কাবুল দখলের এক মাসেই তালেবানে গৃহদাহ
jugantor
কাবুল দখলের এক মাসেই তালেবানে গৃহদাহ

  যুগান্তর ডেস্ক  

১৬ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আফগানিস্তানে নতুন সরকার গঠন নিয়ে তালেবান নেতাদের মধ্যে বড় ধরনের বিরোধ তৈরি হয়েছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে এ ঘটনা ঘটে। কাবুল দখলের এক মাসের মধ্যেই নেতাদের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্বের পাশাপাশি আরও কয়েকটি চ্যালেঞ্জ চোখ রাঙাচ্ছে তালেবান সরকারকে। দেশটির অর্থনীতি খাদের কিনারে দাঁড়িয়েছে এবং ভয়াবহ মানবিক সংকটের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে আফগানরা। খবর বিবিসি, রয়টার্স ও এএফপি।

তালেবানের একটি সূত্র বলেছে, নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পদ-পদবি নিয়ে সংগঠনের সহ-প্রতিষ্ঠাতা মোল্লা আবদুল গনি বারাদার ও মন্ত্রিসভার এক সদস্যের মধ্যে বাগবিতণ্ডা হয়েছে। তবে তালেবান আনুষ্ঠানিকভাবে এ ঘটনা স্বীকার করেনি।

তালেবান নেতৃত্বের মধ্যে মতবিরোধ চলছে বলে বেশ কিছুদিন ধরেই খবর পাওয়া যাচ্ছিল, যদিও তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তালেবানের একটি সূত্র জানিয়েছে, মোল্লা বারাদার ও শরণার্থীবিষয়ক মন্ত্রী খলিল উর-রহমান হাক্কানির মধ্যে উত্তেজনাপূর্ণ বাক্যবিনিময় হয়েছে। তখন সেখানে থাকা তাদের অনুসারীরাও পরস্পরের সঙ্গে বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়ে। খলিল উর-রহমান হাক্কানি আফগানিস্তানের সশস্ত্র গোষ্ঠী হাক্কানি নেটওয়ার্কের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা।

কাতারভিত্তিক এক জ্যেষ্ঠ তালেবান নেতা বলেন, গত সপ্তাহেও একবার তর্ক-বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। সেখানে বিতণ্ডা তৈরি হওয়ার কারণ হলো নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গঠন নিয়ে সন্তুষ্ট নন মোল্লা বারাদার।

তিনি জানিয়েছেন, আফগানিস্তানে তালেবানের বিজয়ে কৃতিত্ব কার হবে, তা নিয়েই বিরোধের শুরু। বারাদার মনে করেন, তার মতো ব্যক্তিরা, যারা কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়েছেন, তাদের কারণেই তালেবানের ‘জয়’ অর্জিত হয়েছে।

অন্যদিকে, হাক্কানি নেটওয়ার্কের সদস্যরা মনে করেন, যুদ্ধক্ষেত্রে লড়াইয়ের মাধ্যমে তালেবানের জয় এসেছে। আর তারাই ছিলেন যুদ্ধক্ষেত্রে। বারাদারের দাবির পেছনে অন্যতম কারণ হলো তিনি তালেবানের হয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়েছেন। ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তালেবানের শান্তিচুক্তির আগে তিনি সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে টেলিফোনে কথাও বলেছেন। এ ছাড়া বারাদার চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গেও বৈঠক করেছিলেন।

অন্যদিকে, আফগানিস্তানের ক্ষমতাচ্যুত সরকারের বাহিনী ও পশ্চিমা বাহিনীকে লক্ষ্য করে যেসব বড় হামলা চালানো হয়েছিল, সেগুলোর মুখ্য ভূমিকায় ছিল হাক্কানি নেটওয়ার্ক। হাক্কানি নেটওয়ার্ক যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসী তালিকাভুক্ত একটি সংগঠন।

অর্থনৈতিক সংকট চোখ রাঙাচ্ছে : অর্থ সংকটে দেশ পরিচালনায় হিমশিম খাচ্ছে তালেবান সরকার। গত মাসে তালেবান আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর নিরাপত্তা ব্যবস্থার অনেক উন্নতি দেখা গেলেও গত ২০ বছরে উন্নয়ন খাতে হাজার হাজার কোটি ডলার ব্যয় করা দেশটির অর্থনীতি খাদের কিনারে দাঁড়িয়েছে। তালেবান ক্ষমতায় আসার পর দেশটির ব্যাংকিং সিস্টেম বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

ব্যাংকগুলোর সামনে দেখা যাচ্ছে গ্রাহকের দীর্ঘ সারি। সেখানে সপ্তাহে মাত্র ২০ হাজার জনকে টাকা তোলার সুযোগ দেয়া হচ্ছে। তাও সর্বোচ্চ ২০০ ডলার করে। রিজার্ভের সুরক্ষায় এই সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। বাড়ছে খাদ্যের দাম। কাবুলে খাবারের দাম দেখা গেছে আকাশচুম্বী। রাজধানীজুড়ে এখন অসংখ্য ছোটখাটো অস্থায়ী বাজার, যেখানে মানুষজন অর্থের জন্য ঘরের জিনিসপত্র বিক্রি করতে নেমেছেন, যদিও ক্রেতার সংখ্যা সীমিত। শত শত কোটি ডলারের বিদেশি সাহায্যের পরও আফগানিস্তানের অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরেই ধুঁকছিল; জনসংখ্যার ক্রমাগত বৃদ্ধির সঙ্গে প্রবৃদ্ধি তাল মেলাতে ব্যর্থ হয়। চাকরি দুষ্প্রাপ্য। সরকারি কর্মীদের অনেকে জুলাই থেকে বেতনও পাননি। আফগানিস্তানের বাইরে দেশটির যে ৯০০ কোটি ডলারের বেশি বিদেশি রিজার্ভ আছে, তার ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ওঠারও লক্ষণ নেই।

ভয়াবহ মানবিক সংকটের দ্বারপ্রান্তে : বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি বা ডব্লিউএফপি জানাচ্ছে, চলতি মাসের মধ্যেই আফগানিস্তানে তাদের খাদ্যের জোগান ফুরিয়ে আসতে শুরু করবে। এতে করে না খেয়ে থাকতে হবে ১ কোটি ৪০ লাখ আফগানকে। খরা আর দুর্ভিক্ষের কারণে লাখ লাখ আফগান গ্রামাঞ্চল ছেড়ে শহরমুখী হয়েছেন। দেশটির একটি বড় অংশ টিকে আছে সরাসরি আন্তর্জাতিক সাহায্যের ওপর।

জাতিসংঘ সদর দপ্তরে মঙ্গলবার এক ভিডিও ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, এখনই ৪০ লাখের বেশি আফগানের জরুরি খাদ্য সহায়তা প্রয়োজন। আফগানিস্তানের ৭০ ভাগ মানুষই প্রত্যন্ত অঞ্চলে বাস করেন। সেখানে এখন প্রচণ্ড খরা চলছে যা দেশের ৭৩ লাখ মানুষকে আক্রান্ত করেছে। সব মিলিয়ে মানবিক সংকট আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করবে। জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস আন্তর্জাতিক দাতাগোষ্ঠীর কাছে আফগানিস্তানের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। এরইমধ্যে ১২০ কোটি ডলার সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দাতারা।

কাবুল দখলের এক মাসেই তালেবানে গৃহদাহ

 যুগান্তর ডেস্ক 
১৬ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আফগানিস্তানে নতুন সরকার গঠন নিয়ে তালেবান নেতাদের মধ্যে বড় ধরনের বিরোধ তৈরি হয়েছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে এ ঘটনা ঘটে। কাবুল দখলের এক মাসের মধ্যেই নেতাদের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্বের পাশাপাশি আরও কয়েকটি চ্যালেঞ্জ চোখ রাঙাচ্ছে তালেবান সরকারকে। দেশটির অর্থনীতি খাদের কিনারে দাঁড়িয়েছে এবং ভয়াবহ মানবিক সংকটের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে আফগানরা। খবর বিবিসি, রয়টার্স ও এএফপি।

তালেবানের একটি সূত্র বলেছে, নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পদ-পদবি নিয়ে সংগঠনের সহ-প্রতিষ্ঠাতা মোল্লা আবদুল গনি বারাদার ও মন্ত্রিসভার এক সদস্যের মধ্যে বাগবিতণ্ডা হয়েছে। তবে তালেবান আনুষ্ঠানিকভাবে এ ঘটনা স্বীকার করেনি।

তালেবান নেতৃত্বের মধ্যে মতবিরোধ চলছে বলে বেশ কিছুদিন ধরেই খবর পাওয়া যাচ্ছিল, যদিও তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তালেবানের একটি সূত্র জানিয়েছে, মোল্লা বারাদার ও শরণার্থীবিষয়ক মন্ত্রী খলিল উর-রহমান হাক্কানির মধ্যে উত্তেজনাপূর্ণ বাক্যবিনিময় হয়েছে। তখন সেখানে থাকা তাদের অনুসারীরাও পরস্পরের সঙ্গে বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়ে। খলিল উর-রহমান হাক্কানি আফগানিস্তানের সশস্ত্র গোষ্ঠী হাক্কানি নেটওয়ার্কের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা।

কাতারভিত্তিক এক জ্যেষ্ঠ তালেবান নেতা বলেন, গত সপ্তাহেও একবার তর্ক-বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। সেখানে বিতণ্ডা তৈরি হওয়ার কারণ হলো নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গঠন নিয়ে সন্তুষ্ট নন মোল্লা বারাদার।

তিনি জানিয়েছেন, আফগানিস্তানে তালেবানের বিজয়ে কৃতিত্ব কার হবে, তা নিয়েই বিরোধের শুরু। বারাদার মনে করেন, তার মতো ব্যক্তিরা, যারা কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়েছেন, তাদের কারণেই তালেবানের ‘জয়’ অর্জিত হয়েছে।

অন্যদিকে, হাক্কানি নেটওয়ার্কের সদস্যরা মনে করেন, যুদ্ধক্ষেত্রে লড়াইয়ের মাধ্যমে তালেবানের জয় এসেছে। আর তারাই ছিলেন যুদ্ধক্ষেত্রে। বারাদারের দাবির পেছনে অন্যতম কারণ হলো তিনি তালেবানের হয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়েছেন। ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তালেবানের শান্তিচুক্তির আগে তিনি সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে টেলিফোনে কথাও বলেছেন। এ ছাড়া বারাদার চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গেও বৈঠক করেছিলেন।

অন্যদিকে, আফগানিস্তানের ক্ষমতাচ্যুত সরকারের বাহিনী ও পশ্চিমা বাহিনীকে লক্ষ্য করে যেসব বড় হামলা চালানো হয়েছিল, সেগুলোর মুখ্য ভূমিকায় ছিল হাক্কানি নেটওয়ার্ক। হাক্কানি নেটওয়ার্ক যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসী তালিকাভুক্ত একটি সংগঠন।

অর্থনৈতিক সংকট চোখ রাঙাচ্ছে : অর্থ সংকটে দেশ পরিচালনায় হিমশিম খাচ্ছে তালেবান সরকার। গত মাসে তালেবান আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর নিরাপত্তা ব্যবস্থার অনেক উন্নতি দেখা গেলেও গত ২০ বছরে উন্নয়ন খাতে হাজার হাজার কোটি ডলার ব্যয় করা দেশটির অর্থনীতি খাদের কিনারে দাঁড়িয়েছে। তালেবান ক্ষমতায় আসার পর দেশটির ব্যাংকিং সিস্টেম বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

ব্যাংকগুলোর সামনে দেখা যাচ্ছে গ্রাহকের দীর্ঘ সারি। সেখানে সপ্তাহে মাত্র ২০ হাজার জনকে টাকা তোলার সুযোগ দেয়া হচ্ছে। তাও সর্বোচ্চ ২০০ ডলার করে। রিজার্ভের সুরক্ষায় এই সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। বাড়ছে খাদ্যের দাম। কাবুলে খাবারের দাম দেখা গেছে আকাশচুম্বী। রাজধানীজুড়ে এখন অসংখ্য ছোটখাটো অস্থায়ী বাজার, যেখানে মানুষজন অর্থের জন্য ঘরের জিনিসপত্র বিক্রি করতে নেমেছেন, যদিও ক্রেতার সংখ্যা সীমিত। শত শত কোটি ডলারের বিদেশি সাহায্যের পরও আফগানিস্তানের অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরেই ধুঁকছিল; জনসংখ্যার ক্রমাগত বৃদ্ধির সঙ্গে প্রবৃদ্ধি তাল মেলাতে ব্যর্থ হয়। চাকরি দুষ্প্রাপ্য। সরকারি কর্মীদের অনেকে জুলাই থেকে বেতনও পাননি। আফগানিস্তানের বাইরে দেশটির যে ৯০০ কোটি ডলারের বেশি বিদেশি রিজার্ভ আছে, তার ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ওঠারও লক্ষণ নেই।

ভয়াবহ মানবিক সংকটের দ্বারপ্রান্তে : বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি বা ডব্লিউএফপি জানাচ্ছে, চলতি মাসের মধ্যেই আফগানিস্তানে তাদের খাদ্যের জোগান ফুরিয়ে আসতে শুরু করবে। এতে করে না খেয়ে থাকতে হবে ১ কোটি ৪০ লাখ আফগানকে। খরা আর দুর্ভিক্ষের কারণে লাখ লাখ আফগান গ্রামাঞ্চল ছেড়ে শহরমুখী হয়েছেন। দেশটির একটি বড় অংশ টিকে আছে সরাসরি আন্তর্জাতিক সাহায্যের ওপর।

জাতিসংঘ সদর দপ্তরে মঙ্গলবার এক ভিডিও ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, এখনই ৪০ লাখের বেশি আফগানের জরুরি খাদ্য সহায়তা প্রয়োজন। আফগানিস্তানের ৭০ ভাগ মানুষই প্রত্যন্ত অঞ্চলে বাস করেন। সেখানে এখন প্রচণ্ড খরা চলছে যা দেশের ৭৩ লাখ মানুষকে আক্রান্ত করেছে। সব মিলিয়ে মানবিক সংকট আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করবে। জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস আন্তর্জাতিক দাতাগোষ্ঠীর কাছে আফগানিস্তানের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। এরইমধ্যে ১২০ কোটি ডলার সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দাতারা।

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন