‘প্রেস রিলিজ’ কমিটিতে মশগুল ছাত্রলীগ
jugantor
আ.লীগের কেন্দ্রীয় নেতারাও বিব্রত বিরক্ত
‘প্রেস রিলিজ’ কমিটিতে মশগুল ছাত্রলীগ

  হাসিবুল হাসান  

১৫ অক্টোবর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

খোদ প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার নির্দেশনা অমান্য করে সম্মেলন ছাড়াই ‘প্রেস রিলিজ’ দিয়ে কমিটি ঘোষণা অব্যাহত রেখেছে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ।

বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি দলীয় কয়েকটি সভায় কেন্দ্রীয় কয়েকজন নেতাও এভাবে কমিটি গঠনের কড়া সমালোচনা করেন। অপরদিকে এ ধরনের প্রেস রিলিজ কমিটির প্রায় সবকটি নিয়েই রয়েছে বিস্তর অভিযোগ।

কমিটি প্রত্যাখ্যান করে প্রতিবাদ মিছিল ও সমাবেশ হয়েছে। এমনকি কমিটি গঠন নিয়ে অর্থ লেনদেনের মতো স্পর্শকাতর অভিযোগের তোপ দাগছেন কেউ কেউ। এছাড়া ছাত্রদল ও শিবিরকর্মীদের কমিটিতে জায়গা দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগও এখন বেশ চাউর। সৃষ্টি হচ্ছে নানা বিতর্ক।

এদিকে যথাসময়ে কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে সাংগঠনিক দায়িত্ব বণ্টন না করা এবং সাংগঠনিক ইউনিটগুলোর সম্মেলন না হওয়ায় অনেকটা অগোছাল হয়ে পড়েছে ঐতিহ্যবাহী সংগঠনটি। এতে হতাশ সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কমিটির অনেক নেতাও। গৌরবোজ্জ্বল ছাত্র সংগঠনটির দেখভালের দায়িত্বে থাকা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা এ নিয়ে ত্যক্তবিরক্ত ও বিব্রত। যুগান্তরকে এমনটিই জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র।

সম্মেলন না করে ঢাকায় বসে প্রেস রিলিজ দিয়ে কমিটি ঘোষণা প্রসঙ্গে ছাত্রলীগ সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় বুধবার যুগান্তরকে বলেন, ‘আমাদের আগে যারা ছিলেন, তারাও কিন্তু সম্মেলন শেষ করে ঢাকায় ফিরে এসে পরে কমিটি দিয়েছেন। আর আমরা তো আগেই বলেছি, করোনার জন্য সম্মেলন করতে পারিনি।

তাই যেখানে যেখানে দরকার ছিল, সবার সঙ্গে কথা বলেই আমরা কমিটি করেছি।’ ঘোষিত কমিটি নিয়ে অভিযোগ ও বিতর্কের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘প্রতিটি কমিটি গঠনের আগেই কিন্তু অনেক সিভি (জীবনবৃত্তান্ত) জমা পড়ে।

সেখানে সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক পদে যোগ্য প্রার্থী থাকেন অনেকেই। কিন্তু পদের সীমাবদ্ধতার কারণে আমরা সবাইকে তো জায়গা দিতে পারি না। তাই কিছু মানুষ কষ্ট পায়। কেউ কেউ প্রতিক্রিয়া দেখায়।’

ছাত্রলীগ সভাপতি জানান, ‘করোনাকালীন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ নানা কর্মসূচি নিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। করোনার জন্য আমরা সাংগঠনিক সফর শুরু করতে পারিনি।

কয়েকদিনের মধ্যেই সাংগঠনিক দায়িত্ব বণ্টন করে দেব। এছাড়া এ মাসেই সাংগঠনিক সফর শুরু হবে। ইতোমধ্যে জেলা সম্মেলন শুরু করার জন্য সংশ্লিষ্ট জেলা নেতাদের সঙ্গে কথা বলা শুরু করেছি।’

করোনাকালীন ২০২০ সালের অক্টোবরে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। ছাত্রলীগ করোনার দোহাই দিয়ে সম্মেলন ছাড়া কমিটি ঘোষণা করলেও সেদিনের বৈঠকে দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা সম্মেলন ছাড়া আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনগুলোয় কমিটি গঠন না করার নির্দেশনা দেন।

সভা শেষে ওইদিন বিকালে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেন, ‘নেত্রী (আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা) সম্মেলন ছাড়া কমিটি গঠন করতে নিষেধ করেছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট এলাকায় গিয়ে সম্মেলনের মাধ্যমে কমিটি করতে হবে। এর ফলে মাঠের লোকরাই নেতা হবেন। কিন্তু সম্মেলন ছাড়া কমিটি হলে লবিংয়ে বা তদবিরের লোক নেতা হয়। এজন্য প্রধানমন্ত্রী সম্মেলনের ওপরই বেশি জোর দিয়েছেন।’

প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালের ১১ ও ১২ মে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এর দুই মাস পর ২০১৮ সালের ৩১ জুলাই গঠিত হয় কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদ।

সে হিসাবে দুই বছর মেয়াদি কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের মেয়াদ শেষ হয়েছে গত বছরের ৩১ জুলাই। এর আগে ২৯তম সম্মেলনের মাধ্যমে ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন এবং সাধারণ সম্পাদক হন গোলাম রাব্বানী।

তবে এক বছর গড়াতেই অনিয়ম ও চাঁদাবাজির অভিযোগে শোভন-রাব্বানীকে ২০১৯ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর অপসারণ করা হয়। শোভন-রাব্বানীকে অপসারণের পর গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, এক নম্বর সহসভাপতি আল নাহিয়ান খান জয়কে সভাপতি ও এক নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্যকে ভারপ্রাপ্ত হিসাবে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয়। কয়েক মাস ভারপ্রাপ্ত হিসাবে দায়িত্ব পালন করলেও ২০২০ সালের ৪ জানুয়ারি তাদের ভারমুক্ত করে পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব দেওয়া হয়। এদিকে করোনা মহামারি ও বন্যাসহ বিভিন্ন সংকটে মানুষের পাশে দাঁড়ালেও সাংগঠনিক কার্যক্রম গোছাতে পারেননি নতুন নেতারা।

সম্প্রতি ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য যুগান্তরকে জানান, ‘তারা দায়িত্ব পাওয়ার সময় প্রায় সব ইউনিট মেয়াদোত্তীর্ণ ছিল। তবে কাজ শুরু করার পর তারা পর্যায়ক্রমে ৩১টি ইউনিটের কমিটি দিয়েছেন। এর মধ্যে জেলা ও মহানগর কমিটি রয়েছে ১৯টির মতো।’

ছাত্রলীগের দপ্তর সূত্রে জানা যায়, জেলা নতুন কমিটি হয়েছে মোট ২১টি। এর মধ্যে ২০১৯ সালে হয়েছে ১টি, ২০২০ সালে ৫টি এবং ২০২১ সালে ১৫টি নতুন কমিটি ঘোষিত হয়েছে। জেলায় পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয়েছে মোট ১৪টি। এর মধ্যে ২০১৯ সালে চারটি, ২০২০ সালে ৬টি এবং ২০২১ সালে ৪টি কমিটি পূর্ণাঙ্গ হয়েছে।

এছাড়া ২০২০ সালে সম্মিলিত মেডিকেল কলেজ শাখার নতুন কমিটি ঘোষিত হয়। তাছাড়া একই বছর ৬টি মেডিকেল শাখা ছাত্রলীগের নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়।

২০২১ সালে আরও ৬টি মেডিকেলের নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়। অর্থাৎ ইতোমধ্যে সম্মিলিত মেডিকেল কলেজ ছাত্রলীগ এবং মেডিকেল কলেজ ছাত্রলীগের ১২টি ইউনিটসহ মোট ১৩টি কমিটি ঘোষিত হয়েছে। তবে ঢাকায় বসে ঘোষণা করা এসব কমিটি নিয়ে বেশির ভাগ জায়গায় ক্ষোভ-বিক্ষোভের ঘটনা ঘটেছে।

সবশেষ গত মঙ্গলবার এ রকম ঘটনা ঘটে সিলেটে। ওইদিন জেলা ও মহানগর ছাত্রলীগের আংশিক কমিটি ঘোষণার পর তা প্রত্যাখ্যান করে সড়ক অবরোধ ও টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ মিছিল করে ছাত্রলীগের একটি অংশ। অর্থের বিনিময়ে কমিটির শীর্ষপদ বিক্রির অভিযোগ এনেছেন তারা। এভাবে কমিটি করায় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের এক অংশও ক্ষোভ প্রকাশ করে। এভাবে কমিটি ঘোষণা করাকে তারা গঠনতন্ত্রবিরোধী আখ্যা দিয়েছেন। এদিন এর প্রতিবাদে কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে দুই সদস্য পদত্যাগও করেন। এর আগে ৩০ জুলাই ঠাকুরগাঁও জেলা ছাত্রলীগের আংশিক কমিটি ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় কমিটি। রাতে ঘোষণার পর কমিটিতে জায়গা না পাওয়া নেতারা বিক্ষোভ করেন। কক্সবাজার জেলা ছাত্রলীগের কমিটি ঘোষণার পরও বিক্ষোভ হয়।

এদিকে সম্মেলন ছাড়া কমিটি গঠন করা নিয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদেরও প্রকাশ্যে বিরক্তি প্রকাশ করতে দেখা গেছে। ২২ আগস্ট বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ আয়োজিত আলোচনাসভায় আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, ‘ছাত্রলীগ আমাদের আস্থার ঠিকানা, নির্ভরতার জায়গা। কিন্তু মনে রাখতে হবে, এভাবে চলতে পারে না। এভাবে চলবে না। সংগঠন দাঁড় করাতে হবে।

তিনি আরও বলেন, যাদের সম্মেলনের মেয়াদ শেষ হয়েছে, তাদের সময় দিতে হবে। একটা নির্দিষ্ট তারিখের মধ্যে কমিটি গঠন করবেন, না হলে সেই কমিটি ওই তারিখে বিলুপ্ত বা বাতিল হয়ে যাবে। তখন সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির মাধ্যমে সম্মেলন করে কমিটি ঘোষণা করতে হবে। ঢাকা থেকে কমিটি ঘোষণা দিয়েন না। এই কমিটি দিয়ে কোনো কাজ হবে না।’

এর একদিন আগে ২০ আগস্ট একই স্থানে অপর এক অনুষ্ঠানে সম্মেলন ছাড়া প্রেস রিলিজের মাধ্যমে বিভিন্ন কমিটি গঠনের সমালোচনা করেন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম। তিনি বলেন, ‘কিছুদিন ধরে সম্মেলন ছাড়াই কমিটি গঠন হচ্ছে। সিভি নেওয়ার মাধ্যমে বিভিন্ন জেলা কমিটি তারা প্রদান করে আসছে। আসলে ছাত্রলীগ একটি ঐতিহ্য, ছাত্রলীগ একটি কৃষ্টি। ছাত্রলীগ যদি কোনো জায়গায় ভুল করে, তাহলে সবাই কিন্তু এই ভুলটা করবে।’

ওই বক্তৃতায় আগামী দিনে প্রেস রিলিজের মাধ্যমে কমিটি গঠন না করার জন্য ছাত্রলীগ সভাপতি-সাধারণ সম্পাদককে অনুরোধ জানান মির্জা আজম।

এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়, জেলাসহ বিভিন্ন ইউনিটের সম্মেলন না হওয়া, গঠনতন্ত্র না মানা, প্রেস বিজ্ঞপ্তিনির্ভর কমিটি দেওয়াসহ নানা কারণে সাংগঠনিকভাবে স্থবির হয়ে পড়েছে ছাত্রলীগ। অন্যদিকে এখনো সাংগঠনিক দায়িত্ব বণ্টন করে না দেওয়ায় ক্ষুব্ধ কেন্দ্রীয় কমিটির বেশ কয়েকজন নেতা।

‘মেয়াদ শেষ’ হওয়ার পরে এখন দায়িত্ব বণ্টনের উদ্যোগ নিলেও দায়িত্ব নিতে রাজি নন অনেক নেতা। ছাত্রলীগের একটি সূত্র জানায়, এখন দায়িত্ব বণ্টন করা হলে কেন্দ্রীয় কমিটির অন্তত ২০ জনের মতো নেতা পদত্যাগ করতে পারেন। তারা বলছেন, ‘কেন্দ্রীয় কমিটিরই মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে।

এখন আর দায়িত্ব বণ্টন করে লাভ কী?’ ছাত্রলীগের সহসভাপতি সৈয়দ আরিফ হোসেন সম্প্রতি এ বিষয়ে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন। সেখানে তিনি লিখেছেন, ‘ইতোমধ্যে মেয়াদ শেষ হওয়া ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতাদের জেলাভিত্তিক দায়িত্ব বণ্টন করা হলে সেটি হবে আরও একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।’

সূত্র জানায়, তার মতো সংক্ষুব্ধ আরও কয়েকজন নেতা এ বিষয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাসে তাদের ক্ষোভের কথা তুলে ধরেন।

আ.লীগের কেন্দ্রীয় নেতারাও বিব্রত বিরক্ত

‘প্রেস রিলিজ’ কমিটিতে মশগুল ছাত্রলীগ

 হাসিবুল হাসান 
১৫ অক্টোবর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

খোদ প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার নির্দেশনা অমান্য করে সম্মেলন ছাড়াই ‘প্রেস রিলিজ’ দিয়ে কমিটি ঘোষণা অব্যাহত রেখেছে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ।

বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি দলীয় কয়েকটি সভায় কেন্দ্রীয় কয়েকজন নেতাও এভাবে কমিটি গঠনের কড়া সমালোচনা করেন। অপরদিকে এ ধরনের প্রেস রিলিজ কমিটির প্রায় সবকটি নিয়েই রয়েছে বিস্তর অভিযোগ।

কমিটি প্রত্যাখ্যান করে প্রতিবাদ মিছিল ও সমাবেশ হয়েছে। এমনকি কমিটি গঠন নিয়ে অর্থ লেনদেনের মতো স্পর্শকাতর অভিযোগের তোপ দাগছেন কেউ কেউ। এছাড়া ছাত্রদল ও শিবিরকর্মীদের কমিটিতে জায়গা দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগও এখন বেশ চাউর। সৃষ্টি হচ্ছে নানা বিতর্ক।

এদিকে যথাসময়ে কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে সাংগঠনিক দায়িত্ব বণ্টন না করা এবং সাংগঠনিক ইউনিটগুলোর সম্মেলন না হওয়ায় অনেকটা অগোছাল হয়ে পড়েছে ঐতিহ্যবাহী সংগঠনটি। এতে হতাশ সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কমিটির অনেক নেতাও। গৌরবোজ্জ্বল ছাত্র সংগঠনটির দেখভালের দায়িত্বে থাকা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা এ নিয়ে ত্যক্তবিরক্ত ও বিব্রত। যুগান্তরকে এমনটিই জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র।

সম্মেলন না করে ঢাকায় বসে প্রেস রিলিজ দিয়ে কমিটি ঘোষণা প্রসঙ্গে ছাত্রলীগ সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় বুধবার যুগান্তরকে বলেন, ‘আমাদের আগে যারা ছিলেন, তারাও কিন্তু সম্মেলন শেষ করে ঢাকায় ফিরে এসে পরে কমিটি দিয়েছেন। আর আমরা তো আগেই বলেছি, করোনার জন্য সম্মেলন করতে পারিনি।

তাই যেখানে যেখানে দরকার ছিল, সবার সঙ্গে কথা বলেই আমরা কমিটি করেছি।’ ঘোষিত কমিটি নিয়ে অভিযোগ ও বিতর্কের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘প্রতিটি কমিটি গঠনের আগেই কিন্তু অনেক সিভি (জীবনবৃত্তান্ত) জমা পড়ে।

সেখানে সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক পদে যোগ্য প্রার্থী থাকেন অনেকেই। কিন্তু পদের সীমাবদ্ধতার কারণে আমরা সবাইকে তো জায়গা দিতে পারি না। তাই কিছু মানুষ কষ্ট পায়। কেউ কেউ প্রতিক্রিয়া দেখায়।’

ছাত্রলীগ সভাপতি জানান, ‘করোনাকালীন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ নানা কর্মসূচি নিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। করোনার জন্য আমরা সাংগঠনিক সফর শুরু করতে পারিনি।

কয়েকদিনের মধ্যেই সাংগঠনিক দায়িত্ব বণ্টন করে দেব। এছাড়া এ মাসেই সাংগঠনিক সফর শুরু হবে। ইতোমধ্যে জেলা সম্মেলন শুরু করার জন্য সংশ্লিষ্ট জেলা নেতাদের সঙ্গে কথা বলা শুরু করেছি।’

করোনাকালীন ২০২০ সালের অক্টোবরে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। ছাত্রলীগ করোনার দোহাই দিয়ে সম্মেলন ছাড়া কমিটি ঘোষণা করলেও সেদিনের বৈঠকে দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা সম্মেলন ছাড়া আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনগুলোয় কমিটি গঠন না করার নির্দেশনা দেন।

সভা শেষে ওইদিন বিকালে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেন, ‘নেত্রী (আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা) সম্মেলন ছাড়া কমিটি গঠন করতে নিষেধ করেছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট এলাকায় গিয়ে সম্মেলনের মাধ্যমে কমিটি করতে হবে। এর ফলে মাঠের লোকরাই নেতা হবেন। কিন্তু সম্মেলন ছাড়া কমিটি হলে লবিংয়ে বা তদবিরের লোক নেতা হয়। এজন্য প্রধানমন্ত্রী সম্মেলনের ওপরই বেশি জোর দিয়েছেন।’

প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালের ১১ ও ১২ মে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এর দুই মাস পর ২০১৮ সালের ৩১ জুলাই গঠিত হয় কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদ।

সে হিসাবে দুই বছর মেয়াদি কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের মেয়াদ শেষ হয়েছে গত বছরের ৩১ জুলাই। এর আগে ২৯তম সম্মেলনের মাধ্যমে ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন এবং সাধারণ সম্পাদক হন গোলাম রাব্বানী।

তবে এক বছর গড়াতেই অনিয়ম ও চাঁদাবাজির অভিযোগে শোভন-রাব্বানীকে ২০১৯ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর অপসারণ করা হয়। শোভন-রাব্বানীকে অপসারণের পর গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, এক নম্বর সহসভাপতি আল নাহিয়ান খান জয়কে সভাপতি ও এক নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্যকে ভারপ্রাপ্ত হিসাবে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয়। কয়েক মাস ভারপ্রাপ্ত হিসাবে দায়িত্ব পালন করলেও ২০২০ সালের ৪ জানুয়ারি তাদের ভারমুক্ত করে পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব দেওয়া হয়। এদিকে করোনা মহামারি ও বন্যাসহ বিভিন্ন সংকটে মানুষের পাশে দাঁড়ালেও সাংগঠনিক কার্যক্রম গোছাতে পারেননি নতুন নেতারা।

সম্প্রতি ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য যুগান্তরকে জানান, ‘তারা দায়িত্ব পাওয়ার সময় প্রায় সব ইউনিট মেয়াদোত্তীর্ণ ছিল। তবে কাজ শুরু করার পর তারা পর্যায়ক্রমে ৩১টি ইউনিটের কমিটি দিয়েছেন। এর মধ্যে জেলা ও মহানগর কমিটি রয়েছে ১৯টির মতো।’

ছাত্রলীগের দপ্তর সূত্রে জানা যায়, জেলা নতুন কমিটি হয়েছে মোট ২১টি। এর মধ্যে ২০১৯ সালে হয়েছে ১টি, ২০২০ সালে ৫টি এবং ২০২১ সালে ১৫টি নতুন কমিটি ঘোষিত হয়েছে। জেলায় পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয়েছে মোট ১৪টি। এর মধ্যে ২০১৯ সালে চারটি, ২০২০ সালে ৬টি এবং ২০২১ সালে ৪টি কমিটি পূর্ণাঙ্গ হয়েছে।

এছাড়া ২০২০ সালে সম্মিলিত মেডিকেল কলেজ শাখার নতুন কমিটি ঘোষিত হয়। তাছাড়া একই বছর ৬টি মেডিকেল শাখা ছাত্রলীগের নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়।

২০২১ সালে আরও ৬টি মেডিকেলের নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়। অর্থাৎ ইতোমধ্যে সম্মিলিত মেডিকেল কলেজ ছাত্রলীগ এবং মেডিকেল কলেজ ছাত্রলীগের ১২টি ইউনিটসহ মোট ১৩টি কমিটি ঘোষিত হয়েছে। তবে ঢাকায় বসে ঘোষণা করা এসব কমিটি নিয়ে বেশির ভাগ জায়গায় ক্ষোভ-বিক্ষোভের ঘটনা ঘটেছে।

সবশেষ গত মঙ্গলবার এ রকম ঘটনা ঘটে সিলেটে। ওইদিন জেলা ও মহানগর ছাত্রলীগের আংশিক কমিটি ঘোষণার পর তা প্রত্যাখ্যান করে সড়ক অবরোধ ও টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ মিছিল করে ছাত্রলীগের একটি অংশ। অর্থের বিনিময়ে কমিটির শীর্ষপদ বিক্রির অভিযোগ এনেছেন তারা। এভাবে কমিটি করায় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের এক অংশও ক্ষোভ প্রকাশ করে। এভাবে কমিটি ঘোষণা করাকে তারা গঠনতন্ত্রবিরোধী আখ্যা দিয়েছেন। এদিন এর প্রতিবাদে কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে দুই সদস্য পদত্যাগও করেন। এর আগে ৩০ জুলাই ঠাকুরগাঁও জেলা ছাত্রলীগের আংশিক কমিটি ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় কমিটি। রাতে ঘোষণার পর কমিটিতে জায়গা না পাওয়া নেতারা বিক্ষোভ করেন। কক্সবাজার জেলা ছাত্রলীগের কমিটি ঘোষণার পরও বিক্ষোভ হয়।

এদিকে সম্মেলন ছাড়া কমিটি গঠন করা নিয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদেরও প্রকাশ্যে বিরক্তি প্রকাশ করতে দেখা গেছে। ২২ আগস্ট বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ আয়োজিত আলোচনাসভায় আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, ‘ছাত্রলীগ আমাদের আস্থার ঠিকানা, নির্ভরতার জায়গা। কিন্তু মনে রাখতে হবে, এভাবে চলতে পারে না। এভাবে চলবে না। সংগঠন দাঁড় করাতে হবে।

তিনি আরও বলেন, যাদের সম্মেলনের মেয়াদ শেষ হয়েছে, তাদের সময় দিতে হবে। একটা নির্দিষ্ট তারিখের মধ্যে কমিটি গঠন করবেন, না হলে সেই কমিটি ওই তারিখে বিলুপ্ত বা বাতিল হয়ে যাবে। তখন সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির মাধ্যমে সম্মেলন করে কমিটি ঘোষণা করতে হবে। ঢাকা থেকে কমিটি ঘোষণা দিয়েন না। এই কমিটি দিয়ে কোনো কাজ হবে না।’

এর একদিন আগে ২০ আগস্ট একই স্থানে অপর এক অনুষ্ঠানে সম্মেলন ছাড়া প্রেস রিলিজের মাধ্যমে বিভিন্ন কমিটি গঠনের সমালোচনা করেন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম। তিনি বলেন, ‘কিছুদিন ধরে সম্মেলন ছাড়াই কমিটি গঠন হচ্ছে। সিভি নেওয়ার মাধ্যমে বিভিন্ন জেলা কমিটি তারা প্রদান করে আসছে। আসলে ছাত্রলীগ একটি ঐতিহ্য, ছাত্রলীগ একটি কৃষ্টি। ছাত্রলীগ যদি কোনো জায়গায় ভুল করে, তাহলে সবাই কিন্তু এই ভুলটা করবে।’

ওই বক্তৃতায় আগামী দিনে প্রেস রিলিজের মাধ্যমে কমিটি গঠন না করার জন্য ছাত্রলীগ সভাপতি-সাধারণ সম্পাদককে অনুরোধ জানান মির্জা আজম।

এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়, জেলাসহ বিভিন্ন ইউনিটের সম্মেলন না হওয়া, গঠনতন্ত্র না মানা, প্রেস বিজ্ঞপ্তিনির্ভর কমিটি দেওয়াসহ নানা কারণে সাংগঠনিকভাবে স্থবির হয়ে পড়েছে ছাত্রলীগ। অন্যদিকে এখনো সাংগঠনিক দায়িত্ব বণ্টন করে না দেওয়ায় ক্ষুব্ধ কেন্দ্রীয় কমিটির বেশ কয়েকজন নেতা।

‘মেয়াদ শেষ’ হওয়ার পরে এখন দায়িত্ব বণ্টনের উদ্যোগ নিলেও দায়িত্ব নিতে রাজি নন অনেক নেতা। ছাত্রলীগের একটি সূত্র জানায়, এখন দায়িত্ব বণ্টন করা হলে কেন্দ্রীয় কমিটির অন্তত ২০ জনের মতো নেতা পদত্যাগ করতে পারেন। তারা বলছেন, ‘কেন্দ্রীয় কমিটিরই মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে।

এখন আর দায়িত্ব বণ্টন করে লাভ কী?’ ছাত্রলীগের সহসভাপতি সৈয়দ আরিফ হোসেন সম্প্রতি এ বিষয়ে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন। সেখানে তিনি লিখেছেন, ‘ইতোমধ্যে মেয়াদ শেষ হওয়া ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতাদের জেলাভিত্তিক দায়িত্ব বণ্টন করা হলে সেটি হবে আরও একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।’

সূত্র জানায়, তার মতো সংক্ষুব্ধ আরও কয়েকজন নেতা এ বিষয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাসে তাদের ক্ষোভের কথা তুলে ধরেন।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন