অর্থনীতিতে উভয় সংকট
jugantor
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি
অর্থনীতিতে উভয় সংকট
দাম সমন্বয় করলে দেশে সব ধরনের সেবা ও পণ্যের মূল্য বাড়বে

  যুগান্তর প্রতিবেদন  

০১ নভেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম নিয়ে উভয় সংকটে পড়েছে দেশের অর্থনীতি। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করলে স্থানীয়ভাবে সব ধরনের সেবা ও পণ্যের মূল্য বাড়বে।

এতে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়বে। একই সঙ্গে পাল্লা দেবে মূল্যস্ফীতির হার। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে অর্থনীতিতে। করোনার ক্ষতির পর অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কার্যক্রমও হবে বাধাগ্রস্ত। অপর দিকে দাম না বাড়ালে আর্থিকভাবে প্রচণ্ড চাপে পড়বে সরকার। বেশি দামে কিনে কমে বিক্রি করলে মোটা অর্থ ভর্তুকি দিতে হবে। এতে সরকারের ঋণ বাড়বে।

এছাড়া প্রতিবেশী দেশে দাম বেশি হওয়ায় পাচারের শঙ্কা আছে। এটা যাতে না হয় সেজন্য সীমান্তবর্তী জেলার প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সীমান্ত রক্ষীবাহিনীকে চিঠি দিয়েছে জ্বালানি মন্ত্রণালয়। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হলে প্রথম ধাক্কায় পণ্যের পরিবহণ ব্যয় বেড়ে যাবে। দ্বিতীয় দফায় বাড়বে গণপরিবহণ ব্যয়। এর পাশাপাশি বাড়বে সব ধরনের পণ্যের উৎপাদন ব্যয়। এ অবস্থায় বিনিয়োগ করে উৎপাদনে যেতেও খরচ বাড়বে।

এসব কারণে অর্থনীতিবিদরা জ্বালানি তেলের দাম না বাড়িয়ে ভর্তুকি দিয়ে বাজার ব্যবস্থা স্থিতিশীল রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। তারা বলেছেন, দাম বাড়ালে বাজারে যে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে তার মোকাবিলা করা কঠিন হবে। করোনার পর হঠাৎ করে চাহিদা বাড়ায় জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। কিছুদিন পর চাহিদা আবার কমে এলে তখন এর দামও কমে যাবে।

এছাড়া আগামী শীতে নতুন করোনার সংক্রমণ বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সেটা সত্য হলে চাহিদা কমে তেলের দাম আবার নেমে যাবে। তখন বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির যে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে তা আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, করোনার প্রভাব কমে যাওয়ায় হঠাৎ করেই সবকিছুর চাহিদা বেড়েছে।

জ্বালানি তেলেরও চাহিদা বেড়েছে। কিন্তু সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক হয়নি। এতে দাম বাড়ছে। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে এর দাম বাড়ানো হলে বাজারে এর তীব্র নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। সবকিছুর দাম বেড়ে যাবে। করোনার কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। সেটা এখনো আগের অবস্থায় যায়নি। এ অবস্থায় সরকারের নীতির কারণে পণ্যমূল্য বাড়লে ভোক্তাদের জন্য তা অসহনীয় হয়ে উঠবে।

এ বিবেচনায় এখন তেলের দাম বাড়ানো ঠিক হবে না। বরং কিছুদিন পর্যবেক্ষণ করা উচিত। হঠাৎ বেড়েছে, আবার কমেও যেতে পারে। কারণ পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে ২-৩ মাসের মধ্যেই স্বাভাবিক হয়ে যাবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি তেল হলো অর্থনীতির লাইফ লাইন। প্রায় সব ধরনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জ্বালানি তেলের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। প্রায় সব পণ্যেই জ্বালানি তেলের ব্যবহার রয়েছে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ উৎপাদনে কাঁচামাল হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে তেল।

এর দাম বাড়লে বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। তখন বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রশ্ন আসবে। বিদ্যুতের দাম বাড়লে সব খাতেই এর প্রভাব পড়বে। পণ্য পরিবহণ ও গণপরিবহণের প্রধান উপকরণ জ্বালানি তেল।

এর দাম বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে এসব খাতের পণ্যমূল্য বাড়বে। বাধ্য হয়ে ভোক্তাদের বেশি দামে পণ্য কিনতে হবে। এমনিতেই মূল্যস্ফীতির হার বাড়ছে। তখন জ্বালানি তেলের কারণে মূল্যস্ফীতিতে চাপ আরও বাড়বে।

গত সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, মূল্যস্ফীতির হার বাড়ছে। গত জুলাইয়ে এ হার ছিল ৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ। সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে হয়েছে ৫ দশমিক ৫৯ শতাংশ। এর মধ্যে খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতির হারও বেড়েছে। খাদ্যবহির্ভূত পণ্যে এ হার ছিল ৫ দশমিক ৮০ শতাংশ। সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ১৯ শতাংশ। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হলে দুই খাতেই এ হার বেড়ে যেতে পারে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. শামসুল আলম বলেন, দুই বছর বা তার চেয়ে বেশি সময় ধরে তেল বিক্রি করে সরকার লাভ করেছে সেই টাকা কোথায় গেল? যখন বিশ্ববাজারে তেলের দাম কম ছিল তখন দেশে বেশি দামে তেল বিক্রি করেছে। করোনাকালে দেশের মানুষের আয় কমেছে।

এমনিতেই বাজারে নিত্যপণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী। এখন তেলের দাম বাড়লে ভয়ংকর অবস্থা হতে পারে। এই মুহূর্তে সরকারকে জনগণের পাশে থেকে সুরক্ষা দেওয়া দরকার। কিন্তু তা না করে সরকারকে অপ্রিয় করে তুলছেন সরকারের বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তারা। তাদের তৎপরতায় জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে।

এদিকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) বলেছে, করোনার সময়ে তেলের দাম কমলেও রাখার জায়গা ছিল না বলে আমদানি করা সম্ভব হয়নি। একই সঙ্গে ওই সময়ে চাহিদা ছিল কম। অনেক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, শিল্প-কারখানা ও যানবাহন বন্ধ ছিল।

এয়ারলাইন্সগুলো বন্ধ থাকায় তেল বিক্রিতে পর্যাপ্ত চাহিদা ছিল না। তারপরও বিপিসি বিপুল অঙ্কের টাকা লাভ করেছে। তবে লাভ করলেও বছর শেষে সে টাকা সরকারের কোষাগারে জমা দিতে হয়েছে।

জানা গেছে ২০১৪-২০১৫ অর্থবছর থেকে মূলত বিপিসি লাভের ধারায় ফিরে। এর আগে জ্বালানি তেল বিক্রি থেকে গত ২০১৩-১৪ অর্থবছর পর্যন্ত ২ হাজার ৩২২ কোটি টাকা লোকসানে ছিল সংস্থাটি। কিন্তু ২০১৪-১৫ অর্থবছর থেকে তারা লাভে চলে আসে।

ওই বছরে তারা ৪১২৬ কোটি টাকা মুনাফা করে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৯০৪০কোটি টাকা, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৮৬৫৩ কোটি টাকা, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৫৬৪৪ কোটি টাকা মুনাফা হয়।

এছাড়া ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৪৭৬৮ কোটি টাকা, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৫০৬৭ কোটি টাকা এবং ২০২০-২১ অর্থবছরে ৫৮৪০ কোটি টাকা লাভ করে বিপিসি। নতুন আইন অনুযায়ী এসব মুনাফা সরকার তার নিজস্ব হিসাবে নিয়ে গেছে। এখন প্রতি মাসে গড়ে ৪৫০ থেকে ৫০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে।

সূত্র জানায়, গত বছরের জানুয়ারিতে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল জ্বালানি তেলের দাম গড়ে ছিল ৬৬ ডলার ২৫ সেন্ট। করোনার প্রকোপ শুরু হলে ১৮ মার্চ তা কমে ২৪ ডলার ৮৮ সেন্টে দাঁড়ায়। ৩১ মার্চ আরও কমে ২২ ডলার ৭৪ সেন্টে দাঁড়ায়। ২৭ এপ্রিল তা আরও কমে ২২ ডলার ২০ সেন্টে নেমে আসে। এর পর থেকে এর দামে সামান্য ওঠানামা থাকলেও গড়ে বাড়তে থাকে। ১৫ ডিসেম্বর ৫০ ডলারে ওঠে। চলতি বছরের ১১ মার্চ ৬২ ডলার, ১৫ সেপ্টেম্বর তা আরও বেড়ে ৭৫ ডলার ৪৬ সেন্টে দাঁড়ায়। গত ৩০ অক্টোবর তা আরও বেড়ে ৮৯ দশমিক ৮ ডলারে ওঠে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, দেশের আমদানির এককভাবে সবচেয়ে বেশি ব্যয় হয় এ খাতে। মোট আমদানি ব্যয়ের ১৫ থেকে ২০ শতাংশ ব্যয় হয় জ্বালানি তেলে। করোনার কারণে এ খাতে গত দুই অর্থবছরে ব্যয় কম হয়েছে। মোট আমদানি ব্যয়ের ৮ থেকে ১০ শতাংশ। গত ২০১৯-২০ অর্থবছরে জ্বালানি তেল আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ৪৫৩ কোটি ডলার। গত অর্থবছরে ব্যয় হয়েছে ৪৩০ কোটি ডলার। গত দুই অর্থবছরেই জ্বালানি তেলের দাম ছিল তলানিতে। সর্বনিম্ন ২০ ডলার থেকে ৬০ ডলারের মধ্যে। এখন তেলের দাম বাড়লে এ খাতে আমদানি ব্যয়ও বাড়বে।

আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষকরা পূর্ভাবাস দিয়েছেন, করোনার আঘাত ফের না হলে তেলের দাম এ বছরের মধ্যেই প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাবে। এর আগে ইরাক যুদ্ধের সময় এর দাম সর্বোচ্চ বেড়ে ১৫২ ডলারে উঠেছিল। বিশ্লেষকরা বলেছেন, অর্থনীতি পুরোদমে সচল হলে জ্বালানি তেলের চাহিদা আরও বাড়বে। তখন আরও বেশি তেল আমদানি করতে হবে। বাড়তি দামে তেল আমদানি হলে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয়ও বাড়বে। তখন সরকারের চলতি হিসাবে ঘাটতি দেখা দেবে। এমনিতেই চলতি অর্থবছরের শুরু থেকে আমদানি ব্যয় বাড়ায় ডলারের দাম বেড়ে গেছে। একই সঙ্গে সরকারের বৈদেশিক মুদ্রার চলতি হিসাবে গত জুলাই-আগস্টে ঘাটতি দেখা দিয়েছে ১২৪ কোটি ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে এ হিসাবে উদ্বৃত্ত ছিল ৩২৩ ডলার।

সূত্র জানায়, এতদিন আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কম থাকায় গত বেশ কয়েক বছর এ খাতে কোনো ভর্তুকি দিতে হয়নি। বরং তেল আমদানিকারক সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন মুনাফা করেছে। এখনো আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ৭০ ডলারের মধ্যে থাকলে কোনো ভর্তুকি দিতে হবে না। এর বেশি হলে ভর্তুকি দিতে হবে। গত সেপ্টেম্বর থেকে এর দাম ৭০ ডলারের ওপরে রয়েছে। ফলে যে তেল আমদানি হচ্ছে তা ভর্তুকি দিয়ে বিক্রি করতে হবে।

করোনার পর ব্যবসা-বাণিজ্য এখনো স্বাভাবিক না হওয়ার কারণে এখন রাজস্ব আয় প্রত্যাশা অনুযায়ী বাড়েনি। কাজেই রাজস্ব আয় থেকে এ খাতে ভর্তুকি দেওয়া সম্ভব হবে না। ভর্তুকি দিতে চাইলে সরকারকে দেশি-বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নিতে হবে। জ্বালানি তেল আমদানি করতে সরকার ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক (আইডিবি) থেকে বছর ১০০ থেকে ১৫০ কোটি ডলার ঋণ নেয়। তেল বিক্রির টাকায় ঋণ শোধ করা হয়। তখন এর বাইরে আরও ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। স্থানীয়ভাবে সরকার বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে খুবই কম ঋণ নেওয়ার সিন্ধান্ত নিয়েছে। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ দিতে হবে। এতে মূল্যস্ফীতির হার আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে।

সূত্র জানায়, বাংলাদেশে ডিজেল প্রতি লিটার ৬৫ টাকা। ভারতে প্রতি লিটার ১০৫ থেকে ১২৭ টাকা বিক্রি হচ্ছে। ভারতে তেলের দাম বেশি বলে বাংলাদেশ থেকে পাচারের শঙ্কা বাড়ছে। একই কারণে মিয়ানমারেও তেল পাচার হতে পারে। তেল পাচার ঠেকাতে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোর জেলা প্রশাসক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সীমান্ত রক্ষীবাহিনীকে চিঠি দেওয়া হয়েছে জ্বালানি মন্ত্রণালয় থেকে।

এদিকে কয়েক বছর ধরে অকটেন ও পেট্রল আমদানি করতে হয় না। দেশের গ্যাসফিল্ডগুলো থেকে প্রাকৃতিক গ্যাসের উপজাত হিসেবে পাওয়া ‘কনডেনসেট’ সরকারি-বেসরকারি শোধনাগারে (রিফাইনারি) পরিশোধন ও প্রক্রিয়াকরণ করে দেশের পুরো চাহিদা পূরণ করার মতো অকটেন ও পেট্রল তৈরি করা হচ্ছে। দেশের জ্বালানিসম্পদ ব্যবহার করেই অকটেন ও পেট্রল তৈরি করা হচ্ছে বলে এই খাতে সরকারের মুনাফা হচ্ছে অনেক বেশি।

সরকারি-বেসরকারি সূত্রগুলোর হিসাব থেকে দেখা যায়, বছরে তিন লাখ টন অকটেন-পেট্রল বিক্রি করে সরকার ট্যাক্স-ভ্যাট নেওয়া ছাড়াও মুনাফা করছে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা। কিন্তু দেশের সর্বোচ্চ পেট্রল উৎপাদনকারী রিফাইনারি এক মাসের জন্য বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পেট্রল নিয়েও সমস্যায় পড়তে হতে পারে সরকারকে।

বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি

অর্থনীতিতে উভয় সংকট

দাম সমন্বয় করলে দেশে সব ধরনের সেবা ও পণ্যের মূল্য বাড়বে
 যুগান্তর প্রতিবেদন 
০১ নভেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম নিয়ে উভয় সংকটে পড়েছে দেশের অর্থনীতি। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করলে স্থানীয়ভাবে সব ধরনের সেবা ও পণ্যের মূল্য বাড়বে।

এতে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়বে। একই সঙ্গে পাল্লা দেবে মূল্যস্ফীতির হার। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে অর্থনীতিতে। করোনার ক্ষতির পর অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কার্যক্রমও হবে বাধাগ্রস্ত। অপর দিকে দাম না বাড়ালে আর্থিকভাবে প্রচণ্ড চাপে পড়বে সরকার। বেশি দামে কিনে কমে বিক্রি করলে মোটা অর্থ ভর্তুকি দিতে হবে। এতে সরকারের ঋণ বাড়বে।

এছাড়া প্রতিবেশী দেশে দাম বেশি হওয়ায় পাচারের শঙ্কা আছে। এটা যাতে না হয় সেজন্য সীমান্তবর্তী জেলার প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সীমান্ত রক্ষীবাহিনীকে চিঠি দিয়েছে জ্বালানি মন্ত্রণালয়। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হলে প্রথম ধাক্কায় পণ্যের পরিবহণ ব্যয় বেড়ে যাবে। দ্বিতীয় দফায় বাড়বে গণপরিবহণ ব্যয়। এর পাশাপাশি বাড়বে সব ধরনের পণ্যের উৎপাদন ব্যয়। এ অবস্থায় বিনিয়োগ করে উৎপাদনে যেতেও খরচ বাড়বে। 

এসব কারণে অর্থনীতিবিদরা জ্বালানি তেলের দাম না বাড়িয়ে ভর্তুকি দিয়ে বাজার ব্যবস্থা স্থিতিশীল রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। তারা বলেছেন, দাম বাড়ালে বাজারে যে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে তার মোকাবিলা করা কঠিন হবে। করোনার পর হঠাৎ করে চাহিদা বাড়ায় জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। কিছুদিন পর চাহিদা আবার কমে এলে তখন এর দামও কমে যাবে।

এছাড়া আগামী শীতে নতুন করোনার সংক্রমণ বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সেটা সত্য হলে চাহিদা কমে তেলের দাম আবার নেমে যাবে। তখন বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির যে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে তা আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, করোনার প্রভাব কমে যাওয়ায় হঠাৎ করেই সবকিছুর চাহিদা বেড়েছে।

জ্বালানি তেলেরও চাহিদা বেড়েছে। কিন্তু সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক হয়নি। এতে দাম বাড়ছে। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে এর দাম বাড়ানো হলে বাজারে এর তীব্র নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। সবকিছুর দাম বেড়ে যাবে। করোনার কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। সেটা এখনো আগের অবস্থায় যায়নি। এ অবস্থায় সরকারের নীতির কারণে পণ্যমূল্য বাড়লে ভোক্তাদের জন্য তা অসহনীয় হয়ে উঠবে।

এ বিবেচনায় এখন তেলের দাম বাড়ানো ঠিক হবে না। বরং কিছুদিন পর্যবেক্ষণ করা উচিত। হঠাৎ বেড়েছে, আবার কমেও যেতে পারে। কারণ পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে ২-৩ মাসের মধ্যেই স্বাভাবিক হয়ে যাবে। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি তেল হলো অর্থনীতির লাইফ লাইন। প্রায় সব ধরনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জ্বালানি তেলের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। প্রায় সব পণ্যেই জ্বালানি তেলের ব্যবহার রয়েছে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ উৎপাদনে কাঁচামাল হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে তেল।

এর দাম বাড়লে বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। তখন বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রশ্ন আসবে। বিদ্যুতের দাম বাড়লে সব খাতেই এর প্রভাব পড়বে। পণ্য পরিবহণ ও গণপরিবহণের প্রধান উপকরণ জ্বালানি তেল।

এর দাম বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে এসব খাতের পণ্যমূল্য বাড়বে। বাধ্য হয়ে ভোক্তাদের বেশি দামে পণ্য কিনতে হবে। এমনিতেই মূল্যস্ফীতির হার বাড়ছে। তখন জ্বালানি তেলের কারণে মূল্যস্ফীতিতে চাপ আরও বাড়বে।

গত সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, মূল্যস্ফীতির হার বাড়ছে। গত জুলাইয়ে এ হার ছিল ৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ। সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে হয়েছে ৫ দশমিক ৫৯ শতাংশ। এর মধ্যে খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতির হারও বেড়েছে। খাদ্যবহির্ভূত পণ্যে এ হার ছিল ৫ দশমিক ৮০ শতাংশ। সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ১৯ শতাংশ। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হলে দুই খাতেই এ হার বেড়ে যেতে পারে। 

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. শামসুল আলম বলেন, দুই বছর বা তার চেয়ে বেশি সময় ধরে তেল বিক্রি করে সরকার লাভ করেছে সেই টাকা কোথায় গেল? যখন বিশ্ববাজারে তেলের দাম কম ছিল তখন দেশে বেশি দামে তেল বিক্রি করেছে। করোনাকালে দেশের মানুষের আয় কমেছে।

এমনিতেই বাজারে নিত্যপণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী। এখন তেলের দাম বাড়লে ভয়ংকর অবস্থা হতে পারে। এই মুহূর্তে সরকারকে জনগণের পাশে থেকে সুরক্ষা দেওয়া দরকার। কিন্তু তা না করে সরকারকে অপ্রিয় করে তুলছেন সরকারের বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তারা। তাদের তৎপরতায় জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে। 

এদিকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) বলেছে, করোনার সময়ে তেলের দাম কমলেও রাখার জায়গা ছিল না বলে আমদানি করা সম্ভব হয়নি। একই সঙ্গে ওই সময়ে চাহিদা ছিল কম। অনেক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, শিল্প-কারখানা ও যানবাহন বন্ধ ছিল।

এয়ারলাইন্সগুলো বন্ধ থাকায় তেল বিক্রিতে পর্যাপ্ত চাহিদা ছিল না। তারপরও বিপিসি বিপুল অঙ্কের টাকা লাভ করেছে। তবে লাভ করলেও বছর শেষে সে টাকা সরকারের কোষাগারে জমা দিতে হয়েছে। 

জানা গেছে ২০১৪-২০১৫ অর্থবছর থেকে মূলত বিপিসি লাভের ধারায় ফিরে। এর আগে জ্বালানি তেল বিক্রি থেকে গত ২০১৩-১৪ অর্থবছর পর্যন্ত ২ হাজার ৩২২ কোটি টাকা লোকসানে ছিল সংস্থাটি। কিন্তু ২০১৪-১৫ অর্থবছর থেকে তারা লাভে চলে আসে।

ওই বছরে তারা ৪১২৬ কোটি টাকা মুনাফা করে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৯০৪০কোটি টাকা, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৮৬৫৩ কোটি টাকা, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৫৬৪৪ কোটি টাকা মুনাফা হয়।

এছাড়া ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৪৭৬৮ কোটি টাকা, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৫০৬৭ কোটি টাকা এবং ২০২০-২১ অর্থবছরে ৫৮৪০ কোটি টাকা লাভ করে বিপিসি। নতুন আইন অনুযায়ী এসব মুনাফা সরকার তার নিজস্ব হিসাবে নিয়ে গেছে। এখন প্রতি মাসে গড়ে ৪৫০ থেকে ৫০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। 

সূত্র জানায়, গত বছরের জানুয়ারিতে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল জ্বালানি তেলের দাম গড়ে ছিল ৬৬ ডলার ২৫ সেন্ট। করোনার প্রকোপ শুরু হলে ১৮ মার্চ তা কমে ২৪ ডলার ৮৮ সেন্টে দাঁড়ায়। ৩১ মার্চ আরও কমে ২২ ডলার ৭৪ সেন্টে দাঁড়ায়। ২৭ এপ্রিল তা আরও কমে ২২ ডলার ২০ সেন্টে নেমে আসে। এর পর থেকে এর দামে সামান্য ওঠানামা থাকলেও গড়ে বাড়তে থাকে। ১৫ ডিসেম্বর ৫০ ডলারে ওঠে। চলতি বছরের ১১ মার্চ ৬২ ডলার, ১৫ সেপ্টেম্বর তা আরও বেড়ে ৭৫ ডলার ৪৬ সেন্টে দাঁড়ায়। গত ৩০ অক্টোবর তা আরও বেড়ে ৮৯ দশমিক ৮ ডলারে ওঠে। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, দেশের আমদানির এককভাবে সবচেয়ে বেশি ব্যয় হয় এ খাতে। মোট আমদানি ব্যয়ের ১৫ থেকে ২০ শতাংশ ব্যয় হয় জ্বালানি তেলে। করোনার কারণে এ খাতে গত দুই অর্থবছরে ব্যয় কম হয়েছে। মোট আমদানি ব্যয়ের ৮ থেকে ১০ শতাংশ। গত ২০১৯-২০ অর্থবছরে জ্বালানি তেল আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ৪৫৩ কোটি ডলার। গত অর্থবছরে ব্যয় হয়েছে ৪৩০ কোটি ডলার। গত দুই অর্থবছরেই জ্বালানি তেলের দাম ছিল তলানিতে। সর্বনিম্ন ২০ ডলার থেকে ৬০ ডলারের মধ্যে। এখন তেলের দাম বাড়লে এ খাতে আমদানি ব্যয়ও বাড়বে। 

আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষকরা পূর্ভাবাস দিয়েছেন, করোনার আঘাত ফের না হলে তেলের দাম এ বছরের মধ্যেই প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাবে। এর আগে ইরাক যুদ্ধের সময় এর দাম সর্বোচ্চ বেড়ে ১৫২ ডলারে উঠেছিল। বিশ্লেষকরা বলেছেন, অর্থনীতি পুরোদমে সচল হলে জ্বালানি তেলের চাহিদা আরও বাড়বে। তখন আরও বেশি তেল আমদানি করতে হবে। বাড়তি দামে তেল আমদানি হলে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয়ও বাড়বে। তখন সরকারের চলতি হিসাবে ঘাটতি দেখা দেবে। এমনিতেই চলতি অর্থবছরের শুরু থেকে আমদানি ব্যয় বাড়ায় ডলারের দাম বেড়ে গেছে। একই সঙ্গে সরকারের বৈদেশিক মুদ্রার চলতি হিসাবে গত জুলাই-আগস্টে ঘাটতি দেখা দিয়েছে ১২৪ কোটি ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে এ হিসাবে উদ্বৃত্ত ছিল ৩২৩ ডলার। 

সূত্র জানায়, এতদিন আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কম থাকায় গত বেশ কয়েক বছর এ খাতে কোনো ভর্তুকি দিতে হয়নি। বরং তেল আমদানিকারক সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন মুনাফা করেছে। এখনো আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ৭০ ডলারের মধ্যে থাকলে কোনো ভর্তুকি দিতে হবে না। এর বেশি হলে ভর্তুকি দিতে হবে। গত সেপ্টেম্বর থেকে এর দাম ৭০ ডলারের ওপরে রয়েছে। ফলে যে তেল আমদানি হচ্ছে তা ভর্তুকি দিয়ে বিক্রি করতে হবে। 

করোনার পর ব্যবসা-বাণিজ্য এখনো স্বাভাবিক না হওয়ার কারণে এখন রাজস্ব আয় প্রত্যাশা অনুযায়ী বাড়েনি। কাজেই রাজস্ব আয় থেকে এ খাতে ভর্তুকি দেওয়া সম্ভব হবে না। ভর্তুকি দিতে চাইলে সরকারকে দেশি-বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নিতে হবে। জ্বালানি তেল আমদানি করতে সরকার ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক (আইডিবি) থেকে বছর ১০০ থেকে ১৫০ কোটি ডলার ঋণ নেয়। তেল বিক্রির টাকায় ঋণ শোধ করা হয়। তখন এর বাইরে আরও ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। স্থানীয়ভাবে সরকার বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে খুবই কম ঋণ নেওয়ার সিন্ধান্ত নিয়েছে। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ দিতে হবে। এতে মূল্যস্ফীতির হার আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে। 

সূত্র জানায়, বাংলাদেশে ডিজেল প্রতি লিটার ৬৫ টাকা। ভারতে প্রতি লিটার ১০৫ থেকে ১২৭ টাকা বিক্রি হচ্ছে। ভারতে তেলের দাম বেশি বলে বাংলাদেশ থেকে পাচারের শঙ্কা বাড়ছে। একই কারণে মিয়ানমারেও তেল পাচার হতে পারে। তেল পাচার ঠেকাতে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোর জেলা প্রশাসক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সীমান্ত রক্ষীবাহিনীকে চিঠি দেওয়া হয়েছে জ্বালানি মন্ত্রণালয় থেকে। 

এদিকে কয়েক বছর ধরে অকটেন ও পেট্রল আমদানি করতে হয় না। দেশের গ্যাসফিল্ডগুলো থেকে প্রাকৃতিক গ্যাসের উপজাত হিসেবে পাওয়া ‘কনডেনসেট’ সরকারি-বেসরকারি শোধনাগারে (রিফাইনারি) পরিশোধন ও প্রক্রিয়াকরণ করে দেশের পুরো চাহিদা পূরণ করার মতো অকটেন ও পেট্রল তৈরি করা হচ্ছে। দেশের জ্বালানিসম্পদ ব্যবহার করেই অকটেন ও পেট্রল তৈরি করা হচ্ছে বলে এই খাতে সরকারের মুনাফা হচ্ছে অনেক বেশি।

সরকারি-বেসরকারি সূত্রগুলোর হিসাব থেকে দেখা যায়, বছরে তিন লাখ টন অকটেন-পেট্রল বিক্রি করে সরকার ট্যাক্স-ভ্যাট নেওয়া ছাড়াও মুনাফা করছে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা। কিন্তু দেশের সর্বোচ্চ পেট্রল উৎপাদনকারী রিফাইনারি এক মাসের জন্য বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পেট্রল নিয়েও সমস্যায় পড়তে হতে পারে সরকারকে।
 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন