মিয়ানমারকে চাপ দিন

ওআইসির প্রতি প্রধানমন্ত্রী

  যুগান্তর রিপোর্ট ০৬ মে ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বিপন্ন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ানোর জন্য ইসলামী সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা অনুযায়ী রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনে ওআইসিকে অবশ্যই মিয়ানমারের ওপর চাপ অব্যাহত রাখতে হবে।

শনিবার ঢাকায় ওআইসির সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে তিনি এ আহবান জানান। বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে দু’দিনব্যাপী ইসলামী সহযোগিতা সংস্থার ৪৫তম পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের সভার (সিএফএম) উদ্বোধন হয়। শুরুতেই অনুষ্ঠানে আইভরি কোস্টের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং ৪৪তম সিএফএম’র সভাপতি মার্সেল আমন-তানোহ বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর কাছে ৪৫তম সিএফএম’র সভাপতিত্ব হস্তান্তর করেন। সম্মেলনের আয়োজক দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এর মাধ্যমে আগামী ১ বছর ওআইসি কাউন্সিল অব মিনিস্টারসের (সিএফএম) চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করবে। তবে, পরে আরেকটি সেশনে শনিবার ওআইসির সহকারী মহাসচিব পদে এশিয়া গ্রুপের নির্বাচনে বাংলাদেশ হেরে যায়।

এদিকে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী, ওআইসির মহাসচিব, কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী, তুরস্কের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী, সেনেগালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ সবাই রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠীর প্রতি সংহতি প্রকাশ করে মিয়ানমার সরকারের নিন্দা জানান। সম্মেলনে ৫৭-সদস্য বিশিষ্ট এ সংস্থার প্রায় ৬০০ প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন। এর মধ্যে ২৭ জন পররাষ্ট্রমন্ত্রী, ১২ জন প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী পর্যায়ের প্রতিনিধি এবং ওআইসি প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রধানরা আছেন। এবার অসদস্য কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টিয়া ফ্রিল্যান্ডকে বিশেষ অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এবারের সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে ‘ইসলামিক ভ্যালুস ফর সাসটেইনেবল পিস, সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট।’

এ অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর বিপন্ন মানবতার পাশে দাঁড়ানোর বাণী উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) নিপীড়িত মানবতার পাশে দাঁড়ানোর জন্য নির্দেশনা দিয়ে গেছেন। কাজেই মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী যখন জাতিগত নির্মূলের মুখোমুখি ওআইসি তখন নিশ্চুপ থাকতে পারে না।’ তিনি বলেন, ইসলামী সহযোগিতা সংস্থাকে অবশ্যই মিয়ানমার সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ অব্যাহত রাখতে হবে। যাতে মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা অনুযায়ী তাদের অধিবাসী রোহিঙ্গাদের দেশে নিরাপদে ফেরত নিয়ে যায়। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীও সবার মতো মর্যাদার সঙ্গে বাঁচার এবং জীবন-জীবিকার অধিকার রাখেন বলে এ সময় প্রধানমন্ত্রী মন্তব্য করেন।

পরে মাহমুদ আলীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উদ্বোধনী পর্বে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পাশাপাশি কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টিয়া ফ্রিল্যান্ড এবং ওআইসি মহাসচিব ইউসুফ এ ওসাইমিন অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন। এছাড়া তুরস্কের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং ওআইসি সম্মেলনের সভাপতির প্রতিনিধি বেকির বোজড্যাগ এশিয়া, আরব এবং আফ্রিকার পক্ষে ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত ভাইস মিনিস্টার আবদুর রাহমান মোহাম্মাদ ফাসির, সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদেল বিন আহমেদ আল জুবায়ের এবং সেনেগালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিদকি কাবা অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন।

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ব্যক্তিগতভাবে রোহিঙ্গাদের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, আমি ব্যক্তিগতভাবে তাদের ব্যথায় ব্যথিত। কারণ, আমার পিতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ পরিবারের ১৮ জন সদস্য নির্মমভাবে নিহত হওয়ার পর আমি ৬ বছর দেশে ফিরতে পারিনি। উদ্বাস্তু হিসেবে বিদেশের মাটিতে কাটিয়েছি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, কাজেই জোরপূর্বক বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের মর্যাদা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আমি ওআইসিকে তাদের পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ানোর আহ্বান জানাচ্ছি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইতিহাসের এক বিশেষ সন্ধিক্ষণে ঢাকায় এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তিনি বলেন, আমরা এমন একটা সময় অতিক্রম করছি যখন প্রযুক্তি প্রবাহ ত্বরান্বিত হচ্ছে এবং যুব সমাজের কলেবর বৃদ্ধি পাচ্ছে। একই সঙ্গে বৃদ্ধি পাচ্ছে অসমতা, অসহিষ্ণুতা ও সামাজিক অবিচার এবং জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব। এসবের সমন্বিত প্রভাবে আমাদের ইসলামী চিন্তা-চেতনার মৌলিক ভিত্তি আজ হুমকির সম্মুখীন। তিনি বলেন, এখনকার মতো মুসলিম বিশ্ব আগে কখনও এত বেশি পরিমাণ সংঘাত, অভ্যন্তরীণ গোলযোগ, বিভাজন ও অস্থিরতার মুখোমুখি হয়নি। ব্যাপক হারে বাস্তুহারা হয়ে মুসলিম জনগোষ্ঠী দেশান্তরী হচ্ছে এটা দেখা যায়নি। আজ মুসলমান পরিচয়কে ভুলভাবে সহিংসতা ও চরমপন্থার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হচ্ছে। এ অবস্থা চলতে পারে না। এখন সময় এসেছে আমাদের চিন্তা-চেতনা ও দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনার। সময় এসেছে টেকসই শান্তি, সংহতি ও সমৃদ্ধির আলোকে আমাদের ভবিষ্যৎকে নতুন আঙ্গিকে ঢেলে সাজানোর।

বাংলাদেশের সরকার প্রধান এ প্রসঙ্গে তার পাঁচ দফা চিন্তা-ভাবনা তুলে ধরেন-

প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যের শুরুতেই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে বলেন, তার সুদূরপ্রসারী ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বে বাংলাদেশ ১৯৭৪ সালে ইসলামী সম্মেলন সংস্থায় যোগদান করে। কেননা বঙ্গবন্ধু প্রথম থেকেই বিশ্বের সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মুসলিম উম্মাহর সমন্বিত ভূমিকার অপরিসীম গুরুত্বের বিষয়টি উপলব্ধি করেছিলেন এবং শান্তি, সমৃদ্ধি, উন্নয়ন ও নিরাপত্তা অর্জনের অভিন্ন আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও সংহতির ওপর জোর দিয়েছিলেন। আমাদের হাজার বছরের প্রাচীন আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি দৃষ্টান্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, বাংলাদেশ বিগত বছরগুলোতে গড়ে শতকরা ৭ ভাগেরও অধিক হারে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করে বিস্ময় সৃষ্টি করেছে। অবকাঠামো এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ আজ দৃঢ় প্রত্যয়ের সঙ্গে এগিয়ে চলেছে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতি নিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্থপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়- এ নীতিতে বিশ্বাস করতেন। আমরা মনে করি, আজ ইসলামী বিশ্বে যেসব মতপার্থক্য ও ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি পরিলক্ষিত হচ্ছে, তা খোলা মন নিয়ে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে দূর করা সম্ভব। রক্তপাত শুধু অপ্রয়োজনীয়ই নয় বরং তা আরও খারাপ পরিস্থিতির জন্ম দেয়। ওআইসি মহাসচিব ইউসুফ এ ওসাইমিন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীকে পবিত্র কাবা শরিফের গিলাফ উপহার দেন। প্রধানমন্ত্রী ওআইসি পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের ৪৫তম বৈঠক (সিএফএম) উপলক্ষে অনুষ্ঠানে স্মারক ডাকটিকিট অবমুক্ত করেন।

এর আগে ১৯৮৩ সালে ১৪তম সম্মেলন ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

এদিকে শনিবার দুপুরে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ওআইসির সহকারী মহাসচিব পদের ভোট অনুষ্ঠিত হয়। এশিয়ান গ্র“পের দেশগুলোর মধ্যে ওআইসির সহকারী মহাসচিব (বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি) পদে নির্বাচনে বাংলাদেশের প্রার্থী হেরে যান। বাংলাদেশ পায় ৬ ভোট। প্রতিদ্বন্দ্বী কাজাখস্তান ১২ ভোট পেয়ে এ পদে নির্বাচিত হয়। নির্বাচনে এশিয়া গ্র“পের ১৮টি রাষ্ট্র গোপন ব্যালটে ভোটাধিকার প্রয়োগ করে।

আজ সম্মেলনের শেষ দিনে শুরুতেই উন্মুক্ত সেশনে ওআইসি দেশগুলোর আসন্ন মানবিক চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে আলোচনা হবে। এ সেশনে রোহিঙ্গা ইস্যু প্রাধান্য পাবে।

কানাডা দ্রুত রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান চায় : এদিকে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সেখানে সাক্ষাৎ করেন সম্মেলনে যোগ দেয়া কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টিয়া ফ্রিল্যান্ড। দুই নেতার সাক্ষাৎ শেষে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব এহসানুল করিম সাংবাদিকদের জানান, কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীকে বলেছেন, তার দেশ রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান চায়। কানাডা এ বিষয়ে সব ধরনের সহযোগিতা দিতে রাজি আছে।

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
.