ভুয়া চিঠিতে ১৫ বছর পার, তদন্ত কমিটির ছড়াছড়ি
jugantor
বেহাত ঐতিহাসিক রানি ভবানী দিঘি
ভুয়া চিঠিতে ১৫ বছর পার, তদন্ত কমিটির ছড়াছড়ি
ঘটনার দেড় যুগ পর বিভাগীয় মামলায় অভিযুক্ত হলেন আরডিসি মান্নু, ওএসডি আছেন ৫ বছর

  বিএম জাহাঙ্গীর  

০৭ নভেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ছড়াছড়ি

একটি ভুয়া চিঠি। ডিসির কাছে পাঠানো হলো ভূমি মন্ত্রণালয়ের নামে। অতঃপর বেহাত হয়ে গেল নাটোরের ঐতিহাসিক রানি ভবানী দিঘি। গঠিত হলো তদন্তের পর তদন্ত কমিটি। প্রকৃত সত্য বের করতে বাঘা বাঘা সব কর্মকর্তার কত দৌড়ঝাঁপ। মিটিংয়ের পর মিটিং।

সময় নষ্ট। কাগজ নষ্ট। মাঠে নামল দুদকও। দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ। গভীর অনুসন্ধান। কত কী। অবশেষে চিহ্নিত হলেন জড়িতরা। সবাই মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তি। এসব করতেই দেড় যুগ পার। তবু মেলেনি সমাধান।

ফাঁকফোকর গলিয়ে বেরিয়ে গেলেন নেপথ্যের গডফাদাররা। হাতছাড়া হলো বিশাল এই দিঘি, যা আজও নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেনি সরকার। রহস্যজনক কারণে ওই ‘ভুয়া চিঠিই’ হয়ে গেল বেশি শক্তিশালী। সরকার হারল সবখানে।

ভূমি সচিব মো. মোস্তাফিজুর রহমানের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি যুগান্তরকে বলেন, ‘পুরো বিষয়টি না জেনে আমার পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য করা সমীচীন হবে না। তবে এ বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

সংশ্লিষ্ট নথিপত্র থেকে জানা যায়, এ বিষয়ে গঠিত তদন্ত কমিটিগুলো মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকর্তা-কর্মচারী ছাড়াও নাটোর ডিসি অফিসের তৎকালীন ৩ ডিসিসহ ৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে দায়ী করে। তারা হলেন-সাবেক ডিসি কেএম আবুল আহসান, এম ইসহাক ভূঁইয়া, মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন এবং এডিসি (রেভিনিউ) শরীফ আহমেদ, ইফতেখারুল ইসলাম, আরডিসি নাজমুন নাহার মান্নু, এসি ল্যান্ড জামিল হোসেন, রাজস্ব শাখার উচ্চমান সহকারী সিদ্দিকুর রহমান ও ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম।

প্রশাসন ক্যাডারের ১৫তম ব্যাচের কর্মকর্তা নাজমুন নাহার মান্নু উপসচিব পদে পদোন্নতি পেলেও এই বিভাগীয় মামলার কারণে তিনি ৫ বছর ওএসডি আছেন। তার মামলার তদন্ত করতেই দীর্ঘ সময় পার হয়েছে। ২১ আগস্ট প্রতিবেদন দেয় তদন্ত কমিটি। সূত্রমতে, এই কর্মকর্তার নামে আরও অন্তত ৩টি বিভাগীয় মামলা তদন্তাধীন আছে। এ বিষয়ে বক্তব্য নিতে নাজমুন নাহার মান্নুর সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু খুদেবার্তা পাঠিয়েও তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।

উপসচিব মান্নুর তদন্ত শেষ করতে এত বিলম্ব হওয়ার কারণ জানতে চাইলে বিভাগীয় মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা বর্তমানে রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার হিসাবে কর্মরত ড. মো. হুমায়ুন কবীর যুগান্তরকে বলেন, ‘যৌক্তিক কিছু কারণেই তদন্ত শেষ করতে সময় লেগেছে।’

নাটোরের ডিসি শামীম আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, ‘নথিটি কল করে দেখব। এরপর ডিসির অবস্থান থেকে এখনো যা করুণীয়, সেটিই করা হবে।’

লিজগ্রহীতা গোলাম নবী যুগান্তরকে বলেন, ‘আইনের মধ্য দিয়ে রানি ভবানী দিঘি আমাকে লিজ দেওয়া হয়েছে। কোনো ব্যত্যয় হয়ে থাকলে সেটি মন্ত্রণালয় কিংবা ডিসি অফিস করেছে। এ বিষয়ে উচ্চ আদালত থেকে আমার পক্ষেই চূড়ান্ত রায় এসেছে।’

প্রশাসনসংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কয়েকটি সূত্র যুগান্তরকে জানায়, ‘কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বহুবিধ আমলযোগ্য অভিযোগ অতীতের তুলনায় অনেক বেড়ে গেছে। এসব অভিযোগের প্রাথমিক তদন্ত এবং পরবর্তী সময়ে বিভাগীয় মামলার তদন্তকাজে অনেক কর্মকর্তার শ্রমঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। এতে প্রশাসনের অনেক রুটিনওয়ার্ক সময়মতো করা সম্ভব হয় না।

সারা বছর এসব তদন্ত নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয়। উপরন্তু নানা কারণে তদন্ত বাধাগ্রস্ত হয়। এজন্য প্রথমত, অভিযোগের সংখ্যা কমাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রাথমিক তদন্ত ও বিভাগীয় মামলা তদন্তের সময়সীমা নির্ধারণ করে দিতে হবে। তা না হলে বাদী-বিবাদীসহ সব পক্ষের বাড়তেই থাকবে।

ভুয়া চিঠির নেপথ্যে : রানি ভবানী দিঘিটি দীর্ঘমেয়াদে লিজ বরাদ্দ নবায়ন করতে ২০০৫ সালের ১৭ এপ্রিল নাটোরের ডিসির পাঠানো প্রস্তাব ভূমি মন্ত্রণালয়ে আসে। প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করে ডিসির প্রস্তাব তৎকালীন ভূমি প্রতিমন্ত্রী উকিল আব্দুস ছাত্তার ভূঁইয়া নাকচ করে দেন।

নথির ৩৫নং অনুচ্ছেদে প্রতিমন্ত্রী তার মতামতে উল্লেখ করেন, ‘নথি দৃষ্টে দেখা যায়, বর্ণিত বিষয়ে পূর্ববর্তী লিজের মেয়াদ ১০ বছর অর্থাৎ ১৪১৪ বাংলা সনে উত্তীর্ণ হবে। জেলা প্রশাসক, নাটোরের ১২/০৬/০৫ তারিখের প্রতিবেদন অনুযায়ী বর্তমান সময় পর্যন্ত ইজারাদারের পারফরম্যান্স ইতিবাচক/সন্তোষজনক।

সেক্ষেত্রে মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার পর জেলা প্রশাসক ইজারাগ্রহীতার সামগ্রিক পারফরম্যান্স বিবেচনায় বিধি মোতাবেক পরবর্তী ব্যবস্থা নিতে পারেন।’ প্রতিমন্ত্রী এই সিদ্ধান্ত দিয়ে নথিতে স্বাক্ষর করেন ২০০৬ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি। এরপর ফাইলটি ডাউন হয়ে শাখায় চলে যায়।

শাখা থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারি প্রশাসনিক কর্মকর্তা নুরুল ইসলাম তালুকদার প্রতিমন্ত্রীর নোট ও সিদ্ধান্তের আলোকে নাটোরের ডিসিকে পাঠানোর জন্য একটি চিঠির খসড়া প্রস্তুত করেন। চিঠিটি অনুমোদন হয়ে জারি নম্বরসহ (ভূঃমঃ/শা-৪/খাজব-১৬২/২০৩৫-৯৫ তাং ১৯/০২/০৬) ইস্যু করা হয়।

শাখা-৪ এর তৎকালীন সিনিয়র সহকারী সচিব মুহম্মদ জুলফিকার আলী স্বাক্ষরিত চিঠিটি মন্ত্রণালয়ের পত্র বিতরণ ও গ্রহণ শাখার মাধ্যমে তা নাটোরের ডিসির কাছে পাঠানো হয়। চিঠি রেজিস্টারে যার প্রমাণ রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এই চিঠি ডিসিকে পাঠানো হয়নি।

মূল চিঠিতে স্মারক নম্বরের শেষে ৯৫ থাকলেও ভুয়া চিঠিতে লেখা রয়েছে ৭৬। ছিল স্মারক নম্বরেও ভুল। এছাড়া ভুয়া চিঠিতে প্রতিমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে লেখা হয়, ‘বিগত সময় লিজগ্রহীতা প্রতিষ্ঠান সন্তোষজনকভাবে মৎস্যচাষ করেছেন বিধায় আবেদনকারী প্রতিষ্ঠান নাটোর আধুনিক মৎস্যচাষ প্রকল্প লিমিটেডের অনুকূলে ভূমি ব্যবস্থাপনা ম্যানুয়ালের ১০৫ অনুচ্ছেদের বিধিমতে দীর্ঘমেয়াদি ইজারা প্রদানে সরকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিয়াছে।’

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো মনে করে, প্রভাবশালীর হস্তক্ষেপ ছাড়াও অলিখিত ঘুস লেনদেনে যুক্ত হওয়ার কারণে নাটোরের ডিসি অফিস এই ভুয়া চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে দীর্ঘমেয়াদে লিজ বরাদ্দের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল।

যে কারণে এত বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তারা একবারের জন্য মন্ত্রণালয়ের শাখায় ফোন করে চিঠির সত্যতা যাচাই করার প্রয়োজন মনে করেনি। মূলত এর পেছনে সব পক্ষের যোগসাজশ ছিল।

যে কারণে মন্ত্রণালয়ের ১৯ ফেব্রুয়ারির চিঠিটি গোপন করে একটি চক্র নিজেদের তৈরি করা ভুয়া চিঠি ১৪ ফেব্রুয়ারির তারিখ দিয়ে রিলিজ করে। এর সঙ্গে ডেসপাস শাখার তৎকালীন এক কর্মচারী জড়িত ছিল।

এছাড়া যিনি নেপথ্যে থেকে এই জালজালিয়াতির পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করেন তাকে কোনো তদন্ত কমিটি অফিশিয়ালি শনাক্ত করতে পারেনি। বর্তমানে তিনি চাকরিতে নেই। তবে যতদিন কর্মরত ছিলেন, ততদিন সবাই তাকে একনামে চিনতেন।

এর আগে মহসিন উদ্দিন ও গোলাম মোস্তফা নামে দুই মৎস্য ব্যবসায়ীকে ১০ বছরের জন্য এই দিঘিটি লিজ বরাদ্দ দেওয়া হয় ১৯৯৭ সালের ২২ মে। এ সংক্রান্ত প্রস্তাব অনুমোদন করেন তৎকালীন ভূমি সচিব সৈয়দ মারগুব মোর্শেদ।

তদন্ত কমিটি : ভূমি মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন যুগ্মসচিব (আইন) মো. রেজাউল করিমকে প্রধান করে এ বিষয়ে ২০১১ সালের ২৭ জানুয়ারি প্রথম তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অপর সদস্যরা ছিলেন উপসচিব (উন্নয়ন) আব্দুর রউফ এবং উপসচিব (আইন) শংকর চন্দ্র বসু।

কমিটি ২০১২ সালের ৪ জানুয়ারি ভূমি সচিবের কাছে ৬ পৃষ্ঠার তদন্ত রিপোর্ট জমা দেয়। এতে মতামত ও সুপারিশে বলা হয়, রানি ভবানী দিঘি বরাদ্দ দেওয়ার ক্ষেত্রে জালিয়াতি ও প্রতারণার মাধ্যমে বানোয়াট পত্র বা চিঠি সৃষ্টি করা হয়েছে।

জড়িতরা ক্ষমতার অপব্যবহার করে সরকারি রাজস্বের ক্ষতি ছাড়াও সরকারি সম্পত্তি বেহাতের অপচেষ্টা করেছেন। এছাড়া এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত ভূমি মন্ত্রণালয় ও নাটোর ডিসি অফিসের জড়িত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়।

অপরদিকে যে ভুয়া চিঠির ভিত্তিতে যে দলিল সৃষ্টি করা হয়েছে, তা বাতিল করতে দেওয়ানি আদালতে মামলা করতে হবে।

এই তদন্ত কমিটির রিপোর্টে বেশ কয়েকটি গুরুতর অনিয়ম পাওয়া যায়। প্রতিবেদনের মন্তব্যে বলা হয়েছে, লিজের পূর্বের মেয়াদ শেষ হওয়ার ৩ বছর আগেই নাটরের ডিসি ২০০৫ সালের ১৬ জুন নতুন করে মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব করেন।

এছাড়া ভূমি মন্ত্রণালয়ে শাখা-৮ থেকে নথি (৭৩/৯৭) এনে ওই নথিকে নতুনভাবে শাখা-৪ থেকে (ভূঃমঃ/শা-৪/খাজব-১৬২/২০০৫ নাম দিয়ে উপস্থাপন করা হয়। ডিসির চিঠির সূত্র উল্লেখ ছাড়া এটি কীভাবে সম্ভব হলো, তাও রহস্যাবৃত।

এছাড়া তদন্ত কমিটি ভুয়া চিঠির নিচের দিকে বাম কোনায় ইংরেজিতে লেখা পাতা মার্ক সংক্রান্ত সিরিয়াল নং (৫৪-লেটার সি-৪-২০০৬) পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নিশ্চিত হয়েছে যে, এটি সংশ্লিষ্ট শাখা-৪ এর কম্পিউটার থেকে কম্পোজ করে প্রিন্ট দেওয়া হয়েছে।

যদিও ইস্যুকৃত চিঠিতে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক বরাবর পাঠানো অপর একটি চিঠির স্মারক নং ব্যবহার করা হয়েছে। তদন্ত কমিটি পুরো বিষয়টি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে আরও নিশ্চিত হয়েছে যে, ভুয়া এই চিঠি সৃষ্টির পেছনে মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখা এবং ডিসি অফিসের সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশ রয়েছে। এ ঘটনার জন্য প্রত্যেকে তারা ব্যক্তিগতভাবে দায়ী।

এ সংক্রান্ত নাটোর জেলা প্রশাসনের ১৯৯৬ সালের সংশ্লিষ্ট কেস নথিটি ছিল মূলত জলমহাল ইজারা প্রস্তাব। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তা বৈজ্ঞানিক উপায়ে মৎস্যচাষ প্রকল্পের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়।

যদিও সেই বরাদ্দের মেয়াদ বড়জোর ৫-৭ বছর হওয়ার কথা। কিন্তু সেটিও করা হয়েছে ১০ বছর। নিয়মানুযায়ী পূর্বের বছরের ১০ শতাংশ বেশি ইজারামূল্য নির্ধারণ করে এটি বরাদ্দ দেওয়া থাকলেও মূল্য নির্ধারণ করা হয় বাজারমূল্যের ভিত্তিতে, যা সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি বন্দোবস্তের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

অর্থাৎ জেলা প্রশাসকের ইজারা প্রস্তাবকে ভূমি মন্ত্রণালয় দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তাবে রূপান্তর করেছে। অর্থাৎ ১৯৯৭ সালেই মন্ত্রণালয়ের শাখা-৮ এর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এমনটি করে।

এছাড়া ভুয়া চিঠি ইস্যু করার মাধ্যমে বিনা রাজস্বে ৩০ বছরের জন্য রানি ভবানী দিঘিটি ব্যক্তিমালিকানায় ভোগ-দখলের সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়া হয়েছে। এতে সরকারের বিপুল অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।

নিয়মানুযায়ী বছর ভিত্তিতে ইজারামূল্য হিসাব করে বন্দোবস্তের সেলামি হিসাবে প্রদত্ত অর্থ সমন্বয় করে পুনঃইজারা মূল্য নির্ধারণপূর্বক চুক্তিপত্র সম্পাদন করা প্রয়োজন ছিল।

কিন্তু নাটোর জেলা প্রশাসন জলমহাল নীতিমালা লঙ্ঘন করে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিনা রাজস্বে চুক্তিপত্রের পরিবর্তে অকৃষি খাসজমি বন্দোবস্তের নীতিমালা অনুযায়ী দলিল (কবুলিয়ত) সম্পাদন ও রেজিস্ট্রেশন করে দিয়েছে।

লিজ বরাদ্দ : দিঘিটি ১৯৭১ সালের আগ পর্যন্ত পতিত হিসাবে পড়ে ছিল। দেশ স্বাধীনের পরও লিজ ছাড়াই জনসাধারণের জন্য অঘোষিতভাবে উন্মুক্ত ছিল। ১৪০১ থেকে ১৪০৩ বঙ্গাব্দ (১৯৯৪-১৯৯৬ খ্রিষ্টাব্দ) পর্যন্ত সুবল চন্দ্র হালদার নামে এক ব্যক্তিকে লিজ দেওয়া হয়।

পরবর্তী সময়ে নাটোর আধুনিক মৎস্যচাষ লিমিটেডের পক্ষে পরিচালক মহসিন উদ্দিন মানিক ও গোলাম মোস্তফা আবেদন করলে ১৯৯৭ সালে তাদেরকে ১০ বছরের জন্য দীর্ঘমেয়াদে বন্দোবস্ত দেওয়া হয়।

এরপর একই প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গোলাম নবী আবেদন করলে ২০০৬ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি দীর্ঘমেয়াদি বন্দোবস্ত দেওয়া হয়। এর ভিত্তিতে ওই বছর ৩ মার্চ তাদের অনুকূলে দলিলও করে দেওয়া হয়।

রানি ভবানী দিঘির ইতিবৃত্ত : সিএস জরিপের তথ্য অনুযায়ী দেখা যায়, ৮১ বিঘার এই বিশাল দিঘিটির মালিক ছিলেন মহারাজা জগদিন্দ্রনাথ রায় বাহাদুর এবং মহারাজা যোগেন্দ্রনাথ রায় বাহাদুর।

১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর রাজপরিবার দেশত্যাগ করে ভারতে চলে যান। এরপর দিঘিটি রাষ্ট্রীয় প্রজাস্বত্ব আইন-১৯৫০ অনুযায়ী সরকারের খাস সম্পত্তি হিসাবে সরকারের দখলে আসে। দিঘিটির অবস্থান নাটোর সদর উপজেলাধীন শহরের মধ্যে। অনেকের কাছে এটি জয়কালী দিঘি নামে পরিচিত।

বেহাত ঐতিহাসিক রানি ভবানী দিঘি

ভুয়া চিঠিতে ১৫ বছর পার, তদন্ত কমিটির ছড়াছড়ি

ঘটনার দেড় যুগ পর বিভাগীয় মামলায় অভিযুক্ত হলেন আরডিসি মান্নু, ওএসডি আছেন ৫ বছর
 বিএম জাহাঙ্গীর 
০৭ নভেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
ছড়াছড়ি
নাটোরের রানি ভবানী দিঘি। সম্প্রতি তোলা -যুগান্তর

একটি ভুয়া চিঠি। ডিসির কাছে পাঠানো হলো ভূমি মন্ত্রণালয়ের নামে। অতঃপর বেহাত হয়ে গেল নাটোরের ঐতিহাসিক রানি ভবানী দিঘি। গঠিত হলো তদন্তের পর তদন্ত কমিটি। প্রকৃত সত্য বের করতে বাঘা বাঘা সব কর্মকর্তার কত দৌড়ঝাঁপ। মিটিংয়ের পর মিটিং।

সময় নষ্ট। কাগজ নষ্ট। মাঠে নামল দুদকও। দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ। গভীর অনুসন্ধান। কত কী। অবশেষে চিহ্নিত হলেন জড়িতরা। সবাই মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তি। এসব করতেই দেড় যুগ পার। তবু মেলেনি সমাধান।

ফাঁকফোকর গলিয়ে বেরিয়ে গেলেন নেপথ্যের গডফাদাররা। হাতছাড়া হলো বিশাল এই দিঘি, যা আজও নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেনি সরকার। রহস্যজনক কারণে ওই ‘ভুয়া চিঠিই’ হয়ে গেল বেশি শক্তিশালী। সরকার হারল সবখানে। 

ভূমি সচিব মো. মোস্তাফিজুর রহমানের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি যুগান্তরকে বলেন, ‘পুরো বিষয়টি না জেনে আমার পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য করা সমীচীন হবে না। তবে এ বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ 

সংশ্লিষ্ট নথিপত্র থেকে জানা যায়, এ বিষয়ে গঠিত তদন্ত কমিটিগুলো মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকর্তা-কর্মচারী ছাড়াও নাটোর ডিসি অফিসের তৎকালীন ৩ ডিসিসহ ৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে দায়ী করে। তারা হলেন-সাবেক ডিসি কেএম আবুল আহসান, এম ইসহাক ভূঁইয়া, মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন এবং এডিসি (রেভিনিউ) শরীফ আহমেদ, ইফতেখারুল ইসলাম, আরডিসি নাজমুন নাহার মান্নু, এসি ল্যান্ড জামিল হোসেন, রাজস্ব শাখার উচ্চমান সহকারী সিদ্দিকুর রহমান ও ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম।

প্রশাসন ক্যাডারের ১৫তম ব্যাচের কর্মকর্তা নাজমুন নাহার মান্নু উপসচিব পদে পদোন্নতি পেলেও এই বিভাগীয় মামলার কারণে তিনি ৫ বছর ওএসডি আছেন। তার মামলার তদন্ত করতেই দীর্ঘ সময় পার হয়েছে। ২১ আগস্ট প্রতিবেদন দেয় তদন্ত কমিটি। সূত্রমতে, এই কর্মকর্তার নামে আরও অন্তত ৩টি বিভাগীয় মামলা তদন্তাধীন আছে। এ বিষয়ে বক্তব্য নিতে নাজমুন নাহার মান্নুর সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু খুদেবার্তা পাঠিয়েও তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। 

উপসচিব মান্নুর তদন্ত শেষ করতে এত বিলম্ব হওয়ার কারণ জানতে চাইলে বিভাগীয় মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা বর্তমানে রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার হিসাবে কর্মরত ড. মো. হুমায়ুন কবীর যুগান্তরকে বলেন, ‘যৌক্তিক কিছু কারণেই তদন্ত শেষ করতে সময় লেগেছে।’

নাটোরের ডিসি শামীম আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, ‘নথিটি কল করে দেখব। এরপর ডিসির অবস্থান থেকে এখনো যা করুণীয়, সেটিই করা হবে।’

লিজগ্রহীতা গোলাম নবী যুগান্তরকে বলেন, ‘আইনের মধ্য দিয়ে রানি ভবানী দিঘি আমাকে লিজ দেওয়া হয়েছে। কোনো ব্যত্যয় হয়ে থাকলে সেটি মন্ত্রণালয় কিংবা ডিসি অফিস করেছে। এ বিষয়ে উচ্চ আদালত থেকে আমার পক্ষেই চূড়ান্ত রায় এসেছে।’

প্রশাসনসংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কয়েকটি সূত্র যুগান্তরকে জানায়, ‘কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বহুবিধ আমলযোগ্য অভিযোগ অতীতের তুলনায় অনেক বেড়ে গেছে। এসব অভিযোগের প্রাথমিক তদন্ত এবং পরবর্তী সময়ে বিভাগীয় মামলার তদন্তকাজে অনেক কর্মকর্তার শ্রমঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। এতে প্রশাসনের অনেক রুটিনওয়ার্ক সময়মতো করা সম্ভব হয় না।

সারা বছর এসব তদন্ত নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয়। উপরন্তু নানা কারণে তদন্ত বাধাগ্রস্ত হয়। এজন্য প্রথমত, অভিযোগের সংখ্যা কমাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রাথমিক তদন্ত ও বিভাগীয় মামলা তদন্তের সময়সীমা নির্ধারণ করে দিতে হবে। তা না হলে বাদী-বিবাদীসহ সব পক্ষের বাড়তেই থাকবে। 

ভুয়া চিঠির নেপথ্যে : রানি ভবানী দিঘিটি দীর্ঘমেয়াদে লিজ বরাদ্দ নবায়ন করতে ২০০৫ সালের ১৭ এপ্রিল নাটোরের ডিসির পাঠানো প্রস্তাব ভূমি মন্ত্রণালয়ে আসে। প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করে ডিসির প্রস্তাব তৎকালীন ভূমি প্রতিমন্ত্রী উকিল আব্দুস ছাত্তার ভূঁইয়া নাকচ করে দেন।

নথির ৩৫নং অনুচ্ছেদে প্রতিমন্ত্রী তার মতামতে উল্লেখ করেন, ‘নথি দৃষ্টে দেখা যায়, বর্ণিত বিষয়ে পূর্ববর্তী লিজের মেয়াদ ১০ বছর অর্থাৎ ১৪১৪ বাংলা সনে উত্তীর্ণ হবে। জেলা প্রশাসক, নাটোরের ১২/০৬/০৫ তারিখের প্রতিবেদন অনুযায়ী বর্তমান সময় পর্যন্ত ইজারাদারের পারফরম্যান্স ইতিবাচক/সন্তোষজনক।

সেক্ষেত্রে মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার পর জেলা প্রশাসক ইজারাগ্রহীতার সামগ্রিক পারফরম্যান্স বিবেচনায় বিধি মোতাবেক পরবর্তী ব্যবস্থা নিতে পারেন।’ প্রতিমন্ত্রী এই সিদ্ধান্ত দিয়ে নথিতে স্বাক্ষর করেন ২০০৬ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি। এরপর ফাইলটি ডাউন হয়ে শাখায় চলে যায়।

শাখা থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারি প্রশাসনিক কর্মকর্তা নুরুল ইসলাম তালুকদার প্রতিমন্ত্রীর নোট ও সিদ্ধান্তের আলোকে নাটোরের ডিসিকে পাঠানোর জন্য একটি চিঠির খসড়া প্রস্তুত করেন। চিঠিটি অনুমোদন হয়ে জারি নম্বরসহ (ভূঃমঃ/শা-৪/খাজব-১৬২/২০৩৫-৯৫ তাং ১৯/০২/০৬) ইস্যু করা হয়।

শাখা-৪ এর তৎকালীন সিনিয়র সহকারী সচিব মুহম্মদ জুলফিকার আলী স্বাক্ষরিত চিঠিটি মন্ত্রণালয়ের পত্র বিতরণ ও গ্রহণ শাখার মাধ্যমে তা নাটোরের ডিসির কাছে পাঠানো হয়। চিঠি রেজিস্টারে যার প্রমাণ রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এই চিঠি ডিসিকে পাঠানো হয়নি।

মূল চিঠিতে স্মারক নম্বরের শেষে ৯৫ থাকলেও ভুয়া চিঠিতে লেখা রয়েছে ৭৬। ছিল স্মারক নম্বরেও ভুল। এছাড়া ভুয়া চিঠিতে প্রতিমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে লেখা হয়, ‘বিগত সময় লিজগ্রহীতা প্রতিষ্ঠান সন্তোষজনকভাবে মৎস্যচাষ করেছেন বিধায় আবেদনকারী প্রতিষ্ঠান নাটোর আধুনিক মৎস্যচাষ প্রকল্প লিমিটেডের অনুকূলে ভূমি ব্যবস্থাপনা ম্যানুয়ালের ১০৫ অনুচ্ছেদের বিধিমতে দীর্ঘমেয়াদি ইজারা প্রদানে সরকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিয়াছে।’

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো মনে করে, প্রভাবশালীর হস্তক্ষেপ ছাড়াও অলিখিত ঘুস লেনদেনে যুক্ত হওয়ার কারণে নাটোরের ডিসি অফিস এই ভুয়া চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে দীর্ঘমেয়াদে লিজ বরাদ্দের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল।

যে কারণে এত বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তারা একবারের জন্য মন্ত্রণালয়ের শাখায় ফোন করে চিঠির সত্যতা যাচাই করার প্রয়োজন মনে করেনি। মূলত এর পেছনে সব পক্ষের যোগসাজশ ছিল।

যে কারণে মন্ত্রণালয়ের ১৯ ফেব্রুয়ারির চিঠিটি গোপন করে একটি চক্র নিজেদের তৈরি করা ভুয়া চিঠি ১৪ ফেব্রুয়ারির তারিখ দিয়ে রিলিজ করে। এর সঙ্গে ডেসপাস শাখার তৎকালীন এক কর্মচারী জড়িত ছিল।

এছাড়া যিনি নেপথ্যে থেকে এই জালজালিয়াতির পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করেন তাকে কোনো তদন্ত কমিটি অফিশিয়ালি শনাক্ত করতে পারেনি। বর্তমানে তিনি চাকরিতে নেই। তবে যতদিন কর্মরত ছিলেন, ততদিন সবাই তাকে একনামে চিনতেন। 

এর আগে মহসিন উদ্দিন ও গোলাম মোস্তফা নামে দুই মৎস্য ব্যবসায়ীকে ১০ বছরের জন্য এই দিঘিটি লিজ বরাদ্দ দেওয়া হয় ১৯৯৭ সালের ২২ মে। এ সংক্রান্ত প্রস্তাব অনুমোদন করেন তৎকালীন ভূমি সচিব সৈয়দ মারগুব মোর্শেদ।

তদন্ত কমিটি : ভূমি মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন যুগ্মসচিব (আইন) মো. রেজাউল করিমকে প্রধান করে এ বিষয়ে ২০১১ সালের ২৭ জানুয়ারি প্রথম তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অপর সদস্যরা ছিলেন উপসচিব (উন্নয়ন) আব্দুর রউফ এবং উপসচিব (আইন) শংকর চন্দ্র বসু।

কমিটি ২০১২ সালের ৪ জানুয়ারি ভূমি সচিবের কাছে ৬ পৃষ্ঠার তদন্ত রিপোর্ট জমা দেয়। এতে মতামত ও সুপারিশে বলা হয়, রানি ভবানী দিঘি বরাদ্দ দেওয়ার ক্ষেত্রে জালিয়াতি ও প্রতারণার মাধ্যমে বানোয়াট পত্র বা চিঠি সৃষ্টি করা হয়েছে।

জড়িতরা ক্ষমতার অপব্যবহার করে সরকারি রাজস্বের ক্ষতি ছাড়াও সরকারি সম্পত্তি বেহাতের অপচেষ্টা করেছেন। এছাড়া এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত ভূমি মন্ত্রণালয় ও নাটোর ডিসি অফিসের জড়িত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়।

অপরদিকে যে ভুয়া চিঠির ভিত্তিতে যে দলিল সৃষ্টি করা হয়েছে, তা বাতিল করতে দেওয়ানি আদালতে মামলা করতে হবে।

এই তদন্ত কমিটির রিপোর্টে বেশ কয়েকটি গুরুতর অনিয়ম পাওয়া যায়। প্রতিবেদনের মন্তব্যে বলা হয়েছে, লিজের পূর্বের মেয়াদ শেষ হওয়ার ৩ বছর আগেই নাটরের ডিসি ২০০৫ সালের ১৬ জুন নতুন করে মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব করেন।

এছাড়া ভূমি মন্ত্রণালয়ে শাখা-৮ থেকে নথি (৭৩/৯৭) এনে ওই নথিকে নতুনভাবে শাখা-৪ থেকে (ভূঃমঃ/শা-৪/খাজব-১৬২/২০০৫ নাম দিয়ে উপস্থাপন করা হয়। ডিসির চিঠির সূত্র উল্লেখ ছাড়া এটি কীভাবে সম্ভব হলো, তাও রহস্যাবৃত। 

এছাড়া তদন্ত কমিটি ভুয়া চিঠির নিচের দিকে বাম কোনায় ইংরেজিতে লেখা পাতা মার্ক সংক্রান্ত সিরিয়াল নং (৫৪-লেটার সি-৪-২০০৬) পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নিশ্চিত হয়েছে যে, এটি সংশ্লিষ্ট শাখা-৪ এর কম্পিউটার থেকে কম্পোজ করে প্রিন্ট দেওয়া হয়েছে।

যদিও ইস্যুকৃত চিঠিতে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক বরাবর পাঠানো অপর একটি চিঠির স্মারক নং ব্যবহার করা হয়েছে। তদন্ত কমিটি পুরো বিষয়টি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে আরও নিশ্চিত হয়েছে যে, ভুয়া এই চিঠি সৃষ্টির পেছনে মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখা এবং ডিসি অফিসের সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশ রয়েছে। এ ঘটনার জন্য প্রত্যেকে তারা ব্যক্তিগতভাবে দায়ী। 

এ সংক্রান্ত নাটোর জেলা প্রশাসনের ১৯৯৬ সালের সংশ্লিষ্ট কেস নথিটি ছিল মূলত জলমহাল ইজারা প্রস্তাব। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তা বৈজ্ঞানিক উপায়ে মৎস্যচাষ প্রকল্পের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়।

যদিও সেই বরাদ্দের মেয়াদ বড়জোর ৫-৭ বছর হওয়ার কথা। কিন্তু সেটিও করা হয়েছে ১০ বছর। নিয়মানুযায়ী পূর্বের বছরের ১০ শতাংশ বেশি ইজারামূল্য নির্ধারণ করে এটি বরাদ্দ দেওয়া থাকলেও মূল্য নির্ধারণ করা হয় বাজারমূল্যের ভিত্তিতে, যা সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি বন্দোবস্তের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

অর্থাৎ জেলা প্রশাসকের ইজারা প্রস্তাবকে ভূমি মন্ত্রণালয় দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তাবে রূপান্তর করেছে। অর্থাৎ ১৯৯৭ সালেই মন্ত্রণালয়ের শাখা-৮ এর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এমনটি করে। 

এছাড়া ভুয়া চিঠি ইস্যু করার মাধ্যমে বিনা রাজস্বে ৩০ বছরের জন্য রানি ভবানী দিঘিটি ব্যক্তিমালিকানায় ভোগ-দখলের সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়া হয়েছে। এতে সরকারের বিপুল অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।

নিয়মানুযায়ী বছর ভিত্তিতে ইজারামূল্য হিসাব করে বন্দোবস্তের সেলামি হিসাবে প্রদত্ত অর্থ সমন্বয় করে পুনঃইজারা মূল্য নির্ধারণপূর্বক চুক্তিপত্র সম্পাদন করা প্রয়োজন ছিল।

কিন্তু নাটোর জেলা প্রশাসন জলমহাল নীতিমালা লঙ্ঘন করে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিনা রাজস্বে চুক্তিপত্রের পরিবর্তে অকৃষি খাসজমি বন্দোবস্তের নীতিমালা অনুযায়ী দলিল (কবুলিয়ত) সম্পাদন ও রেজিস্ট্রেশন করে দিয়েছে। 

লিজ বরাদ্দ : দিঘিটি ১৯৭১ সালের আগ পর্যন্ত পতিত হিসাবে পড়ে ছিল। দেশ স্বাধীনের পরও লিজ ছাড়াই জনসাধারণের জন্য অঘোষিতভাবে উন্মুক্ত ছিল। ১৪০১ থেকে ১৪০৩ বঙ্গাব্দ (১৯৯৪-১৯৯৬ খ্রিষ্টাব্দ) পর্যন্ত সুবল চন্দ্র হালদার নামে এক ব্যক্তিকে লিজ দেওয়া হয়।

পরবর্তী সময়ে নাটোর আধুনিক মৎস্যচাষ লিমিটেডের পক্ষে পরিচালক মহসিন উদ্দিন মানিক ও গোলাম মোস্তফা আবেদন করলে ১৯৯৭ সালে তাদেরকে ১০ বছরের জন্য দীর্ঘমেয়াদে বন্দোবস্ত দেওয়া হয়।

এরপর একই প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গোলাম নবী আবেদন করলে ২০০৬ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি দীর্ঘমেয়াদি বন্দোবস্ত দেওয়া হয়। এর ভিত্তিতে ওই বছর ৩ মার্চ তাদের অনুকূলে দলিলও করে দেওয়া হয়। 

রানি ভবানী দিঘির ইতিবৃত্ত : সিএস জরিপের তথ্য অনুযায়ী দেখা যায়, ৮১ বিঘার এই বিশাল দিঘিটির মালিক ছিলেন মহারাজা জগদিন্দ্রনাথ রায় বাহাদুর এবং মহারাজা যোগেন্দ্রনাথ রায় বাহাদুর।

১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর রাজপরিবার দেশত্যাগ করে ভারতে চলে যান। এরপর দিঘিটি রাষ্ট্রীয় প্রজাস্বত্ব আইন-১৯৫০ অনুযায়ী সরকারের খাস সম্পত্তি হিসাবে সরকারের দখলে আসে। দিঘিটির অবস্থান নাটোর সদর উপজেলাধীন শহরের মধ্যে। অনেকের কাছে এটি জয়কালী দিঘি নামে পরিচিত। 
 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন