কৌশল নির্ধারণে ব্যস্ত দুদল
jugantor
আগামী সংসদ নির্বাচন
কৌশল নির্ধারণে ব্যস্ত দুদল

  হাসিবুল হাসান ও তারিকুল ইসলাম  

২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নানা কৌশল নির্ধারণে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নীতিনির্ধারকরা। সংগঠনকে ঢেলে সাজানো, অভ্যন্তরীণ বিরোধ নিরসন, ইশতেহার তৈরিসহ ছয় বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজে নেমে পড়েছে ক্ষমতাসীনরা। নজর রাখছে জোট-মহাজোটের মেরুকরণেও। অন্যদিকে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার ও নির্বাচন কমিশন গঠনসহ একগুচ্ছ দাবিতে আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি। এরই মধ্যে দুই দফা সিরিজ বৈঠক করে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের মতামত নেওয়া হয়েছে। শিগগিরই আন্দোলনের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে মাঠে নামবে দলটি

তৃণমূলে বিরোধ মেটাতে মাঠে নেতারা

ছয় ইস্যুতে মনোযোগী আওয়ামী লীগ

হাসিবুল হাসান

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আগাম প্রস্তুতি শুরু করেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। এক্ষেত্রে ছয় বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়ে ইতোমধ্যে কাজে নেমে পড়েছে দলটি। বিষয়গুলো হচ্ছে-সম্মেলনের মাধ্যমে তৃণমূল পর্যন্ত সংগঠনকে ঢেলে সাজানো, অভ্যন্তরীণ বিরোধ নিরসন, ইশতেহার তৈরি, বিএনপি কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ, জোটের মেরুকরণ ও দলীয় প্রার্থী বাছাই। দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতার সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে এসব তথ্য। তারা আরও জানান, আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশের পরই দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা এ নিয়ে কাজ শুরু

করেছেন। নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপির আন্দোলন কর্মসূচিসহ সার্বিক বিষয় কঠোর পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। নজর রাখা হচ্ছে জোট-মহাজোটের মেরুকরণও। আনুষ্ঠানিকভাবে না হলেও দলীয় প্রার্থী বাছাইয়ের কাজও এগিয়ে রাখা হচ্ছে। তথ্য নেওয়া হচ্ছে মনোনয়নপ্রত্যাশীর। পাশাপাশি নির্বাচন কমিশন গঠনসহ অন্যান্য বিষয়েও কঠোর দৃষ্টি রাখছেন তারা।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে বলেন, নির্বাচনকে সামনে রেখে আমরা প্রস্তুতি শুরু করেছি। যেখানে মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি আছে সম্মেলনের মাধ্যমে সেগুলো ঢেলে সাজানোর কাজ করছি। দলের অভ্যন্তরে কোনো সমস্যা থাকলে তা সমাধানের চেষ্টা চলছে। আমরা চাই-তৃণমূল পর্যন্ত অর্থাৎ একেবারে ইউনিট পর্যন্ত সংগঠনকে শক্তিশালী করে গড়ে তুলতে। এটা করতে পারলে নির্বাচনের সবচেয়ে বড় প্রস্তুতিটা হয়ে যাবে।

ইশতেহার তৈরির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটার জন্য আমাদের দলের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটা কমিটি করে দেবেন। তারা দেশের বিভিন্ন খাতের বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে খসড়া তৈরি করবেন। বিএনপির আন্দোলন মোকাবিলা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আন্দোলন করতে হলে জনসম্পৃক্ততা দরকার হয়। কিন্তু বিএনপির তা নেই। তবে আন্দোলনের নামে বিএনপিকে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও অরাজকতা সৃষ্টি করতে দেওয়া হবে না বলেও জানান এই নীতিনির্ধারক।

তৃণমূলকে ঢেলে সাজানো : জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ইতোমধ্যেই তৃণমূল গোছানোর কাজ শুরু করেছে আওয়ামী লীগ। করোনার কারণে কিছুদিন এই কাজে গতি কমে গেলেও চলতি মাসের শুরু থেকে পুরোদমে কাজ শুরু হয়েছে। সাংগঠনিক নেতারা তৃণমূল নিয়মিত সফর করছেন। চলছে বর্ধিত সভাও। চলতি সপ্তাহেও রাজবাড়ীসহ কয়েকটি জেলা ও উপজেলায় বর্ধিত সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন। আগামী সপ্তাহেও কয়েকটি জেলায় বর্ধিত সভার তারিখ চূড়ান্ত করা হয়েছে।

এছাড়া চলছে তৃণমূলের সম্মেলনের আয়োজনের কাজ। পাবনা, নাটোর, রাজবাড়ী জেলার সম্মেলনের তারিখ চূড়ান্ত করা হয়েছে। সম্মেলনের তারিখ চূড়ান্ত না হলেও আলোচনা চলছে আরও কয়েকটি জেলা নিয়ে। পাশাপাশি চলছে উপজেলা-থানা সম্মেলনের কাজও। সলঙ্গা, এনায়েতপুরসহ কয়েকটি থানা-উপজেলার সম্মেলন এ মাসে অনুষ্ঠিত হবে। আওয়ামী লীগের বিভাগীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা বলছেন, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই সারা দেশের মেয়াদোত্তীর্ণ সব জেলা-উপজেলা সম্মেলনের কাজ শেষে করতে চান তারা। এছাড়া নির্বাচনের আগে মেয়াদোত্তীর্ণ সহযোগী ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোকে ঢেলে সাজানো হবে।

অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব নিরসন : খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তৃণমূলে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ বিরোধ চরম আকার ধারণ করেছে। দ্বন্দ্বে জর্জরিত প্রায় প্রতিটি জেলা-উপজেলা। কোথাও জেলার সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক বিরোধ। কোথাও বিরোধ স্থানীয় এমপির সঙ্গে আওয়ামী লীগের। রাজনৈতিক পদ-পদবি ছাড়াও স্থানীয়ভাবে প্রভাব বিস্তার এবং দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকায় টেন্ডার, দখল, বালুমহাল নিয়ন্ত্রণসহ নানা কারণেই এই বিরোধ রূপ নিচ্ছে সংঘর্ষে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য মতে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আওয়ামী লীগের মধ্যে ৫৮টি অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় আটজন নিহত ও ৮০২ জন আহত হয়েছেন। নির্বাচনে আগে এসব সমস্যা সমাধান করতে চায় আওয়ামী লীগ। দলটির আট সাংগঠনিক টিমের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা নিজেদের বিরোধ মেটাতে মাঠে নেমেছেন। বিরোধপূর্ণ জেলার নেতাদের ডেকে সমস্যা সমাধানের নির্দেশ দিচ্ছেন। করছেন বর্থিত সভা। নির্দেশমতো দ্রুত বিরোধ নিরসন না করলে হাইকমান্ডের কাছে পরবর্তী করণীয় প্রসঙ্গে জানতে চাওয়া হবে।

দলটির নেতারা বলছেন, দলীয় সভাপতির নির্দেশে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই সব অভ্যন্তরীণ সমস্যা মিটিয়ে তৃণমূল পর্যন্ত দলকে ঐক্যবদ্ধ এবং আরও শক্তিশালী করতে তারা মাঠে নেমেছেন।

ইশতেহার তৈরি : দলীয় সভাপতির নির্দেশে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য ইশতেহার তৈরির প্রক্রিয়াও শুরু করেছে দলটির নীতিনির্ধারকরা। দলের বিভাগীয় সম্পাদকরা সভা-সেমিনারের মাধ্যমে এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়ার কাজও শুরু করেছেন। শিক্ষা দিবস উপলক্ষ্যে ১৭ সেপ্টেম্বর বঙ্গবন্ধু এভিনিউর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ‘শিক্ষা : ২০৪১ সালের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের বাস্তবিক কৌশল’ শীর্ষক সেমিনারের আয়োজন করে দলের শিক্ষা ও মানবসম্পদবিষয়ক উপকমিটি।

শুক্রবার ‘ঢাকা শহরের জলাবদ্ধতা : সমস্যা ও প্রতিকার’ শীর্ষক সেমিনারের আয়োজন করেছিল দলটির বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপকমিটি। নির্বাচনের আগে দলীয় সভাপতি ইশতেহার প্রস্তুতি কমিটি গঠন করে দেবেন। উপকমিটিগুলো সেই কমিটির কাছে তাদের এসব সেমিনারের মধ্য দিয়ে উঠে আসা প্রস্তাবনা সংযুক্তির জন্য দেবেন।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক প্রকৌশলী আবদুস সবুর যুগান্তরকে বলেন, আমরা অবশ্যই আমাদের কিছু প্রস্তাবনা দলের কাছে দেব। দল যদি মনে করে সেটা বার্নিং ইস্যু তাহলে তা গ্রহণ করবে। নির্বাহী কমিটি গ্রহণ করলে আওয়ামী লীগের আগামী দিনের কর্মকাণ্ডে এগুলো যুক্ত হবে।

পর্যবেক্ষণে বিএনপি : নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপির যাবতীয় কর্মকাণ্ড নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে ক্ষমতাসীনরা। বিশেষ করে বিএনপির চলমান ধারাবাহিক বৈঠক ও সেখানে গৃহীত সিদ্ধান্ত বিশ্লেষণ করছেন আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্টরা। নির্বাচনের আগে মাঠ গরম করে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না।

এ ক্ষেত্রে আগের মতোই কঠোর অবস্থান অব্যাহত রাখবে দলটি। ফলে এখন থেকেই সব দিক দিয়ে প্রস্তুতি নিয়ে রাখা হচ্ছে। তৃণমূলসহ সব পর্যায়ের নেতাদের এমন বার্তাও দেওয়া হয়েছে। গুজব-অপপ্রচারের জবাব দিতে প্রস্তুত করা হচ্ছে লক্ষাধিক অনলাইন এক্টিভিস্ট। কেউ যেন অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে না পারে, এজন্য কঠোর নজদারিতে থাকবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। সরকার ও দলের বিরুদ্ধে অপ্রপচারের বিরুদ্ধে তথ্যপ্রমাণসহ জবাব দিতেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে নেতাদের।

জোটের মেরুকরণ : এদিকে নির্বাচনকে সামনে রেখে জোট-মহাজোটে শুরু হয়েছে নতুন আলোচনা। একাদশ জাতীয় নির্বাচনের পর থেকেই আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটে দূরত্ব বেড়েছে। তবে আওয়ামী লীগ এখনই জোটের কোনো দলকে দূরে সরাতে চায় না। বরং আলোচনা করে নিজেদের মধ্যে দূরত্ব কমিয়ে আনার পক্ষেই জোর দিচ্ছেন জোট নেতারা।

অন্যদিকে কয়েকটি দলের আগ্রহ রয়েছে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটে যুক্ত হওয়ার। যদিও এখনো এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি ক্ষমতাসীনরা। তবে নির্বাচনের আগে পরিস্থিতি বিবেচনায় যে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। পাশাপাশি বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট বা বিরোধী অন্য সব জোটের বিষয়েও সার্বিক খোঁজখবর রাখছে আওয়ামী লীগ।

দলীয় প্রার্থী বাছাই : দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ শুরু না হলেও ভেতরে ভেতরে এ প্রক্রিয়া চলছে। আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিভিন্ন মাধ্যমে খোঁজখবর রাখছেন বর্তমান এমপি ও মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সম্পর্কে। দল ও দলের বাইরেও বিভিন্ন মাধ্যমে নিয়মিত জরিপ করাচ্ছেন দলের হাইকমান্ড। অনেক সমীকরণ মিলিয়ে দলের মনোনয়ন দিতে হয়। আওয়ামী লীগের সবশেষ দুটি বৈঠকে আগামী নির্বাচনে দলের প্রার্থী বাছাইয়ের বিষয়ে কিছু ইঙ্গিত দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

একাদশ জাতীয় সংসদ উপনির্বাচনগুলোতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রয়াত এমপির পরিবারের সদস্যদের মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। অর্থাৎ শুধু পারিবারিক ঐতিহ্য থাকলেই যে মনোনয়ন পাওয়া যেত, সেটা থেকে অনেকটা সরে এসেছে দলটি। পারিবারিক ঐতিহ্যের পাশাপাশি ত্যাগী, দলের প্রতি নিবেদিত এবং স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয়তার বিষয়টিও বিবেচিত হবে।

সিরিজ বৈঠকে অনুপস্থিত নেতাদের শোকজ

আন্দোলনের পরিকল্পনায় তোড়জোড় বিএনপির

তারিকুল ইসলাম

নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারসহ একগুচ্ছ দাবি নিয়ে এবার এককভাবে মাঠে নামতে চায় বিএনপি। আন্দোলনের বিকল্প নেই-এমন বার্তা এসেছে দলটির দুদফা সিরিজ বৈঠক থেকে। বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের এই অভিন্ন মতামতকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে আন্দোলনের পরিকল্পনা প্রণয়নে দফায় দফায় বৈঠক করছেন নীতিনির্ধারকরা। বিরোধী সব রাজনৈতিক দল ও বিশিষ্ট নাগরিক এবং গণতন্ত্রমনা ব্যক্তিদের এক ছাতার নিচে আনতে নানা উদ্যোগ অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে এ পরিকল্পনায়। বিএনপির সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে এসব তথ্য।
এছাড়া সিরিজ বৈঠকগুলোতে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গ ছাড়তে ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ভেঙে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন নেতারা। সবাই বর্তমান সরকার এবং বিদ্যমান ব্যবস্থায় নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিপক্ষে মত দেন। তবে আগামী সংসদ নির্বাচনে অংশ নেবে কিনা, না নিলে আন্দোলনের কৌশল কী হবে বা রাজপথের দুই মিত্র জোটের (২০ দল ও ঐক্যফ্রন্ট) সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ক কেমন হবে-এসব বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। সিরিজ বৈঠকের আগে দলীয় কর্মপন্থা ঠিক করতে ১০ থেকে ১২ দফার একটি রূপরেখার খসড়া তৈরি করেন নীতিনির্ধারকরা। এ বিষয়ে বৈঠকগুলোতে নেতাদের মতামত নেওয়া হয়। এরই ভিত্তিতে একটি প্রাথমিক খসড়া তৈরি হয়েছে। এটি আজ স্থায়ী কমিটির বৈঠকে পর্যালোচনা করা হবে। এরপর বিশিষ্ট নাগরিক ও পেশাজীবীদেরও মতামত নিয়ে শিগগিরই তৈরি করা হবে আন্দোলনের পরিকল্পনার খসড়া। প্রয়োজনীয় সংশোধনের মাধ্যমে এটি চূড়ান্ত করবেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
এদিকে সিরিজ বৈঠকে যৌক্তিক কারণ ছাড়া অনুপস্থিত নেতাদের শোকজ করেছে বিএনপি হাইকমান্ড। শুক্রবার থেকে তাদের শোকজের চিঠি পাঠানো শুরু করেছে। কেন্দ্রীয় এক নেতা জানান, বৈঠকে না যাওয়ার কারণ যারা ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও মহাসচিবকে অবহিত করেছেন, অসুস্থ ও বিদেশে অবস্থান করছেন তাদের ছাড়া অনুপস্থিত সব নেতাদের শোকজ করা হয়েছে। যৌক্তিক কারণ দেখাতে না পারলে তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শুক্রবার যুগান্তরকে বলেন, সাংগঠনিক অবস্থা ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য কী করা যেতে পারে, সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। সেই সঙ্গে গণতন্ত্রের নেত্রী দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং বাংলাদেশের মুক্তির বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে। নেতাদের সব বক্তব্য লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। দলের নীতিনির্ধারণী সভায় সেগুলো নিয়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে- আমরা কোন ধরনের কর্মসূচি গ্রহণ করব।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মেজর (অব.) হাফিজউদ্দিন আহমদ বলেন, শতভাগ নেতারা একটি ব্যাপারে একমত হয়েছে যে, আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে আর নির্বাচনে যাবে না। এ ব্যাপারে আর কোনো ছাড় নেই। এটি আর পরিবর্তনযোগ্য নয়। সুতরাং তত্ত্বাবধায়ক সরকার আনার জন্য বিএনপি নেতাকর্মীদেরই সর্বোচ্চ ত্যাগ শিকার করতে হবে। আমরা রাপজপথে আমাদের শক্তি প্রদর্শন করব।
সূত্র জানায়, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আগামী নির্বাচন এবং আন্দোলন প্রশ্নে যে পরিকল্পনা তৈরি করা হচ্ছে, সেখানে তৃণমূলের চাহিদাকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এজন্যই দুদফায় ছয় দিনের বৈঠকে সবার মতামত নেওয়া হয়। আগামী মাসে বড় পরিসরে একটি সংবাদ সম্মেলন করার কথা রয়েছে বিএনপির। এতে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন, খালেদা জিয়ার নিঃশর্ত মুক্তি এবং তার বিরুদ্ধে দায়ের করা সব মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার, বিএনপিসহ দেশের সব বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীর মুক্তি, সাজা বাতিল ও মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার, নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করার বিধান নিশ্চিত করাসহ সাত দফা দাবি এবং দলের অবস্থান তুলে ধরে আন্দোলনের ডাক দেওয়া হতে পারে। এ সংবাদ সম্মেলনে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও নাগরিকদের আমন্ত্রণ জানানো হবে। তবে আন্দোলনে নামার আগে মেয়াদোত্তীর্ণ বিএনপির জেলা ও মহানগর এবং কেন্দ্রীয় অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কমিটি ঢেলে সাজানো হবে। ধারাবাহিক বৈঠকে দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির নেতাদের বক্তব্য শোনার পর নীতিনির্ধারকরা এমন চিন্তা করছেন বলে জানা গেছে।
সূত্র জানায়, ছয় দিনের ওই সিরিজ বৈঠকে নেতারা দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিসহ দলের সাংগঠনিক নানা বিষয়ে বক্তব্য দেন। এর মধ্যে নেতারা ১২টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মতামত দিয়েছেন। তা হচ্ছে-দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি ও নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে বিএনপির নেতৃত্বে আন্দোলন গড়ে তোলা, আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনে অংশ না নেওয়া, সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে একই প্ল্যাটফরমে আনা, পরিকল্পনা অনুযায়ী আন্দোলনের ছক কষা, দীর্ঘ নয়, স্বল্প সময়ের জন্য আন্দোলন গড়ে তোলা, বিভেদ ভুলে দলে আÍিক বন্ধন সুদৃঢ় করা, কমিটি গঠনে অনৈতিক লেনদেন বন্ধ করা, আন্দোলনমুখী নেতৃত্ব বাছাই করা, সংগঠনকে শক্তিশালী করা, বিভিন্ন পেশাজীবী ও সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়, বিশ্ব পরিস্থিতি বুঝে কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধি এবং দলের অবস্থান পরিষ্কার করা। এর বাইরেও দলের স্থায়ী কমিটি ও জাতীয় নির্বাহী কমিটির শূন্যপদ পূরণের পক্ষে মতামত দিয়েছেন নেতারা।
জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার বিষয়ে অনেক নেতা মত দেন। বিশেষ করে সিনিয়র ও জেলা পর্যায়ের নেতারা জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার কারণে বিএনপির ক্ষতির কারণগুলো ব্যাখ্যা করেন।
এ প্রসঙ্গে বিএনপি ভাইস চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার মোহাম্মদ শাহজাহান ওমর যুগান্তরকে বলেন, আজ মূল্যায়ন করতে হবে জামায়াতে ইসলামী আমাদের অ্যাসেট (সম্পদ) না লায়াবিলিটি (বোঝা)। যদি লায়াবিলিটি হয় তাহলে ২০ দলীয় জোটে সরাসরি না রাখাই ভালো। আর অ্যাসেট হওয়ার তো কোনো সুযোগ দেখি না। কারণ জামায়াতের অতীত ইতিহাস যা বলে তাতে তাদের নিয়ে একত্রে আন্দোলন করা সম্ভব নয়, নির্বাচনেও যাওয়া উচিত নয়। তবে আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে জামায়াতকে নিয়ে যেভাবে বিএনপির বিরুদ্ধে যুগপৎ আন্দোলন করেছিল, সেভাবে সামনে জামায়াতকে যুগপৎ আন্দোলনে বিএনপি শরিক করতে পারে।
দলীয় সূত্রগুলো জানায়, সিরিজ বৈঠকে দল পুনর্গঠনে ক্ষোভ, কূটনৈতিক ব্যর্থতায় হতাশা প্রকাশের বিষয়টি উঠে আসে। ঘুরেফিরে বেশির ভাগ নেতাই দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ছাড়া ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ ভুল ছিল বলে মত দেন। ঐক্যফ্রন্ট ভেঙে দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। দলের সাংগঠনিক অবস্থাকে গুরুত্বসহকারে তুলে ধরা হয়। বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কমিটি দীর্ঘদিন ধরে পূর্ণাঙ্গ হচ্ছে না, কমিটিতে স্থান পেতে নানা তদবির-লবিং করতে হয়, মফস্বল থেকে ঢাকায় এসে কমিটির জন্য তদবির করা, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের নাম ভাঙানো, কমিটি বাণিজ্য ইত্যাদি বিষয়ও তুলে ধরা হয়।
বৈঠকে নেতারা আরও বলেন, আন্দোলন ছাড়া দলের চেয়ারপারসনের মুক্তি মিলবে না। এ সরকারের অধীন ও বিদ্যমান ব্যবস্থায় নির্বাচনে গেলে ফল ২০১৪ ও ২০১৮ সালের মতোই হবে। প্রায় সব নেতাই মত দিয়েছেন, এ পরিস্থিতিতে ভোটে যেতে হলে বিদ্যমান নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনতে হবে। আর তা করতে হলে আন্দোলন ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।
বৈঠকে মধ্যম সারির নেতারা বলেন, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, ছাত্রদল, মহিলা দলসহ সব অঙ্গসংগঠনকে সক্রিয় রাখতে পুনর্গঠন করতে হবে। পাশাপাশি নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠনের দাবিকে জনগণের দাবিতে পরিণত করতে ২০ দলীয় জোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে অটুট রেখে ডান-বামসহ সরকারবিরোধী বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, পেশাজীবীসহ সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। যুগপৎ আন্দোলনের মাধ্যমে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার দাবি আদায় করতে হবে।
সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু বলেন, দেশের আশি ভাগ লোক বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচন চায় না। জনগণের কথাই হচ্ছে বিএনপি নেতাদের কথা। দাবি আদায়ে আন্দোলনের বিকল্প নেই। ক্ষমতাসীন সরকারকে ক্ষমতা থেকে হটিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে এবং স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের অধীনে যদি নির্বাচন হয়, সেখানে বিএনপি অংশগ্রহণ করবে।

আগামী সংসদ নির্বাচন

কৌশল নির্ধারণে ব্যস্ত দুদল

 হাসিবুল হাসান ও তারিকুল ইসলাম 
২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নানা কৌশল নির্ধারণে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নীতিনির্ধারকরা। সংগঠনকে ঢেলে সাজানো, অভ্যন্তরীণ বিরোধ নিরসন, ইশতেহার তৈরিসহ ছয় বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজে নেমে পড়েছে ক্ষমতাসীনরা। নজর রাখছে জোট-মহাজোটের মেরুকরণেও। অন্যদিকে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার ও নির্বাচন কমিশন গঠনসহ একগুচ্ছ দাবিতে আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি। এরই মধ্যে দুই দফা সিরিজ বৈঠক করে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের মতামত নেওয়া হয়েছে। শিগগিরই আন্দোলনের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে মাঠে নামবে দলটি

তৃণমূলে বিরোধ মেটাতে মাঠে নেতারা

ছয় ইস্যুতে মনোযোগী আওয়ামী লীগ

হাসিবুল হাসান

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আগাম প্রস্তুতি শুরু করেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। এক্ষেত্রে ছয় বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়ে ইতোমধ্যে কাজে নেমে পড়েছে দলটি। বিষয়গুলো হচ্ছে-সম্মেলনের মাধ্যমে তৃণমূল পর্যন্ত সংগঠনকে ঢেলে সাজানো, অভ্যন্তরীণ বিরোধ নিরসন, ইশতেহার তৈরি, বিএনপি কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ, জোটের মেরুকরণ ও দলীয় প্রার্থী বাছাই। দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতার সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে এসব তথ্য। তারা আরও জানান, আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশের পরই দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা এ নিয়ে কাজ শুরু

করেছেন। নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপির আন্দোলন কর্মসূচিসহ সার্বিক বিষয় কঠোর পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। নজর রাখা হচ্ছে জোট-মহাজোটের মেরুকরণও। আনুষ্ঠানিকভাবে না হলেও দলীয় প্রার্থী বাছাইয়ের কাজও এগিয়ে রাখা হচ্ছে। তথ্য নেওয়া হচ্ছে মনোনয়নপ্রত্যাশীর। পাশাপাশি নির্বাচন কমিশন গঠনসহ অন্যান্য বিষয়েও কঠোর দৃষ্টি রাখছেন তারা।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে বলেন, নির্বাচনকে সামনে রেখে আমরা প্রস্তুতি শুরু করেছি। যেখানে মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি আছে সম্মেলনের মাধ্যমে সেগুলো ঢেলে সাজানোর কাজ করছি। দলের অভ্যন্তরে কোনো সমস্যা থাকলে তা সমাধানের চেষ্টা চলছে। আমরা চাই-তৃণমূল পর্যন্ত অর্থাৎ একেবারে ইউনিট পর্যন্ত সংগঠনকে শক্তিশালী করে গড়ে তুলতে। এটা করতে পারলে নির্বাচনের সবচেয়ে বড় প্রস্তুতিটা হয়ে যাবে।

ইশতেহার তৈরির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটার জন্য আমাদের দলের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটা কমিটি করে দেবেন। তারা দেশের বিভিন্ন খাতের বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে খসড়া তৈরি করবেন। বিএনপির আন্দোলন মোকাবিলা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আন্দোলন করতে হলে জনসম্পৃক্ততা দরকার হয়। কিন্তু বিএনপির তা নেই। তবে আন্দোলনের নামে বিএনপিকে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও অরাজকতা সৃষ্টি করতে দেওয়া হবে না বলেও জানান এই নীতিনির্ধারক।

তৃণমূলকে ঢেলে সাজানো : জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ইতোমধ্যেই তৃণমূল গোছানোর কাজ শুরু করেছে আওয়ামী লীগ। করোনার কারণে কিছুদিন এই কাজে গতি কমে গেলেও চলতি মাসের শুরু থেকে পুরোদমে কাজ শুরু হয়েছে। সাংগঠনিক নেতারা তৃণমূল নিয়মিত সফর করছেন। চলছে বর্ধিত সভাও। চলতি সপ্তাহেও রাজবাড়ীসহ কয়েকটি জেলা ও উপজেলায় বর্ধিত সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন। আগামী সপ্তাহেও কয়েকটি জেলায় বর্ধিত সভার তারিখ চূড়ান্ত করা হয়েছে।

এছাড়া চলছে তৃণমূলের সম্মেলনের আয়োজনের কাজ। পাবনা, নাটোর, রাজবাড়ী জেলার সম্মেলনের তারিখ চূড়ান্ত করা হয়েছে। সম্মেলনের তারিখ চূড়ান্ত না হলেও আলোচনা চলছে আরও কয়েকটি জেলা নিয়ে। পাশাপাশি চলছে উপজেলা-থানা সম্মেলনের কাজও। সলঙ্গা, এনায়েতপুরসহ কয়েকটি থানা-উপজেলার সম্মেলন এ মাসে অনুষ্ঠিত হবে। আওয়ামী লীগের বিভাগীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা বলছেন, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই সারা দেশের মেয়াদোত্তীর্ণ সব জেলা-উপজেলা সম্মেলনের কাজ শেষে করতে চান তারা। এছাড়া নির্বাচনের আগে মেয়াদোত্তীর্ণ সহযোগী ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোকে ঢেলে সাজানো হবে।

অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব নিরসন : খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তৃণমূলে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ বিরোধ চরম আকার ধারণ করেছে। দ্বন্দ্বে জর্জরিত প্রায় প্রতিটি জেলা-উপজেলা। কোথাও জেলার সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক বিরোধ। কোথাও বিরোধ স্থানীয় এমপির সঙ্গে আওয়ামী লীগের। রাজনৈতিক পদ-পদবি ছাড়াও স্থানীয়ভাবে প্রভাব বিস্তার এবং দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকায় টেন্ডার, দখল, বালুমহাল নিয়ন্ত্রণসহ নানা কারণেই এই বিরোধ রূপ নিচ্ছে সংঘর্ষে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য মতে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আওয়ামী লীগের মধ্যে ৫৮টি অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় আটজন নিহত ও ৮০২ জন আহত হয়েছেন। নির্বাচনে আগে এসব সমস্যা সমাধান করতে চায় আওয়ামী লীগ। দলটির আট সাংগঠনিক টিমের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা নিজেদের বিরোধ মেটাতে মাঠে নেমেছেন। বিরোধপূর্ণ জেলার নেতাদের ডেকে সমস্যা সমাধানের নির্দেশ দিচ্ছেন। করছেন বর্থিত সভা। নির্দেশমতো দ্রুত বিরোধ নিরসন না করলে হাইকমান্ডের কাছে পরবর্তী করণীয় প্রসঙ্গে জানতে চাওয়া হবে।

দলটির নেতারা বলছেন, দলীয় সভাপতির নির্দেশে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই সব অভ্যন্তরীণ সমস্যা মিটিয়ে তৃণমূল পর্যন্ত দলকে ঐক্যবদ্ধ এবং আরও শক্তিশালী করতে তারা মাঠে নেমেছেন।

ইশতেহার তৈরি : দলীয় সভাপতির নির্দেশে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য ইশতেহার তৈরির প্রক্রিয়াও শুরু করেছে দলটির নীতিনির্ধারকরা। দলের বিভাগীয় সম্পাদকরা সভা-সেমিনারের মাধ্যমে এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়ার কাজও শুরু করেছেন। শিক্ষা দিবস উপলক্ষ্যে ১৭ সেপ্টেম্বর বঙ্গবন্ধু এভিনিউর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ‘শিক্ষা : ২০৪১ সালের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের বাস্তবিক কৌশল’ শীর্ষক সেমিনারের আয়োজন করে দলের শিক্ষা ও মানবসম্পদবিষয়ক উপকমিটি।

শুক্রবার ‘ঢাকা শহরের জলাবদ্ধতা : সমস্যা ও প্রতিকার’ শীর্ষক সেমিনারের আয়োজন করেছিল দলটির বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপকমিটি। নির্বাচনের আগে দলীয় সভাপতি ইশতেহার প্রস্তুতি কমিটি গঠন করে দেবেন। উপকমিটিগুলো সেই কমিটির কাছে তাদের এসব সেমিনারের মধ্য দিয়ে উঠে আসা প্রস্তাবনা সংযুক্তির জন্য দেবেন।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক প্রকৌশলী আবদুস সবুর যুগান্তরকে বলেন, আমরা অবশ্যই আমাদের কিছু প্রস্তাবনা দলের কাছে দেব। দল যদি মনে করে সেটা বার্নিং ইস্যু তাহলে তা গ্রহণ করবে। নির্বাহী কমিটি গ্রহণ করলে আওয়ামী লীগের আগামী দিনের কর্মকাণ্ডে এগুলো যুক্ত হবে।

পর্যবেক্ষণে বিএনপি : নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপির যাবতীয় কর্মকাণ্ড নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে ক্ষমতাসীনরা। বিশেষ করে বিএনপির চলমান ধারাবাহিক বৈঠক ও সেখানে গৃহীত সিদ্ধান্ত বিশ্লেষণ করছেন আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্টরা। নির্বাচনের আগে মাঠ গরম করে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না।

এ ক্ষেত্রে আগের মতোই কঠোর অবস্থান অব্যাহত রাখবে দলটি। ফলে এখন থেকেই সব দিক দিয়ে প্রস্তুতি নিয়ে রাখা হচ্ছে। তৃণমূলসহ সব পর্যায়ের নেতাদের এমন বার্তাও দেওয়া হয়েছে। গুজব-অপপ্রচারের জবাব দিতে প্রস্তুত করা হচ্ছে লক্ষাধিক অনলাইন এক্টিভিস্ট। কেউ যেন অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে না পারে, এজন্য কঠোর নজদারিতে থাকবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। সরকার ও দলের বিরুদ্ধে অপ্রপচারের বিরুদ্ধে তথ্যপ্রমাণসহ জবাব দিতেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে নেতাদের।

জোটের মেরুকরণ : এদিকে নির্বাচনকে সামনে রেখে জোট-মহাজোটে শুরু হয়েছে নতুন আলোচনা। একাদশ জাতীয় নির্বাচনের পর থেকেই আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটে দূরত্ব বেড়েছে। তবে আওয়ামী লীগ এখনই জোটের কোনো দলকে দূরে সরাতে চায় না। বরং আলোচনা করে নিজেদের মধ্যে দূরত্ব কমিয়ে আনার পক্ষেই জোর দিচ্ছেন জোট নেতারা।

অন্যদিকে কয়েকটি দলের আগ্রহ রয়েছে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটে যুক্ত হওয়ার। যদিও এখনো এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি ক্ষমতাসীনরা। তবে নির্বাচনের আগে পরিস্থিতি বিবেচনায় যে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। পাশাপাশি বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট বা বিরোধী অন্য সব জোটের বিষয়েও সার্বিক খোঁজখবর রাখছে আওয়ামী লীগ।

দলীয় প্রার্থী বাছাই : দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ শুরু না হলেও ভেতরে ভেতরে এ প্রক্রিয়া চলছে। আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিভিন্ন মাধ্যমে খোঁজখবর রাখছেন বর্তমান এমপি ও মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সম্পর্কে। দল ও দলের বাইরেও বিভিন্ন মাধ্যমে নিয়মিত জরিপ করাচ্ছেন দলের হাইকমান্ড। অনেক সমীকরণ মিলিয়ে দলের মনোনয়ন দিতে হয়। আওয়ামী লীগের সবশেষ দুটি বৈঠকে আগামী নির্বাচনে দলের প্রার্থী বাছাইয়ের বিষয়ে কিছু ইঙ্গিত দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

একাদশ জাতীয় সংসদ উপনির্বাচনগুলোতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রয়াত এমপির পরিবারের সদস্যদের মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। অর্থাৎ শুধু পারিবারিক ঐতিহ্য থাকলেই যে মনোনয়ন পাওয়া যেত, সেটা থেকে অনেকটা সরে এসেছে দলটি। পারিবারিক ঐতিহ্যের পাশাপাশি ত্যাগী, দলের প্রতি নিবেদিত এবং স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয়তার বিষয়টিও বিবেচিত হবে।

 

সিরিজ বৈঠকে অনুপস্থিত নেতাদের শোকজ

আন্দোলনের পরিকল্পনায় তোড়জোড় বিএনপির

তারিকুল ইসলাম

নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারসহ একগুচ্ছ দাবি নিয়ে এবার এককভাবে মাঠে নামতে চায় বিএনপি। আন্দোলনের বিকল্প নেই-এমন বার্তা এসেছে দলটির দুদফা সিরিজ বৈঠক থেকে। বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের এই অভিন্ন মতামতকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে আন্দোলনের পরিকল্পনা প্রণয়নে দফায় দফায় বৈঠক করছেন নীতিনির্ধারকরা। বিরোধী সব রাজনৈতিক দল ও বিশিষ্ট নাগরিক এবং গণতন্ত্রমনা ব্যক্তিদের এক ছাতার নিচে আনতে নানা উদ্যোগ অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে এ পরিকল্পনায়। বিএনপির  সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে এসব তথ্য।  
এছাড়া সিরিজ বৈঠকগুলোতে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গ ছাড়তে ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ভেঙে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন নেতারা। সবাই বর্তমান সরকার এবং বিদ্যমান ব্যবস্থায় নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিপক্ষে মত দেন। তবে আগামী সংসদ নির্বাচনে অংশ নেবে কিনা, না নিলে আন্দোলনের কৌশল কী হবে বা রাজপথের দুই মিত্র জোটের (২০ দল ও ঐক্যফ্রন্ট) সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ক কেমন হবে-এসব বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। সিরিজ বৈঠকের আগে দলীয় কর্মপন্থা ঠিক করতে ১০ থেকে ১২ দফার একটি রূপরেখার খসড়া তৈরি করেন নীতিনির্ধারকরা। এ বিষয়ে বৈঠকগুলোতে নেতাদের মতামত নেওয়া হয়। এরই ভিত্তিতে একটি প্রাথমিক খসড়া তৈরি হয়েছে। এটি আজ স্থায়ী কমিটির বৈঠকে পর্যালোচনা করা হবে। এরপর  বিশিষ্ট নাগরিক ও পেশাজীবীদেরও মতামত নিয়ে শিগগিরই তৈরি করা হবে আন্দোলনের পরিকল্পনার খসড়া। প্রয়োজনীয় সংশোধনের মাধ্যমে এটি চূড়ান্ত করবেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
এদিকে সিরিজ বৈঠকে যৌক্তিক কারণ ছাড়া অনুপস্থিত নেতাদের শোকজ করেছে বিএনপি হাইকমান্ড। শুক্রবার থেকে তাদের শোকজের চিঠি পাঠানো শুরু করেছে। কেন্দ্রীয় এক নেতা জানান, বৈঠকে না যাওয়ার কারণ যারা ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও মহাসচিবকে অবহিত করেছেন, অসুস্থ ও বিদেশে অবস্থান করছেন তাদের ছাড়া অনুপস্থিত সব নেতাদের শোকজ করা হয়েছে। যৌক্তিক কারণ দেখাতে না পারলে তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শুক্রবার যুগান্তরকে বলেন, সাংগঠনিক অবস্থা ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য কী করা যেতে পারে, সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। সেই সঙ্গে গণতন্ত্রের নেত্রী দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং বাংলাদেশের মুক্তির বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে। নেতাদের সব বক্তব্য লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। দলের নীতিনির্ধারণী সভায় সেগুলো নিয়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে- আমরা কোন ধরনের কর্মসূচি গ্রহণ করব।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মেজর (অব.) হাফিজউদ্দিন আহমদ বলেন, শতভাগ নেতারা একটি ব্যাপারে একমত হয়েছে যে, আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে আর নির্বাচনে যাবে না। এ ব্যাপারে আর কোনো ছাড় নেই। এটি আর পরিবর্তনযোগ্য নয়। সুতরাং তত্ত্বাবধায়ক সরকার আনার জন্য বিএনপি নেতাকর্মীদেরই সর্বোচ্চ ত্যাগ শিকার করতে হবে। আমরা রাপজপথে  আমাদের শক্তি প্রদর্শন করব।
সূত্র জানায়, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আগামী নির্বাচন এবং আন্দোলন প্রশ্নে যে পরিকল্পনা তৈরি করা হচ্ছে, সেখানে তৃণমূলের চাহিদাকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এজন্যই দুদফায় ছয় দিনের বৈঠকে সবার মতামত নেওয়া হয়। আগামী মাসে বড় পরিসরে একটি সংবাদ সম্মেলন করার কথা রয়েছে বিএনপির। এতে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন, খালেদা জিয়ার নিঃশর্ত মুক্তি এবং তার বিরুদ্ধে দায়ের করা সব মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার, বিএনপিসহ দেশের সব বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীর মুক্তি, সাজা বাতিল ও মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার, নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করার বিধান নিশ্চিত করাসহ সাত দফা দাবি এবং দলের অবস্থান তুলে ধরে আন্দোলনের ডাক দেওয়া হতে পারে। এ সংবাদ সম্মেলনে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও নাগরিকদের আমন্ত্রণ জানানো হবে। তবে আন্দোলনে নামার আগে মেয়াদোত্তীর্ণ বিএনপির জেলা ও মহানগর এবং কেন্দ্রীয় অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কমিটি ঢেলে সাজানো হবে। ধারাবাহিক বৈঠকে দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির নেতাদের বক্তব্য শোনার পর নীতিনির্ধারকরা এমন চিন্তা করছেন বলে জানা গেছে।
সূত্র জানায়, ছয় দিনের ওই সিরিজ বৈঠকে নেতারা দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিসহ দলের সাংগঠনিক নানা বিষয়ে বক্তব্য দেন। এর মধ্যে নেতারা ১২টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মতামত দিয়েছেন। তা হচ্ছে-দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি ও নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে বিএনপির নেতৃত্বে আন্দোলন গড়ে তোলা, আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনে অংশ না নেওয়া, সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে একই প্ল্যাটফরমে আনা, পরিকল্পনা অনুযায়ী আন্দোলনের ছক কষা, দীর্ঘ নয়, স্বল্প সময়ের জন্য আন্দোলন গড়ে তোলা, বিভেদ ভুলে দলে আÍিক বন্ধন সুদৃঢ় করা, কমিটি গঠনে অনৈতিক লেনদেন বন্ধ করা, আন্দোলনমুখী নেতৃত্ব বাছাই করা, সংগঠনকে শক্তিশালী করা, বিভিন্ন পেশাজীবী ও সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়, বিশ্ব পরিস্থিতি বুঝে কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধি এবং দলের অবস্থান পরিষ্কার করা। এর বাইরেও দলের স্থায়ী কমিটি ও জাতীয় নির্বাহী কমিটির শূন্যপদ পূরণের পক্ষে মতামত দিয়েছেন নেতারা।
জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার বিষয়ে অনেক নেতা মত দেন। বিশেষ করে সিনিয়র ও জেলা পর্যায়ের নেতারা জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার কারণে বিএনপির ক্ষতির কারণগুলো ব্যাখ্যা করেন।
এ প্রসঙ্গে বিএনপি ভাইস চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার মোহাম্মদ শাহজাহান ওমর যুগান্তরকে বলেন, আজ মূল্যায়ন করতে হবে জামায়াতে ইসলামী আমাদের অ্যাসেট (সম্পদ) না লায়াবিলিটি (বোঝা)। যদি লায়াবিলিটি হয় তাহলে ২০ দলীয় জোটে সরাসরি না রাখাই ভালো। আর অ্যাসেট হওয়ার তো কোনো সুযোগ দেখি না। কারণ জামায়াতের অতীত ইতিহাস যা বলে তাতে তাদের নিয়ে একত্রে আন্দোলন করা সম্ভব নয়, নির্বাচনেও যাওয়া উচিত নয়। তবে আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে জামায়াতকে নিয়ে যেভাবে বিএনপির বিরুদ্ধে যুগপৎ আন্দোলন করেছিল, সেভাবে সামনে জামায়াতকে যুগপৎ আন্দোলনে বিএনপি শরিক করতে পারে।
দলীয় সূত্রগুলো জানায়, সিরিজ বৈঠকে দল পুনর্গঠনে ক্ষোভ, কূটনৈতিক ব্যর্থতায় হতাশা প্রকাশের বিষয়টি উঠে আসে। ঘুরেফিরে বেশির ভাগ নেতাই দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ছাড়া ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ ভুল ছিল বলে মত দেন। ঐক্যফ্রন্ট ভেঙে দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। দলের সাংগঠনিক অবস্থাকে গুরুত্বসহকারে তুলে ধরা হয়। বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কমিটি দীর্ঘদিন ধরে পূর্ণাঙ্গ হচ্ছে না, কমিটিতে স্থান পেতে নানা তদবির-লবিং করতে হয়, মফস্বল থেকে ঢাকায় এসে কমিটির জন্য তদবির করা, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের নাম ভাঙানো, কমিটি বাণিজ্য ইত্যাদি বিষয়ও তুলে ধরা হয়।
বৈঠকে নেতারা আরও বলেন, আন্দোলন ছাড়া দলের চেয়ারপারসনের মুক্তি মিলবে না। এ সরকারের অধীন ও বিদ্যমান ব্যবস্থায় নির্বাচনে গেলে ফল ২০১৪ ও ২০১৮ সালের মতোই হবে। প্রায় সব নেতাই মত দিয়েছেন, এ পরিস্থিতিতে ভোটে যেতে হলে বিদ্যমান নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনতে হবে। আর তা করতে হলে আন্দোলন ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।
বৈঠকে মধ্যম সারির নেতারা বলেন, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, ছাত্রদল, মহিলা দলসহ সব অঙ্গসংগঠনকে সক্রিয় রাখতে পুনর্গঠন করতে হবে। পাশাপাশি নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠনের দাবিকে জনগণের দাবিতে পরিণত করতে ২০ দলীয় জোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে অটুট রেখে ডান-বামসহ সরকারবিরোধী বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, পেশাজীবীসহ সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। যুগপৎ আন্দোলনের মাধ্যমে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার দাবি আদায় করতে হবে।
সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু বলেন, দেশের আশি ভাগ লোক বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচন চায় না। জনগণের কথাই হচ্ছে বিএনপি নেতাদের কথা। দাবি আদায়ে আন্দোলনের বিকল্প নেই। ক্ষমতাসীন সরকারকে ক্ষমতা থেকে হটিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে এবং স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের অধীনে যদি নির্বাচন হয়, সেখানে বিএনপি অংশগ্রহণ করবে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন