চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ আতঙ্কে যাত্রীরা

  শিপন হাবীব ০৪ মে ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আহত শিকদার
চলন্ত ট্রেনে ছোড়া ঢিলের আঘাতে আহত শিকদার বায়েজিদ স্কয়ার হাসপাতালে। লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে তাকে। সোমবারের ছবি যুগান্তর

৩০ এপ্রিল, বেলা ১১টা। ৯৬ কমিউটার ট্রেনে টিকিট চেক করছিলেন টিআই শিকদার বায়েজিদ। ট্রেনটি খুলনার দৌলতপুর স্টেশনের কাছে এলে কে বা কারা পাথর ছুড়তে থাকে। একটি পাথর বায়েজিদের মাথায় লাগলে জ্ঞান হারান তিনি। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত জ্ঞান ফেরেনি তার। রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে (লাইফ সাপোর্টে) রয়েছেন তিনি। ভাই তফিদুর রহমান যুগান্তরকে জানান, বায়েজিদের কিছু হলে পরিবারটি পথে বসবে। স্ত্রী, ৭ বছরের ছেলে আর বৃদ্ধ মা-বাবা তার আয়ের ওপরই নির্ভরশীল। ২০০৪ সালের ৮ অক্টোবর আন্তঃনগর ট্রেনে আখাউড়া থেকে সিলেট যাচ্ছিলেন রাধানগর ঘোষপাড়ার সুনীল চন্দ্র বিশ্বাসের ছেলে সঞ্জিত কুমার চন্দ্র বিশ্বাস। পথে ছোড়া পাথরের আঘাতে দুটি চোখই নষ্ট হয়ে যায় তার। জীবনের সঙ্গে সঞ্জিতের ঘরেও এখন অন্ধকার। ২০১৩ সালের ১৩ আগস্ট চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে পাথরের আঘাতে প্রীতি দাশ নামে এক প্রকৌশলী মারা যান। শেষ হয়ে গেছে ওই পরিবারের সব স্বপ্ন।

শুধু বায়েজিদ, সঞ্জিত বা প্রীতি নন- প্রায়ই বিভিন্ন স্থানে ট্রেনে পাথর ছুড়ে মারায় আহত হচ্ছেন অনেকেই। সেখান থেকে পরে মৃত্যু বা পঙ্গুত্বের ঘটনা ঘটছে। এতে বিপর্যয় নামছে ওই পরিবারে। সেই সঙ্গে দরজা-জানালার কাচ ও লাইট-ফ্যানসহ ট্রেনের বিভিন্ন যন্ত্রাংশও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। রেলসূত্র বলছে, এক বছরেই পাথর নিক্ষেপের দেড় শতাধিক ঘটনা ঘটেছে। আর এতে আহত হয়েছেন রেলের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সাধারণ যাত্রী মিলে দুই শতাধিক ব্যক্তি। ফলে চলন্ত ট্রেনে এখন বড় আতঙ্কের নাম ‘পাথর নিক্ষেপ’।

এর ভিত্তিতে রেলপথের ৭০টি এলাকা ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু ঠেকানো যায়নি পাথর নিক্ষেপ। পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় কাউকে গ্রেফতারের তথ্যও পাওয়া যায়নি। এমন প্রেক্ষাপটে বৃহস্পতিবার রেলপথ মন্ত্রণালয়, কমলাপুর ও রাজশাহীসহ ৭৭ স্টেশনে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভা করেছে রেলওয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ট্রেড ইউনিয়নের নেতাকর্মীরা। তারা দুষ্কৃতকারীদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

রেলপথমন্ত্রী মো. মুজিবুল হক যুগান্তরকে বলেন, ‘চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের মতো জঘন্য ঘটনা আর হতে পারে না। রেল দেশের ১৬ কোটি মানুষের সম্পদ, এটি রক্ষা করা প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব। টিআই শিকদার বায়েজিদ আজ মৃত্যৃশয্যায়, তার কী অপরাধ ছিল?’ পারিবারিকভাবে সন্তানদের সুশিক্ষা ও জনগণের সম্পদ রক্ষার বিষয়ে সচেতন করতে অভিভাবকদের প্রতি অনুরোধ জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, বায়েজিদের চিকিৎসার দায়িত্ব রেলের। তার চিকিৎসার জন্য যা যা প্রয়োজন, তা করা হবে।

বায়েজিদের ভাই তফিদুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, ‘ওইদিন একটি পাথর ভাইয়ের চোখ ও মাথায় আঘাত করে, সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। তাকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসকরা ঢাকায় পাঠান। বিকালে হেলিকপ্টারে তাকে ঢাকায় আনা হয়। স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।’

বায়েজিদের স্ত্রী খুশি আক্তার যুগান্তরকে জানান, ডাক্তার বলেছেন, তার অবস্থা ভালো নেই। লাইফ সাপোর্টে রয়েছে, জ্ঞান না ফিরলে কিছুই বলা যাচ্ছে না। কথাগুলো বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন খুশি। তিনি বলেন, আমার স্বামীর কিছু হলে আমরা কী করে বাঁচব। শ্বশুর শিকদার আবদুস সাত্তার ও শাশুড়ি হেলেনা বেগম ছেলের জন্য বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন। খুশির প্রশ্ন, ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করা হলেও কেন ওইসব স্থানে পর্যান্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয় না? হাসপাতালে বায়েজিদকে দেখতে আসা ও যথাযথ চিকিৎসার প্রতিশ্রুতি দেয়ায় রেলমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।

ট্রেনচালক শাহাদত হোসেন ২০১২ সালে পাথরের আঘাতে মাথায় গুরুতর আহত হন। তিনি এখনও স্বাভাবিক হয়ে উঠতে পারেননি। সম্প্রতি ট্রেনচালক রফিকুল ইসলাম পাথরের আঘাতে গুরুতর আহত হন। আখাউড়ায় চোখ হারানো সঞ্জিত যুগান্তরকে বলেন, বৈধ যাত্রী হওয়া সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত রেলের পক্ষ থেকে কোনো ক্ষতিপূরণ পাইনি। আমি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে অনুরোধ করি, ‘আপনি (প্রধানমন্ত্রী) মানবতার প্রতীক। আমার জন্য কিছু করুন।’

রেলওয়ে পুলিশ সূত্র জানায়, রেলপথের ৭০টি পয়েন্ট চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে পাথর নিক্ষেপ সবচেয়ে বেশি হয়ে থাকে। তবে রেলপথের সর্বত্রই এ ঘটনা ঘটছে। নানা ব্যবস্থা নিয়েও পাথর নিক্ষেপ বন্ধ না হওয়ায় এসব পয়েন্ট দিয়ে রেল চলাচল ক্রমশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।

সূত্র জানায়, ২০১৩ সালে প্রকৌশলী প্রীতি দাশের মৃত্যুর পর প্রথমবার একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে কর্তৃপক্ষ (চট্টগ্রাম রেলওয়ে)। ওই কমিটির প্রতিবেদন বা এর ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেয়ার কথা আজও জানা যায়নি।

রেলওয়ে ট্রাফিক ও অপারেশন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ করা হয়। তবে কোনো যাত্রী বা কর্মকর্তা আহত হলেই তা নজরে আসে। প্রায় প্রতিটি ট্রেনেই জানালার গ্লাস ভাঙা রয়েছে। বদলানো হলেও সপ্তাহ না যেতেই আবার গ্লাসগুলো ভাঙছে। এ খাতে প্রতিবছর রেলের খরচ হয় প্রায় পৌনে ২ কোটি টাকা। ৫ বছরে জানালা-দরজার কাচ ভাঙার ঘটনা ঘটে ২ হাজারেরও বেশি।

উপপরিচালক ট্রাফিক-ট্রান্সপেটিশন মো. মায়েনুল ইসলাম যুগান্তরকে জানান, ২০১৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের ১ মে পর্যন্ত সারা দেশে দেড় শতাধিক পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। পশ্চিমাঞ্চল রেলপথে ২৯ ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টে ৭০টি ঘটনা ঘটেছে। সাধারণ যাত্রীদের আহত হওয়ার তথ্য আমাদের কাছে নেই, রেলের কর্মচারী আহত হয়েছেন ১৪ জন। অন্যদিকে পূর্বাঞ্চল রেলপথে ৩৬ ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টে ৮০টিরও বেশি ঘটনা ঘটেছে।

অতিরিক্ত মহাপুলিশ পরির্দশক (রেলওয়ে পুলিশ) মো. আবুল কাশেম যুগান্তরকে জানান, শতচেষ্টার পরও আমরা ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ রোধ করতে পারছি না। তাদের রোধ করতে পারে কেবল স্থানীয় পর্যায়ে থাকা সচেতন মানুষই।

রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আমজাদ হোসেন যুগান্তরকে জানান, পৃথিবীর কোনো দেশে ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা নেই, বাংলাদেশে অহরহ হচ্ছে। আমরা এর প্রতিকার চেয়ে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসার শিক্ষকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছি। কেবল পারিবারিক শিক্ষার মাধ্যমেই এ ন্যক্কারজনক কাজ বন্ধ করা সম্ভব। সন্তানদের সচেতন করতে অভিভাবকদেরই এগিয়ে আসতে হবে।

প্রতিবাদ সভা, মানববন্ধন : রেলওয়ে শ্রমিক লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট হুমায়ুন কবির যুগান্তরকে জানান, শিকদারের ওপর পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় রেলপথ মন্ত্রণালয়, কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনসহ ৭৭ স্টেশন চত্বরে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। তিনি বলেন, মাঠপর্যায়ে কাজ করা কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিরাপদ নন। এমন অবস্থা চলমান থাকলে তারা ট্রেন চালানো বন্ধ করে দিতে পারেন।

যুগান্তরের রাজশাহী ব্যুরো জানায়, বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টায় পশ্চিমাঞ্চল রেলের প্রধান কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন ও সভা হয়। এতে ছিলেন পশ্চিমাঞ্চল রেলের জিএম মজিবুর রহমান, প্রধান প্রকৌশলী রমজান আলী, সিসিএম মিহির কান্তি গুহ, রেলওয়ে শ্রমিক লীগ ওপেন লাইন শাখার সভাপতি জহুরুল হক, সাধারণ সম্পাদক এম আক্তার হোসেন, আরবিআর সদর দফতর শাখার সভাপতি মোতাহার হোসেন বুলু, সাধারণ সম্পাদক মেহেদি হাসান প্রমুখ।

পাথর নিক্ষেপকারীর সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড : রেলওয়ে আইনের ১২৭ ধারায় ট্রেনে পাথর ছুড়লে যাবজ্জীবন জেলসহ ১০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। পাথর নিক্ষেপে যদি কারও মৃত্যু হয়, তাহলে ৩০২ ধারা মতে দোষীর মৃত্যুদণ্ডের বিধানও রয়েছে। কিন্তু গ্রেফতার বা বিচারের কোনো উদাহরণ নেই।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter