১৪৬ কোটি টাকা ঋণ
jugantor
সরকারি জমি বন্ধক রেখেছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান
১৪৬ কোটি টাকা ঋণ

  নেসারুল হক খোকন  

২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সরকারি জমি বন্ধক রেখেছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান

সরকারি জমি ব্যাংকের কাছে বন্ধক রেখে প্রায় দেড়শ কোটি টাকা ঋণ তুলে নিয়েছে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। জমির মালিক পানি উন্নয়ন বোর্ড। অথচ জালিয়াতির মাধ্যমে এই জমি ব্যক্তিমালিকানায় কেনাবেচাও করা হয়। এমনকি চক্রটি নামজারি করে নিতেও সক্ষম হয়। দুটি ব্যাংকে এই জমি বন্ধক রেখে অ্যাগ্রো ইনডেক্স নামে ঢাকার একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান বিপুল অঙ্কের ঋণ তুলে নেয়। যুগান্তরের এক বছরের অনুসন্ধান শেষে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসার পর নড়েচড়ে বসে পানি উন্নয়ন বোর্ড। শুরু হয় তদন্ত। ধরা পড়ে সব জাল-জালিয়াতির কারবার। চিহ্নিত হয় দোষীরা। কিন্তু এখন পর্যন্ত এই জমি উদ্ধার এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

অভিযোগ রয়েছে, ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের পেছনে প্রভাবশালী মহলের সমর্থন থাকায় প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছে না। বরং যারা পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করছেন, তাদেরকে নানাভাবে হয়রানি করা হচ্ছে।

জমিটির অবস্থান পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলার আলীপুরে। উপকূলীয় এলাকায় প্রাকৃতিক জলোচ্ছ্বাসে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) এই জমি সংরক্ষণ করে। ১৯৬৩ সালে এই জমি অধিগ্রহণ করা হয়। সর্বশেষ মাঠ জরিপেও জমিটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের নামে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। অথচ এখানকার প্রায় ৩ একর সরকারি জমি সাবরেজিস্ট্রি অফিসে বেচাকেনা হয়েছে।

তথ্যানুসন্ধানে পাওয়া নথিপত্রে দেখা যায়, ২০১২ সাল থেকে শুরু করে বরফকলটি এখনো চালুই হয়নি। অথচ সেটিকে উৎপাদনমুখী প্রতিষ্ঠান হিসাবে ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল (ঋণ কার্যকরী মূলধন) দেখিয়েছে একটি ব্যাংক, যা ব্যাংকিং আইনবহির্ভূত ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ ধরনের একটি বরফকল স্থাপনে সর্বসাকুল্যে ২৫ থেকে ৩০ কোটি টাকা খরচ হওয়ার কথা। অথচ সেখানে ঋণ দেওয়া হয়েছে ১৪৬ কোটি টাকা, যা নজিরবিহীন ঘটনা। জানা যায়, সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকাকে জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষায় বাঁধ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য রাখা জমিটি দখলমুক্ত করতে এক বছর ধরে চেষ্টা করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। পটুয়াখালী জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে এ বিষয়ে দখলকারী প্রতিষ্ঠানকে নোটিশও করা হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের একজন কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে যুগান্তরকে বলেন, জেলা প্রশাসনের উচ্ছেদ নোটিশ পেয়ে হাইকোর্টে রিট পিটিশন করেন অ্যাগ্রো ইনডেক্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাকিয়া তাজিন। শুনানি শেষে উচ্ছেদ অভিযানে স্থগিতাদেশ দেন হাইকোর্ট। এরপর পানি উন্নয়ন বোর্ড আপিল করলে উচ্ছেদ অভিযান স্থগিতাদেশটি স্থগিত করেন হাইকোর্টের আপিল বিভাগ। এরপর বারবার তাগিদ দেওয়ার পরও উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনা না করে সময়ক্ষেপণ করা হয়। করোনার অজুহাতে স্বয়ং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় উচ্ছেদ অভিযান বন্ধ করে দেওয়ায় মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সব আয়োজন ভেস্তে গেছে।

ওই কর্মকর্তা বলেন, পাউবোর শত শত একর জমি বেহাত হচ্ছে শুধু নিজেদের গাফিলতির কারণে। দখল বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদেরও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত।

জানতে চাইলে পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসক কামাল হোসেন সম্প্রতি যুগান্তরকে বলেন, ‘আমি জেলায় নতুন এসেছি। তবে অভিযোগের সত্যতা থাকলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। উপকূলীয় এলাকা সুরক্ষায় বাঁধের জন্য জমি সংরক্ষিত রাখা হলে স্থাপনার নামে দখল অবশ্যই উচ্ছেদ করা হবে।’

তথ্য গোপন করে ঋণ : তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, ২০১২ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত একটি ব্যাংক বরফকল স্থাপনের জন্য ১০ কোটি টাকা ঋণ অনুমোদন দেয়। পরবর্তী সময়ে ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ জানতে পারে, বন্ধকি জমির কাগজপত্র সঠিক নয়। সরকারি জমি হওয়ার কারণে অনুমোদিত ঋণ প্রকল্পটি বাতিল করা হয়। কিন্তু এর মধ্যে ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠান অ্যাগ্রো ইনডেক্স লিমিটেড এক কোটি টাকা তুলে নেয়। রাষ্ট্রায়ত্ত ওই ব্যাংকের নথিপত্রে প্রকল্পের উৎপাদন পণ্য হিসাবে দেখানো হয়েছে ইলিশ মাছ হিমায়িতকরণ ও আইস ব্লক স্থাপন। ৫ হাজার ৬শ মেট্রিক টন ইলিশ হিমায়িতকরণ ছাড়াও প্রায় ৩০ হাজার টন বরফ সংরক্ষণের তথ্য দেওয়া আছে রাষ্ট্রায়াত্ত ব্যাংকের অঙ্গীকারনামায়।

অঙ্গীকারনামায় আরও বলা হয়, কলাপাড়ার লতাচাপলি মৌজায় ৩৪নং জেল এলস্থিত, ১১৯২ খতিয়ানে এসএ ৮৭১/১ ও ৮৭২/১নং দাগে মোট ১০০ শতাংশ (৩ একর) জমিতে প্রকল্পটি স্থাপিত হবে। প্রকল্পের জমি কোম্পানির নামে হস্তান্তর করতে হবে। অথচ কোম্পানির নামে হস্তান্তর ছাড়াই ঋণ অনুমোদন করেছে ব্যাংকের পরিচালনা বোর্ড, যা রহস্যজনক।

এদিকে ২০১৬ সালে একই প্রকল্পে ১৪৪ কোটি টাকা ঋণ দেয় বেসরকারি আরেকটি ব্যাংক। গত ৯ বছরে যে প্রতিষ্ঠান চালুই হয়নি, সেই অ্যাগ্রো ইনডেক্সকে উৎপাদনমুখী প্রতিষ্ঠান উল্লেখ করে বেসরকারি এই ব্যাংকটি ২০১৭ সালেই ৮৭ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে।

জমির মালিক পাউবো : গত বছরের ২৬ আগস্ট পাউবোর পটুয়াখালীর নির্বাহী প্রকৌশলী খান মোহাম্মদ ওয়ালিউজ্জামান অবৈধভাবে স্থাপনা অপসারণে জাকিয়া তাজিনকে উচ্ছেদ নোটিশ দেন। নোটিশের এক স্থানে বলা হয়, কলাপাড়া উপজেলার ৪৮নং পোল্ডারে লতাচাপলি মৌজায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণের জন্য ১৯৬৩-১৯৬৪ সালে ১৮ দশমিক ২২ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। অধিগ্রহণকৃত এই জমিতে তৎকালীন বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ/স্লুইচ নির্মাণ করা হয়। অব্যবহৃত অবশিষ্ট জমি বাঁধ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য রাখা হয়েছে। জমিটি সর্বশেষ দিয়ারা সেটেলমেন্ট জরিপে পাউবোর নামে রেকর্ডভুক্ত আছে। অবৈধভাবে দখল করার বিষয়টি উল্লেখ করে নির্বাহী প্রকৌশলীর উচ্ছেদ নোটিশে বলা হয়, ‘সরেজমিনে দেখা যায়, ওই জমিতে আপনার প্রতিষ্ঠান কর্তৃক (বরফকল) স্থাপনা তৈরি করেছেন। সম্প্রতি তারকাঁটার বেড়া দিয়ে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করে অবৈধভাবে ভোগদখলে রাখা হয়েছে, যা সরকারি সম্পত্তি স্থায়ীভাবে দখলের উদ্যোগ। তাই বর্ণিত জমি থেকে সব স্থাপনা সরিয়ে নিতে ১০ দিনের সময় দেওয়া হলো। অন্যথায় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

নোটিশ পেয়ে জাকিয়া তাজিন ১ দশমিক ৯৫ একর জমি নিজের দাবি করে উচ্ছেদ নোটিশ স্থগিত চেয়ে হাইকোর্টে রিট পিটিশন (৫৭৩১/২০২০) দায়ের করেন। ওই রিট পিটিশনের প্রাথমিক শুনানিতে আলোচ্য উচ্ছেদের ওপর অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ দেন হাইকোর্ট। গত বছর ১৩ অক্টোবর স্থগিতাদেশের বিষয়টি লিখিতভাবে পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জানানো হয়। এরপর অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশের বিরুদ্ধে আপিল (সিপিএলএ ২২০১/২০২০) করে পানি উন্নয়ন বোর্ড। আপিল বিভাগে শুনানিতে ১৩ ডিসেম্বর হাইকোর্টের প্রদত্ত অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ গত ২৬ জুন পর্যন্ত স্থগিত করা হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের একজন কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, ‘রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তারাই যদি সরকারি জমি দখল করতে সহযোগিতা করেন, তাহলে কে প্রতিবাদ করবে? সময়ের কাজ সময়মতো না করায় বাঁধ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য রাখা এই জমিও বেহাত হয়ে যাবে। এভাবে কুয়াকাটার অন্তত শত একর জমি দখল করে নিয়েছে প্রভাবশালীরা।’

বাঁধের জমি কেনাবেচা : এ সংক্রান্ত নথিপত্রে দেখা যায়, জাকিয়া তাজিন হাইকোর্টে এসএ ৩৪নং লতাচাপলি মৌজায় ১১৯২নং খতিয়ানে এসএ ৮৭১/১, ৮৭২/১নং দাগে এবং বিএস ৫৮নং আলীপুর মৌজার বিএস ৫নং খতিয়ানের বিএস ১৪৭, ১৪৮নং দাগে মোট ১ দশমিক ৯৫ একর জমি নিজের দাবি করে উচ্ছেদ কার্যক্রম স্থগিতাদেশ চেয়ে রিট পিটিশন করেন। এই নথিপত্রের সূত্র ধরে তথ্যানুসন্ধান চালিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু দলিল পাওয়া যায়। এতে দেখা যায়, ২০১২ সালের ৯ ফেব্র“য়ারি আমমোক্তারনামার তথ্য গোপন করে খেপুপাড়া সাবরেজিস্ট্রি অফিসে এক একর জমি ৫৫ লাখ টাকায় কিনে নেন জাকিয়া তাজিন। দলিল নং ৯৬১। এরপর ২০১৪ সালের ২২ অক্টোবর ৪৩৬৬ দলিলে চান মিয়া ওরফে দেলোয়ার হোসেন ৫০ শতক জমি জাকিয়া তাজিনের কাছে বিক্রি করেন ৩২ লাখ টাকায়। ২০১৬ সালের ৩১ মার্চ একই সাবরেজিস্ট্রি অফিসে ১৬৯৮নং দলিলে ১০ লাখ টাকা দলিলমূল্য দেখিয়ে ১৫ শতক জমি কেনেন জাকিয়া তাজিন। আব্দুল বারেক মোল্লা জমিটির বিক্রেতা। ২০১২ এবং ২০১৬ সালে জাকিয়া তাজিনের নামে এই জমি নামজারিও করে দেওয়া হয়। ২০১৬ সালে নামজারির নথিপত্রে কলাপাড়ার তৎকালীন এসি ল্যান্ড দীপক কুমার রায়ের স্বাক্ষর রয়েছে। বর্তমানে তিনি ফরিদপুরে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (জেনারেল) হিসাবে কর্মরত। পানি উন্নয়ন বোর্ডের রেকর্ডীয় জমি কীভাবে জাকিয়া তাজিনের নামে নামজারি করে দিলেন জানতে চাইলে দীপক কুমার রায় যুগান্তরকে বলেন, ‘বিষয়টি জ্ঞানত তার মনে পড়ছে না। এছাড়া নামজারি হলেই মালিকানা নিশ্চিত করা যায় না। সঠিক কাগজপত্র না থাকলে নামজারি বাতিল হয়।’

অধিগ্রহণকৃত জমির সাক্ষী : এই জমি দখল উচ্ছেদের জন্য গত বছর পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসককে দাপ্তরিক পত্র দেওয়া হয়। এরপর জেলা প্রশাসক গত বছরের ২৯ অক্টোবর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে স্থানীয় ভূমি কর্মকর্তাদের কাছে বিষয়টি তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলেন। এ নির্দেশনা পাওয়ার পর কলাপাড়া এসি ল্যান্ড (সহকারী কমিশনার, ভূমি) জগৎবন্ধু মন্ডল গত ৭ জানুয়ারি এ সংক্রান্ত একটি মিসকেস (নং ৩২) ওপেন করে পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণ করেন। কলাপাড়া উপজেলা ভূমি অফিসের কানুনগো মো. আলতাফ হোসেন, সার্ভেয়ার মো. আলী আজগর হাওলাদার, মো. হুমায়ুন কবির এবং মহিপুর ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মো. আজিজুর রহমান গত ৬ এপ্রিল কলাপাড়া এসি ল্যান্ড কার্যালয়ে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন। এতে বলা হয়, ‘কলাপাড়া উপজেলাধীন ৫৮নং জেএলস্থিত আলীপুর মৌজায় বিএস ৫নং খতিয়ানের বিএস ১৪৬, ১৪৭, ১৪৮, ১৪৯, ১৫০, ১৫৬নং দাগের ৩ একর জমির ওপর জাকিয়া তাজিন অবৈধভাবে পাউবোর জমিতে পাকা বরফকল নির্মাণ ও পুকুর খনন করেছেন, যা সম্পূর্ণ আইনবহির্ভূত। ওই জমি উচ্ছেদ করা একান্ত আবশ্যক।’ ওইদিনই এসি ল্যান্ড ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এক আদেশে ইনডেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাকিয়া তাজিনের বিরুদ্ধে সরকারি এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের ভূমি ও ইমারত (দখল ও পুনরুদ্ধার) অধ্যাদেশ ১৯৭০-এর ৫ ধারা অনুযায়ী উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপর কেসটি কলাপাড়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়। প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর গত ১১ মে জাকিয়া তাজিনকে ৭ দিনের মধ্যে পাউবোর জমি দখল ত্যাগের নির্দেশ দেন পটুয়াখালীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব)। বলা হয়, ‘এ সময়ের মধ্যে যদি জাকিয়া তাজিন জমির দখল ত্যাগ করতে সম্মত না হন অথবা অস্বীকার করেন, তাহলে উচ্ছেদ করে দখল গ্রহণ করা হবে।’ অথচ এই নোটিশের চার মাস অতিবাহিত হওয়ার পরও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

তাজিন যা বললেন : রোববার এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে অ্যাগ্রো ইনডেক্স গ্র“পের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোবাইল ফোনে জাকিয়া তাজিন যুগান্তরকে বলেন, ‘আমি একজন মহিলা উদ্যোক্তা। উপরন্তু করোনা পরিস্থিতির কারণে সেভাবে কোনো কাজই করতে পারিনি। পানি উন্নয়ন বোর্ডের উচ্ছেদ নোটিশের বিপরীতে আমরা আপিল করে উচ্ছেদ স্থগিতাদেশ পেয়েছিলাম। আবার পাউবো সেই আদেশের বিপরীতে আপিল করলে আদেশটি বাতিল করা হয়। এরপর এখন আবার আমরা উচ্চ আদালতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি।’ ঋণের কোনো কিস্তি পরিশোধ করেছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে বলার মতো সময় হয়নি।’

এর আগে গত বছরের ২০ আগস্ট জাকিয়া তাজিন যুগান্তরকে বলেন, ইনডেক্স গ্র“পের চেয়ারম্যান শহীদুল্লাহ আল মুনির জমিটি কেনার প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত ছিলেন। তবে জমি রেজিস্ট্রি এবং নামজারি হয়েছে আমার নামে।’ প্রসঙ্গত, শহীদুল্লাহ মুনির বর্তমানে কারাগারে আছেন। জাকিয়া তাজিন তার সাবেক স্ত্রী।

সরকারি জমি বন্ধক রেখেছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান

১৪৬ কোটি টাকা ঋণ

 নেসারুল হক খোকন 
২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
সরকারি জমি বন্ধক রেখেছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান
প্রতীকী ছবি

সরকারি জমি ব্যাংকের কাছে বন্ধক রেখে প্রায় দেড়শ কোটি টাকা ঋণ তুলে নিয়েছে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। জমির মালিক পানি উন্নয়ন বোর্ড। অথচ জালিয়াতির মাধ্যমে এই জমি ব্যক্তিমালিকানায় কেনাবেচাও করা হয়। এমনকি চক্রটি নামজারি করে নিতেও সক্ষম হয়। দুটি ব্যাংকে এই জমি বন্ধক রেখে অ্যাগ্রো ইনডেক্স নামে ঢাকার একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান বিপুল অঙ্কের ঋণ তুলে নেয়। যুগান্তরের এক বছরের অনুসন্ধান শেষে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসার পর নড়েচড়ে বসে পানি উন্নয়ন বোর্ড। শুরু হয় তদন্ত। ধরা পড়ে সব জাল-জালিয়াতির কারবার। চিহ্নিত হয় দোষীরা। কিন্তু এখন পর্যন্ত এই জমি উদ্ধার এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

অভিযোগ রয়েছে, ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের পেছনে প্রভাবশালী মহলের সমর্থন থাকায় প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছে না। বরং যারা পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করছেন, তাদেরকে নানাভাবে হয়রানি করা হচ্ছে।

জমিটির অবস্থান পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলার আলীপুরে। উপকূলীয় এলাকায় প্রাকৃতিক জলোচ্ছ্বাসে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) এই জমি সংরক্ষণ করে। ১৯৬৩ সালে এই জমি অধিগ্রহণ করা হয়। সর্বশেষ মাঠ জরিপেও জমিটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের নামে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। অথচ এখানকার প্রায় ৩ একর সরকারি জমি সাবরেজিস্ট্রি অফিসে বেচাকেনা হয়েছে।

তথ্যানুসন্ধানে পাওয়া নথিপত্রে দেখা যায়, ২০১২ সাল থেকে শুরু করে বরফকলটি এখনো চালুই হয়নি। অথচ সেটিকে উৎপাদনমুখী প্রতিষ্ঠান হিসাবে ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল (ঋণ কার্যকরী মূলধন) দেখিয়েছে একটি ব্যাংক, যা ব্যাংকিং আইনবহির্ভূত ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ ধরনের একটি বরফকল স্থাপনে সর্বসাকুল্যে ২৫ থেকে ৩০ কোটি টাকা খরচ হওয়ার কথা। অথচ সেখানে ঋণ দেওয়া হয়েছে ১৪৬ কোটি টাকা, যা নজিরবিহীন ঘটনা। জানা যায়, সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকাকে জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষায় বাঁধ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য রাখা জমিটি দখলমুক্ত করতে এক বছর ধরে চেষ্টা করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। পটুয়াখালী জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে এ বিষয়ে দখলকারী প্রতিষ্ঠানকে নোটিশও করা হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের একজন কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে যুগান্তরকে বলেন, জেলা প্রশাসনের উচ্ছেদ নোটিশ পেয়ে হাইকোর্টে রিট পিটিশন করেন অ্যাগ্রো ইনডেক্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাকিয়া তাজিন। শুনানি শেষে উচ্ছেদ অভিযানে স্থগিতাদেশ দেন হাইকোর্ট। এরপর পানি উন্নয়ন বোর্ড আপিল করলে উচ্ছেদ অভিযান স্থগিতাদেশটি স্থগিত করেন হাইকোর্টের আপিল বিভাগ। এরপর বারবার তাগিদ দেওয়ার পরও উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনা না করে সময়ক্ষেপণ করা হয়। করোনার অজুহাতে স্বয়ং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় উচ্ছেদ অভিযান বন্ধ করে দেওয়ায় মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সব আয়োজন ভেস্তে গেছে।

ওই কর্মকর্তা বলেন, পাউবোর শত শত একর জমি বেহাত হচ্ছে শুধু নিজেদের গাফিলতির কারণে। দখল বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদেরও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত।

জানতে চাইলে পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসক কামাল হোসেন সম্প্রতি যুগান্তরকে বলেন, ‘আমি জেলায় নতুন এসেছি। তবে অভিযোগের সত্যতা থাকলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। উপকূলীয় এলাকা সুরক্ষায় বাঁধের জন্য জমি সংরক্ষিত রাখা হলে স্থাপনার নামে দখল অবশ্যই উচ্ছেদ করা হবে।’

তথ্য গোপন করে ঋণ : তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, ২০১২ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত একটি ব্যাংক বরফকল স্থাপনের জন্য ১০ কোটি টাকা ঋণ অনুমোদন দেয়। পরবর্তী সময়ে ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ জানতে পারে, বন্ধকি জমির কাগজপত্র সঠিক নয়। সরকারি জমি হওয়ার কারণে অনুমোদিত ঋণ প্রকল্পটি বাতিল করা হয়। কিন্তু এর মধ্যে ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠান অ্যাগ্রো ইনডেক্স লিমিটেড এক কোটি টাকা তুলে নেয়। রাষ্ট্রায়ত্ত ওই ব্যাংকের নথিপত্রে প্রকল্পের উৎপাদন পণ্য হিসাবে দেখানো হয়েছে ইলিশ মাছ হিমায়িতকরণ ও আইস ব্লক স্থাপন। ৫ হাজার ৬শ মেট্রিক টন ইলিশ হিমায়িতকরণ ছাড়াও প্রায় ৩০ হাজার টন বরফ সংরক্ষণের তথ্য দেওয়া আছে রাষ্ট্রায়াত্ত ব্যাংকের অঙ্গীকারনামায়।

অঙ্গীকারনামায় আরও বলা হয়, কলাপাড়ার লতাচাপলি মৌজায় ৩৪নং জেল এলস্থিত, ১১৯২ খতিয়ানে এসএ ৮৭১/১ ও ৮৭২/১নং দাগে মোট ১০০ শতাংশ (৩ একর) জমিতে প্রকল্পটি স্থাপিত হবে। প্রকল্পের জমি কোম্পানির নামে হস্তান্তর করতে হবে। অথচ কোম্পানির নামে হস্তান্তর ছাড়াই ঋণ অনুমোদন করেছে ব্যাংকের পরিচালনা বোর্ড, যা রহস্যজনক।

এদিকে ২০১৬ সালে একই প্রকল্পে ১৪৪ কোটি টাকা ঋণ দেয় বেসরকারি আরেকটি ব্যাংক। গত ৯ বছরে যে প্রতিষ্ঠান চালুই হয়নি, সেই অ্যাগ্রো ইনডেক্সকে উৎপাদনমুখী প্রতিষ্ঠান উল্লেখ করে বেসরকারি এই ব্যাংকটি ২০১৭ সালেই ৮৭ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে।

জমির মালিক পাউবো : গত বছরের ২৬ আগস্ট পাউবোর পটুয়াখালীর নির্বাহী প্রকৌশলী খান মোহাম্মদ ওয়ালিউজ্জামান অবৈধভাবে স্থাপনা অপসারণে জাকিয়া তাজিনকে উচ্ছেদ নোটিশ দেন। নোটিশের এক স্থানে বলা হয়, কলাপাড়া উপজেলার ৪৮নং পোল্ডারে লতাচাপলি মৌজায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণের জন্য ১৯৬৩-১৯৬৪ সালে ১৮ দশমিক ২২ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। অধিগ্রহণকৃত এই জমিতে তৎকালীন বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ/স্লুইচ নির্মাণ করা হয়। অব্যবহৃত অবশিষ্ট জমি বাঁধ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য রাখা হয়েছে। জমিটি সর্বশেষ দিয়ারা সেটেলমেন্ট জরিপে পাউবোর নামে রেকর্ডভুক্ত আছে। অবৈধভাবে দখল করার বিষয়টি উল্লেখ করে নির্বাহী প্রকৌশলীর উচ্ছেদ নোটিশে বলা হয়, ‘সরেজমিনে দেখা যায়, ওই জমিতে আপনার প্রতিষ্ঠান কর্তৃক (বরফকল) স্থাপনা তৈরি করেছেন। সম্প্রতি তারকাঁটার বেড়া দিয়ে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করে অবৈধভাবে ভোগদখলে রাখা হয়েছে, যা সরকারি সম্পত্তি স্থায়ীভাবে দখলের উদ্যোগ। তাই বর্ণিত জমি থেকে সব স্থাপনা সরিয়ে নিতে ১০ দিনের সময় দেওয়া হলো। অন্যথায় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

নোটিশ পেয়ে জাকিয়া তাজিন ১ দশমিক ৯৫ একর জমি নিজের দাবি করে উচ্ছেদ নোটিশ স্থগিত চেয়ে হাইকোর্টে রিট পিটিশন (৫৭৩১/২০২০) দায়ের করেন। ওই রিট পিটিশনের প্রাথমিক শুনানিতে আলোচ্য উচ্ছেদের ওপর অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ দেন হাইকোর্ট। গত বছর ১৩ অক্টোবর স্থগিতাদেশের বিষয়টি লিখিতভাবে পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জানানো হয়। এরপর অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশের বিরুদ্ধে আপিল (সিপিএলএ ২২০১/২০২০) করে পানি উন্নয়ন বোর্ড। আপিল বিভাগে শুনানিতে ১৩ ডিসেম্বর হাইকোর্টের প্রদত্ত অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ গত ২৬ জুন পর্যন্ত স্থগিত করা হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের একজন কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, ‘রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তারাই যদি সরকারি জমি দখল করতে সহযোগিতা করেন, তাহলে কে প্রতিবাদ করবে? সময়ের কাজ সময়মতো না করায় বাঁধ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য রাখা এই জমিও বেহাত হয়ে যাবে। এভাবে কুয়াকাটার অন্তত শত একর জমি দখল করে নিয়েছে প্রভাবশালীরা।’

বাঁধের জমি কেনাবেচা : এ সংক্রান্ত নথিপত্রে দেখা যায়, জাকিয়া তাজিন হাইকোর্টে এসএ ৩৪নং লতাচাপলি মৌজায় ১১৯২নং খতিয়ানে এসএ ৮৭১/১, ৮৭২/১নং দাগে এবং বিএস ৫৮নং আলীপুর মৌজার বিএস ৫নং খতিয়ানের বিএস ১৪৭, ১৪৮নং দাগে মোট ১ দশমিক ৯৫ একর জমি নিজের দাবি করে উচ্ছেদ কার্যক্রম স্থগিতাদেশ চেয়ে রিট পিটিশন করেন। এই নথিপত্রের সূত্র ধরে তথ্যানুসন্ধান চালিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু দলিল পাওয়া যায়। এতে দেখা যায়, ২০১২ সালের ৯ ফেব্র“য়ারি আমমোক্তারনামার তথ্য গোপন করে খেপুপাড়া সাবরেজিস্ট্রি অফিসে এক একর জমি ৫৫ লাখ টাকায় কিনে নেন জাকিয়া তাজিন। দলিল নং ৯৬১। এরপর ২০১৪ সালের ২২ অক্টোবর ৪৩৬৬ দলিলে চান মিয়া ওরফে দেলোয়ার হোসেন ৫০ শতক জমি জাকিয়া তাজিনের কাছে বিক্রি করেন ৩২ লাখ টাকায়। ২০১৬ সালের ৩১ মার্চ একই সাবরেজিস্ট্রি অফিসে ১৬৯৮নং দলিলে ১০ লাখ টাকা দলিলমূল্য দেখিয়ে ১৫ শতক জমি কেনেন জাকিয়া তাজিন। আব্দুল বারেক মোল্লা জমিটির বিক্রেতা। ২০১২ এবং ২০১৬ সালে জাকিয়া তাজিনের নামে এই জমি নামজারিও করে দেওয়া হয়। ২০১৬ সালে নামজারির নথিপত্রে কলাপাড়ার তৎকালীন এসি ল্যান্ড দীপক কুমার রায়ের স্বাক্ষর রয়েছে। বর্তমানে তিনি ফরিদপুরে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (জেনারেল) হিসাবে কর্মরত। পানি উন্নয়ন বোর্ডের রেকর্ডীয় জমি কীভাবে জাকিয়া তাজিনের নামে নামজারি করে দিলেন জানতে চাইলে দীপক কুমার রায় যুগান্তরকে বলেন, ‘বিষয়টি জ্ঞানত তার মনে পড়ছে না। এছাড়া নামজারি হলেই মালিকানা নিশ্চিত করা যায় না। সঠিক কাগজপত্র না থাকলে নামজারি বাতিল হয়।’

অধিগ্রহণকৃত জমির সাক্ষী : এই জমি দখল উচ্ছেদের জন্য গত বছর পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসককে দাপ্তরিক পত্র দেওয়া হয়। এরপর জেলা প্রশাসক গত বছরের ২৯ অক্টোবর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে স্থানীয় ভূমি কর্মকর্তাদের কাছে বিষয়টি তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলেন। এ নির্দেশনা পাওয়ার পর কলাপাড়া এসি ল্যান্ড (সহকারী কমিশনার, ভূমি) জগৎবন্ধু মন্ডল গত ৭ জানুয়ারি এ সংক্রান্ত একটি মিসকেস (নং ৩২) ওপেন করে পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণ করেন। কলাপাড়া উপজেলা ভূমি অফিসের কানুনগো মো. আলতাফ হোসেন, সার্ভেয়ার মো. আলী আজগর হাওলাদার, মো. হুমায়ুন কবির এবং মহিপুর ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মো. আজিজুর রহমান গত ৬ এপ্রিল কলাপাড়া এসি ল্যান্ড কার্যালয়ে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন। এতে বলা হয়, ‘কলাপাড়া উপজেলাধীন ৫৮নং জেএলস্থিত আলীপুর মৌজায় বিএস ৫নং খতিয়ানের বিএস ১৪৬, ১৪৭, ১৪৮, ১৪৯, ১৫০, ১৫৬নং দাগের ৩ একর জমির ওপর জাকিয়া তাজিন অবৈধভাবে পাউবোর জমিতে পাকা বরফকল নির্মাণ ও পুকুর খনন করেছেন, যা সম্পূর্ণ আইনবহির্ভূত। ওই জমি উচ্ছেদ করা একান্ত আবশ্যক।’ ওইদিনই এসি ল্যান্ড ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এক আদেশে ইনডেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাকিয়া তাজিনের বিরুদ্ধে সরকারি এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের ভূমি ও ইমারত (দখল ও পুনরুদ্ধার) অধ্যাদেশ ১৯৭০-এর ৫ ধারা অনুযায়ী উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপর কেসটি কলাপাড়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়। প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর গত ১১ মে জাকিয়া তাজিনকে ৭ দিনের মধ্যে পাউবোর জমি দখল ত্যাগের নির্দেশ দেন পটুয়াখালীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব)। বলা হয়, ‘এ সময়ের মধ্যে যদি জাকিয়া তাজিন জমির দখল ত্যাগ করতে সম্মত না হন অথবা অস্বীকার করেন, তাহলে উচ্ছেদ করে দখল গ্রহণ করা হবে।’ অথচ এই নোটিশের চার মাস অতিবাহিত হওয়ার পরও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

তাজিন যা বললেন : রোববার এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে অ্যাগ্রো ইনডেক্স গ্র“পের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোবাইল ফোনে জাকিয়া তাজিন যুগান্তরকে বলেন, ‘আমি একজন মহিলা উদ্যোক্তা। উপরন্তু করোনা পরিস্থিতির কারণে সেভাবে কোনো কাজই করতে পারিনি। পানি উন্নয়ন বোর্ডের উচ্ছেদ নোটিশের বিপরীতে আমরা আপিল করে উচ্ছেদ স্থগিতাদেশ পেয়েছিলাম। আবার পাউবো সেই আদেশের বিপরীতে আপিল করলে আদেশটি বাতিল করা হয়। এরপর এখন আবার আমরা উচ্চ আদালতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি।’ ঋণের কোনো কিস্তি পরিশোধ করেছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে বলার মতো সময় হয়নি।’

এর আগে গত বছরের ২০ আগস্ট জাকিয়া তাজিন যুগান্তরকে বলেন, ইনডেক্স গ্র“পের চেয়ারম্যান শহীদুল্লাহ আল মুনির জমিটি কেনার প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত ছিলেন। তবে জমি রেজিস্ট্রি এবং নামজারি হয়েছে আমার নামে।’ প্রসঙ্গত, শহীদুল্লাহ মুনির বর্তমানে কারাগারে আছেন। জাকিয়া তাজিন তার সাবেক স্ত্রী।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন