পরতে পরতে অনিয়ম
jugantor
কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল স্থাপন
পরতে পরতে অনিয়ম
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন

  হামিদ-উজ-জামান  

০২ আগস্ট ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

পরতে পরতে অনিয়ম হয়েছে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল স্থাপন প্রকল্পে। সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে এ চিত্র। সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ছাড়াই প্রকল্প গ্রহণ, দরপত্র প্রক্রিয়ায় আর্থিক ও পরিকল্পনা-শৃঙ্খলার বিচ্যুতি, কর্র্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়াই ইচ্ছমতো প্লিন্থ এরিয়া পরিবর্তন এবং আর্থিক ও পরিকল্পনা-শৃঙ্খলা লঙ্ঘন করে নির্মাণ কাজ পরিবর্তনসহ নানা অনিয়ম ঘটে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে। সেই সঙ্গে বাস্তবায়নে তৈরি হয় দীর্ঘসূত্রতা।

সরকারের প্রকল্প তদারকি সংস্থা বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) থেকে বিভিন্ন সময় অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়টি তুলে ধরে সুপারিশ দেওয়া হলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

সম্প্রতি আইএমইডি সচিবের নেতৃত্বে গঠিত চার সদস্যের তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদন দেয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে। সেখান থেকে ফাইল ফেরত এলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে সেই প্রতিবেদন পাঠিয়ে দিয়েছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়।

তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে যারা এসব অনিয়মের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন শুধু তাদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়নি। ওই সময় যারা এসব কাজের বিষয়ে ব্যত্যয় হয়নি বলে লিখিত বক্তব্য দিয়েছিলেন তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান যুগান্তরকে বলেন, দ্রুত ব্যবস্থা নিতে আমি প্রতিবেদন পাঠিয়েছি। এখনো জানি না ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কিনা। স্লো মুভিং প্রকল্প এবং মান নিয়ে প্রশ্ন ছিল বলে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আইএমইডি সচিবকে একটি বিশেষ দায়িত্ব দিয়েছিলাম। তারা প্রতিবেদন দিয়েছে। আমিও দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে প্রকল্পটির কাজ যাতে শুরু করা যায় সেজন্য চিঠি দিয়েছি। সেটিও প্রায় এক মাস হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মেডিকেল কলেজের চিকিৎসা সংক্রান্ত কাজ করে চিকিৎসকরা আর নির্মাণ কাজ করে পূর্ত মন্ত্রণালয়। যারা এ প্রকল্পে অনিয়মে যুক্ত ছিলেন-এই দুই মন্ত্রণালয় থেকে ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ তারা তো আমার দায়িত্বে কাজ করে না।

তদন্ত কমিটির প্রধান আইএমইডির সচিব প্রদীপ রঞ্জন চক্রবর্তী রোববার বলেন, আমরা ১৭ জানুয়ারি প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেছি। সেই সঙ্গে প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত গণপূর্ত বিভাগ এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্ততরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং প্রকল্প পরিচালকের সঙ্গে আলোচনা করে প্রকল্পের কার্যক্রম বিষয়ে পর্যালোচনা করেছি এবং তাদের লিখিত বক্তব্য নেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনটি চূড়ান্ত করে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে স্বাস্থ্য ও গৃহায়ন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

আইএমইডির প্রতিবেদনের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে : বিবেচ্য প্রকল্প প্রস্তাব প্রণয়ণের সময় প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়নি। মূল ডিপিপির (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছিল গণপুর্ত বিভাগের ২০০৮ সালের রেট শিডিউলের ভিত্তিতে। কিন্তু প্রকল্পটি অনুমোদন পায় ২০১২ সালে। সে সময় ২০১১ সালের রেট শিডিউল বিদ্যমান ছিল। উদ্যোগী মন্ত্রণালয় কিংবা বাস্তবায়নরকারী সংস্থার বিষয়টি খতিয়ে দেখা উচিত ছিল। এ ছাড়া ২০১৬ সালের ১৪ মার্চ আইএমইডির এক পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছিল প্রকল্পটি অনুমোদনের বিভিন্ন শর্তের ব্যত্যয় ঘটিয়ে অধিকাংশ নির্মাণ কাজ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। বাস্তব কাজ আংশিক শুরু করার পর স্কোপ ও ডিজাইন পরিবর্তন করা হয়েছে। ফলে বাস্তবায়ন সময়, বাস্তব কাজ এবং ব্যয়ের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। স্কোপ ও ডিজাইন পরিবর্তন করার ক্ষেত্রে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেওয়া হয়নি, যা আর্থিক ও পরিকল্পনা-শৃঙ্খলার পরিপন্থি। এক্ষেত্রে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং প্রকল্প পরিচালক দায়ী। প্রকল্প পরিচালকের চাহিদা মোতাবেক গণপূর্ত অধিদপ্তর ড্রয়িং ও ডিজাইন পরিবর্তন করে দরপত্র দলিল প্রণয়ন করে এবং কার্যাদেশ প্রদান করে যা যথাযথ হয়নি। ফলে ওই অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্টরাও দায়ী। কিন্তু এ পর্যবেক্ষণের আলোকে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ এবং গণপূর্ত অধিদপ্তর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়, ২০১৭ সালের ৩১ অক্টোবর প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় সিদ্ধান্ত হয়, নির্মাণ কাজের ভৌত লক্ষ্য এবং স্কোপ পরিবর্তনসহ অনুমোদিত ব্যয় প্রাক্কলন পরিবর্তন করে নির্মাণ করা হয়েছে। সেগুলো সুস্পষ্টভাবে পরিকল্পনা ও আর্থিক শৃঙ্খলার ব্যত্যয় ও নিয়ম পরিপন্থি। এ বিষয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং প্রকল্প সংশ্লিষ্ট দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেবে। সেই সঙ্গে গৃহীত পদক্ষেপের একটি প্রতিবেদন আরএডিপিপিতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। পিইসি সভার ওই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হয়নি।

তদন্ত কমিটির সুপারিশ : প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে গঠিত তদন্ত কমিটি পাঁচটি সুপারিশ করেছে প্রতিবেদনে। এগুলো হলো : ২০০৮ সালের রেট শিডিউলের পরিবর্তে ২০১১ সালের রেট শিডিউল অনুযায়ী টেন্ডার প্রক্রিয়া গ্রহণ করায় আর্থিক ও পরিকল্পনা-শৃঙ্খলার বিচ্যুতি ঘটেছে। এজন্য প্রকল্প পরিচালক ও নির্বাহী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়াই অনুমোদিত নকশা পরিবর্তন করা এবং এই সংক্রান্ত নিয়মের কোনো ব্যত্যয় হয়নি বলে লিখিত বক্তব্য দেওয়ায় গণপূর্ত বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়াই বিভিন্ন ভবনের প্লিন্থ এরিয়া পরিবর্তন করে নতুনভাবে প্রণীত নকশা প্রকল্প পরিচালক ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের অনুমোদন ও প্রতিস্বাক্ষর করানোর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়াই আর্থিক ও পরিকল্পনা শৃঙ্খলা লঙ্ঘন করে অনুমোদিত ডিপিপির নির্মাণ কাজের স্কোপ অব ওয়ার্ক পরিবর্তন করে অনিয়ম করা হয়েছে। সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ২০১৮ সালের ২১ জুন অনুষ্ঠিত একনেক সভার যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল সেক্ষেত্রে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে তা জানানোর জন্য স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়কে বলা যেতে পারে। যেহেতু প্রকল্পটির কাজ ৫৫ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে এবং অন্যান্য ভবনের কাজ শেষ পর্যায়ে এমতাবস্থায় জনস্বার্থে প্রকল্পটির দ্বিতীয় সংশোধিত প্রস্তাব যথাযথভাবে পুনঃউপস্থাপনের জন্য স্বাস্থ্যসেবা বিভাগকে বলা যেতে পারে।

এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের সচিব মো. আলী নূর রোববার যুগান্তরকে বলেন, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন বিষয়ে এখনো আমি অবগত নই। তবে এটি হাতে পাওয়ার পর অবশ্যই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, অন্যায় হলে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হবে না? অবশ্যই ব্যবস্থা নেব।

জানতে চাইলে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব শহীদ উল্লা খন্দকার যুগান্তরকে বলেন, হ্যাঁ আমি, প্রতিবেদনটি পেয়েছি। সেই সঙ্গে পরিকল্পনা কমিশন থেকে একটি চিঠিও দেওয়া হয়েছে। ওই সময়ের দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পিডব্লিউডির চিফ ইঞ্জিনিয়ারকে লিখিত চিঠি দিয়েছি। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, শুনেছি তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে।

সূত্র জানায়, মূল প্রকল্পটি সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে মোট ২৭৫ কোটি ৪৩ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে হাতে নেয় স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের আওতায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। ২০১২ সালের জানুয়ারি হতে ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ২০১২ সালের ৬ মার্চ প্রকল্পটি অনুমোদন দেয় একনেক। এরপর প্রথম দফায় ২০১৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এবং দ্বিতীয় দফায় ২০১৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়। পরে ব্যয় বাড়িয়ে মোট ৬১১ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে বাস্তবায়নের জন্য ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত (তিন বছর বৃদ্ধি) বৃদ্ধি করে প্রকল্পটির প্রথম সংশোধন করা হয়। এর মধ্যে বাস্তবায়ন না হওয়ায় সর্বশেষ দ্বিতীয় সংশোধনের মাধ্যমে প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় বাড়িয়ে ৭৪২ কোটি টাকা এবং মেয়াদ ২০২২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারণ করে প্রস্তাব পাঠানো হয় পরিকল্পনা কমিশনে। গত বছরের ১২ মার্চ প্রথম পিইসি (প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি) সভা অনুষ্ঠিত হয়। পুনর্গঠিত ডিপিপিতে প্রথম পিইসি সভার সিদ্ধান্ত সঠিকভাবে পালন না করায় গত বছরের ২৬ আগস্ট দ্বিতীয় পিইসি সভা অনুষ্ঠিত হয়। অবশেষে ৬৮২ কোটি ৪৬ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে ২০২৩ সালের জুনে বাস্তবায়ন মেয়াদ ধরে প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধন প্রস্তাব করা হয়েছিল। প্রকল্পটির দ্বিতীয় সংশোধনী প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য গত ৫ জানুয়ারি উপস্থাপন করা হয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে। বাস্তবায়নের ধীরগতি দেখে ক্ষুব্ধ হন প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপারসন শেখ হাসিনা। অনুমোদন না দিয়ে তদন্তের নির্দেশ দেন তিনি।

কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল স্থাপন

পরতে পরতে অনিয়ম

তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন
 হামিদ-উজ-জামান 
০২ আগস্ট ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

পরতে পরতে অনিয়ম হয়েছে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল স্থাপন প্রকল্পে। সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে এ চিত্র। সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ছাড়াই প্রকল্প গ্রহণ, দরপত্র প্রক্রিয়ায় আর্থিক ও পরিকল্পনা-শৃঙ্খলার বিচ্যুতি, কর্র্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়াই ইচ্ছমতো প্লিন্থ এরিয়া পরিবর্তন এবং আর্থিক ও পরিকল্পনা-শৃঙ্খলা লঙ্ঘন করে নির্মাণ কাজ পরিবর্তনসহ নানা অনিয়ম ঘটে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে। সেই সঙ্গে বাস্তবায়নে তৈরি হয় দীর্ঘসূত্রতা।

সরকারের প্রকল্প তদারকি সংস্থা বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) থেকে বিভিন্ন সময় অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়টি তুলে ধরে সুপারিশ দেওয়া হলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

সম্প্রতি আইএমইডি সচিবের নেতৃত্বে গঠিত চার সদস্যের তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদন দেয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে। সেখান থেকে ফাইল ফেরত এলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে সেই প্রতিবেদন পাঠিয়ে দিয়েছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়।

তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে যারা এসব অনিয়মের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন শুধু তাদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়নি। ওই সময় যারা এসব কাজের বিষয়ে ব্যত্যয় হয়নি বলে লিখিত বক্তব্য দিয়েছিলেন তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান যুগান্তরকে বলেন, দ্রুত ব্যবস্থা নিতে আমি প্রতিবেদন পাঠিয়েছি। এখনো জানি না ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কিনা। স্লো মুভিং প্রকল্প এবং মান নিয়ে প্রশ্ন ছিল বলে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আইএমইডি সচিবকে একটি বিশেষ দায়িত্ব দিয়েছিলাম। তারা প্রতিবেদন দিয়েছে। আমিও দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে প্রকল্পটির কাজ যাতে শুরু করা যায় সেজন্য চিঠি দিয়েছি। সেটিও প্রায় এক মাস হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মেডিকেল কলেজের চিকিৎসা সংক্রান্ত কাজ করে চিকিৎসকরা আর নির্মাণ কাজ করে পূর্ত মন্ত্রণালয়। যারা এ প্রকল্পে অনিয়মে যুক্ত ছিলেন-এই দুই মন্ত্রণালয় থেকে ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ তারা তো আমার দায়িত্বে কাজ করে না।

তদন্ত কমিটির প্রধান আইএমইডির সচিব প্রদীপ রঞ্জন চক্রবর্তী রোববার বলেন, আমরা ১৭ জানুয়ারি প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেছি। সেই সঙ্গে প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত গণপূর্ত বিভাগ এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্ততরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং প্রকল্প পরিচালকের সঙ্গে আলোচনা করে প্রকল্পের কার্যক্রম বিষয়ে পর্যালোচনা করেছি এবং তাদের লিখিত বক্তব্য নেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনটি চূড়ান্ত করে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে স্বাস্থ্য ও গৃহায়ন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

আইএমইডির প্রতিবেদনের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে : বিবেচ্য প্রকল্প প্রস্তাব প্রণয়ণের সময় প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়নি। মূল ডিপিপির (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছিল গণপুর্ত বিভাগের ২০০৮ সালের রেট শিডিউলের ভিত্তিতে। কিন্তু প্রকল্পটি অনুমোদন পায় ২০১২ সালে। সে সময় ২০১১ সালের রেট শিডিউল বিদ্যমান ছিল। উদ্যোগী মন্ত্রণালয় কিংবা বাস্তবায়নরকারী সংস্থার বিষয়টি খতিয়ে দেখা উচিত ছিল। এ ছাড়া ২০১৬ সালের ১৪ মার্চ আইএমইডির এক পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছিল প্রকল্পটি অনুমোদনের বিভিন্ন শর্তের ব্যত্যয় ঘটিয়ে অধিকাংশ নির্মাণ কাজ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। বাস্তব কাজ আংশিক শুরু করার পর স্কোপ ও ডিজাইন পরিবর্তন করা হয়েছে। ফলে বাস্তবায়ন সময়, বাস্তব কাজ এবং ব্যয়ের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। স্কোপ ও ডিজাইন পরিবর্তন করার ক্ষেত্রে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেওয়া হয়নি, যা আর্থিক ও পরিকল্পনা-শৃঙ্খলার পরিপন্থি। এক্ষেত্রে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং প্রকল্প পরিচালক দায়ী। প্রকল্প পরিচালকের চাহিদা মোতাবেক গণপূর্ত অধিদপ্তর ড্রয়িং ও ডিজাইন পরিবর্তন করে দরপত্র দলিল প্রণয়ন করে এবং কার্যাদেশ প্রদান করে যা যথাযথ হয়নি। ফলে ওই অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্টরাও দায়ী। কিন্তু এ পর্যবেক্ষণের আলোকে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ এবং গণপূর্ত অধিদপ্তর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়, ২০১৭ সালের ৩১ অক্টোবর প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় সিদ্ধান্ত হয়, নির্মাণ কাজের ভৌত লক্ষ্য এবং স্কোপ পরিবর্তনসহ অনুমোদিত ব্যয় প্রাক্কলন পরিবর্তন করে নির্মাণ করা হয়েছে। সেগুলো সুস্পষ্টভাবে পরিকল্পনা ও আর্থিক শৃঙ্খলার ব্যত্যয় ও নিয়ম পরিপন্থি। এ বিষয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং প্রকল্প সংশ্লিষ্ট দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেবে। সেই সঙ্গে গৃহীত পদক্ষেপের একটি প্রতিবেদন আরএডিপিপিতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। পিইসি সভার ওই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হয়নি।

তদন্ত কমিটির সুপারিশ : প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে গঠিত তদন্ত কমিটি পাঁচটি সুপারিশ করেছে প্রতিবেদনে। এগুলো হলো : ২০০৮ সালের রেট শিডিউলের পরিবর্তে ২০১১ সালের রেট শিডিউল অনুযায়ী টেন্ডার প্রক্রিয়া গ্রহণ করায় আর্থিক ও পরিকল্পনা-শৃঙ্খলার বিচ্যুতি ঘটেছে। এজন্য প্রকল্প পরিচালক ও নির্বাহী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়াই অনুমোদিত নকশা পরিবর্তন করা এবং এই সংক্রান্ত নিয়মের কোনো ব্যত্যয় হয়নি বলে লিখিত বক্তব্য দেওয়ায় গণপূর্ত বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়াই বিভিন্ন ভবনের প্লিন্থ এরিয়া পরিবর্তন করে নতুনভাবে প্রণীত নকশা প্রকল্প পরিচালক ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের অনুমোদন ও প্রতিস্বাক্ষর করানোর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়াই আর্থিক ও পরিকল্পনা শৃঙ্খলা লঙ্ঘন করে অনুমোদিত ডিপিপির নির্মাণ কাজের স্কোপ অব ওয়ার্ক পরিবর্তন করে অনিয়ম করা হয়েছে। সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ২০১৮ সালের ২১ জুন অনুষ্ঠিত একনেক সভার যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল সেক্ষেত্রে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে তা জানানোর জন্য স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়কে বলা যেতে পারে। যেহেতু প্রকল্পটির কাজ ৫৫ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে এবং অন্যান্য ভবনের কাজ শেষ পর্যায়ে এমতাবস্থায় জনস্বার্থে প্রকল্পটির দ্বিতীয় সংশোধিত প্রস্তাব যথাযথভাবে পুনঃউপস্থাপনের জন্য স্বাস্থ্যসেবা বিভাগকে বলা যেতে পারে।

এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের সচিব মো. আলী নূর রোববার যুগান্তরকে বলেন, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন বিষয়ে এখনো আমি অবগত নই। তবে এটি হাতে পাওয়ার পর অবশ্যই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, অন্যায় হলে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হবে না? অবশ্যই ব্যবস্থা নেব।

জানতে চাইলে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব শহীদ উল্লা খন্দকার যুগান্তরকে বলেন, হ্যাঁ আমি, প্রতিবেদনটি পেয়েছি। সেই সঙ্গে পরিকল্পনা কমিশন থেকে একটি চিঠিও দেওয়া হয়েছে। ওই সময়ের দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পিডব্লিউডির চিফ ইঞ্জিনিয়ারকে লিখিত চিঠি দিয়েছি। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, শুনেছি তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে।

সূত্র জানায়, মূল প্রকল্পটি সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে মোট ২৭৫ কোটি ৪৩ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে হাতে নেয় স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের আওতায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। ২০১২ সালের জানুয়ারি হতে ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ২০১২ সালের ৬ মার্চ প্রকল্পটি অনুমোদন দেয় একনেক। এরপর প্রথম দফায় ২০১৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এবং দ্বিতীয় দফায় ২০১৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়। পরে ব্যয় বাড়িয়ে মোট ৬১১ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে বাস্তবায়নের জন্য ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত (তিন বছর বৃদ্ধি) বৃদ্ধি করে প্রকল্পটির প্রথম সংশোধন করা হয়। এর মধ্যে বাস্তবায়ন না হওয়ায় সর্বশেষ দ্বিতীয় সংশোধনের মাধ্যমে প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় বাড়িয়ে ৭৪২ কোটি টাকা এবং মেয়াদ ২০২২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারণ করে প্রস্তাব পাঠানো হয় পরিকল্পনা কমিশনে। গত বছরের ১২ মার্চ প্রথম পিইসি (প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি) সভা অনুষ্ঠিত হয়। পুনর্গঠিত ডিপিপিতে প্রথম পিইসি সভার সিদ্ধান্ত সঠিকভাবে পালন না করায় গত বছরের ২৬ আগস্ট দ্বিতীয় পিইসি সভা অনুষ্ঠিত হয়। অবশেষে ৬৮২ কোটি ৪৬ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে ২০২৩ সালের জুনে বাস্তবায়ন মেয়াদ ধরে প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধন প্রস্তাব করা হয়েছিল। প্রকল্পটির দ্বিতীয় সংশোধনী প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য গত ৫ জানুয়ারি উপস্থাপন করা হয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে। বাস্তবায়নের ধীরগতি দেখে ক্ষুব্ধ হন প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপারসন শেখ হাসিনা। অনুমোদন না দিয়ে তদন্তের নির্দেশ দেন তিনি।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন