ঋণ জালিয়াতিতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বড় ধাক্কা
jugantor
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ প্রতিবেদন
ঋণ জালিয়াতিতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বড় ধাক্কা
ঋণ বিতরণে অনিয়ম, সুশাসনের অভাব ও করোনার নেতিবাচক প্রভাব দায়ী

  যুগান্তর প্রতিবেদন  

০৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

লাগামহীন ঋণ জালিয়াতি, দুর্বল অভ্যন্তরীণ শাসন ও করোনার প্রভাবে নন ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সার্বিক ব্যবস্থাপনায় বড় ধাক্কা লেগেছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর কমেছে আয়, বেড়েছে ব্যয়। খেলাপি ঋণ ও লিজ বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ।

এতে ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ ও প্রভিশন খাতে অর্থ আটকে থাকার অঙ্কও বেড়েছে। কমেছে নিট সম্পদ, মূলধন থেকে আয় ও মুনাফা। সার্বিকভাবে বেড়েছে মূলধন ঘাটতি। নন ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের তৈরি একটি প্রতিবেদনে এসব উদ্বেগজনক তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, গত কয়েক বছরে সাতটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে পরিচালকরা নামে বেনামে ঋণ নিয়ে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। পরিচালকদের লুটপাটের কারণে সাতটি প্রতিষ্ঠানই এখন পথে বসার উপক্রম। পরিশোধ করতে পারছে না আমানতকারীদের অর্থ। এসব ঋণ এখন খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। এদিকে আদালতের নির্দেশে তিনটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অনিয়মের বিষয়ে তদন্ত করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বাংলাদেশ লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্স কোম্পানিজ অ্যাসোসিয়েশনের একজন সদস্য বলেন, ৩৪টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৫-৭টি অনিয়মের কারণে দুর্বল হয়ে পড়েছে। বাকিগুলো বেশ ভালো আছে। কিন্তু দুর্বলগুলোর কারণে পুরো খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত দুই বছরে গড়ে প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ ও ব্যবসা কমেছে। বিতরণ করা ঋণ ও লিজ খেলাপি হওয়ার প্রবণতা বাড়ায় তারল্য সংকট বেড়েছে।

এই ধাক্কা সামলে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে উদ্ধার করতে বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ কাঠামো জোরদার করেছে। অনিয়ম দুর্নীতিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। একই সঙ্গে নীতি কাঠামোতে দেওয়া হয়েছে ব্যাপক ছাড়, যাতে দুর্বলতা কাটিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো আবার উঠে দাঁড়াতে পারে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম বলেন, আর্থিক খাতে তদারকি জোরদার করা হয়েছে। দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোকে সবল করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। যেসব অনিয়ম হয়েছে সেগুলোর বিষয়ে তদন্ত হচ্ছে।

তহবিল সংকট : আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট তহবিলের ৮৪ শতাংশই আসে ব্যাংক থেকে। বাকি ১৬ শতাংশ সঞ্চয়ীদের আমানত ও অন্যান্য উৎস থেকে আসে। অর্থাৎ তহবিলের জন্য তাদের ব্যাংকের ওপরই ভরসা করতে হচ্ছে। লিজিং কোম্পানিগুলো ব্যাংক থেকে স্থায়ী আমানত, মেয়াদি আমানত ও কলমানির মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহ করত। গত দুই বছর ধরে বেশ কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠান ব্যাংক থেকে নেওয়া আমানত ও কলমানিতে নেওয়া ধার সময়মতো পরিশোধ করতে পারছিল না। পরে বাধ্য হয়ে দফায় দফায় এগুলোর মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। তার পরও তা পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়েছে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান।

এ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নালিশও করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে এগুলো নিয়ে একাধিক বৈঠক হয়েছে। এতেও অর্থ পরিশোধ করতে না পারায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকে সংকেত পেয়ে ছয়টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে ঋণ খেলাপি হিসাবে চিহ্নিত করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোতে (সিআইবি) রিপোর্ট করেছে। ফার্স ফাইন্যান্সের ৩০ কোটি টাকার একটি এফডিআর বন্ধক রেখে প্রাইম ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক থেকে ৩০ কোটি টাকা করে ৬০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

এই ঋণ পরিশোধে প্রথমে ব্যর্থতা, পরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপে নিষ্পত্তি হয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংকগুলো আর্থিক প্রতিষ্ঠানে নতুন আমানত রাখা, আগের আমানতের মেয়াদ বাড়ানো এবং কলমানিতে অর্থ ধার দেওয়া বন্ধ করে দেয়। এতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর তহবিলের বড় উৎস সঙ্কুচিত হয়ে গেলে তারল্য সংকট বেড়ে যায়, যা এখনো অব্যাহত রয়েছে।

বিনিয়োগ কমেছে : ২০১৯ সালে মোট ঋণ ও লিজ ছিল ৬৭ হাজার ৬৩০ কোটি টাকা। গত বছরের তা কমে দাঁড়িয়েছে ৬৭ হাজার ২০ কোটি টাকায়। অন্যান্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণের পরিমাণ ১৯ হাজার ৮১০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১ হাজার কোটি টাকায়। আমানত ৪৫ হাজার ১৯০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৫ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা।

শেয়ারহোল্ডার ইকুইটি ১১ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা থেকে কমে ৯ হাজার ৯০ কোটি টাকা হয়েছে। অর্থাৎ আলোচ্য সময়ে বিনিয়োগ ও মূলধন কমেছে। কিন্তু দেনা বেড়েছে। ফলে আর্থিক ব্যবস্থাপনা আরও দুর্বল হয়েছে। বেড়েছে সংকট।

কমেছে মুনাফা : আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আয়ের বড় অংশই আসে সুদ বা মুনাফা থেকে। এ খাতে আয় ভয়াবহভাবে কমে গেছে। ২০১৯ সালে সুদ আয় ছিল আট হাজার ৪৯০ কোটি টাকা। গত বছর এ খাতে আয় কমে হয়েছে ছয় হাজার ৯৪০ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে আয় কমেছে প্রায় ২০ শতাংশ। আমানতের বিপরীতে সুদ পরিশোধের পর নিট আয়ও কমে গেছে। তবে বিভিন্ন বিনিয়োগের বিপরীতে আয় বেড়েছে।

এর মধ্যে সুদবহির্ভূত আয় ৪৩০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৫৯০ কোটি টাকা হয়েছে। সব মিলে আলোচ্য সময়ে মোট পরিচালন আয় তিন হাজার ৩০০ কোটি টাকা থেকে কমে দুই হাজার ১৮০ কোটি টাকা হয়েছে। অথচ পরিচালন ব্যয় এক হাজার ৬০ কোটি টাকা অপরিবর্তিত রয়েছে। নিট মুনাফা ২০১৯ সালে ছিল এক হাজার ২৮০ কোটি টাকা। গত বছর হয়েছে ৬৪০ কোটি টাকা। এক বছরে মুনাফা কমেছে ৫০ শতাংশ। গত জুন পর্যন্ত হিসাবে পরিচালন মুনাফা কমেছে ৩২ শতাংশ।

কমেছে মূলধন : মৌলিক মূলধন ২০১৯ সালে ছিল ১১ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা। গত বছর তা কমে দাঁড়িয়েছে আট হাজার ৯৪০ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে মূলধন কমেছে ২৭ শতাংশ। তবে প্রচ্ছন্ন মূলধন বা বিভিন্ন বন্ডে বিনিয়োগ এক হাজার ৩৩০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে এক হাজার ৩৪০ কোটি টাকা হয়েছে।

বেড়েছে খেলাপি ঋণ : ২০১৯ সালে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ছয় হাজার ৪০ কোটি টাকা। গত বছর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৫০ কোটি টাকা। গত জুন পর্যন্ত প্রাথমিক হিসাবে খেলাপি ঋণ ১১ হাজার কোটি টাকা ছড়িয়ে গেছে। আলোচ্য সময়ে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৪০ শতাংশ। খেলাপি লিজ ও ঋণের হার ছিল ২০১৯ সালে সাড়ে ৯ শতাংশ। গত বছর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫ শতাংশে। ২০১৯ সালে প্রভিশনের প্রয়োজন ছিল তিন হাজার ২৮০ কোটি টাকা।

খেলাপি ঋণ বাড়ায় ২০২০ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে পাঁচ হাজার ১৮০ কোটি টাকায়। প্রভিশন সংরক্ষণ দুই হাজার ৩৪০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে চার হাজার ৪৪০ কোটি টাকা হয়েছে। প্রভিশন ঘাটতি ৭৪০ কোটি টাকা। গত জুনে তা সামান্য বেড়েছে। খেলাপি ঋণ বাড়ায় সম্পদের বিপরীতে আয় কমে গেছে। ২০১৯ সালে এ খাতে আয় ছিল ১ দশমিক ৫ শতাংশ। গত বছর তা আরও কমে শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ হয়েছে। একই সময়ে মূলধনের বিপরীতে আয় ১০ দশমকি ৮ শতাংশ থেকে কমে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ হয়েছে। গত জুনে এ দুই খাতেই আয় সামান্য কমেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ প্রতিবেদন

ঋণ জালিয়াতিতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বড় ধাক্কা

ঋণ বিতরণে অনিয়ম, সুশাসনের অভাব ও করোনার নেতিবাচক প্রভাব দায়ী
 যুগান্তর প্রতিবেদন 
০৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

লাগামহীন ঋণ জালিয়াতি, দুর্বল অভ্যন্তরীণ শাসন ও করোনার প্রভাবে নন ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সার্বিক ব্যবস্থাপনায় বড় ধাক্কা লেগেছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর কমেছে আয়, বেড়েছে ব্যয়। খেলাপি ঋণ ও লিজ বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ।

এতে ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ ও প্রভিশন খাতে অর্থ আটকে থাকার অঙ্কও বেড়েছে। কমেছে নিট সম্পদ, মূলধন থেকে আয় ও মুনাফা। সার্বিকভাবে বেড়েছে মূলধন ঘাটতি। নন ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের তৈরি একটি প্রতিবেদনে এসব উদ্বেগজনক তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, গত কয়েক বছরে সাতটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে পরিচালকরা নামে বেনামে ঋণ নিয়ে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। পরিচালকদের লুটপাটের কারণে সাতটি প্রতিষ্ঠানই এখন পথে বসার উপক্রম। পরিশোধ করতে পারছে না আমানতকারীদের অর্থ। এসব ঋণ এখন খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। এদিকে আদালতের নির্দেশে তিনটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অনিয়মের বিষয়ে তদন্ত করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বাংলাদেশ লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্স কোম্পানিজ অ্যাসোসিয়েশনের একজন সদস্য বলেন, ৩৪টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৫-৭টি অনিয়মের কারণে দুর্বল হয়ে পড়েছে। বাকিগুলো বেশ ভালো আছে। কিন্তু দুর্বলগুলোর কারণে পুরো খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত দুই বছরে গড়ে প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ ও ব্যবসা কমেছে। বিতরণ করা ঋণ ও লিজ খেলাপি হওয়ার প্রবণতা বাড়ায় তারল্য সংকট বেড়েছে।

এই ধাক্কা সামলে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে উদ্ধার করতে বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ কাঠামো জোরদার করেছে। অনিয়ম দুর্নীতিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। একই সঙ্গে নীতি কাঠামোতে দেওয়া হয়েছে ব্যাপক ছাড়, যাতে দুর্বলতা কাটিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো আবার উঠে দাঁড়াতে পারে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম বলেন, আর্থিক খাতে তদারকি জোরদার করা হয়েছে। দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোকে সবল করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। যেসব অনিয়ম হয়েছে সেগুলোর বিষয়ে তদন্ত হচ্ছে।

তহবিল সংকট : আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট তহবিলের ৮৪ শতাংশই আসে ব্যাংক থেকে। বাকি ১৬ শতাংশ সঞ্চয়ীদের আমানত ও অন্যান্য উৎস থেকে আসে। অর্থাৎ তহবিলের জন্য তাদের ব্যাংকের ওপরই ভরসা করতে হচ্ছে। লিজিং কোম্পানিগুলো ব্যাংক থেকে স্থায়ী আমানত, মেয়াদি আমানত ও কলমানির মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহ করত। গত দুই বছর ধরে বেশ কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠান ব্যাংক থেকে নেওয়া আমানত ও কলমানিতে নেওয়া ধার সময়মতো পরিশোধ করতে পারছিল না। পরে বাধ্য হয়ে দফায় দফায় এগুলোর মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। তার পরও তা পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়েছে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান।

এ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নালিশও করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে এগুলো নিয়ে একাধিক বৈঠক হয়েছে। এতেও অর্থ পরিশোধ করতে না পারায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকে সংকেত পেয়ে ছয়টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে ঋণ খেলাপি হিসাবে চিহ্নিত করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোতে (সিআইবি) রিপোর্ট করেছে। ফার্স ফাইন্যান্সের ৩০ কোটি টাকার একটি এফডিআর বন্ধক রেখে প্রাইম ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক থেকে ৩০ কোটি টাকা করে ৬০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

এই ঋণ পরিশোধে প্রথমে ব্যর্থতা, পরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপে নিষ্পত্তি হয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংকগুলো আর্থিক প্রতিষ্ঠানে নতুন আমানত রাখা, আগের আমানতের মেয়াদ বাড়ানো এবং কলমানিতে অর্থ ধার দেওয়া বন্ধ করে দেয়। এতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর তহবিলের বড় উৎস সঙ্কুচিত হয়ে গেলে তারল্য সংকট বেড়ে যায়, যা এখনো অব্যাহত রয়েছে।

বিনিয়োগ কমেছে : ২০১৯ সালে মোট ঋণ ও লিজ ছিল ৬৭ হাজার ৬৩০ কোটি টাকা। গত বছরের তা কমে দাঁড়িয়েছে ৬৭ হাজার ২০ কোটি টাকায়। অন্যান্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণের পরিমাণ ১৯ হাজার ৮১০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১ হাজার কোটি টাকায়। আমানত ৪৫ হাজার ১৯০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৫ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা।

শেয়ারহোল্ডার ইকুইটি ১১ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা থেকে কমে ৯ হাজার ৯০ কোটি টাকা হয়েছে। অর্থাৎ আলোচ্য সময়ে বিনিয়োগ ও মূলধন কমেছে। কিন্তু দেনা বেড়েছে। ফলে আর্থিক ব্যবস্থাপনা আরও দুর্বল হয়েছে। বেড়েছে সংকট।

কমেছে মুনাফা : আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আয়ের বড় অংশই আসে সুদ বা মুনাফা থেকে। এ খাতে আয় ভয়াবহভাবে কমে গেছে। ২০১৯ সালে সুদ আয় ছিল আট হাজার ৪৯০ কোটি টাকা। গত বছর এ খাতে আয় কমে হয়েছে ছয় হাজার ৯৪০ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে আয় কমেছে প্রায় ২০ শতাংশ। আমানতের বিপরীতে সুদ পরিশোধের পর নিট আয়ও কমে গেছে। তবে বিভিন্ন বিনিয়োগের বিপরীতে আয় বেড়েছে।

এর মধ্যে সুদবহির্ভূত আয় ৪৩০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৫৯০ কোটি টাকা হয়েছে। সব মিলে আলোচ্য সময়ে মোট পরিচালন আয় তিন হাজার ৩০০ কোটি টাকা থেকে কমে দুই হাজার ১৮০ কোটি টাকা হয়েছে। অথচ পরিচালন ব্যয় এক হাজার ৬০ কোটি টাকা অপরিবর্তিত রয়েছে। নিট মুনাফা ২০১৯ সালে ছিল এক হাজার ২৮০ কোটি টাকা। গত বছর হয়েছে ৬৪০ কোটি টাকা। এক বছরে মুনাফা কমেছে ৫০ শতাংশ। গত জুন পর্যন্ত হিসাবে পরিচালন মুনাফা কমেছে ৩২ শতাংশ।

কমেছে মূলধন : মৌলিক মূলধন ২০১৯ সালে ছিল ১১ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা। গত বছর তা কমে দাঁড়িয়েছে আট হাজার ৯৪০ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে মূলধন কমেছে ২৭ শতাংশ। তবে প্রচ্ছন্ন মূলধন বা বিভিন্ন বন্ডে বিনিয়োগ এক হাজার ৩৩০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে এক হাজার ৩৪০ কোটি টাকা হয়েছে।

বেড়েছে খেলাপি ঋণ : ২০১৯ সালে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ছয় হাজার ৪০ কোটি টাকা। গত বছর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৫০ কোটি টাকা। গত জুন পর্যন্ত প্রাথমিক হিসাবে খেলাপি ঋণ ১১ হাজার কোটি টাকা ছড়িয়ে গেছে। আলোচ্য সময়ে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৪০ শতাংশ। খেলাপি লিজ ও ঋণের হার ছিল ২০১৯ সালে সাড়ে ৯ শতাংশ। গত বছর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫ শতাংশে। ২০১৯ সালে প্রভিশনের প্রয়োজন ছিল তিন হাজার ২৮০ কোটি টাকা।

খেলাপি ঋণ বাড়ায় ২০২০ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে পাঁচ হাজার ১৮০ কোটি টাকায়। প্রভিশন সংরক্ষণ দুই হাজার ৩৪০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে চার হাজার ৪৪০ কোটি টাকা হয়েছে। প্রভিশন ঘাটতি ৭৪০ কোটি টাকা। গত জুনে তা সামান্য বেড়েছে। খেলাপি ঋণ বাড়ায় সম্পদের বিপরীতে আয় কমে গেছে। ২০১৯ সালে এ খাতে আয় ছিল ১ দশমিক ৫ শতাংশ। গত বছর তা আরও কমে শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ হয়েছে। একই সময়ে মূলধনের বিপরীতে আয় ১০ দশমকি ৮ শতাংশ থেকে কমে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ হয়েছে। গত জুনে এ দুই খাতেই আয় সামান্য কমেছে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন