তিস্তা দখলে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র
jugantor
চরের ২০০ একর জমি কাঁটাতারে ঘেরা
তিস্তা দখলে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র
নদীর বুকচিরে দুই কিলোমিটার দীর্ঘ রাস্তা নির্মাণ

  মো. মিজানুর রহমান দুলাল, লালমনিরহাট  

১৭ আগস্ট ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার এপাশে দক্ষিণ ভোটমারী (নাককাটির ডাঙ্গা) গ্রাম। ওপাশে শৌলমারী চর, মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে তিস্তা নদী। গ্রামের মানুষগুলো বংশপরম্পরায় নদী পেরিয়ে ওই চরে চাষাবাদ করে আসছে। কিন্তু হঠাৎ করেই তাদের জমি কাঁটা তার দিয়ে ঘিরে ফেলা হয়। কারণ এখানে ইন্ট্রাকো সোলার পাওয়ার লিমিটেড নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র করবে। সেই থেকে গ্রামের মানুষগুলোর জীবন প্রায় থমকে গেছে। চাষাবাদের জন্য তাদের আর এক শতাংশ জমিও অবশিষ্ট নেই। এখন করবে কী, খাওয়াইবা জুটবে কোথা থেকে সেই চিন্তায় অস্থির সবাই।

এদের একজন শাহজাহান আলী কৃষক। তিনি বলেন, ‘ভুট্টা তুলে আনার পর আমার জমি দখল করে নেওয়া হয়েছে। আমার আর কোনো জমি নেই। এখন আমার দিন চলবে কিভাবে, কি দিয়ে সংসার চালাব ভেবে পাচ্ছি না। শাহজাহানের মতো এ এলাকার অনেকেই জমি হারিয়ে এখন প্রায় নিঃস্ব।

ইন্ট্রাকো সোলারের বিরুদ্ধে শুধু কৃষকের জমি দখল নয়, তিস্তার গলা চেপে ধরার অভিযোগও উঠেছে। সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে যাতায়াতের জন্য নদীর বুকচিরে দুই কিলোমিটার লম্বা এবং ৫০ ফুট চওড়া রাস্তা তৈরি করছে তারা। অপরিকল্পিত ও বিধির বাইরে রাস্তা নির্মাণে তিস্তার বামতীরের চ্যানেলটি প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, এ কারণে নদীভাঙনসহ সম্পদহানি ঘটবে। নদী গবেষকরা এটিকে ‘তিস্তার সর্বনাশ করা হচ্ছে’ বলে উল্লেখ করেন। দ্রুত এসব বন্ধের দাবি জানিয়েছেন তারা।

জানা গেছে, শৌলমারী চরে ৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য সরকারের সঙ্গে চুক্তি করেছে ইন্ট্রাকো সোলার পাওয়ার লিমিটেড। এদিকে ইন্ট্রাকোর ৮০ শতাংশ শেয়ার কিনেছে প্যারামাউন্ট বিট্র্যাক অ্যানার্জি লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান। মূলত এরাই ইন্ট্রাকোর পক্ষে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণসংক্রান্ত কাজ করছে।

তিস্তার বুকচিরে রাস্তা নির্মাণও প্যারামাউন্টের তত্ত্বাবধানেই হচ্ছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। কোম্পানিটি জমি নিলেও দাম দেয়নি। কাউকে সামান্য কিছু টাকা দিয়ে জমি লিখে নিয়েছে। কৌশলে জমির মালিকদের না দাবিনামায় স্বাক্ষর করিয়ে নিয়েছে। লালমনিরহাট জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, তারা সামান্য কিছু জমি কিনে কাজ শুরু করেছে। খাসজমির জন্য আবেদন করেছে। অথচ বাস্তবে দেখা গেছে বিশাল এলাকা কাঁটা তার দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে।

সরেজমিন দেখা যায়, তিস্তার বামতীরে নদীর ওপর লাগানো হয়েছে ‘ইন্ট্রাকো সোলার পাওয়ার লিমিটেডের’ সাইনবোর্ড। সেখানে পাহারায় আছেন কর্তৃপক্ষের সতর্ক নিরাপত্তারক্ষীরা। নদীর মাঝখানে কিছুটা জায়গা ফাঁকা (বেইলি ব্রিজের জন্য) রেখে চলছে রাস্তার কাজ। এজন্য মাঝখানে বালুভর্তি শত শত জিও রেখে দুই পাশে ইটের গাঁথুনি দেওয়া হয়েছে। ফলে নদীর পানি বাধাগ্রস্ত হয়ে দুই তীরে ভাঙন দেখা দিয়েছে। যা বাঁশ-টিন দিয়ে রক্ষার চেষ্টা করা হয়েছে। নদী পার হয়ে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় দুই কিলোমিটারের ইট বিছানো রাস্তাটি চলে গেছে শৌলমারী চরে নির্মাণাধীন সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রকল্প এলাকা পর্যন্ত। রাস্তার কারণে চরের মাঝে পানি আটকে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এতে ডুবে আছে চরের অনেক জমি।

এদিকে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য নদীর বুকে যেখানে রাস্তা তৈরি করা হয়েছে, সেখান থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার ভাটিতে আছে দক্ষিণ ভোটমারী (নাককাটির ডাঙ্গা) গ্রাম। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, ওই রাস্তার কারণে পানির গতিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে নদীটি গ্রামের কাছাকাছি চলে এসেছে। গ্রাম লাগোয়া বিস্তীর্ণ আবাদি জমি ইতোমধ্যে চলে গেছ নদীগর্ভে। গ্রাম থেকে নেমে চরের দিকে চলে যাওয়া একটি সরকারি কাঁচা রাস্তার অনেকটা জায়গা ভেঙে গেছে পানির চাপে। হুমকিতে রয়েছে একটি সেতু।

স্থানীয় বাসিন্দা ইউসুফ আলী বলেন, ‘সোলার কোম্পানি রাস্তা করে নদীর পানি আটকে দেওয়ায় আমাদের এলাকার সব জমিজমাতে ভাঙন দেখা দিয়েছে। পানি রাস্তায় ধাক্কা খেয়ে উজানের জমিজমা সব শেষ করে দিচ্ছে। মজমুল আলম বলেন, শৌলমারী চরের জমি ওরা দখল করেছে, এখন নদীর এপাশে থাকা জমিও ভেঙে যাচ্ছে। শুধু নাককাটির ডাঙ্গা নয়, নির্মাণাধীন রাস্তার উজান-ভাটির অনেক জায়গায় নদীর দুই পাড়ে ইতোমধ্যে নতুন করে ভাঙন দেখা দিয়েছে বলে জানা গেছে।

এই বিষয়ে রিভারাইন পিপলসের পরিচালক ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. তুহিন ওয়াদুদের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের অন্যান্য নদীর চেয়ে তিস্তা অনেক ভালো। কারণ এখানে দখল-দূষণ ছিল না। কিন্তু নদীর অভ্যন্তরে বিধিবহির্ভূতভাবে ইন্ট্রাকো সোলার পাওয়ার লিমিটেড যে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করছে তাতে নদীর সর্বনাশ হবে।

যে মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রী তিস্তা মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন সে সময় নদীটির ভেতরে যে অবকাঠামো নির্মাণ হচ্ছে তাতে মানুষ ও পরিবেশের ক্ষতি হবে। আর তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও আন্দোলন পরিষদের সভাপতি নজরুল ইসলাম হক্কানী প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘যারা এসব প্রকল্প করে আমাদের জীবনকে ধ্বংস করছে, মানুষকে বিপর্যস্ত করছে, তাদের সাহসের ভিত্তি কোথায়?’

লালমনিরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান বলেন, ‘সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে যাতায়াতের জন্য বামতীর চ্যানেলে যে রাস্তা তৈরি হচ্ছে তাতে পানির গতিপ্রবাহে বাধার সৃষ্টি হবে। এতে ডানতীরসহ বিভিন্ন স্থানে নদীভাঙনে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হবে। প্রকল্পের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কিছু জানানো হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমাদের কাছে কোনো মতামত চাওয়া হয়নি। তবে বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হয়েছে।

প্যারামাউন্ট বিট্র্যাক অ্যানার্জি লিমিটেডের মেজবা আজিজ নামে এক কর্মকর্তার দাবি, ‘নদীর বুকে রাস্তা নির্মাণে গতিপথের কোনো ক্ষতি হবে না। নদীর পানি যাতে স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারে সেজন্য দুটি বেইলি ব্রিজ নির্মাণ করা হবে।’ এ বিষয়ে কোনো অনুমোদন আছে কিনা? এমন প্রশ্নের সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি।

এদিকে শৈলমারীর প্রায় পুরো চর ঘিরে রাখা হয়েছে সিমেন্টের পিলার ও কাঁটা তার দিয়ে। এক পাশে তৈরি করা হয়েছে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অফিস। বাকি অংশে বসানো হচ্ছে শত শত সিমেন্টের পিলার। সেসব পিলারে সোলার প্যানেল লাগানোর কাজ শুরু হয়েছে ইতোমধ্যে। ঠিক কী পরিমাণ জমি নিয়ে বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি গড়ে উঠছে তার সঠিক কোনো হিসাব পাওয়া যায়নি।

বিভিন্নভাবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জমির পরিমাণ ১২০ একর দাবি করা হলেও স্থানীয় লোকজন বলছেন, সেখানে কমপক্ষে ২০০ একর জমি ঘিরে রাখা হয়েছে। এসব জমি যেমন ব্যক্তি মালিকানাধীন তেমনি সরকারি খাসজমিও আছে। কাঁটা তার দিয়ে ঘেরা প্রকল্প এলাকায় লাগানো হয়েছে বেশ কিছু সাইনবোর্ড। তাতে লেখা রয়েছে, ‘বায়নাসূত্রে এই জমির মালিক ইন্ট্রাকো সোলার পাওয়ার লিমিটেড’। সাইনবোর্ডে দাগ, খতিয়ান ও জমির পরিমাণের জায়গা ফাঁকা রাখা হয়েছে। একটি সূত্র জানায়, এখন পর্যন্ত সামান্য কিছু জমি রেজিস্ট্রি করা হয়েছে। বাকি জমির মালিকের কাছ থেকে হয় ‘না দাবি’ লিখে নেওয়া হয়েছে, নয়তো ইচ্ছেমতো দখল করা হয়েছে।

শৌলমারীর বাসিন্দা বৃদ্ধ তহুবর ইসলাম বলেন, জমির দাম হিসাবে একরপ্রতি ১০ লাখ টাকা করে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কয়েকজনের কাছ থেকে ১১ একর জমি নিয়ে দাম দিয়েছে মাত্র ২২ লাখ টাকা। সেই সঙ্গে চাপ দিয়ে ‘না দাবি’ লিখে নেওয়ার পর আর কোনো টাকা দেয়নি। তারা আমাদের ওপর নানা ধরনের অন্যায়-অত্যাচর শুরু করেছে- বলে তিনি অভিযোগ করেন।

শৌলমারী চরের কৃষক এমদাদুল হক জানান, তার কেনা প্রায় পৌনে তিন একর জমির মধ্যে ৯০ শতাংশ জমি কাঁটা তার দিয়ে ঘিরে নেওয়া হয়েছে। খবর পেয়ে সেখানে গিয়ে প্রতিবাদ করেন ওই কৃষক ও তার স্বজনরা। কিন্তু জমি তো রক্ষা হয়নি উলটো কমিটির লোকজনের হাতে মারধরের শিকার হয়েছেন তারা। গত ১২ এপ্রিলের ওই ঘটনায় কৃষক এমদাদুল হক ও তার স্ত্রীসহ ৯ জনের নামে কাঁটা তার ও টাকা ছিনতাইয়ের মামলাও করা হয়েছে কালীগঞ্জ থানায়।

নিজেকে ইন্ট্রাকো সোলার লিমিটেড ‘কমিটির ম্যানেজার’ দাবি করে ওই এলাকার বুলু মিয়া নামে এক ব্যক্তি মামলাটি করেন। এমদাদুল হক অভিযোগ করে বলেন, ‘তারা আমার জমি দখলে নিয়ে মারধরও করেছে, আবার টাকার জোরে আমাদের নামেই মিথ্যা মামলা দিয়েছে।’ এ ঘটনার বিচার চেয়ে তিনি পরবর্তীতে পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন বলে উল্লেখ করেন।

সম্প্রতি ওই প্রকল্প এলাকায় গিয়ে দেখা হয়, প্যারামাউন্ট বিট্র্যাক অ্যানার্জি লিমিটেডের জেনারেল ম্যানেজার (অপারেশন) আব্দুল হালিমের সাথে। কিন্তু তিনি সাংবাদিক দেখে কথা বলতে আপত্তি জানিয়ে দ্রুত সেখান থেকে চলে যান। পরে তার সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও কথা বলা সম্ভব হয়নি।

এ প্রসঙ্গে লালমনিরহাটের জেলা প্রশাসক মো. আবু জাফর সাংবাদিকদের বলেন, কিছু জমি কিনে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাজ শুরু করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এ ছাড়া প্রকল্পসংলগ্ন এলাকার খাসজমির বন্দোবস্ত চেয়েও আবেদন করা হয়েছে। খাসজমির বিষয়ে সিদ্ধান্ত ভূমি মন্ত্রণালয়ের বলে উল্লেখ করেন তিনি।

চরের ২০০ একর জমি কাঁটাতারে ঘেরা

তিস্তা দখলে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র

নদীর বুকচিরে দুই কিলোমিটার দীর্ঘ রাস্তা নির্মাণ
 মো. মিজানুর রহমান দুলাল, লালমনিরহাট 
১৭ আগস্ট ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার এপাশে দক্ষিণ ভোটমারী (নাককাটির ডাঙ্গা) গ্রাম। ওপাশে শৌলমারী চর, মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে তিস্তা নদী। গ্রামের মানুষগুলো বংশপরম্পরায় নদী পেরিয়ে ওই চরে চাষাবাদ করে আসছে। কিন্তু হঠাৎ করেই তাদের জমি কাঁটা তার দিয়ে ঘিরে ফেলা হয়। কারণ এখানে ইন্ট্রাকো সোলার পাওয়ার লিমিটেড নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র করবে। সেই থেকে গ্রামের মানুষগুলোর জীবন প্রায় থমকে গেছে। চাষাবাদের জন্য তাদের আর এক শতাংশ জমিও অবশিষ্ট নেই। এখন করবে কী, খাওয়াইবা জুটবে কোথা থেকে সেই চিন্তায় অস্থির সবাই।

এদের একজন শাহজাহান আলী কৃষক। তিনি বলেন, ‘ভুট্টা তুলে আনার পর আমার জমি দখল করে নেওয়া হয়েছে। আমার আর কোনো জমি নেই। এখন আমার দিন চলবে কিভাবে, কি দিয়ে সংসার চালাব ভেবে পাচ্ছি না। শাহজাহানের মতো এ এলাকার অনেকেই জমি হারিয়ে এখন প্রায় নিঃস্ব।

ইন্ট্রাকো সোলারের বিরুদ্ধে শুধু কৃষকের জমি দখল নয়, তিস্তার গলা চেপে ধরার অভিযোগও উঠেছে। সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে যাতায়াতের জন্য নদীর বুকচিরে দুই কিলোমিটার লম্বা এবং ৫০ ফুট চওড়া রাস্তা তৈরি করছে তারা। অপরিকল্পিত ও বিধির বাইরে রাস্তা নির্মাণে তিস্তার বামতীরের চ্যানেলটি প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, এ কারণে নদীভাঙনসহ সম্পদহানি ঘটবে। নদী গবেষকরা এটিকে ‘তিস্তার সর্বনাশ করা হচ্ছে’ বলে উল্লেখ করেন। দ্রুত এসব বন্ধের দাবি জানিয়েছেন তারা।

জানা গেছে, শৌলমারী চরে ৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য সরকারের সঙ্গে চুক্তি করেছে ইন্ট্রাকো সোলার পাওয়ার লিমিটেড। এদিকে ইন্ট্রাকোর ৮০ শতাংশ শেয়ার কিনেছে প্যারামাউন্ট বিট্র্যাক অ্যানার্জি লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান। মূলত এরাই ইন্ট্রাকোর পক্ষে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণসংক্রান্ত কাজ করছে।

তিস্তার বুকচিরে রাস্তা নির্মাণও প্যারামাউন্টের তত্ত্বাবধানেই হচ্ছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। কোম্পানিটি জমি নিলেও দাম দেয়নি। কাউকে সামান্য কিছু টাকা দিয়ে জমি লিখে নিয়েছে। কৌশলে জমির মালিকদের না দাবিনামায় স্বাক্ষর করিয়ে নিয়েছে। লালমনিরহাট জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, তারা সামান্য কিছু জমি কিনে কাজ শুরু করেছে। খাসজমির জন্য আবেদন করেছে। অথচ বাস্তবে দেখা গেছে বিশাল এলাকা কাঁটা তার দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে।

সরেজমিন দেখা যায়, তিস্তার বামতীরে নদীর ওপর লাগানো হয়েছে ‘ইন্ট্রাকো সোলার পাওয়ার লিমিটেডের’ সাইনবোর্ড। সেখানে পাহারায় আছেন কর্তৃপক্ষের সতর্ক নিরাপত্তারক্ষীরা। নদীর মাঝখানে কিছুটা জায়গা ফাঁকা (বেইলি ব্রিজের জন্য) রেখে চলছে রাস্তার কাজ। এজন্য মাঝখানে বালুভর্তি শত শত জিও রেখে দুই পাশে ইটের গাঁথুনি দেওয়া হয়েছে। ফলে নদীর পানি বাধাগ্রস্ত হয়ে দুই তীরে ভাঙন দেখা দিয়েছে। যা বাঁশ-টিন দিয়ে রক্ষার চেষ্টা করা হয়েছে। নদী পার হয়ে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় দুই কিলোমিটারের ইট বিছানো রাস্তাটি চলে গেছে শৌলমারী চরে নির্মাণাধীন সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রকল্প এলাকা পর্যন্ত। রাস্তার কারণে চরের মাঝে পানি আটকে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এতে ডুবে আছে চরের অনেক জমি।

এদিকে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য নদীর বুকে যেখানে রাস্তা তৈরি করা হয়েছে, সেখান থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার ভাটিতে আছে দক্ষিণ ভোটমারী (নাককাটির ডাঙ্গা) গ্রাম। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, ওই রাস্তার কারণে পানির গতিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে নদীটি গ্রামের কাছাকাছি চলে এসেছে। গ্রাম লাগোয়া বিস্তীর্ণ আবাদি জমি ইতোমধ্যে চলে গেছ নদীগর্ভে। গ্রাম থেকে নেমে চরের দিকে চলে যাওয়া একটি সরকারি কাঁচা রাস্তার অনেকটা জায়গা ভেঙে গেছে পানির চাপে। হুমকিতে রয়েছে একটি সেতু।

স্থানীয় বাসিন্দা ইউসুফ আলী বলেন, ‘সোলার কোম্পানি রাস্তা করে নদীর পানি আটকে দেওয়ায় আমাদের এলাকার সব জমিজমাতে ভাঙন দেখা দিয়েছে। পানি রাস্তায় ধাক্কা খেয়ে উজানের জমিজমা সব শেষ করে দিচ্ছে। মজমুল আলম বলেন, শৌলমারী চরের জমি ওরা দখল করেছে, এখন নদীর এপাশে থাকা জমিও ভেঙে যাচ্ছে। শুধু নাককাটির ডাঙ্গা নয়, নির্মাণাধীন রাস্তার উজান-ভাটির অনেক জায়গায় নদীর দুই পাড়ে ইতোমধ্যে নতুন করে ভাঙন দেখা দিয়েছে বলে জানা গেছে।

এই বিষয়ে রিভারাইন পিপলসের পরিচালক ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. তুহিন ওয়াদুদের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের অন্যান্য নদীর চেয়ে তিস্তা অনেক ভালো। কারণ এখানে দখল-দূষণ ছিল না। কিন্তু নদীর অভ্যন্তরে বিধিবহির্ভূতভাবে ইন্ট্রাকো সোলার পাওয়ার লিমিটেড যে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করছে তাতে নদীর সর্বনাশ হবে।

যে মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রী তিস্তা মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন সে সময় নদীটির ভেতরে যে অবকাঠামো নির্মাণ হচ্ছে তাতে মানুষ ও পরিবেশের ক্ষতি হবে। আর তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও আন্দোলন পরিষদের সভাপতি নজরুল ইসলাম হক্কানী প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘যারা এসব প্রকল্প করে আমাদের জীবনকে ধ্বংস করছে, মানুষকে বিপর্যস্ত করছে, তাদের সাহসের ভিত্তি কোথায়?’

লালমনিরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান বলেন, ‘সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে যাতায়াতের জন্য বামতীর চ্যানেলে যে রাস্তা তৈরি হচ্ছে তাতে পানির গতিপ্রবাহে বাধার সৃষ্টি হবে। এতে ডানতীরসহ বিভিন্ন স্থানে নদীভাঙনে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হবে। প্রকল্পের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কিছু জানানো হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমাদের কাছে কোনো মতামত চাওয়া হয়নি। তবে বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হয়েছে।

প্যারামাউন্ট বিট্র্যাক অ্যানার্জি লিমিটেডের মেজবা আজিজ নামে এক কর্মকর্তার দাবি, ‘নদীর বুকে রাস্তা নির্মাণে গতিপথের কোনো ক্ষতি হবে না। নদীর পানি যাতে স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারে সেজন্য দুটি বেইলি ব্রিজ নির্মাণ করা হবে।’ এ বিষয়ে কোনো অনুমোদন আছে কিনা? এমন প্রশ্নের সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি।

এদিকে শৈলমারীর প্রায় পুরো চর ঘিরে রাখা হয়েছে সিমেন্টের পিলার ও কাঁটা তার দিয়ে। এক পাশে তৈরি করা হয়েছে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অফিস। বাকি অংশে বসানো হচ্ছে শত শত সিমেন্টের পিলার। সেসব পিলারে সোলার প্যানেল লাগানোর কাজ শুরু হয়েছে ইতোমধ্যে। ঠিক কী পরিমাণ জমি নিয়ে বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি গড়ে উঠছে তার সঠিক কোনো হিসাব পাওয়া যায়নি।

বিভিন্নভাবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জমির পরিমাণ ১২০ একর দাবি করা হলেও স্থানীয় লোকজন বলছেন, সেখানে কমপক্ষে ২০০ একর জমি ঘিরে রাখা হয়েছে। এসব জমি যেমন ব্যক্তি মালিকানাধীন তেমনি সরকারি খাসজমিও আছে। কাঁটা তার দিয়ে ঘেরা প্রকল্প এলাকায় লাগানো হয়েছে বেশ কিছু সাইনবোর্ড। তাতে লেখা রয়েছে, ‘বায়নাসূত্রে এই জমির মালিক ইন্ট্রাকো সোলার পাওয়ার লিমিটেড’। সাইনবোর্ডে দাগ, খতিয়ান ও জমির পরিমাণের জায়গা ফাঁকা রাখা হয়েছে। একটি সূত্র জানায়, এখন পর্যন্ত সামান্য কিছু জমি রেজিস্ট্রি করা হয়েছে। বাকি জমির মালিকের কাছ থেকে হয় ‘না দাবি’ লিখে নেওয়া হয়েছে, নয়তো ইচ্ছেমতো দখল করা হয়েছে।

শৌলমারীর বাসিন্দা বৃদ্ধ তহুবর ইসলাম বলেন, জমির দাম হিসাবে একরপ্রতি ১০ লাখ টাকা করে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কয়েকজনের কাছ থেকে ১১ একর জমি নিয়ে দাম দিয়েছে মাত্র ২২ লাখ টাকা। সেই সঙ্গে চাপ দিয়ে ‘না দাবি’ লিখে নেওয়ার পর আর কোনো টাকা দেয়নি। তারা আমাদের ওপর নানা ধরনের অন্যায়-অত্যাচর শুরু করেছে- বলে তিনি অভিযোগ করেন।

শৌলমারী চরের কৃষক এমদাদুল হক জানান, তার কেনা প্রায় পৌনে তিন একর জমির মধ্যে ৯০ শতাংশ জমি কাঁটা তার দিয়ে ঘিরে নেওয়া হয়েছে। খবর পেয়ে সেখানে গিয়ে প্রতিবাদ করেন ওই কৃষক ও তার স্বজনরা। কিন্তু জমি তো রক্ষা হয়নি উলটো কমিটির লোকজনের হাতে মারধরের শিকার হয়েছেন তারা। গত ১২ এপ্রিলের ওই ঘটনায় কৃষক এমদাদুল হক ও তার স্ত্রীসহ ৯ জনের নামে কাঁটা তার ও টাকা ছিনতাইয়ের মামলাও করা হয়েছে কালীগঞ্জ থানায়।

নিজেকে ইন্ট্রাকো সোলার লিমিটেড ‘কমিটির ম্যানেজার’ দাবি করে ওই এলাকার বুলু মিয়া নামে এক ব্যক্তি মামলাটি করেন। এমদাদুল হক অভিযোগ করে বলেন, ‘তারা আমার জমি দখলে নিয়ে মারধরও করেছে, আবার টাকার জোরে আমাদের নামেই মিথ্যা মামলা দিয়েছে।’ এ ঘটনার বিচার চেয়ে তিনি পরবর্তীতে পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন বলে উল্লেখ করেন।

সম্প্রতি ওই প্রকল্প এলাকায় গিয়ে দেখা হয়, প্যারামাউন্ট বিট্র্যাক অ্যানার্জি লিমিটেডের জেনারেল ম্যানেজার (অপারেশন) আব্দুল হালিমের সাথে। কিন্তু তিনি সাংবাদিক দেখে কথা বলতে আপত্তি জানিয়ে দ্রুত সেখান থেকে চলে যান। পরে তার সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও কথা বলা সম্ভব হয়নি।

এ প্রসঙ্গে লালমনিরহাটের জেলা প্রশাসক মো. আবু জাফর সাংবাদিকদের বলেন, কিছু জমি কিনে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাজ শুরু করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এ ছাড়া প্রকল্পসংলগ্ন এলাকার খাসজমির বন্দোবস্ত চেয়েও আবেদন করা হয়েছে। খাসজমির বিষয়ে সিদ্ধান্ত ভূমি মন্ত্রণালয়ের বলে উল্লেখ করেন তিনি।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন