বিএনপির দাবি খালেদা জিয়ার মুক্তি ও নিরপেক্ষ সরকার

কঠোর আন্দোলনের প্রস্তুতি

চলমান আন্দোলনে দাবি আদায় করা যাবে না- মন্তব্য ৭৮ সাংগঠনিক জেলা নেতাদের * জোটের শরিক, অন্য রাজনৈতিক দল ও পেশাজীবীদের সম্পৃক্ত করে ঈদের পর মাঠে নামার পরিকল্পনা

প্রকাশ : ০৯ মে ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  তারিকুল ইসলাম

খালেদা জিয়ার মুক্তি ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন- এ দুই ইস্যুতে ঈদের পর কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলার প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি। ৭৮টি সাংগঠনিক জেলা শাখার নেতাদের মতামতের ভিত্তিতে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি।

তৃণমূল নেতারা প্রায় অভিন্ন অভিমত দিয়ে বলেছেন, বর্তমানে যে ‘স্টাইলে’ আন্দোলন হচ্ছে, তাতে সরকারের কাছ থেকে কোনো দাবিই আদায় করা যাবে না। উল্টো সব স্তরের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেয়াসহ নানাভাবে হেনস্তা করা হচ্ছে। সম্প্রতি বিভিন্ন জেলা নেতাদের মতামত ও সুপারিশ পর্যালোচনা

করেছেন দলটির হাইকমান্ড। এরপরই সিদ্ধান্ত হয়, রোজার ঈদের পর দাবি আদায়ে সর্বশক্তি নিয়ে আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। বিএনপির নীতিনীর্ধারণী সূত্রে জানা গেছে এসব তথ্য।

সূত্র আরও জানায়, এ আন্দোলন সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা ও সফল করতে এখন থেকেই নানা পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে দলটির শীর্ষ নীতিনির্ধারকরা। তাদের মতে, এ আন্দোলনে শুধু বিএনপিই নয়, ২০ দলীয় শরিকদেরও যুক্ত করা হবে। পাশাপাশি সরকারবিরোধী অন্য রাজনৈতিক দল ও পেশাজীবীদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হবে। যাতে সাধারণ মানুষ সরকারবিরোধী আন্দোলনে সম্পৃক্ত হতে পারে।

এ লক্ষ্যে প্রণয়ন করা হচ্ছে নানা কৌশল। এরই অংশ হিসেবে রোজার মাসকে ‘সাংগঠনিক মাস’ হিসেবে ঘোষণা করে সব পর্যায়ের সংগঠনকে শক্তিশালী করতে নানা তৎপরতা চালানো হবে। পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যাংক জালিয়াতিসহ সরকারের নানা দুর্নীতি এবং জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে রোজার মাসজুড়ে দেশব্যাপী গণসংযোগ চালাবে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান যুগান্তরকে বলেন, দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশেই বিএনপি শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক আন্দোলন করছে। এর অর্থ এই নয় সরকার যা খুশি তাই করবে, আর আমরা সব সহ্য করব। আমাদের তৃণমূল থেকে চাপ আসছে। তৃণমূলের নেতারা বলছেন, শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে না। বরং কর্মসূচিতে বাধা দেয়া হচ্ছে, নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করছে, মিথ্যা মামলা দেয়া হচ্ছে। তাই অন্য কিছু করা যায় কিনা। আন্দোলন কর্মসূচির ব্যাপারে দল ও জোট সিদ্ধান্ত নেবে কি করা যায়।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মো. শাহজাহান যুগান্তরকে বলেন, মিথ্যা মামলায় বিএনপি চেয়ারপাসনকে কারাগারে রেখেছে সরকার। তার মুক্তিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করছে বিএনপি। পাশাপাশি আইনি লড়াইও চলছে। খালেদা জিয়ার মুক্তিতে যদি আইনিভাবে অন্তরায় সৃষ্টি করা হয় তাহলে রাজনৈতিকভাবেই তা মোকাবেলা করবে বিএনপি। তিনি আরও বলেন, দেশের জনগণ যেখানে একটি অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য অপেক্ষা করছে, সেখানে সরকার আবারও ভোট ছাড়া ক্ষমতায় আসতে চায়। বিএনপি শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সব ধরনের দাবি আদায়ের পক্ষে রয়েছে। কিন্তু যেভাবে বিরোধী দলকে হেনস্তা করা হচ্ছে, তাতে তাদের আন্দোলন পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনা ছাড়া উপায় থাকবে না।

দলীয় সূত্র জানায়, সম্প্রতি দলের করণীয় বিষয়ে তৃণমূল নেতাদের মতামত নেয়া হয়। ৭৮টি জেলা শাখার নেতারা তাদের মতামত দেন। যেখানে প্রায় সব নেতাই চলমান আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায় করা যাবে না বলে মত দেন। একই সঙ্গে তারা জানান, কেন্দ্র থেকে যে কোনো আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা হলে তা সফলে তৃণমূল প্রস্তুত আছে। তবে এবার আগে ঢাকা মহানগরকে প্রস্তুত রাখার পরামর্শও দেন তারা। এরপর বিএনপি শুক্রবার চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয়ে যৌথ সভা করে। সেখানেও অধিকাংশ কেন্দ্রীয় নেতা আন্দোলন কর্মসূচির পরিবর্তনের কথা বলেন।

বিএনপির বরিশাল জেলা উত্তরের সাধারণ সম্পাদক আকন কুদ্দুসুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, অগণতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক উপায়ে দাবি আদায় করা যায় না। তৃণমূলের দাবি সর্বাত্মক আন্দোলন করতে হবে। আমরা তৃণমূল প্রস্তুত আছি, যা কেন্দ্রকে ইতিমধ্যে জানিয়েছি।

মুন্সীগঞ্জ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কামরুজ্জামান রতন বলেন, যেখানে দেশের প্রশাসন, বিচার ব্যবস্থাসহ সবকিছু নিয়ন্ত্রিত এবং মানুষ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়। সেখানে মানুষ রাজপথে আন্দোলন করবেই। কেন্দ্র থেকে যে কোনো কর্মসূচি দিলে আমরা তা সফলে প্রস্তুত আছি।

সূত্র জানায়, তৃণমূল ও কেন্দ্রীয় নেতাদের মতামত নেয়ার পর স্থায়ী কমিটির সদস্যরা কয়েক দফা বৈঠকও করেছেন। সেখানে চলমান শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের ধরন পরিবর্তনের বিষয়ে আলোচনা হয়। তৃণমূল নেতাদের মতামতের সঙ্গে সিনিয়র নেতারাও একমত পোষণ করেন কঠোর কর্মসূচি ছাড়া দাবি আদায় করা যাবে না। এজন্য খালেদা জিয়ার মুক্তি ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনের দাবিতে ঈদের পর কঠোর আন্দোলনের বিষয়ে প্রাথমিকভাবে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। আন্দোলনে সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করার জন্য বিভিন্ন ইস্যু দাবির মধ্যে আনা হবে। এজন্য রমজানকে সাংগঠনিক মাস হিসেবে ঘোষণা করে দাবির পক্ষে ঢাকা মহানগরসহ সব সাংগঠনিক জেলায় জনসংযোগ চালাবে বিএনপি। জনসংযোগে চালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের আকাশছোঁয়া মূল্য, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দফায় দফায় দাম বৃদ্ধি, উন্নয়নের নামে দুর্নীতি ও লুটপাটসহ বিভিন্ন ইস্যুও সম্পৃক্ত করা হবে।

সূত্র আরও জানায়, আন্দোলন কর্মসূচি নিয়ে তৃণমূল ও কেন্দ্রীয় নেতাদের মতামত দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে জানিয়েছেন স্থায়ী কমিটির সদস্যরা। কঠোর আন্দোলনের বিষয়ে তৃণমূলের মতামতের ব্যাপারে দলের হাইকমান্ডও ইতিবাচক। তাই ঈদের পরে কঠোর কর্মসূচি দেয়া হবে বলে দলের একাধিক নীতিনিধারণী পর্যায়ের নেতারা যুগান্তরকে জানিয়েছেন। তবে কঠোর কর্মসূচি কি হবে তা কৌশলগত কারণে এখনই প্রকাশ করতে চাচ্ছেন না তারা।

বিএনপি যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল যুগান্তরকে বলেন, যেখানে অনিয়ম, জুলুম-নির্যাতন বাসা বেঁধে বসে আছে, সেখানে শান্তিপূর্ণ অঙ্গীকারে কাজ হয় না। তখন এর বাইরেও কাজ থাকে। সচিবালয় ঘেরাও, জেলার পুলিশ প্রধানদের অফিস ঘেরাওয়ের মতো কর্মসূচি দেয়ার ব্যাপারে প্রস্তাব এসেছে। কেউ কেউ হরতাল দেয়ার ব্যাপারেও প্রস্তাব করেছেন। সরকার বাধ্য করলে একদিন বা আংশিক কর্মসূচি হবে না, টানা কর্মসূচি দেয়া হবে।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় ৮ ফেব্র“য়ারি খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডাদেশ দিয়ে রায় দেন আদালত। এর পর থেকে দলের চেয়ারপারসনের মুক্তির দাবিতে তিন মাস ধরে মানববন্ধন, অবস্থান, বিক্ষোভ, জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপিসহ বিভিন্ন শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করে আসছে দলটি। তবে ঢাকায় একটি সমাবেশ করতে কয়েক দফা চেষ্টা করেও পুলিশের অনুমতি পায়নি দলটি। ঢাকার বাইরে যেসব সমাবেশ হচ্ছে, সেটিও পছন্দের স্থানে করতে পারছে না। গ্রেফতার আতঙ্কে অত্যন্ত সীমিত পরিসরে সমাবেশগুলো হচ্ছে।

সূত্র জানায়, দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং নিরপেক্ষ সরকারের অধীন জাতীয় নির্বাচনের দাবি আদায়ের ঈদের পরে কঠোর কর্মসূচি দেবে বিএনপি। এজন্য জোটের শরিক জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যদের সঙ্গেও আলোচনা চলছে। আন্দোলনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে রমজান মাসকে কেন্দ্র করে দলকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করার উদ্যোগও নেয়া হয়েছে। এজন্য ৭৮টি জেলা শাখার মধ্যে যেখানে পূর্ণাঙ্গ কমিটি নেই তার একটি তালিকা করা হবে। আবার কোনো জেলার কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে এবং আহ্বায়ক কমিটি আছে কিনা তাও একই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এই তালিকা ধরে যেসব জেলা কমিটির মেয়াদ উত্তীর্ণ, সেখানে নতুন কমিটি এবং সব জেলায় পূর্ণাঙ্গ কমিটি করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ ছাড়া ইতিমধ্যে ঢাকা মহানগরীকে ঢেলে সাজানোর জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। রমজানের মাসের মধ্যেই ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের পূর্ণাঙ্গ কমিটি এবং ওয়ার্ড ও থানাগুলোতে নতুন কমিটি করার কথা বলা হয়েছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান বলেন, বিএনপির ঘুরে দাঁড়ানোর সময় এসেছে। কেউ যদি মনে করে দলীয় চেয়ারপারসনকে কারাগারে পাঠিয়ে বিএনপির মতো একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলকে ভেঙে ফেলা যাবে, সেটা ভুল ধারণা। তিনি বলেন, অতীতে চেষ্টা করা হয়েছিল কিন্তু ষড়যন্ত্রকারীরা সফল হয়নি। দল আরও শক্তভাবে ঘুরে দাঁড়াবে। সে অনুযায়ী পুরোদমে হোমওয়ার্ক চলছে। নেতারাও কেউ বসে নেই।