লাগাম টানতে কমিটি গঠন
jugantor
ই-কমার্সের প্রতারণা
লাগাম টানতে কমিটি গঠন

  মিজান চৌধুরী  

২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ই-কমার্স খাতে প্রতারণার লাগাম টানা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে অতিরিক্ত সচিব (আইআইটি) এএইচএম সফিকুজ্জামানকে প্রধান করে ১৬ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। করণীয় নির্ধারণ করে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে তারা রিপোর্ট দেবে। পাশাপাশি একটি কমার্স ডিজিটাল আইন এবং রেগুলেটরি অথরিটি দাঁড় করাতে কাজ করবে। এক্ষেত্রে কমিটিকে দুমাস সময় দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে যেসব ই-কমার্স বাজারে ব্যবসা করছে তাদের নিবন্ধন প্রক্রিয়া শিগগিরই শুরু হবে। এটি সম্পন্ন করতে কাজ করছে মন্ত্রণালয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া গেছে এসব তথ্য। প্রতারক প্রতিষ্ঠান যুবক ও ডেসটিনির গ্রাহকদের পাওনা ফেরত দেওয়ার ব্যাপারে এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেনি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। অপরদিকে প্রতারক প্রতিষ্ঠান ইভ্যালির কাছে পাওনার তথ্য দিয়ে গ্রাহক পর্যায়ের অসংখ্য চিঠি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে জমা পড়ছে।

জানতে চাইলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব এবং ই-কমার্স সেলের প্রধান মো. হাফিজুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, ই-কমার্স খাতকে শৃঙ্খলায় আনতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পৃথক আইন, কর্তৃপক্ষ গঠন করা হবে। এজন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি এ খাতে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে কী করণীয় তা ঠিক করবে। পাশাপাশি আইন প্রণয়ন ও কর্তৃপক্ষ গঠনের ব্যাপারে সহায়তা করবে।

সম্প্রতি কয়েকটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান নানাভাবে অনিয়ম করছে। এদের ব্যবসায়িক কার্যক্রমের সঙ্গে কয়েকটি মন্ত্রণালয় জড়িত। ফলে তাদের প্রতারণা বন্ধ করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সহায়তা দরকার। যে কারণে ১৬ সদস্যের ওই কমিটিতে অর্থ মন্ত্রণালয়, আইন মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, তথ্য মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

কমিটির এক সদস্য জানান, প্রতারণা বন্ধ করতে তারা প্রতিটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করবেন। বিদ্যমান আইনে রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করতে হবে। ফলে কোনো ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান অনিয়ম করলে তাকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত ১ হাজার ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তাদের নিবন্ধনের আওতায় আনা হবে। এ নিয়ে মন্ত্রণালয় কাজ শুরু করেছে। এসব প্রতিষ্ঠানকে নিবন্ধনের আওতায় আনার জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় দিয়ে প্রচার-প্রচারণা করা হবে। তালিকার বাইরে যেসব প্রতিষ্ঠান আছে তাদেরও এর আওতায় আনা হবে।

এদিকে ইভ্যালির কাছে পাওনা দাবি করে বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠান বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে লিখিতভাবে জানাচ্ছে। মোবাইল ফোন প্রস্তুতকারক কোম্পানি ম্যাকটেলের চিফ ফিন্যান্সিয়াল অফিসার মো. আলী হোসেন খান সম্প্রতি বাণিজ্য সচিবকে ইভ্যালির কাছে ১ কোটি ১১ লাখ ৮৯ হাজার ৫৩৬ টাকা পাওনার কথা চিঠির মাধ্যমে জানিয়েছে। তিনি বলেন, ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ইভ্যালির সঙ্গে ব্যবসায়িক চুক্তিবদ্ধ হয়ে ব্যবসা পরিচালনা করার প্রথমদিকে তাদের লেনদেন স্বচ্ছ ছিল। কিন্তু ব্যবসার সময় বৃদ্ধির সঙ্গে তাদের রূপ পরিবর্তন হতে থাকে। দিনের পর দিন পাওনা টাকা নিয়ে টালবাহান করতে থাকে। পণ্যের মূল্য বাবদ ইভ্যালি চেক ইস্যু করলেও তা ব্যাংক থেকে প্রত্যাখ্যান করা হয়। এরই মধ্যে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে আমাদের পাওনা টাকা আদায় অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এতে আমাদের কোম্পানি আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। এ ধরনের আরও অনেক করপোরেট পাওনাদার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে ইভ্যালির বিরুদ্ধে লিখিত আবেদন করেছেন।

জানা গেছে, ই-কমার্সের মাধ্যমে বিদেশে অর্থ পাচার করতে না পারে সেজন্য বাংলাদেশ ব্যাংক এ বিষয়ে কাজ শুরু করেছে। বিদ্যমান মানি লন্ডারিং আইন সংশোধন করে ই-কমার্সকে ওই আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এই আইনটি সংশোধনের ব্যাপারে এর আগে বাণিজ্যমন্ত্রী এবং আইনমন্ত্রী একমত পোষণ করেছেন। বর্তমান সিআইডি ১১টি ই-কমার্সের অর্থ পাচার করেছে কিনা সেটি তদন্ত করে দেখছে।

এদিকে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি রোববার বলেছেন, যুবক ও ডেসটিনির সম্পত্তি বিক্রি করে গ্রাহকদের পাওনার ৫০ শতাংশ মেটানো সম্ভব। এ ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে কোনো কাজ শুরু করেনি। জানতে চাইলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (বাণিজ্য সংগঠন) সোলেয়মান খান যুগান্তরকে বলেন, মন্ত্রী বা সচিব পর্যায় থেকে এখনো পর্যন্ত যুবক ও ডেসটিনি সংক্রান্ত কোনো বিষয়ের নির্দেশনা আমার কাছে আসেনি।

জানা গেছে, যুবকের সাড়ে তিন লাখ গ্রাহকের কাছ থেকে ২২শ কোটি টাকা নিয়েছে প্রতারণার মাধ্যমে। যুবকের গ্রাহকদের অর্থ দিয়ে কেনা সম্পত্তির মূল্য আছে ৬১২৫ কোটি টাকা। একটি আইনের সংশোধনীর অভাবে সম্পত্তি টাকার পরও ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের টাকা ফেরত দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, ই-কমার্স খাতকে সংশোধন করতে হলে ডিজিটাল কমার্স সেল কার্যকর, ডিজিটাল কমার্স পলিসি-২০১৮ অনুযায়ী কমিটি গঠন, ব্যাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে ক্রেতা সেবা চালু, ডাক বিভাগের মাধ্যমে সংযুক্ত করে পণ্যের ডেলিভারি, ডিজিটাল কমপ্লেইন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম চালু করা দরকার।

ই-কমার্সের প্রতারণা

লাগাম টানতে কমিটি গঠন

 মিজান চৌধুরী 
২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ই-কমার্স খাতে প্রতারণার লাগাম টানা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে অতিরিক্ত সচিব (আইআইটি) এএইচএম সফিকুজ্জামানকে প্রধান করে ১৬ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। করণীয় নির্ধারণ করে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে তারা রিপোর্ট দেবে। পাশাপাশি একটি কমার্স ডিজিটাল আইন এবং রেগুলেটরি অথরিটি দাঁড় করাতে কাজ করবে। এক্ষেত্রে কমিটিকে দুমাস সময় দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে যেসব ই-কমার্স বাজারে ব্যবসা করছে তাদের নিবন্ধন প্রক্রিয়া শিগগিরই শুরু হবে। এটি সম্পন্ন করতে কাজ করছে মন্ত্রণালয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া গেছে এসব তথ্য। প্রতারক প্রতিষ্ঠান যুবক ও ডেসটিনির গ্রাহকদের পাওনা ফেরত দেওয়ার ব্যাপারে এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেনি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। অপরদিকে প্রতারক প্রতিষ্ঠান ইভ্যালির কাছে পাওনার তথ্য দিয়ে গ্রাহক পর্যায়ের অসংখ্য চিঠি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে জমা পড়ছে।

জানতে চাইলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব এবং ই-কমার্স সেলের প্রধান মো. হাফিজুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, ই-কমার্স খাতকে শৃঙ্খলায় আনতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পৃথক আইন, কর্তৃপক্ষ গঠন করা হবে। এজন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি এ খাতে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে কী করণীয় তা ঠিক করবে। পাশাপাশি আইন প্রণয়ন ও কর্তৃপক্ষ গঠনের ব্যাপারে সহায়তা করবে।

সম্প্রতি কয়েকটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান নানাভাবে অনিয়ম করছে। এদের ব্যবসায়িক কার্যক্রমের সঙ্গে কয়েকটি মন্ত্রণালয় জড়িত। ফলে তাদের প্রতারণা বন্ধ করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সহায়তা দরকার। যে কারণে ১৬ সদস্যের ওই কমিটিতে অর্থ মন্ত্রণালয়, আইন মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, তথ্য মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

কমিটির এক সদস্য জানান, প্রতারণা বন্ধ করতে তারা প্রতিটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করবেন। বিদ্যমান আইনে রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করতে হবে। ফলে কোনো ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান অনিয়ম করলে তাকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত ১ হাজার ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তাদের নিবন্ধনের আওতায় আনা হবে। এ নিয়ে মন্ত্রণালয় কাজ শুরু করেছে। এসব প্রতিষ্ঠানকে নিবন্ধনের আওতায় আনার জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় দিয়ে প্রচার-প্রচারণা করা হবে। তালিকার বাইরে যেসব প্রতিষ্ঠান আছে তাদেরও এর আওতায় আনা হবে।

এদিকে ইভ্যালির কাছে পাওনা দাবি করে বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠান বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে লিখিতভাবে জানাচ্ছে। মোবাইল ফোন প্রস্তুতকারক কোম্পানি ম্যাকটেলের চিফ ফিন্যান্সিয়াল অফিসার মো. আলী হোসেন খান সম্প্রতি বাণিজ্য সচিবকে ইভ্যালির কাছে ১ কোটি ১১ লাখ ৮৯ হাজার ৫৩৬ টাকা পাওনার কথা চিঠির মাধ্যমে জানিয়েছে। তিনি বলেন, ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ইভ্যালির সঙ্গে ব্যবসায়িক চুক্তিবদ্ধ হয়ে ব্যবসা পরিচালনা করার প্রথমদিকে তাদের লেনদেন স্বচ্ছ ছিল। কিন্তু ব্যবসার সময় বৃদ্ধির সঙ্গে তাদের রূপ পরিবর্তন হতে থাকে। দিনের পর দিন পাওনা টাকা নিয়ে টালবাহান করতে থাকে। পণ্যের মূল্য বাবদ ইভ্যালি চেক ইস্যু করলেও তা ব্যাংক থেকে প্রত্যাখ্যান করা হয়। এরই মধ্যে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে আমাদের পাওনা টাকা আদায় অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এতে আমাদের কোম্পানি আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। এ ধরনের আরও অনেক করপোরেট পাওনাদার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে ইভ্যালির বিরুদ্ধে লিখিত আবেদন করেছেন।

জানা গেছে, ই-কমার্সের মাধ্যমে বিদেশে অর্থ পাচার করতে না পারে সেজন্য বাংলাদেশ ব্যাংক এ বিষয়ে কাজ শুরু করেছে। বিদ্যমান মানি লন্ডারিং আইন সংশোধন করে ই-কমার্সকে ওই আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এই আইনটি সংশোধনের ব্যাপারে এর আগে বাণিজ্যমন্ত্রী এবং আইনমন্ত্রী একমত পোষণ করেছেন। বর্তমান সিআইডি ১১টি ই-কমার্সের অর্থ পাচার করেছে কিনা সেটি তদন্ত করে দেখছে।

এদিকে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি রোববার বলেছেন, যুবক ও ডেসটিনির সম্পত্তি বিক্রি করে গ্রাহকদের পাওনার ৫০ শতাংশ মেটানো সম্ভব। এ ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে কোনো কাজ শুরু করেনি। জানতে চাইলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (বাণিজ্য সংগঠন) সোলেয়মান খান যুগান্তরকে বলেন, মন্ত্রী বা সচিব পর্যায় থেকে এখনো পর্যন্ত যুবক ও ডেসটিনি সংক্রান্ত কোনো বিষয়ের নির্দেশনা আমার কাছে আসেনি।

জানা গেছে, যুবকের সাড়ে তিন লাখ গ্রাহকের কাছ থেকে ২২শ কোটি টাকা নিয়েছে প্রতারণার মাধ্যমে। যুবকের গ্রাহকদের অর্থ দিয়ে কেনা সম্পত্তির মূল্য আছে ৬১২৫ কোটি টাকা। একটি আইনের সংশোধনীর অভাবে সম্পত্তি টাকার পরও ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের টাকা ফেরত দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, ই-কমার্স খাতকে সংশোধন করতে হলে ডিজিটাল কমার্স সেল কার্যকর, ডিজিটাল কমার্স পলিসি-২০১৮ অনুযায়ী কমিটি গঠন, ব্যাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে ক্রেতা সেবা চালু, ডাক বিভাগের মাধ্যমে সংযুক্ত করে পণ্যের ডেলিভারি, ডিজিটাল কমপ্লেইন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম চালু করা দরকার।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন