দুই জনপ্রতিনিধিকে গুলি করে হত্যা

রাঙ্গামাটিতে উপজেলা চেয়ারম্যান ও নরসিংদীতে ইউপি চেয়ারম্যান

  রাঙ্গামাটি ও নরসিংদী প্রতিনিধি ০৪ মে ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট শক্তিমান চাকমা

রাঙ্গামাটির নানিয়ারচর উপজেলা চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট শক্তিমান চাকমাকে (৫২) প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। এ সময় দুর্বৃত্তের ব্রাশফায়ারে রূপম চাকমা (৩৫) নামে তার এক সহকর্মী আহত হয়েছেন। আশঙ্কাজনক অবস্থায় রূপমকে রাঙ্গামাটি জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এদিকে বৃহস্পতিবার দুপুরে নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার বাঁশগাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সিরাজুল হককে (৭৫) গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। ৭ বারের চেয়ারম্যান বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল বাঁশগাড়ি ইউনিয়ন আ’লীগের সভাপতি। পূর্বশত্রুতার জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে ধারণা পুলিশের। ইউপি চেয়ারম্যানের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন গ্রামবাসী। পরে প্রতিপক্ষ সাবেক চেয়ারম্যান সাহেদ সরকার সমর্থকদের বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ করে। বাঁশগাড়ি ইউনিয়ন আ’লীগ সহসভাপতি রতন মেম্বার জানান, অর্ধশত বাড়িঘরে হামলা ও লুটপাট চালানো হয়েছে। এছাড়া সোবহানবাগ, রাজনগর ও বালুয়াকান্দি গ্রামের বেশ কয়েকটি বাড়িঘরে হামলা ও লুটপাট চালানো হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। হত্যার ঘটনায় জড়িত সন্দেহে আবদুল আলী ও আবুল কালাম নামে দু’জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় শক্তিমান চাকমা খুন হন। এজন্য ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টকে (ইউপিডিএফ) দায়ী করেছে শক্তিমান চাকমার দল জনসংহতি সমিতি (এমএন লারমা) গ্রুপ। এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। জনমনে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার সঙ্গে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। আহাজারিতে ফেটে পড়ছেন পরিবার ও স্বজনরা। হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের গ্রেফতারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা অভিযান শুরু করেছেন।

জানা গেছে, শক্তিমান চাকমা তার সরকারি বাসভবন থেকে মোটরসাইকেলে উপজেলা পরিষদের নিজ কার্যালয়ে যাচ্ছিলেন। ওই সময় আগে থেকে ওতপেতে থাকা দুই অস্ত্রধারী তার মোটরসাইকেল থামিয়ে কাছ থেকে তাকে লক্ষ্য করে ব্রাশফায়ার করে পালিয়ে যায়। শক্তিমান মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। পরে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃতু ঘোষণা করেন। শক্তিমান চাকমা জনসংহতি সমিতি (এমএন লারমা) গ্রুপের নানিয়ারচর উপজেলা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক। রাঙ্গামাটি জেলার পুলিশ সুপার মো. আলমগীর কবির বলেন, খবর পেয়ে আমরা ঘটনাস্থল ছুটে যাই। দুষ্কৃতকারীদের গ্রেফতারে সম্ভাব্য এলাকায় পুলিশি অভিযান শুরু হয়েছে। নানিয়ারচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবদুল লতিফ বলেছেন, নিহতের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য রাঙ্গামাটি জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হচ্ছে।

জানা যায়, ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতিতে জড়িত হন শক্তিমান চাকমা। এলএলবি করার পর আইন পেশায় নিয়োজিত হন তিনি। বর্তমানে তিনি জেলা আইনজীবী সমিতির সিনিয়র সদস্য। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত পার্বত্য শান্তিচুক্তি পরবর্তী সময়ে যোগ দেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতিতে। দীর্ঘদিন জনসংহতির কেন্দ্রীয় আইনবিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। পরে দেশে জরুরি অবস্থা চলাকালে জনসংহতি সমিতি দুই ভাগে বিভক্ত হলে সমিতির সংস্কারবাদী (এমএন লারমা) দলের শীর্ষস্থানীয় কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে নেতৃত্ব দেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দলটির কেন্দ্রীয় সহসভাপতি ছিলেন তিনি। ২০১৫ সালের নির্বাচনে নানিয়ারচর উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন শক্তিমান চাকমা। ১৮ মার্চ ইউপিডিএফ সমর্থিত নারী সংগঠন হিল উইমেন্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মন্টি চাকমা ও জেলা কমিটির সভাপতি দয়াসোনা চাকমাকে অপহরণ মামলায় প্রধান আসামি ছিলেন শক্তিমান চাকমা। এছাড়া ইউপিডিএফ এবং জনসংহতি সমিতি (এমএন লারমা) গ্রুপের মধ্যে সহিংসতা চলে আসছে।

এ হত্যাকাণ্ডের জন্য ইউপিডিএফকে দায়ী করে জনসংহতি সমিতি (এমএন লারমা) গ্রুপের কেন্দ্রীয় কমিটির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক ও বাঘাইছড়ি উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান সুদর্শন চাকমা বলেন, ইউপিডিএফ দীর্ঘদিন ধরে তাকে হত্যার হুমকি দিয়ে আসছিল। তারা ছাড়া অন্য কেউ এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা নয়। অভিযোগ অস্বীকার করে ইউপিডিএফ নেতা নিরন চাকমা বলেন, শক্তিমান চাকমাকে খুনের সঙ্গে তাদের কেউ জড়িত নয়। এটা জনসংহতি সমিতির (এমএন লারমা) অন্তর্দ্বন্দ্বের কারণে হতে পারে বলে তাদের ধারণা। শক্তিমান চাকমাকে হত্যার পর কান্নায় ভেঙে পড়েন তার স্ত্রী জয়তী চাকমা জেকি ও মেয়েসহ স্বজনরা। শক্তিমান চাকমার স্ত্রী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। এ দম্পতির এক মেয়ে রাঙ্গামাটি মেডিকেল কলেজে অধ্যয়নরত।

প্রতিবাদে খাগড়াছড়িতে বিক্ষোভ : শক্তিমান চাকমাকে হত্যার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে জেলা আইনজীবী সমিতি। সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. রফিকুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রাজীব চাকমা বলেন, এ হত্যাকাণ্ড মেনে নেয়া যায় না। তারা জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।

হত্যার প্রতিবাদে খাগড়াছড়িতে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (এমএন লারমা)। বিকালে খাগড়াছড়ি জেলা কার্যালয় থেকে মিছিলটি বের হয়। পরে শাপলা চত্বর এলাকায় সমাবেশ হয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (এমএন লারমা) খাগড়াছড়ি জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক সিন্ধু কুমার চাকমা বলেন, ‘ইউপিডিএফ নেতা প্রসীত খীসার নির্দেশনায় শক্তিমান চাকমাকে হত্যা করা হয়। এ সময় তিনি প্রসীত খীসার ফাঁসি দাবি করে বলেন, তার (প্রসীত খীসা) কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামে আজ সহিংসতা বিরাজ করছে। তিনি ইউপিডিএফকে নির্মূল করার আহ্বান জানান। খাগড়াছড়ি সদর থানার সভাপতি কিরণ চাকমার সভাপতিত্বে প্রতিবাদ সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের (পিসিপি) কেন্দ্রীয় সভাপতি সুমেধ চাকমা, পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতি নানিয়ারচর শাখার নেত্রী ববিতা চাকমা। প্রতিবাদ সমাবেশ সঞ্চালনা করেন পিসিপি নেতা তুষার চাকমা।

সাত বারের চেয়ারম্যান সিরাজুল খুন : নরসিংদীর বাঁশগাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সিরাজুল হক বৃহস্পতিবার দুপুরে উপজেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা শেষে বাঁশগাড়ি নিজের বাড়িতে ফিরছিলেন। চেয়ারম্যানের বহনকারী মোটরসাইকেলটি রায়পুরা-বাঁশগাড়ি সড়কের আলীনগর আড়াকান্দা নামক স্থানে পৌঁছলে দুর্বৃত্তরা গতিরোধ করে। মোটরসাইকেলচালককে মারধর করে সরিয়ে দেয় এবং চেয়ারম্যানকে গুলি করে সড়কের পাশে জলাবদ্ধ জমিতে ফেলে দেয়। আশপাশের লোকজন এগিয়ে এলে দুর্বৃত্তরা পালিয়ে যায়। আহতাবস্থায় প্রথমে তাকে রায়পুরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয় এবং অবস্থার অবনতি হলে তাকে নরসিংদী জেলা হাসপাতালে নেয়ার পথে তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। এ সময় স্বজনদের কান্নায় হাসপাতালের পরিবেশ ভারি হয়ে ওঠে। এ সময় শত শত লোক হাসপাতালে ভিড় করেন।

হাসপাতালের চিকিৎসক রেজাউল ইসলাম খান জানান, চেয়ারম্যান সিরাজুল হকের ঘাড়ে ও মাথায় গুলি লেগেছে। তার প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। প্রাথমিক চিকিৎসার পর তাকে দ্রুত নরসিংদী জেলা হাসপাতালে পাঠানো হয়। রায়পুরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) দেলোয়ার হোসেন বলেন, বাঁশগাড়ি ইউনিয়নের আধিপত্য নিয়ে আগে থেকেই দু’পক্ষের মধ্যে বিরোধ চলছিল। তারই জের ধরে এ হামলার ঘটনা ঘটে থাকতে পারে বলে আমরা ধারণা করছি। তদন্ত শুরু হয়েছে। খবর পেয়ে রায়পুরা উপজেলা চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম ও সহকারী পুলিশ সুপার (রায়পুরা-বেলাব সার্কেল) বেলাল আহমেদ ও অন্য ইউনিয়নের চেয়ারম্যানরা হাসপাতালে ছুটে যান।

নিহত ইউপি চেয়ারম্যানের ছেলে আশ্রাফুল বলেন, একটি পক্ষ আমার পিতার জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে পরিকল্পিতভাবে এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। রায়পুরা উপজেলা চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বলেন, সিরাজ ভাই অত্যন্ত জনপ্রিয় একজন চেয়ারম্যান ছিলেন। জনপ্রিয়তাই তার কাল হয়েছে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter