কফিনে কফিনে বেদনা আর স্বপ্নভঙ্গের জ্বালা
jugantor
রূপগঞ্জে আগুনে পোড়া ২৪ লাশ হস্তান্তর
কফিনে কফিনে বেদনা আর স্বপ্নভঙ্গের জ্বালা

  হক ফারুক আহমেদ  

০৫ আগস্ট ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

একটার পর একটা কফিন আসছে আর গগনবিদারী কান্নায় মূর্ছা যাচ্ছেন স্বজনরা। কাঁদতে কাঁদতেই কফিন তুলছেন গাড়িতে। কারও বুকের মানিক, কারও প্রিয়তমা, কারও বা শেষ আশা-ভরসা এখন পোড়া লাশ। প্রিয় মানুষটিকে কবর দিতে পারবেন এই সান্ত্বনাটুকু নিয়ে গ্রামে ছুটছেন তারা। কফিনের গায়ে হাত বুলাতে বুলাতে হারিয়ে যাওয়া মানুষটিকে ঘিরে মনের অজান্তেই বেরিয়ে আসছে বেদনা আর স্বপ্নভঙ্গের কথাগুলো। তাদের এক জীবনের জ্বালা যেন পেরেকে পেরেকে ঠুকানো আছে এই কফিনে।

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে হাসেম ফুডসের সেজান জুসের কারখানায় আগুনে পুড়ে মারা যাওয়া ৪৮ জনের মধ্যে ২৪ জনের লাশ হস্তান্তরের দিনে হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। ঢাকা মেডিকেলের মর্গ থেকে ঘটনার ২৮ দিন পর সিআইডির পক্ষ থেকে লাশগুলো হস্তান্তর শুরু হয়েছে বুধবার।

এদিন যে কজন শ্রমিকের লাশ হস্তান্তর করা হয়েছে তারা হলেন- মো. আয়াত হোসেন, মো. নাঈম ইসলাম, নুসরাত জাহান টুকটুকি, হিমা আক্তার, সাগরিকা সায়লা, খাদেজা আক্তার, মোহাম্মদ আলী, তাকিয়া আকতার, শাহানা আক্তার, মিতু আক্তার, জাহানারা, ফারজানা, ফাতেমা আক্তার, নাজমা খাতুন, ইশরাত জাহান তুলি, নাজমা বেগম, মো. রাশেদ, মো. রাকিব হোসেন, ফিরোজা, মো. তারেক জিয়া, রিপন মিয়া, শাহানা আক্তার, মো. মুন্না ও রিয়া আক্তার।

১৬ বছরের কিশোরী খাদেজা আক্তারের লাশ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায় বুধবার মাগরিবের আজানের একটু আগে। খাদেজার বাবা কাইয়ুম ফোনে বিলাপ করতে করতে যুগান্তরকে বলেন, আমার সব শেষ। আমি গরিব মানুষ তাও আমার খাদেজার জন্য সারা ইউনিয়নের মানুষ হায় হায় করছে। আমার মেয়েটা খুব বুদ্ধিমতী ছিল। পড়াশোনায়ও ভালো ছিল। আমি অসুস্থ, গরিব মানুষ। সংসারের ভালোর জন্য মেয়েটা কাজ করতে গিয়েছিল। ওরা (সেজান কারখানা কর্তৃপক্ষ) যদি তালাটা না মারত তাইলে আমার খাদেজার জীবনটা বাঁচত। সঙ্গে আরও অনেক বাবা-মায়ের কোলও খালি হইত না। আমি বিচার চাই, কঠিন বিচার।

ঢাকা মেডিকেলে মর্গের সামনে লাশ পাওয়ার পর পাথরভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে ছিলেন মৃত হিমা আক্তারের বাবা কবির মিয়া ও বড় বোন ঝিনুক আক্তার। তাদের রিক্ত চোখে দুঃখের পাশাপাশি ক্ষোভেরও ছায়া। ঝিনুক আক্তার যুগান্তরকে বলেন, হিমা ছিল আমার সবচেয়ে ছোট বোন। চার মাস আগে ও সেজানের কারখানায় কাজ শুরু করেছিল। আমাদের সব আশা-আকাক্সক্ষা শেষ হয়ে গেছে। আমার বোনকে হত্যা করা হয়েছে। এটা হত্যা ছাড়া আর কিছু নয়। ওদেরকে সেদিন আটকে রাখা হয়েছিল, বের হতে দেওয়া হয়নি। যাদের এভাবে হত্যা করা হয়েছে তারা সবাই মিলে যদি হত্যা মামলা করত তাহলে আমরাও মামলা করতাম।

অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যাওয়া নোয়াখালীর হাতিয়ার কিশোর তারেক জিয়ার বয়স হয়েছিল মাত্র ১৫ বছর। অ্যাম্বুলেন্সে করে লাশ বাড়ি নিয়ে যেতে যেতে তারেকের বাবা আবুল বাশার যুগান্তরকে বলেন, আমি বিচার চাই না, কার কাছে বিচার চাইব। বিচার তো হবে না। এলাকার আরও কয়েকজন কারখানায় কাজ করার কথা বলে আমার ছেলেটাও সেজানের কারখানায় কাজে গেল। বলল, বাবা আমিও কাজ করতে পারব। কিন্তু ছেলে আমার হারিয়ে গেল চিরতরে।

বুধবার দুপুর থেকে লাশ হস্তান্তর করে সিআইডি। নারায়ণগঞ্জ জেলার সিআইডির এডিশনাল এসপি জীবন কান্তি সরকার বলেন, ৪৮টি লাশের মধ্যে এ পর্যন্ত ৪৫ জনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। বাকি তিনজনের পরিচয় নির্ণয়ের কাজ চলছে। তিনি বলেন, আমরা ২৪ জনের পরিবারকে মঙ্গলবার জানিয়ে দিয়েছিলাম বুধবার তাদের লাশ নিয়ে যাওয়ার জন্য। সে অনুযায়ী বিকালের মধ্যে এগুলো হস্তান্তর করা হয়েছে। পরিচয় পাওয়া বাকি লাশগুলো আগামী শনিবার সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গ থেকে দেওয়া হবে স্বজনদের।

নারায়ণগঞ্জেরর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক এসএম মাহফুজুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, নিহতদের স্বজনদের লাশ বহন ও দাফনের জন্য নগদ ২৫ হাজার করে টাকা দেওয়া হচ্ছে। জেলা প্রশাসনের কর্মীরা এবং পুলিশ মিলে লাশ অ্যাম্বুলেন্সে তুলে দিয়েছেন।

এদিকে সেজানের পক্ষ থেকে তাদের আমদানি বিভাগের কর্মকর্তা কাজল উপস্থিত ছিলেন। তিনি যুগান্তরকে বলেন, এই হতাহতের ঘটনায় আমরাও শোকাহত। যারা মারা গেছেন তাদের পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছি। সবার অ্যাম্বুলেন্স খরচ, কাপনের কাপড়, কফিন দিয়ে আমরা পাশে ছিলাম। লাশ নিয়ে যাওয়ার পথে স্বজনদের জন্য খাবারও দেওয়া হয়েছে।

৮ জুলাই বিকালে রূপগঞ্জে হাসেম ফুড অ্যান্ড বেভারেজ কারখানায় আগুনে তাৎক্ষণিকভাবে ৩ জন মারা যান। পরদিন আগুন নিভিয়ে ফেলার পর ৪৮ জনের পোড়া লাশ উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। এ ঘটনায় রূপগঞ্জ থানার ভুলতা পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পরিদর্শক নাজিম উদ্দিন বাদী হয়ে কারখানার মালিক আবুল হাসেমসহ ৮ জনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাত আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে রূপগঞ্জ থানায় মামলা করেন। লাশগুলো পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রাখা হয়। পরে পরিচয় শনাক্তে স্বজনদের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়। এদিকে ঘটনার তদন্ত অব্যাহত আছে।

রূপগঞ্জে আগুনে পোড়া ২৪ লাশ হস্তান্তর

কফিনে কফিনে বেদনা আর স্বপ্নভঙ্গের জ্বালা

 হক ফারুক আহমেদ 
০৫ আগস্ট ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

একটার পর একটা কফিন আসছে আর গগনবিদারী কান্নায় মূর্ছা যাচ্ছেন স্বজনরা। কাঁদতে কাঁদতেই কফিন তুলছেন গাড়িতে। কারও বুকের মানিক, কারও প্রিয়তমা, কারও বা শেষ আশা-ভরসা এখন পোড়া লাশ। প্রিয় মানুষটিকে কবর দিতে পারবেন এই সান্ত্বনাটুকু নিয়ে গ্রামে ছুটছেন তারা। কফিনের গায়ে হাত বুলাতে বুলাতে হারিয়ে যাওয়া মানুষটিকে ঘিরে মনের অজান্তেই বেরিয়ে আসছে বেদনা আর স্বপ্নভঙ্গের কথাগুলো। তাদের এক জীবনের জ্বালা যেন পেরেকে পেরেকে ঠুকানো আছে এই কফিনে।

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে হাসেম ফুডসের সেজান জুসের কারখানায় আগুনে পুড়ে মারা যাওয়া ৪৮ জনের মধ্যে ২৪ জনের লাশ হস্তান্তরের দিনে হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। ঢাকা মেডিকেলের মর্গ থেকে ঘটনার ২৮ দিন পর সিআইডির পক্ষ থেকে লাশগুলো হস্তান্তর শুরু হয়েছে বুধবার।

এদিন যে কজন শ্রমিকের লাশ হস্তান্তর করা হয়েছে তারা হলেন- মো. আয়াত হোসেন, মো. নাঈম ইসলাম, নুসরাত জাহান টুকটুকি, হিমা আক্তার, সাগরিকা সায়লা, খাদেজা আক্তার, মোহাম্মদ আলী, তাকিয়া আকতার, শাহানা আক্তার, মিতু আক্তার, জাহানারা, ফারজানা, ফাতেমা আক্তার, নাজমা খাতুন, ইশরাত জাহান তুলি, নাজমা বেগম, মো. রাশেদ, মো. রাকিব হোসেন, ফিরোজা, মো. তারেক জিয়া, রিপন মিয়া, শাহানা আক্তার, মো. মুন্না ও রিয়া আক্তার।

১৬ বছরের কিশোরী খাদেজা আক্তারের লাশ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায় বুধবার মাগরিবের আজানের একটু আগে। খাদেজার বাবা কাইয়ুম ফোনে বিলাপ করতে করতে যুগান্তরকে বলেন, আমার সব শেষ। আমি গরিব মানুষ তাও আমার খাদেজার জন্য সারা ইউনিয়নের মানুষ হায় হায় করছে। আমার মেয়েটা খুব বুদ্ধিমতী ছিল। পড়াশোনায়ও ভালো ছিল। আমি অসুস্থ, গরিব মানুষ। সংসারের ভালোর জন্য মেয়েটা কাজ করতে গিয়েছিল। ওরা (সেজান কারখানা কর্তৃপক্ষ) যদি তালাটা না মারত তাইলে আমার খাদেজার জীবনটা বাঁচত। সঙ্গে আরও অনেক বাবা-মায়ের কোলও খালি হইত না। আমি বিচার চাই, কঠিন বিচার।

ঢাকা মেডিকেলে মর্গের সামনে লাশ পাওয়ার পর পাথরভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে ছিলেন মৃত হিমা আক্তারের বাবা কবির মিয়া ও বড় বোন ঝিনুক আক্তার। তাদের রিক্ত চোখে দুঃখের পাশাপাশি ক্ষোভেরও ছায়া। ঝিনুক আক্তার যুগান্তরকে বলেন, হিমা ছিল আমার সবচেয়ে ছোট বোন। চার মাস আগে ও সেজানের কারখানায় কাজ শুরু করেছিল। আমাদের সব আশা-আকাক্সক্ষা শেষ হয়ে গেছে। আমার বোনকে হত্যা করা হয়েছে। এটা হত্যা ছাড়া আর কিছু নয়। ওদেরকে সেদিন আটকে রাখা হয়েছিল, বের হতে দেওয়া হয়নি। যাদের এভাবে হত্যা করা হয়েছে তারা সবাই মিলে যদি হত্যা মামলা করত তাহলে আমরাও মামলা করতাম।

অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যাওয়া নোয়াখালীর হাতিয়ার কিশোর তারেক জিয়ার বয়স হয়েছিল মাত্র ১৫ বছর। অ্যাম্বুলেন্সে করে লাশ বাড়ি নিয়ে যেতে যেতে তারেকের বাবা আবুল বাশার যুগান্তরকে বলেন, আমি বিচার চাই না, কার কাছে বিচার চাইব। বিচার তো হবে না। এলাকার আরও কয়েকজন কারখানায় কাজ করার কথা বলে আমার ছেলেটাও সেজানের কারখানায় কাজে গেল। বলল, বাবা আমিও কাজ করতে পারব। কিন্তু ছেলে আমার হারিয়ে গেল চিরতরে।

বুধবার দুপুর থেকে লাশ হস্তান্তর করে সিআইডি। নারায়ণগঞ্জ জেলার সিআইডির এডিশনাল এসপি জীবন কান্তি সরকার বলেন, ৪৮টি লাশের মধ্যে এ পর্যন্ত ৪৫ জনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। বাকি তিনজনের পরিচয় নির্ণয়ের কাজ চলছে। তিনি বলেন, আমরা ২৪ জনের পরিবারকে মঙ্গলবার জানিয়ে দিয়েছিলাম বুধবার তাদের লাশ নিয়ে যাওয়ার জন্য। সে অনুযায়ী বিকালের মধ্যে এগুলো হস্তান্তর করা হয়েছে। পরিচয় পাওয়া বাকি লাশগুলো আগামী শনিবার সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গ থেকে দেওয়া হবে স্বজনদের।

নারায়ণগঞ্জেরর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক এসএম মাহফুজুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, নিহতদের স্বজনদের লাশ বহন ও দাফনের জন্য নগদ ২৫ হাজার করে টাকা দেওয়া হচ্ছে। জেলা প্রশাসনের কর্মীরা এবং পুলিশ মিলে লাশ অ্যাম্বুলেন্সে তুলে দিয়েছেন।

এদিকে সেজানের পক্ষ থেকে তাদের আমদানি বিভাগের কর্মকর্তা কাজল উপস্থিত ছিলেন। তিনি যুগান্তরকে বলেন, এই হতাহতের ঘটনায় আমরাও শোকাহত। যারা মারা গেছেন তাদের পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছি। সবার অ্যাম্বুলেন্স খরচ, কাপনের কাপড়, কফিন দিয়ে আমরা পাশে ছিলাম। লাশ নিয়ে যাওয়ার পথে স্বজনদের জন্য খাবারও দেওয়া হয়েছে।

৮ জুলাই বিকালে রূপগঞ্জে হাসেম ফুড অ্যান্ড বেভারেজ কারখানায় আগুনে তাৎক্ষণিকভাবে ৩ জন মারা যান। পরদিন আগুন নিভিয়ে ফেলার পর ৪৮ জনের পোড়া লাশ উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। এ ঘটনায় রূপগঞ্জ থানার ভুলতা পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পরিদর্শক নাজিম উদ্দিন বাদী হয়ে কারখানার মালিক আবুল হাসেমসহ ৮ জনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাত আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে রূপগঞ্জ থানায় মামলা করেন। লাশগুলো পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রাখা হয়। পরে পরিচয় শনাক্তে স্বজনদের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়। এদিকে ঘটনার তদন্ত অব্যাহত আছে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : রূপগঞ্জে কারখানায় আগুন