নানিয়ারচরে চলছে খুনের বদলে খুন

ব্রাশফায়ারে ফের নিহত ৫

শক্তিমান চাকমার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যাওয়ার সময় এ হত্যাকাণ্ড * অভিযোগের তীর ইউপিডিএফের দিকে

  রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি ০৫ মে ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

প্রতিশোধের রক্তগঙ্গা বইছে পাহাড়ে। ঘটছে একের পর এক হত্যাকাণ্ড। শুক্রবার অজ্ঞাত বন্দুকধারীদের ব্রাশফায়ারে অকালে প্রাণ গেল আরও পাঁচজনের। রাঙ্গামাটির নানিয়ারচর উপজেলা চেয়ারম্যান শক্তিমান চাকমাকে প্রকাশ্যে খুন করার ২৪ ঘণ্টা যেতে না যেতেই রাঙ্গামাটিতে কেড়ে নেয়া হল পাঁচজনের প্রাণ। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (এমএন লারমা) নেতা শক্তিমান চাকমার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যোগ দিতে মাইক্রোবাসে যাওয়ার সময় এ হত্যাকাণ্ড ঘটে।

গুলিতে ঘটনাস্থলেই নিহত হন ‘ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক)’ দলের প্রধান তপন জ্যোতি চাকমা (৫০) ওরফে বর্মা। তিনি ছাড়াও নিহত হয়েছেন জনসংহতি সমিতি-জেএসএস (এমএন লারম) সমর্থিত যুব সমিতির মহালছড়ি উপজেলার সাধারণ সম্পাদক সুজন চাকমা (৩০), মহালছড়ি উপজেলার তনয় চাকমা (৩১) ও সেতু লাল চাকমা (৩৬)। জেএসএসের (এমএন লারমা) তিন নেতা নিহতের সত্যতা নিশ্চিত করেছে যুব সমিতির কেন্দ্রীয় সহসভাপতি জ্ঞান চাকমা। এ ছাড়া নিহত হন মাইক্রোবাস চালক মো. সজীব (৩৫)। এদের মধ্যে মাইক্রোবাসের চালক সজীব ও সেতু লাল চাকমা খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালে মারা যান। এ ঘটনায় আহত হন দিগন্ত চাকমা (৩০), অর্চীন চাকমা (২৮), অজুর্ন চাকমা (২৯), মিহির চাকমা (২৮), শান্তি রঞ্জন চাকমা (৩৫), প্রীতিকুমার চাকমাসহ ৮ জন। আহতদের মধ্যে দিগন্ত, অর্চীন, অজুর্ন ও মিহির চাকমাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আহতদের বাড়ি খাগড়াছড়ির মহালছড়ি উপজেলায়।

শুক্রবার দুপুরে নানিয়ারচর উপজেলার বেতছড়ি নামক এলাকায় এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। নানিয়ারচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবদুল লতিফ বলেন, খবর পেয়ে হতাহতদের উদ্ধারে তাৎক্ষণিক পুলিশ ও সেনাবাহিনী ঘটনাস্থলে ছুটে যায় এবং উদ্ধার অভিযানে অংশ নেয়।

রাঙ্গামাটির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত তপন জ্যোতি চাকমা, কনক চাকমা ও সুজন চাকমা নামে ৩ জনের লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য রাঙ্গামাটি জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। আহতদের উদ্ধার করে খাগড়াছড়ি জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হলে সেখানে সেতু লাল চাকমা নামে একজন ও গাড়ির চালক মো. সজীব মারা যান।

ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) দলের কেন্দ্রীয় সদস্য লিটন চাকমা এ হত্যাকাণ্ডের জন্য প্রসীত খীসার নেতৃত্বাধীন ইউপিডিএফকে দায়ী করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘প্রসীত খীসার নেতৃত্বে সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যে একটি আঞ্চলিক সড়কে গাড়ির গতি থামিয়ে গুলি করে। সন্ত্রাসীরা তপন জ্যোতি চাকমাসহ অন্যদের মৃত্যু নিশ্চিত করে পালিয়ে যায়।’

তবে হত্যাকাণ্ডের দায় অস্বীকার করেছেন ইউপিডিএফ (প্রসীত) গ্রুপের প্রচার ও প্রকাশনা বিভাগের প্রধান নিরণ চাকমা। তিনি যুগান্তরকে বলেছেন, তবে ‘নানিয়ারচরে একটি মাইক্রোবাস দুর্ঘটনার কথা শুনেছি। হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘কীভাবে এ ঘটনা ঘটল তা খতিয়ে দেখা দরকার।’ তবে এ ঘটনায় কোনোভাবেই তারা দায়ী নন। নিজেদের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্বের কারণে এসব হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে সবার ধারণা।

পুলিশ ও স্থানীয়রা জানান, শক্তিমান চাকমার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যোগ দেয়ার জন্য কয়েকজন সমর্থক ও সহকর্মী মাইক্রোবাসে খাগড়াছড়ি থেকে নানিয়ারচর যাচ্ছিলেন। পথে একদল অস্ত্রধারী মাইক্রোবাস টার্গেট করে গুলি চালায়। প্রথমে গাড়িচালক মো. সজীবকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এতে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাড়িটি উল্টে যায়। এরপর তাদের এলোপাথাড়ি ব্রাশফায়ারে ঘটনাস্থলেই তিনজন নিহত এবং ৯ জন আহত হন।

খাগড়াছড়ি হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডাক্তার নয়নময় ত্রিপুরা জানান, হাসপাতালে ১০ জনকে আনা হলে দু’জন মারা যান। আশঙ্কাজনক অবস্থায় ৪ জনকে চট্টগ্রাম মেডিকেলে পাঠানো হয়েছে।

এ ঘটনায় আহত নীরু কুমার চাকমা ও জীবন্ত চাকমা বলেন, ‘সন্ত্রাসীরা গাড়ির গতি রোধ করে মাইক্রোবাসের চালককে গুলি করে। এতে চালক গাড়িটির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। পরে সন্ত্রাসীরা মাইক্রোবাস লক্ষ্য করে গুলি করে।

সূত্র জানায়, তপন জ্যোতি চাকমা ওরফে বর্মা ছিলেন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) প্রভাবশালী শীর্ষনেতা। মতবিরোধের জেরে দল থেকে বের করে দেয়া হয় বর্মাকে। এরই জেরে মূল সংগঠন ভেঙে ২০১৭ সালের ১৫ নভেম্বর বর্মার নেতৃত্বে আত্মপ্রকাশ করে ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) নামে আরেকটি সংগঠন। সংগঠনটি আত্মপ্রকাশের মাত্র ২০ দিনের মাথায় গত ৫ ডিসেম্বর রাঙ্গামাটির নানিয়ারচরে সাবেক ইউপি সদস্য ও ইউপিডিএফ নেতা অনাদি রঞ্জন চাকমাকে ব্রাশফায়ারে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। এর ১০ দিন পর ১৫ ডিসেম্বর রাতে নানিয়ারচর সীমান্তে বন্দুকভাঙ্গা ইউনিয়নের ধামাইছড়া এলাকায় ব্রাশফায়ারে হত্যা করা হয় ইউপিডিএফের সংগঠক অনল বিকাশ চাকমা ওরফে প্লুটোকে। এরপর ইউপিডিএফের সাংগঠনিক সম্পাদক মিঠুন চাকমাকে খাগড়াছড়িতে হত্যাসহ তাদের আরও কয়েক সদস্য ও সমর্থককে খুন করা হয়।

এ ছাড়া ১৮ মার্চ রাঙ্গামাটি জেলা সদরের কুতুকছড়ি আবাসিক স্কুল এলাকার একটি বাড়িতে হানা দিয়ে অস্ত্রের মুখে মন্টি চাকমা ও দয়াসোনা চাকমাকে অপহরণ করে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। অপহরণের ৩৩ দিন পর ১৯ এপ্রিল রাতে খাগড়াছড়ি জেলা সদরের মধুপুর তেঁতুল তলার এপিবিএন স্কুলগেট এলাকায় মন্টি চাকমা ও দয়াসোনা চাকমাকে ছেড়ে দিয়ে যায় অপহরণকারীরা। মুক্তির জন্য বেশকিছু শর্তসহ ১০ লাখ টাকা দিতে হয়েছে বলে দাবি অপহৃতদের পরিবারের। এসব ঘটনার জন্য তপন জ্যোতি চাকমা ওরফে বর্মাকে দায়ী করে আসছিল ইউপিডিএফ। এ ছাড়া ওই ঘটনায় বর্মার নেতৃত্বাধীন দলে যুক্ত হয়ে জনসংহতি সমিতির সংস্কারবাদী (এমএন লারমা) দলের নেতারাও জড়িত বলে অভিযোগ ইউপিডিএফের। এসব ঘটনায় বিবদমান দুটি দলের সমর্থকদের মধ্যে শুরু হয় খুনের বদলে খুন। সর্বশেষ শুক্রবার খুন হলেন দলের প্রধান তপন জ্যোতি চাকমাসহ ‘ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক)’ দলের নেতারা। আগের দিন উপজেলা চেয়ারম্যান শক্তিমান চাকমাকে হত্যা করা হয়। মন্টি ও দয়াসোনা চাকমা অপহরণ মামলায় মূল আসামি ছিলেন, শক্তিমান চাকমা ও তপন জ্যোতি চাকমা। বর্তমানে এলাকার পরিস্থিতি থমথমে। বিরাজ করছে আতঙ্ক।

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter