নগদ সহায়তা লোপাটে ১৭ ভাবে জালিয়াতি
jugantor
বাপার তদন্ত প্রতিবেদন
নগদ সহায়তা লোপাটে ১৭ ভাবে জালিয়াতি
এক প্রতিষ্ঠানের পণ্য অন্য নামে রপ্তানি * বেশি পণ্য দেখানো হয় কনটেইনারের আয়তনের চেয়ে

  সাদ্দাম হোসেন ইমরান   

১১ অক্টোবর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

কৃষিজাত পণ্য রপ্তানিকে উৎসাহিত করতে সরকারের দেওয়া নগদ সহায়তা ১৭ ধরনের জালিয়াতির মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়েছে। চুক্তিভিত্তিক উৎপাদন, কনটেইনারের আয়তনের তুলনায় বেশি পণ্য রপ্তানি, এক প্রতিষ্ঠানের পণ্য অন্যের নামে রপ্তানি দেখানোর মাধ্যমে এ কাজ করা হচ্ছে।

এছাড়া রপ্তানির অর্থ তৃতীয় দেশ থেকে প্রত্যাবাসন এবং একটি বিল অফ লেডিংয়ের (বি/এল) বিপরীতে একাধিক ব্যাংক থেকে নগদ সহায়তা তুলে নেয়া হয়েছে।

এসব জালিয়াতিতে সহায়তা করেছে বাংলাদেশ এগ্রো প্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশনের (বাপা) গুটি কয়েক অসাধু কর্মকর্তা। খোদ বাপা গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে এ ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে।

জানা গেছে, ভুয়া রপ্তানি ও সার্টিফিকেট জালসহ নানা অনিয়ম রোধে বাপার ১০৬তম সভায় ৩ সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির চেয়ারম্যান করা হয় সংগঠনের সদস্য নূরুল মঈন মিনুকে। অপর দুই সদস্য হলেন- মে. জে. মোহাম্মদ রুহুল আমিন (অব.) ও গুলজার রহমান বিশ্বাস।

কমিটি ২০১৬-১৭ থেকে ২০১৮-১৯ অর্থবছর পর্যন্ত ৩ অর্থবছরের নগদ সহায়তার তথ্য পর্যালোচনার পর গত বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি নির্বাহী বোর্ডে প্রতিবেদন জমা দেয়। এতে নগদ সহায়তা লোপাটে ১৭ ধরনের জালিয়াতির তথ্য তুলে ধরা হয়। একইসঙ্গে এসব জালিয়াতি রোধে ৫ দফা সুপারিশ করা হয়।

এ বিষয়ে কমিটির চেয়ারম্যান নূরুল মঈন মিনু বলেন, তদন্ত প্রতিবেদন সংগঠনের নির্বাহী বোর্ডে জমা দিয়েছি। বোর্ডে তা অনুমোদিত হয়। এরপর রিপোর্ট অনুযায়ী কী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে তা জানা নেই।

তদন্ত কমিটির এক সদস্য বলেন, প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর সংগঠনের নির্বাহী বোর্ড ও প্রভাবশালী সদস্যদের নজিরবিহীন রোষানলে পড়তে হয়েছে। জালিয়াতি বন্ধে কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন তো দূরের কথা, উলটো আমাদেরই নানাভাবে হয়রানি ও ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে। তিনি আরও বলেন, দেশের স্বার্থে নগদ সহায়তায় যত ধরনের অনিয়ম পাওয়া গেছে তার বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নগদ সহায়তায় অনিয়ম প্রতিরোধে বাপা পণ্য জাহাজে ওঠানো আগে পরিদর্শন (প্রি-শিপমেন্ট ইন্সপেকশন) কার্যক্রম চালু করে। তথ্য যাচাই করে দেখা গেছে, পণ্য জাহাজীকরণের ক্রম অনুযায়ী পরিদর্শন প্রতিবেদন নেই। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরিদর্শন ছাড়াই মালামাল রপ্তানি হয়েছে এবং তার বিপরীতে নগদ সহায়তা সার্টিফিকেট ইস্যু করা হয়েছে। আবার কিছু ক্ষেত্রে পরিদর্শন করা হলেও অফিস রেকর্ডে তা পাওয়া যায়নি। রেজিস্ট্রারেও রপ্তানির পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যায়নি। অনেক কোম্পানির ক্ষেত্রে পণ্য পরিদর্শনও করা হয়নি। বাস্তবে নির্বাহী সদস্যদের এ সিদ্ধান্ত অনিয়ম প্রতিরোধে কিছুটা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলেও অনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তি হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। ফলে এ প্রথা বাস্তবে কোনো অনিয়ম রোধ করতে পারেনি।

এতে আরও বলা হয়েছে, একই মালিক একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিপরীতে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে রপ্তানি করেছে। যা সহায়তা সংক্রান্ত সার্কুলারের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। আবার কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিক নিজেই ভিন্ন ভিন্ন দেশে নিজ কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করে নিজ নামে আমদানি-রপ্তানি করেছেন। এ বিষয়টিও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। এছাড়া কনটেইনারের আয়তনের তুলনায় বেশি রপ্তানি পণ্য দেখানো হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনক্ষমতার তুলনায় বেশি পণ্য রপ্তানি করতেও দেখা গেছে। যা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

বেশি নগদ সহায়তা নিতে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে রপ্তানি মূল্য দেখানো হয়েছে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতে পণ্য রপ্তানি মূল্য অন্য দেশের তুলনায় অনেক কম। ফলে ওভার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে নগদ সহায়তা নেয়া হচ্ছে বলে মনে হয়। যেমন কনটেইনারের রপ্তানি মূল্য ৬০ থেকে ৭৫ হাজার ডলার দেখানো হয়েছে। যার ভলিউম কনটেইনারের ধারণক্ষমতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। আবার চুক্তিভিত্তিক রপ্তানির বিপরীতেও বাপার সার্টিফিকেট দিয়ে নগদ সহায়তা নেয়া হয়েছে। এ ধরনের অনেক সন্দেহজনক রপ্তানির বিপরীতে সার্টিফিকেট ইস্যু করা হয়েছে, যা বিধিসম্মত নয়। বাপার কতিপয় কর্মকর্তা এ কাজে জড়িত।

তদন্ত কমিটির ৮ সুপারিশ : তদন্ত প্রতিবেদনে প্রি-শিপমেন্ট ইন্সপেকশন তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে করানোসহ ৮ দফা সুপারিশ করা হয়। এগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে-সন্দেহজনক রপ্তানি চালান শুল্ক গোয়েন্দার মাধ্যমে পরিদর্শন শেষে বাপার সনদ ইস্যু করা। জালিয়াতি রোধে সনদ ব্যাংকে সংশ্লিষ্ট শাখায় ই-মেইল করা। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাচিত অডিটরদের কাছে সনদের তথ্য পাঠানো। বেশি রপ্তানি মূল্যে কনটেইনার সম্পর্কে ঢাকা ও চট্টগ্রাম কাস্টমসকে আগে অবহিত করা। রপ্তানিতে জড়িত প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনক্ষমতা নিরূপণের জন্য স্বীকৃত অথবা তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে পণ্য তালিকা ও উৎপাদন সক্ষমতা নির্ধারণ করা। হাউজ বি/এলের আওতায় বাপা সনদ ইস্যু না করা এবং একটি বি/এলের আওতায় একাধিকবার নগদ সহায়তা গ্রহণ বন্ধে সফটওয়্যারের মাধ্যমে সনদ ইস্যু করা।

এ বিষয়ে বাপা সভাপতি এএফএম ফখরুল ইসলাম মুন্সী বলেন, অনিয়ম রোধে তদন্ত কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে বোর্ড থেকে বলা হয়েছিল। কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে তা সচিব বলতে পারবেন।

সচিব ঈদতাজুল হক বলেন, যে সুপারিশগুলো বাস্তবায়নযোগ্য ছিল সেগুলো বাস্তবায়ন করা হয়েছে।

রপ্তানিকে উৎসাহিত করতে সরকার নগদ সহায়তা দিয়ে আসছে। বর্তমানে ৩৮টি পণ্য রপ্তানিতে ১ থেকে ২০ শতাংশ হারে নগদ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে নগদ সহায়তার জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৭৬২৫ কোটি টাকা। গত অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ৭৩৫০ কোটি টাকা। এ অর্থ হাতিয়ে নিতে রপ্তানিকৃত কনটেইনারের অতিরিক্ত মূল্য দেখানো হয়। আবার অনেক সময় পণ্য রপ্তানি না করেই জাল কাগজপত্রের মাধ্যমে নগদ সহায়তার টাকা তুলে নেয়ার ঘটনা ঘটছে।

সম্প্রতি বিএফআইইউর গোয়েন্দা প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে শুল্ক গোয়েন্দা এমটি এগ্রো নামের এক প্রতিষ্ঠানের রপ্তানির তথ্য যাচাই করে। এতে দেখা যায়, ব্যাংকে যে রপ্তানি বিল (বিল অফ এক্সপোর্ট) জমা দিয়ে নগদ সহায়তা নেয়া হয়েছে, তা জালিয়াতির মাধ্যমে বানানো হয়েছে। রপ্তানি বিলে উল্লিখিত অফডক দিয়ে পণ্য রপ্তানিই হয়নি। আর যে শিপিং এজেন্টের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, তার অস্তিত্বই নেই।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে এমটি এগ্রো ফুড প্রডাক্টের অংশীদার তাজুল ইসলাম টিপু বলেন, পণ্য রপ্তানি না করলে বিদেশ থেকে অর্থ প্রত্যাবাসিত হলো কীভাবে? রপ্তানির স্বপক্ষে সব কাগজপত্র জমা দেয়ার পরই ব্যাংক নগদ সহায়তা দিয়েছে। এখনো কোনো অনিয়ম হয়নি। তৃতীয় দেশ থেকে টাকা আসার বিষয়ে তিনি বলেন, রপ্তানি অর্ডারে এ বিষয়ে উল্লেখ ছিল।

এছাড়া গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম কাস্টমস আরেক কৃষিপণ্য রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের রপ্তানি চালান আটক করে। নথিপত্রে এক লাখ তিন হাজার ডলারের কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য রপ্তানি করার কথা থাকলেও বাস্তবে কায়িক পরীক্ষায় পাওয়া যায় মাত্র পাঁচ হাজার ডলারের পণ্য। জালিয়াতির বিষয়টি যাতে কেউ বুঝতে না পারে, সে জন্য কনটেইনারের দরজার মুখে রপ্তানি পণ্যের বাক্সগুলো সাজিয়ে রাখা হয়েছিল। পেছনে পুরো কনটেইনারই ফাঁকা পাওয়া যায়।

বাপার তদন্ত প্রতিবেদন

নগদ সহায়তা লোপাটে ১৭ ভাবে জালিয়াতি

এক প্রতিষ্ঠানের পণ্য অন্য নামে রপ্তানি * বেশি পণ্য দেখানো হয় কনটেইনারের আয়তনের চেয়ে
 সাদ্দাম হোসেন ইমরান  
১১ অক্টোবর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

কৃষিজাত পণ্য রপ্তানিকে উৎসাহিত করতে সরকারের দেওয়া নগদ সহায়তা ১৭ ধরনের জালিয়াতির মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়েছে। চুক্তিভিত্তিক উৎপাদন, কনটেইনারের আয়তনের তুলনায় বেশি পণ্য রপ্তানি, এক প্রতিষ্ঠানের পণ্য অন্যের নামে রপ্তানি দেখানোর মাধ্যমে এ কাজ করা হচ্ছে।

এছাড়া রপ্তানির অর্থ তৃতীয় দেশ থেকে প্রত্যাবাসন এবং একটি বিল অফ লেডিংয়ের (বি/এল) বিপরীতে একাধিক ব্যাংক থেকে নগদ সহায়তা তুলে নেয়া হয়েছে।

এসব জালিয়াতিতে সহায়তা করেছে বাংলাদেশ এগ্রো প্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশনের (বাপা) গুটি কয়েক অসাধু কর্মকর্তা। খোদ বাপা গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে এ ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে। 

জানা গেছে, ভুয়া রপ্তানি ও সার্টিফিকেট জালসহ নানা অনিয়ম রোধে বাপার ১০৬তম সভায় ৩ সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির চেয়ারম্যান করা হয় সংগঠনের সদস্য নূরুল মঈন মিনুকে। অপর দুই সদস্য হলেন- মে. জে. মোহাম্মদ রুহুল আমিন (অব.) ও গুলজার রহমান বিশ্বাস।

কমিটি ২০১৬-১৭ থেকে ২০১৮-১৯ অর্থবছর পর্যন্ত ৩ অর্থবছরের নগদ সহায়তার তথ্য পর্যালোচনার পর গত বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি নির্বাহী বোর্ডে প্রতিবেদন জমা দেয়। এতে নগদ সহায়তা লোপাটে ১৭ ধরনের জালিয়াতির তথ্য তুলে ধরা হয়। একইসঙ্গে এসব জালিয়াতি রোধে ৫ দফা সুপারিশ করা হয়। 

এ বিষয়ে কমিটির চেয়ারম্যান নূরুল মঈন মিনু বলেন, তদন্ত প্রতিবেদন সংগঠনের নির্বাহী বোর্ডে জমা দিয়েছি। বোর্ডে তা অনুমোদিত হয়। এরপর রিপোর্ট অনুযায়ী কী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে তা জানা নেই। 

তদন্ত কমিটির এক সদস্য বলেন, প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর সংগঠনের নির্বাহী বোর্ড ও প্রভাবশালী সদস্যদের নজিরবিহীন রোষানলে পড়তে হয়েছে। জালিয়াতি বন্ধে কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন তো দূরের কথা, উলটো আমাদেরই নানাভাবে হয়রানি ও ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে। তিনি আরও বলেন, দেশের স্বার্থে নগদ সহায়তায় যত ধরনের অনিয়ম পাওয়া গেছে তার বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। 

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নগদ সহায়তায় অনিয়ম প্রতিরোধে বাপা পণ্য জাহাজে ওঠানো আগে পরিদর্শন (প্রি-শিপমেন্ট ইন্সপেকশন) কার্যক্রম চালু করে। তথ্য যাচাই করে দেখা গেছে, পণ্য জাহাজীকরণের ক্রম অনুযায়ী পরিদর্শন প্রতিবেদন নেই। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরিদর্শন ছাড়াই মালামাল রপ্তানি হয়েছে এবং তার বিপরীতে নগদ সহায়তা সার্টিফিকেট ইস্যু করা হয়েছে। আবার কিছু ক্ষেত্রে পরিদর্শন করা হলেও অফিস রেকর্ডে তা পাওয়া যায়নি। রেজিস্ট্রারেও রপ্তানির পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যায়নি। অনেক কোম্পানির ক্ষেত্রে পণ্য পরিদর্শনও করা হয়নি। বাস্তবে নির্বাহী সদস্যদের এ সিদ্ধান্ত অনিয়ম প্রতিরোধে কিছুটা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলেও অনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তি হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। ফলে এ প্রথা বাস্তবে কোনো অনিয়ম রোধ করতে পারেনি।

এতে আরও বলা হয়েছে, একই মালিক একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিপরীতে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে রপ্তানি করেছে। যা সহায়তা সংক্রান্ত সার্কুলারের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। আবার কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিক নিজেই ভিন্ন ভিন্ন দেশে নিজ কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করে নিজ নামে আমদানি-রপ্তানি করেছেন। এ বিষয়টিও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। এছাড়া কনটেইনারের আয়তনের তুলনায় বেশি রপ্তানি পণ্য দেখানো হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনক্ষমতার তুলনায় বেশি পণ্য রপ্তানি করতেও দেখা গেছে। যা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। 

বেশি নগদ সহায়তা নিতে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে রপ্তানি মূল্য দেখানো হয়েছে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতে পণ্য রপ্তানি মূল্য অন্য দেশের তুলনায় অনেক কম। ফলে ওভার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে নগদ সহায়তা নেয়া হচ্ছে বলে মনে হয়। যেমন কনটেইনারের রপ্তানি মূল্য ৬০ থেকে ৭৫ হাজার ডলার দেখানো হয়েছে। যার ভলিউম কনটেইনারের ধারণক্ষমতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। আবার চুক্তিভিত্তিক রপ্তানির বিপরীতেও বাপার সার্টিফিকেট দিয়ে নগদ সহায়তা নেয়া হয়েছে। এ ধরনের অনেক সন্দেহজনক রপ্তানির বিপরীতে সার্টিফিকেট ইস্যু করা হয়েছে, যা বিধিসম্মত নয়। বাপার কতিপয় কর্মকর্তা এ কাজে জড়িত। 

তদন্ত কমিটির ৮ সুপারিশ : তদন্ত প্রতিবেদনে প্রি-শিপমেন্ট ইন্সপেকশন তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে করানোসহ ৮ দফা সুপারিশ করা হয়। এগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে-সন্দেহজনক রপ্তানি চালান শুল্ক গোয়েন্দার মাধ্যমে পরিদর্শন শেষে বাপার সনদ ইস্যু করা। জালিয়াতি রোধে সনদ ব্যাংকে সংশ্লিষ্ট শাখায় ই-মেইল করা। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাচিত অডিটরদের কাছে সনদের তথ্য পাঠানো। বেশি রপ্তানি মূল্যে কনটেইনার সম্পর্কে ঢাকা ও চট্টগ্রাম কাস্টমসকে আগে অবহিত করা। রপ্তানিতে জড়িত প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনক্ষমতা নিরূপণের জন্য স্বীকৃত অথবা তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে পণ্য তালিকা ও উৎপাদন সক্ষমতা নির্ধারণ করা। হাউজ বি/এলের আওতায় বাপা সনদ ইস্যু না করা এবং একটি বি/এলের আওতায় একাধিকবার নগদ সহায়তা গ্রহণ বন্ধে সফটওয়্যারের মাধ্যমে সনদ ইস্যু করা। 

এ বিষয়ে বাপা সভাপতি এএফএম ফখরুল ইসলাম মুন্সী বলেন, অনিয়ম রোধে তদন্ত কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে বোর্ড থেকে বলা হয়েছিল। কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে তা সচিব বলতে পারবেন। 

সচিব ঈদতাজুল হক বলেন, যে সুপারিশগুলো বাস্তবায়নযোগ্য ছিল সেগুলো বাস্তবায়ন করা হয়েছে। 

রপ্তানিকে উৎসাহিত করতে সরকার নগদ সহায়তা দিয়ে আসছে। বর্তমানে ৩৮টি পণ্য রপ্তানিতে ১ থেকে ২০ শতাংশ হারে নগদ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে নগদ সহায়তার জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৭৬২৫ কোটি টাকা। গত অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ৭৩৫০ কোটি টাকা। এ অর্থ হাতিয়ে নিতে রপ্তানিকৃত কনটেইনারের অতিরিক্ত মূল্য দেখানো হয়। আবার অনেক সময় পণ্য রপ্তানি না করেই জাল কাগজপত্রের মাধ্যমে নগদ সহায়তার টাকা তুলে নেয়ার ঘটনা ঘটছে। 

সম্প্রতি বিএফআইইউর গোয়েন্দা প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে শুল্ক গোয়েন্দা এমটি এগ্রো নামের এক প্রতিষ্ঠানের রপ্তানির তথ্য যাচাই করে। এতে দেখা যায়, ব্যাংকে যে রপ্তানি বিল (বিল অফ এক্সপোর্ট) জমা দিয়ে নগদ সহায়তা নেয়া হয়েছে, তা জালিয়াতির মাধ্যমে বানানো হয়েছে। রপ্তানি বিলে উল্লিখিত অফডক দিয়ে পণ্য রপ্তানিই হয়নি। আর যে শিপিং এজেন্টের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, তার অস্তিত্বই নেই।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে এমটি এগ্রো ফুড প্রডাক্টের অংশীদার তাজুল ইসলাম টিপু বলেন, পণ্য রপ্তানি না করলে বিদেশ থেকে অর্থ প্রত্যাবাসিত হলো কীভাবে? রপ্তানির স্বপক্ষে সব কাগজপত্র জমা দেয়ার পরই ব্যাংক নগদ সহায়তা দিয়েছে। এখনো কোনো অনিয়ম হয়নি। তৃতীয় দেশ থেকে টাকা আসার বিষয়ে তিনি বলেন, রপ্তানি অর্ডারে এ বিষয়ে উল্লেখ ছিল।

এছাড়া গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম কাস্টমস আরেক কৃষিপণ্য রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের রপ্তানি চালান আটক করে। নথিপত্রে এক লাখ তিন হাজার ডলারের কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য রপ্তানি করার কথা থাকলেও বাস্তবে কায়িক পরীক্ষায় পাওয়া যায় মাত্র পাঁচ হাজার ডলারের পণ্য। জালিয়াতির বিষয়টি যাতে কেউ বুঝতে না পারে, সে জন্য কনটেইনারের দরজার মুখে রপ্তানি পণ্যের বাক্সগুলো সাজিয়ে রাখা হয়েছিল। পেছনে পুরো কনটেইনারই ফাঁকা পাওয়া যায়।
 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন