আঞ্চলিক দলগুলো মুখোমুখি

পাহাড় যেন রণক্ষেত্র আতঙ্কে মানুষ

  সুশীল প্রসাদ চাকমা, রাঙ্গামাটি ০৬ মে ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

একের পর এক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন পাহাড়ের মানুষ। শুক্রবার ইউপিডিএফের (গণতান্ত্রিক) প্রধান তপন জ্যোতি চাকমাসহ পাঁচজনের হত্যাকাণ্ডের পর পাহাড়জুড়ে বিরাজ করছে ভয়-আতঙ্ক। বিবদমান আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলো মুখোমুখি অবস্থান করায় পাহাড় রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।

পাহাড় আবার উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। একের পর এক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আতঙ্কে পাহাড়ের মানুষ। এ কারণে প্রয়োজনীয় কাজ ও গন্তব্যে যাতায়াত করতেও সাহস পাচ্ছেন না অনেকে। পালিয়ে বেড়াচ্ছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিও। কখন কী ঘটে- এমন আশঙ্কায় অনেকে ঘর থেকে বের হচ্ছেন না। রাঙ্গামাটি-খাগড়াছড়ি সড়কসহ নানিয়ারচর এলাকার আশপাশে মানুষের ঘোরাফেরা কমে গেছে। নিরাপত্তাহীনতা ভর করেছে পাহাড়ে বাস করা পাহাড়ি-বাঙালি সবার ওপর। নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত সবাই। এসব বিষয়ে প্রকাশ্যে কেউ কোনো মন্তব্য করতে বা মুখ খুলতে চাইছেন না। এদিকে খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতাল মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে শনিবার সকালে স্বজনদের কাছে লাশগুলো হস্তান্তর করা হয়েছে। মাইক্রোবাস চালক মো. সজীব হালদারের হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ও খুনিদের গ্রেফতারের দাবিতে তিন পার্বত্য জেলায় সোম ও মঙ্গলবার ৪৮ ঘণ্টার হরতালের ডাক দিয়েছে বাঙালিভিত্তিক দুই সংগঠন।

বৃহস্পতিবার নানিয়ারচর উপজেলা চেয়ারম্যান শক্তিমান চাকমাকে গুলি করে হত্যা এবং শুক্রবার ইউপিডিএফের বিদ্রোহী প্রধান তপন চাকমাসহ পাঁচজনকে প্রকাশ্যে ব্রাশফায়ারে হত্যার ঘটনায় সংগঠনগুলো পরস্পরকে দোষারোপ করছে। এসব হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ইউপিডিএফ জড়িত বলে দাবি করেছেন ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) দলের নেতা শ্যামল চাকমা ও জনসংহতি সমিতি (এমএন লারমা) দলের কেন্দ্রীয় নেতা প্রশান্ত চাকমা। তারা বলেন, প্রসিত বিকাশ খীসার নির্দেশে তাদের নেতাকর্মীদের খুন করা হয়েছে। জনসংহতি সমিতির মুখপাত্র সজীব চাকমা বলেন, মূলত পার্বত্য শান্তিচুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন না হওয়ায় পাহাড়ে এসব অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটছে। শান্তিচুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন হলেই কেবল পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে ইউপিডিএফ। সংগঠনটির কেন্দ্রীয় নেতা শান্তিদেব চাকমা বলেছেন, এসব ঘটনায় তাদের কোনো সম্পৃক্ততা বা কেউ জড়িত নয়। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাদের সংগঠনকে জড়ানো হচ্ছে। অন্তর্™^ন্দ্বের কারণেই এসব ঘটনা ঘটছে। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) কেন্দ্রীয় কমিটির লিখিত বিবৃতিতে দলীয় কর্মী-সমর্থক ও জনগণকে শান্ত থেকে ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবেলা করার আহ্বান জানানো হয়। শনিবার গণমাধ্যমে এ বিবৃতি পাঠানো হয়।

চট্টগ্রামের ডিআইজি নুরুজ্জামান শনিবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। কাউকে আতঙ্কিত না হওয়ার অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, এলাকায় পর্যাপ্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে তিনি বৈঠক করেছেন। এ সময় জেলা প্রশাসক একেএম মামুনুর রশিদ, পুলিশ সুপার মো. আলমগীর কবিরসহ প্রশাসনিক, পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর পদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। নানিয়ারচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবদুল লতিফ জানান, সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। তবে এখনও মামলা হয়নি। তপন চাকমাকে বহনকারী মাইক্রোবাস ও একটি মোটরসাইকেল নানিয়ারচর থানা হেফাজতে নেয়া হয়েছে।

খাগড়াছড়ির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এমএম সালাউদ্দিন বলেন, হরতালের বিষয়টি মাথায় রেখে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সচেষ্ট রয়েছে পুলিশ। এ ছাড়া হরতালের সময় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হবে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের বিদ্যমান সমস্যার স্থায়ী ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের লক্ষ্যে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর সরকার এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তি সম্পাদিত হয়। কিন্তু শান্তিচুক্তির বিরোধিতা করে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার মতবাদ নিয়ে প্রসিত বিকাশ খীসা, সঞ্চয় চাকমা ও রবি শঙ্কর চাকমাসহ তৎকালীন কিছু পাহাড়ি ছাত্র ও যুবনেতার নেতৃত্বে ১৯৯৮ সালের ২৬ ডিসেম্বর আত্মপ্রকাশ করে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)। শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের কিছু সময় যেতে না যেতেই এ দুটি সংগঠনের সমর্থকদের মধ্যে সংঘাত ও হানাহানি শুরু হয়।

২০০৭ সালে দেশে জরুরি অবস্থা চলাকালে মতবিরোধের জেরে বিভক্তি দেখা দেয় জনসংহতি সমিতির মধ্যে। আত্মপ্রকাশ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (এমএন লারমা)। এরপর সংঘাত রূপ নেয় ত্রিমুখী হয়ে। এতে সংশ্লিষ্ট দলগুলোর নেতাকর্মী ও সমর্থকসহ বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটে।

২০১৫ সালে তিনটি দলের মধ্যে এক সমঝোতা চুক্তির ভিত্তিতে মাঝখানে সশস্ত্র সংঘাত ও সহিংসতা বন্ধ থাকে। কিন্তু সর্বশেষ ক্ষমতা ও আধিপত্যের দ্বন্দ্বে মতবিরোধের জেরে ভেঙে বিভক্তি হয়ে পড়েছে ইউপিডিএফ। এ নিয়ে যোগ হয় আরেকটি আঞ্চলিক সংগঠন। ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) আত্মপ্রকাশের ২০ দিনের মাথায় আবার নতুন করে শুরু হয় সংঘাত। ঘটতে থাকে একের পর এক খুনের বদলে খুন। বৃহস্পতিবার প্রকাশ্যে ব্রাশফায়ারে খুন করা হয় নানিয়ারচর উপজেলা চেয়ারম্যান শক্তিমান চাকমাকে। শুক্রবার গাড়িচালক ও তিন সহকর্মীসহ ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) প্রধান তপন চাকমা নিহত হন। এ নিয়ে ৬ মাসের ব্যবধানে পাল্টাপাল্টি হামলায় গুলিতে কমপক্ষে ২০ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। অপহরণের শিকার হয়েছেন ইউপিডিএফ সমর্থপুষ্ট এক নারী সংগঠনের দুই নেত্রী। প্রতিপক্ষের গুলিতে নানিয়ারচরে প্রথম হত্যার শিকার হন ২০১৭ সালের ৫ ডিসেম্বর ইউপিডিএফ নেতা ও সাবেক ইউপি সদস্য অনাদি রঞ্জন চাকমা। একই দিন রাতে পৃথক ঘটনায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে প্রাণ হারান জুরাছড়ি আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক অরবিন্দু চাকমা। এরপর একে একে ঘটতে থাকে পরবর্তী হত্যাকাণ্ডগুলো। এসব ঘটনায় উদ্বিগ্ন পাহাড়ের মানুষ। থমথমে এলাকার পরিস্থিতি। হঠাৎ মারাÍক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে সার্বিক পরিস্থিতির ওপর। যা সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে প্রশাসন।

বৃহস্পতিবার রাঙ্গামাটির নানিয়ারচর উপজেলা চেয়ারম্যান ও জেএসএস সংস্কারবাদী (এমএন লারমা) নেতা শক্তিমান চাকমাকে এবং শুক্রবার ইউপিডিএফ বিদ্রোহী প্রধান তপন জ্যোতি চাকমা ওরফে বর্মাসহ পাঁচজনকে প্রকাশ্যে ব্রাশফায়ারে হত্যার পর রাঙ্গামাটিসহ পাহাড়ে উদ্ভূত হয়েছে নাজুক পরিস্থিতি। জনমনে দেখা দিয়েছে নানা শঙ্কা, উদ্বেগ আর অজানা ভয়। ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে প্রকাশ্যে এত মানুষের প্রাণহানি সবাইকে হতভম্ব করে দিয়েছে।

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter