে ব্যাংকটি ৪ লাখ ২৬ হাজার ৪১৭ জন কৃষককে ৪ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে। এছাড়া ব্যাংকের প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে গত তিন বছরে ১ হাজার ৯৬২টি বাণিজ্যিক নিরীক্ষা, ৬ হাজার ২৮২টি বাংলাদেশ ব্যাংক পরিদর্শন এবং ৯৯ হাজার ৬০৫টি অভ্যন্তরীণ আপত্তি নিষ্পত্তি করা হয়। একই সময়ে আরও ২৬৯টি শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা নিষ্পত্তি করে বিকেবি।

বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক

ছোট ঋণে বড় খেলাপি

 হামিদ বিশ্বাস 
৩১ জুলাই ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

কৃষকদের মধ্যে ঋণ বিতরণের জন্য জন্ম হয়েছিল সরকারি বিশেষায়িত বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের (বিকেবি)। কিন্তু প্রায় এক দশক আগে লক্ষ্যচ্যুত হওয়ায় ব্যাংকটি এখন সে মাশুল দিয়েই যাচ্ছে। অর্থাৎ বড় শিল্পে ঋণ দিয়ে খেলাপির জালে আটকা পড়েছে বিকেবি। তবে এখন কৃষকদের ঋণ দিয়ে আবার মূল লক্ষ্যে ফিরে আসছে ব্যাংকটি। আগে নেননি-এমন কৃষক খুঁজে ঋণ দিচ্ছে। নতুন আমানত ও প্রবাসী আয় সংগ্রহে জোর দিয়েছে।

কৃষি ব্যাংকের সবচেয়ে বড় গ্রাহকদের একটি পেয়ার ইয়ার্ন। প্রতিষ্ঠানটি ৩০০ কোটি টাকা ঋণ নিলেও কাক্সিক্ষত হারে পরিশোধ করেনি। ফলে বর্তমানে সুদে-আসলে ব্যাংকের পাওনা প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। যা পুরোটাই মন্দমানের খেলাপি।

এছাড়া আনিকা এন্টারপ্রাইজ প্রায় ১০০ কোটি টাকা এবং পিয়াজ এন্টারপ্রাইজের প্রায় ৬০ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ আদায় অযোগ্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য। ২০০৯, ২০১০ ও ২০১১ সালের দিকে এসব ঋণ দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ব্যাংকটির খেলাপি ২ হাজার ৪০৬ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৯ শতাংশ।

এখন শিল্প খাতে ঋণ বিতরণ বন্ধ রেখে খেলাপি ঋণ আদায় কার্যক্রম জোরদার করেছে বিকেবি। এর ফলে কৃষি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার কমে ইতোমধ্যে সিঙ্গেল ডিজিট অর্থাৎ ৯ শতাংশে নেমে এসেছে, যা পাঁচ বছর আগে ছিল ২৮ শতাংশ।

কৃষি ব্যাংকের বেশির ভাগ শাখাই গ্রামে। আর অধিকাংশ প্রবাসীও গ্রামের। সেজন্য রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় সংগ্রহে মনোযোগ দিয়েছে ব্যাংকটি। ইতোমধ্যে মানিগ্রাম, ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন, রিয়া, এক্সপ্রেস মানি, ট্রান্স ফাস্টের মতো বিদেশি এক্সচেঞ্জ হাউসগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করেছে। সেজন্য অনেক প্রবাসী এখন বিদেশ থেকে রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় পাঠাতে বেছে নিচ্ছেন বিকেবিকে।

গত ২০২০-২১ অর্থবছরে ব্যাংকটির মাধ্যমে প্রবাসী আয় এসেছে ৩ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা। এটা নিকট-অতীতে দেখা যায়নি। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এসেছিল ১ হাজার ৭ কোটি টাকার প্রবাসী আয়। ১ হাজার ৩৮টি শাখার সব কটি ইতোমধ্যে অনলাইনের আওতায় আসাটাও প্রবাসী আয় বৃদ্ধির একটি বড় কারণ।

জানতে চাইলে বিকেবির সদ্যবিদায়ী ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আলী হোসেন প্রধানিয়া বলেন, কৃষি ব্যাংককে একটা সঠিক গন্তব্যে পৌঁছে দিতে কাজ করেছি। এতে শতভাগ না হলেও উল্লেখযোগ্য সফলতা এসেছে। আগে ঋণ নেননি-এমন কৃষক খুঁজে ঋণ দিয়েছি। আবার নতুন নতুন আমানতকারী পেয়েছি। যেসব ঋণ দীর্ঘদিন আদায় হয়নি, তা আদায়ে সর্বাত্মক চেষ্টা করেছি।

তিনি আরও বলেন, এখন যা খেলাপি ঋণ রয়েছে, তার অর্ধেকই শিল্প খাতের। দীর্ঘদিনের পুরোনো এসব ঋণ আদায় করা অনেক কঠিন। কারণ ঋণগুলো সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই করে দেওয়া হয়নি। বাকি ঋণ কৃষকদের নেওয়া, যা আদায়ের চেষ্টা চলছে। আর প্রকৃত কৃষক বা উৎপাদনকারী কখনো ঋণখেলাপি হন না।

কৃষি ব্যাংক শুরু থেকে কৃষি ঋণ দিলেও ২০১০ সালের পর হঠাৎ পোশাক শিল্পে ঋণ দেওয়া শুরু করে। তা সাময়িকভাবে সুফল দিলেও দীর্ঘমেয়াদে সুখকর হয়নি। কারণ অল্প সময়েই প্রচুর ঋণখেলাপি হয়ে পড়ে। ফলে ২০১৬ সালে ব্যাংকটিতে খেলাপি ঋণ বেড়ে হয় ৪ হাজার ৮৪১ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা ঋণের ২৮ শতাংশ। তাই ব্যাংকটি শিল্পে ঋণ দেওয়া বন্ধ করে আদায়ে জোর দেয়।

তবে বিকেবি শিগগিরই মুনাফার মুখ দেখছে না। কারণ ব্যাংকটির তহবিল ব্যয় এখনো ৮ দশমিক ৬৬ শতাংশ, যা ২০১৭ সালে ছিল ৯ দশমিক ৮৮ শতাংশ। আর কৃষি ঋণের সুদহার ৮ শতাংশ। অর্থাৎ আয় থেকে ব্যয় ৬৬ শতাংশ বেশি।

জানা গেছে, বিশেষ উদ্যোগ নিয়ে গত চার অর্থবছরে প্রায় ১৬ লাখ নতুন আমানতকারী পেয়েছে ব্যাংকটি। এর ফলে আমানত বৃদ্ধি পেয়েছে ১০ হাজার ২৬১ কোটি টাকা। গত জুন শেষে ব্যাংকটিতে আমানতের অঙ্ক দাঁড়ায় ৩২ হাজার ৯৯৯ কোটি টাকা। আর আমানতকারী বেড়ে হয় ৯২ লাখ ৮৪ হাজার ৫৬৬ জন। আগে ঋণ নেননি এমন কৃষকদের গুরুত্ব দেওয়ায় তিন বছরে ৬ লাখ ২৫ হাজার ৬৫০ জন নতুন ঋণগ্রহীতা তৈরি হয়েছে।

ফলে ব্যাংকটির ঋণগ্রহীতার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৪ লাখ ১৭ হাজার ৯৮১। ২০১৭ সাল শেষে ব্যাংকটিতে খেলাপি ঋণ ছিল ৪ হাজার ৩১৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ২৪ শতাংশ। গত জুনে খেলাপি ঋণ কমে হয়েছে ২ হাজার ৪০৬ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৯ শতাংশ।

করোনাভাইরাসের প্রভাব মোকাবিলায় সরকারের দেওয়া আর্থিক প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে ব্যাংকটি ৪ লাখ ২৬ হাজার ৪১৭ জন কৃষককে ৪ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে। এছাড়া ব্যাংকের প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে গত তিন বছরে ১ হাজার ৯৬২টি বাণিজ্যিক নিরীক্ষা, ৬ হাজার ২৮২টি বাংলাদেশ ব্যাংক পরিদর্শন এবং ৯৯ হাজার ৬০৫টি অভ্যন্তরীণ আপত্তি নিষ্পত্তি করা হয়। একই সময়ে আরও ২৬৯টি শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা নিষ্পত্তি করে বিকেবি।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন