রাজপথে না থাকলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা
jugantor
বিএনপির রুদ্ধদ্বার বৈঠকের তৃতীয় দিন
রাজপথে না থাকলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা
অঙ্গসংগঠনের কমিটি গঠনে প্রভাবশালীদের তদবির বন্ধের পরামর্শ * নেতাকর্মীরা মার খেলেও কেন্দ্রের অনেককে পাওয়া যায় না

  যুগান্তর প্রতিবেদন  

১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বিএনপির সিরিজ বৈঠকের শেষদিনে দলের অঙ্গসংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে হাইকমান্ডের বৈঠকে গুরুত্ব পায় নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে আন্দোলন। সেই আন্দোলনের চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছাতে দলকে শক্তিশালী করার ওপর জোর দেন নেতারা। বিশেষ করে অঙ্গসংগঠনগুলোর নেতৃত্ব আন্দোলনমুখী করার পরামর্শ দেন তারা। যাতে সামনের দিনে রাজপথে তারা ‘ভ্যানগার্ড’র ভূমিকা পালন করতে পারে। দৃঢ়তা ও সংকল্প নিয়ে নামতে হবে রাজপথে। সভায় নেতারা জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের সমালোচনা করেন।

আগামী দিনের করণীয় চূড়ান্তে কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে ৩ দিনের সিরিজ বৈঠক শেষ হয়েছে বৃহস্পতিবার। বৈঠকে বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে অঙ্গসংগঠনের নেতাদের ভূমিকার সমালোচনা করেন কেউ কেউ। আবার অনেকে নিজেদের নানা সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরেন। কর্মী সংকট রয়েছে জানিয়ে তারা বলেন, আন্দোলন-সংগ্রামে ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকর্মীরা রাজপথে মার খেলেও কেন্দ্রীয় অনেক নেতাকে পাশে পাওয়া যায় না। এ অবস্থার পরিবর্তন করতে হবে। অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের পাশে হাইকমান্ডকে অবশ্যই প্রধান ভূমিকা হিসাবে থাকতে হবে। নেতাদের পক্ষ থেকে এমন বক্তব্যের পর নীতিনির্ধারকরা জানান, এবারের আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে থাকতে না পারলে আগেই দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান। যে পারবে তাকে সুযোগ করে দেন। তবে কাউকেই দল থেকে বাদ দেওয়া হবে না। দলের সঙ্গেই রাখা হবে, কোনো দায়িত্বে নয়। রাজপথে না থাকলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা অবশ্যই নেওয়া হবে।

বিকাল ৪টায় গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে বৈঠক শুরু হয়ে চলে প্রায় সাড়ে ৪ ঘণ্টা। এতে সভাপতিত্ব করেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি যোগ দেন তিনি। বিএনপির ১১টি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন থাকলেও তৃতীয় দিনে ৯টি সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন। কৃষক দল ও জাসাসের কমিটি বিলুপ্ত করায় এ দুটি সংগঠনের কেউ বৈঠকে ছিলেন না। বৈঠকে ৯১ জন উপস্থিত ছিলেন। এদের মধ্যে বক্তব্য দেন ৩০ জন। সিরিজ বৈঠকের প্রথমদিন মঙ্গলবার চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও নির্বাহী কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান ও দ্বিতীয় দিন নির্বাহী কমিটির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব, যুগ্ম-মহাসচিব, সাংগঠনিক ও সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক, সম্পাদক ও সহ-সম্পাদকদের নিয়ে বৈঠক করে হাইকমান্ড।

বৈঠক সূত্র জানায়, আগামী দিনের করণীয় নিয়ে নেতারা তাদের মতামত তুলে ধরেন। বেশিরভাগ নেতাই বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আন্দোলন, আগামী নির্বাচন, দল পুনর্গঠন, চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি, জোটের রাজনীতিসহ নানা বিষয়ে নিজেদের মত দেন। প্রায় সব নেতাই একই সুরে বলেন, শেখ হাসিনার অধীনে কোনো নির্বাচনে যাওয়া উচিত হবে না। আগামী দিনের আন্দোলন ও নির্বাচনে বিএনপিকেই সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে হবে। এ সময় কয়েক নেতা বিগত সময়ে আন্দোলনে রাজপথে উপস্থিতি কম থাকার যৌক্তিকতা তুলে ধরেন। তারা বলেন, আমাদের কর্মী সংখ্যা কমে গেছে। তাই নতুন করে কর্মী বাড়াতে হবে। এ সময় তারেক রহমান বলেন, কর্মী সংখ্যা কম নয়, রাজপথে নামার সংকল্প ও দৃঢ়তার অভাব ছিল।

বৈঠকে অনেকে গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ঐক্যফ্রন্ট গঠনের সমালোচনা করে বলেন, ফ্রন্টের অনেকে আমাদের দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানকে স্বীকৃতি দিতে চায় না। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের নেতৃত্ব মানতে চায় না। এমনকি বিভিন্ন সভায় তারা জিয়াউর রহমানের নাম না নিলেও অন্য একটি দলের নেতার নাম বেশ উচ্চ স্বরে নিয়ে থাকেন। তাই ভবিষ্যতে জোট করার আগে এ বিষয়টি ভাবতে হবে। যারা বিএনপির নেতৃত্বকে মানবে না তাদের সঙ্গে কোনো জোট নয়।

বৈঠকে মূলমঞ্চে বসেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। বৈঠকের সার্বিক সহযোগিতা করেন বিএনপির চেয়ারপারসনের একান্ত সচিব এবিএম আবদুস সাত্তার, সহ-তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক রিয়াজউদ্দিন নসু, সহ-দপ্তর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপু, মুনীর হোসেন ও বেলাল আহমেদ। বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স।

শেষ দিনের বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন- যুবদলের সাইফুল ইসলাম নীরব, সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু, মোরতাজুল করীম বাদুর, নুরুল ইসলাম নয়ন, মামুন হাসান, মোনায়েম মুন্না, তরিকুল ইসলাম বনি, এসএম জাহাঙ্গীর, স্বেচ্ছাসেবক দলের মোস্তাফিজুর রহমান, আবদুল কাদির ভূঁইয়া জুয়েল, গোলাম সারোয়ার, সাইফুল ইসলাম ফিরোজ, ইয়াসীন আলী, সাদরেজ জামান, রফিকুল ইসলাম, নাজমুল হাসান, মহিলা দলের আফরোজা আব্বাস, সুলতানা আহমেদ, নেওয়াজ হালিমা আরলী, শাম্মী আখতার, জেবা খান, হেলেন জেরিন খান, চৌধুরী নায়াবা ইউসুফ, তাঁতী দলের আবুল কালাম আজাদ, মৎস্যজীবী দলের রফিকুল ইসলাম মাহতাব, ছাত্র দলের ফজলুর রহমান খোকন, ইকবাল হোসেন শ্যামল, কাজী রওনুকুল ইসলাম শ্রাবন, জাকিরুল ইসলাম জাকির, আশরাফুল আলম ফকির লিংকন, হাফিজুর রহমান হাফিজ, মামুন খান, পার্থদেব মণ্ডল, মোস্তাফিজুর রহমান, আমিনুর রহমান আমিন, ওলামা দলের শাহ নেসারুল হক, নজরুল ইসলাম তালুকদার প্রমুখ।

বৈঠক শেষে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের করণীয় কী তা নিয়ে নেতারা মতামত দিয়েছেন। রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও দলের সাংগঠনিক বিষয়গুলো নিয়ে কথা হয়েছে। শনিবার দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠক রয়েছে।

এই বৈঠকে আমরা সিদ্ধান্ত নেব, আরও কয়েকটি সভা করব কিনা। কারণ আমাদের এখনো কিছু কার্যনির্বাহী সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় বাকি রয়েছে এবং জেলা পর্যায়ের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকদের নিয়ে বৈঠক করার কথা আছে। পরে পেশাজীবীদের সঙ্গেও আলোচনা করার কথা রয়েছে। নির্বাচন কমিশন গঠন প্রশ্নে বিএনপির অবস্থান নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা এ বিষয় নিয়ে এখন কিছু ভাবছি না।

বৈঠকে অঙ্গসংগঠনের নেতারা বিভিন্ন জেলা-উপজেলা কমিটি গঠনে স্থানীয় বিএনপিসহ দলের শীর্ষ নেতাদের তদবিরকে দোষারোপ করেছেন। প্রভাবশালী নেতাদের পছন্দের লোককে নেতা বানানো না হলেই তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ দেন। কমিটি গঠনে এসব প্রভাব থেকে রক্ষা করতে না পারলে অনেক ত্যাগী ও যোগ্যরা বাদ যেতে পারেন। কয়েক জন কৃষক দলের কমিটি নিয়ে লেজেগোবরে অবস্থা চিত্র তুলে ধরে বলেন, গুরুত্বপূর্ণ এই সংগঠনের কাউন্সিল সম্পন্ন হয়েছে ৬ মাস আগে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কমিটি ঘোষণা করা হয়নি। কমিটি গঠনে এরকম সিদ্ধান্তহীনতা ও সময়ক্ষেপণ দলের জন্য ক্ষতি হচ্ছে। একইভাবে যেসব অঙ্গসংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটি ভেঙে আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছে সেসব কমিটিকে মনিটরিংয়ের আওতায় আনতে না পারলে বছরের পর বছর মেয়াদোত্তীর্ণ অবস্থায় থাকবে।

বৈঠক সূত্র জানায়, ওলামা দলের আহ্বায়ক মাওলানা শাহ নেসারুল হক বলেন, সারা দেশের জনগণ বিএনপির দিকে তাকিয়ে আছে। তাদের ভোটাধিকার, মানবাধিকার পুনরুদ্ধার করতে বিএনপিকেই নেতৃত্ব দিতে হবে। ওই আন্দোলনে তার মতো বয়োজ্যেষ্ঠরাও সাধ্যমতো ভূমিকা পালন করবেন। এর বাইরে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির মতো বিভিন্ন জায়গায় ধর্মীয় নেতৃত্বকে স্থান দেওয়ার আহ্বান করেন তিনি। ওলামা দলকে কোথাও গুরুত্ব দেওয়া হয় না। সবাই ভাবে এদের দায়িত্ব শুধু মোনাজাত করা।

এ প্রসঙ্গে সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু বলেন, ওলামা দলকে শক্তিশালী হতে হবে। রাজধানীর বিভিন্ন মাদ্রাসায় গিয়ে তাদের কর্মী বাড়াতে পারে। সংগঠন শক্তিশালী হলে সবাই আপনাদের ডাকবে।

মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাস বলেন, মহিলা দলকে শক্তিশালী করতে সংগঠনের বাইরে থাকা অনেক নারী নেত্রী, সাবেক এমপিকে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। তাই নতুনভাবে এ সংগঠনকে ঢেলে সাজাতে হবে। শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন বলেন, শ্রমিক দলের মেয়াদ শেষ হয়েছে অনেক আগে। সংগঠনের কেন্দ্রীয় ৩৫ সদস্যের অনেকে মারা গেছেন, অনেকে অসুস্থ। এ অবস্থায় নতুন কমিটি প্রয়োজন রয়েছে।

স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আনু মোহাম্মদ শামীম বলেন, এই সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাওয়া আর ট্রেনের নিচে মাথা দেওয়া একই কথা।

নেতাদের বক্তব্যের জবাবে বিএনপির হাইকমান্ড বলেন, আন্দোলন ও নির্বাচন নিয়ে যারা যে বক্তব্য দিয়েছেন তা পালন করা এবং বাস্তবায়ন করাও তাদের দায়িত্ব। সময়মতো আন্দোলন কর্মসূচি দেওয়া হবে। জ্যেষ্ঠ নেতারাও এবার মাঠে থাকবে। যারা রাজপথে থাকবে না তাদের বিরুদ্ধে কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। রাজপথে থাকা নেতাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে মূল্যায়ন করা হবে। সবাই যদি নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করেন তাহলে অবশ্যই আমরা সফল হব।

বৈঠকে যুবদলের এক নেতা বলেন, ইউনিট কমিটি কেন বছরের পর বছর পূর্ণাঙ্গ হয় না? এ প্রসঙ্গ টেনে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের এক নেতা বলেন, আপনারা কোনো কিছু হলেই ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের নাম ভাঙান। কেন? ভুল করেন আপনারা নাম ভাঙান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের। গত দুই বছর ধরে আপনাদের পেছনে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সময় দিচ্ছেন। যার কারণে তিনি আমাদের সঙ্গেও কথা বলার সময় বের করতে পারেন না।

মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাস ও সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আহমেদ দুই গ্রুপে বিভক্ত। তাদের উদ্দেশ্যে এক নেতা বলেন, আপনারা কী করবেন, ভেবে দেখেন। একত্রে কাজ করবেন কিনা দেখেন। আমরা এবার কর্মসূচি দেব। যদি রাজপথে থাকতে না পারেন, শারীরিক কারণ হোক অথবা অন্য কোনো কারণ হোক সরে দাঁড়ান।

বিএনপির রুদ্ধদ্বার বৈঠকের তৃতীয় দিন

রাজপথে না থাকলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা

অঙ্গসংগঠনের কমিটি গঠনে প্রভাবশালীদের তদবির বন্ধের পরামর্শ * নেতাকর্মীরা মার খেলেও কেন্দ্রের অনেককে পাওয়া যায় না
 যুগান্তর প্রতিবেদন 
১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বিএনপির সিরিজ বৈঠকের শেষদিনে দলের অঙ্গসংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে হাইকমান্ডের বৈঠকে গুরুত্ব পায় নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে আন্দোলন। সেই আন্দোলনের চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছাতে দলকে শক্তিশালী করার ওপর জোর দেন নেতারা। বিশেষ করে অঙ্গসংগঠনগুলোর নেতৃত্ব আন্দোলনমুখী করার পরামর্শ দেন তারা। যাতে সামনের দিনে রাজপথে তারা ‘ভ্যানগার্ড’র ভূমিকা পালন করতে পারে। দৃঢ়তা ও সংকল্প নিয়ে নামতে হবে রাজপথে। সভায় নেতারা জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের সমালোচনা করেন। 

আগামী দিনের করণীয় চূড়ান্তে কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে ৩ দিনের সিরিজ বৈঠক শেষ হয়েছে বৃহস্পতিবার। বৈঠকে বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে অঙ্গসংগঠনের নেতাদের ভূমিকার সমালোচনা করেন কেউ কেউ। আবার অনেকে নিজেদের নানা সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরেন। কর্মী সংকট রয়েছে জানিয়ে তারা বলেন, আন্দোলন-সংগ্রামে ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকর্মীরা রাজপথে মার খেলেও কেন্দ্রীয় অনেক নেতাকে পাশে পাওয়া যায় না। এ অবস্থার পরিবর্তন করতে হবে। অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের পাশে হাইকমান্ডকে অবশ্যই প্রধান ভূমিকা হিসাবে থাকতে হবে। নেতাদের পক্ষ থেকে এমন বক্তব্যের পর নীতিনির্ধারকরা জানান, এবারের আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে থাকতে না পারলে আগেই দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান। যে পারবে তাকে সুযোগ করে দেন। তবে কাউকেই দল থেকে বাদ দেওয়া হবে না। দলের সঙ্গেই রাখা হবে, কোনো দায়িত্বে নয়। রাজপথে না থাকলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা অবশ্যই নেওয়া হবে। 

বিকাল ৪টায় গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে বৈঠক শুরু হয়ে চলে প্রায় সাড়ে ৪ ঘণ্টা। এতে সভাপতিত্ব করেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি যোগ দেন তিনি। বিএনপির ১১টি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন থাকলেও তৃতীয় দিনে ৯টি সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন। কৃষক দল ও জাসাসের কমিটি বিলুপ্ত করায় এ দুটি সংগঠনের কেউ বৈঠকে ছিলেন না। বৈঠকে ৯১ জন উপস্থিত ছিলেন। এদের মধ্যে বক্তব্য দেন ৩০ জন। সিরিজ বৈঠকের প্রথমদিন মঙ্গলবার চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও নির্বাহী কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান ও দ্বিতীয় দিন নির্বাহী কমিটির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব, যুগ্ম-মহাসচিব, সাংগঠনিক ও সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক, সম্পাদক ও সহ-সম্পাদকদের নিয়ে বৈঠক করে হাইকমান্ড।

বৈঠক সূত্র জানায়, আগামী দিনের করণীয় নিয়ে নেতারা তাদের মতামত তুলে ধরেন। বেশিরভাগ নেতাই বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আন্দোলন, আগামী নির্বাচন, দল পুনর্গঠন, চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি, জোটের রাজনীতিসহ নানা বিষয়ে নিজেদের মত দেন। প্রায় সব নেতাই একই সুরে বলেন, শেখ হাসিনার অধীনে কোনো নির্বাচনে যাওয়া উচিত হবে না। আগামী দিনের আন্দোলন ও নির্বাচনে বিএনপিকেই সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে হবে। এ সময় কয়েক নেতা বিগত সময়ে আন্দোলনে রাজপথে উপস্থিতি কম থাকার যৌক্তিকতা তুলে ধরেন। তারা বলেন, আমাদের কর্মী সংখ্যা কমে গেছে। তাই নতুন করে কর্মী বাড়াতে হবে। এ সময় তারেক রহমান বলেন, কর্মী সংখ্যা কম নয়, রাজপথে নামার সংকল্প ও দৃঢ়তার অভাব ছিল।  

বৈঠকে অনেকে গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ঐক্যফ্রন্ট গঠনের সমালোচনা করে বলেন, ফ্রন্টের অনেকে আমাদের দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানকে স্বীকৃতি দিতে চায় না। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের নেতৃত্ব মানতে চায় না। এমনকি বিভিন্ন সভায় তারা জিয়াউর রহমানের নাম না নিলেও অন্য একটি দলের নেতার নাম বেশ উচ্চ স্বরে নিয়ে থাকেন। তাই ভবিষ্যতে জোট করার আগে এ বিষয়টি ভাবতে হবে। যারা বিএনপির নেতৃত্বকে মানবে না তাদের সঙ্গে কোনো জোট নয়। 

বৈঠকে মূলমঞ্চে বসেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। বৈঠকের সার্বিক সহযোগিতা করেন বিএনপির চেয়ারপারসনের একান্ত সচিব এবিএম আবদুস সাত্তার, সহ-তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক রিয়াজউদ্দিন নসু, সহ-দপ্তর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপু, মুনীর হোসেন ও বেলাল আহমেদ। বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স। 

শেষ দিনের বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন- যুবদলের সাইফুল ইসলাম নীরব, সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু, মোরতাজুল করীম বাদুর, নুরুল ইসলাম নয়ন, মামুন হাসান, মোনায়েম মুন্না, তরিকুল ইসলাম বনি, এসএম জাহাঙ্গীর, স্বেচ্ছাসেবক দলের মোস্তাফিজুর রহমান, আবদুল কাদির ভূঁইয়া জুয়েল, গোলাম সারোয়ার, সাইফুল ইসলাম ফিরোজ, ইয়াসীন আলী, সাদরেজ জামান, রফিকুল ইসলাম, নাজমুল হাসান, মহিলা দলের আফরোজা আব্বাস, সুলতানা আহমেদ, নেওয়াজ হালিমা আরলী, শাম্মী আখতার, জেবা খান, হেলেন জেরিন খান, চৌধুরী নায়াবা ইউসুফ, তাঁতী দলের আবুল কালাম আজাদ, মৎস্যজীবী দলের রফিকুল ইসলাম মাহতাব, ছাত্র দলের ফজলুর রহমান খোকন, ইকবাল হোসেন শ্যামল, কাজী রওনুকুল ইসলাম শ্রাবন, জাকিরুল ইসলাম জাকির, আশরাফুল আলম ফকির লিংকন, হাফিজুর রহমান হাফিজ, মামুন খান, পার্থদেব মণ্ডল, মোস্তাফিজুর রহমান, আমিনুর রহমান আমিন, ওলামা দলের শাহ নেসারুল হক, নজরুল ইসলাম তালুকদার প্রমুখ। 

বৈঠক শেষে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের করণীয় কী তা নিয়ে নেতারা মতামত দিয়েছেন। রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও দলের সাংগঠনিক বিষয়গুলো নিয়ে কথা হয়েছে। শনিবার দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠক রয়েছে।

এই বৈঠকে আমরা সিদ্ধান্ত নেব, আরও কয়েকটি সভা করব কিনা। কারণ আমাদের এখনো কিছু কার্যনির্বাহী সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় বাকি রয়েছে এবং জেলা পর্যায়ের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকদের নিয়ে বৈঠক করার কথা আছে। পরে পেশাজীবীদের সঙ্গেও আলোচনা করার কথা রয়েছে। নির্বাচন কমিশন গঠন প্রশ্নে বিএনপির অবস্থান নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা এ বিষয় নিয়ে এখন কিছু ভাবছি না। 

বৈঠকে অঙ্গসংগঠনের নেতারা বিভিন্ন জেলা-উপজেলা কমিটি গঠনে স্থানীয় বিএনপিসহ দলের শীর্ষ নেতাদের তদবিরকে দোষারোপ করেছেন। প্রভাবশালী নেতাদের পছন্দের লোককে নেতা বানানো না হলেই তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ দেন। কমিটি গঠনে এসব প্রভাব থেকে রক্ষা করতে না পারলে অনেক ত্যাগী ও যোগ্যরা বাদ যেতে পারেন। কয়েক জন কৃষক দলের কমিটি নিয়ে লেজেগোবরে অবস্থা চিত্র তুলে ধরে বলেন, গুরুত্বপূর্ণ এই সংগঠনের কাউন্সিল সম্পন্ন হয়েছে ৬ মাস আগে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কমিটি ঘোষণা করা হয়নি। কমিটি গঠনে এরকম সিদ্ধান্তহীনতা ও সময়ক্ষেপণ দলের জন্য ক্ষতি হচ্ছে। একইভাবে যেসব অঙ্গসংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটি ভেঙে আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছে সেসব কমিটিকে মনিটরিংয়ের আওতায় আনতে না পারলে বছরের পর বছর মেয়াদোত্তীর্ণ অবস্থায় থাকবে। 

বৈঠক সূত্র জানায়, ওলামা দলের আহ্বায়ক মাওলানা শাহ নেসারুল হক বলেন, সারা দেশের জনগণ বিএনপির দিকে তাকিয়ে আছে। তাদের ভোটাধিকার, মানবাধিকার পুনরুদ্ধার করতে বিএনপিকেই নেতৃত্ব দিতে হবে। ওই আন্দোলনে তার মতো বয়োজ্যেষ্ঠরাও সাধ্যমতো ভূমিকা পালন করবেন। এর বাইরে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির মতো বিভিন্ন জায়গায় ধর্মীয় নেতৃত্বকে স্থান দেওয়ার আহ্বান করেন তিনি। ওলামা দলকে কোথাও গুরুত্ব দেওয়া হয় না। সবাই ভাবে এদের দায়িত্ব শুধু মোনাজাত করা। 

এ প্রসঙ্গে সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু বলেন, ওলামা দলকে শক্তিশালী হতে হবে। রাজধানীর বিভিন্ন মাদ্রাসায় গিয়ে তাদের কর্মী বাড়াতে পারে। সংগঠন শক্তিশালী হলে সবাই আপনাদের ডাকবে। 

মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাস বলেন, মহিলা দলকে শক্তিশালী করতে সংগঠনের বাইরে থাকা অনেক নারী নেত্রী, সাবেক এমপিকে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। তাই নতুনভাবে এ সংগঠনকে ঢেলে সাজাতে হবে। শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন বলেন, শ্রমিক দলের মেয়াদ শেষ হয়েছে অনেক আগে। সংগঠনের কেন্দ্রীয় ৩৫ সদস্যের অনেকে মারা গেছেন, অনেকে অসুস্থ। এ অবস্থায় নতুন কমিটি প্রয়োজন রয়েছে। 

স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আনু মোহাম্মদ শামীম বলেন, এই সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাওয়া আর ট্রেনের নিচে মাথা দেওয়া একই কথা। 

নেতাদের বক্তব্যের জবাবে বিএনপির হাইকমান্ড বলেন, আন্দোলন ও নির্বাচন নিয়ে যারা যে বক্তব্য দিয়েছেন তা পালন করা এবং বাস্তবায়ন করাও তাদের দায়িত্ব। সময়মতো আন্দোলন কর্মসূচি দেওয়া হবে। জ্যেষ্ঠ নেতারাও এবার মাঠে থাকবে। যারা রাজপথে থাকবে না তাদের বিরুদ্ধে কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। রাজপথে থাকা নেতাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে মূল্যায়ন করা হবে। সবাই যদি নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করেন তাহলে অবশ্যই আমরা সফল হব। 

বৈঠকে যুবদলের এক নেতা বলেন, ইউনিট কমিটি কেন বছরের পর বছর পূর্ণাঙ্গ হয় না? এ প্রসঙ্গ টেনে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের এক নেতা বলেন, আপনারা কোনো কিছু হলেই ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের নাম ভাঙান। কেন? ভুল করেন আপনারা নাম ভাঙান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের। গত দুই বছর ধরে আপনাদের পেছনে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সময় দিচ্ছেন। যার কারণে তিনি আমাদের সঙ্গেও কথা বলার সময় বের করতে পারেন না।

মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাস ও সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আহমেদ দুই গ্রুপে বিভক্ত। তাদের উদ্দেশ্যে এক নেতা বলেন, আপনারা কী করবেন, ভেবে দেখেন। একত্রে কাজ করবেন কিনা দেখেন। আমরা এবার কর্মসূচি দেব। যদি রাজপথে থাকতে না পারেন, শারীরিক কারণ হোক অথবা অন্য কোনো কারণ হোক সরে দাঁড়ান।
 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন