১১১ সুপারিশের বেশির ভাগই বাস্তবায়ন হয়নি
jugantor
ঝরছে তরুণ-তাজা প্রাণ
১১১ সুপারিশের বেশির ভাগই বাস্তবায়ন হয়নি

  সিরাজুল ইসলাম  

২৬ নভেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের সড়ক-মহাসড়কে প্রতিনিয়ত তরুণ-তাজা প্রাণ ঝরছে। কোনো একটা ঘটনায় ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হলে বা অন্দোলন গড়ে উঠলে পরিস্থিতি সামাল দিতে কমিটি গঠন করা হয়।

তাৎক্ষণিক নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু কিছুদিন পরই সবাই সবকিছু ভুলে যান। স্থায়ী সমাধান হয় না কিছুতেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যার কাজ তাকে করতে না দিয়ে অন্যের ঘাড়ে চাপানো হয়।

এ কারণেই সমস্যার কোনো সমাধান হয় না। এদিকে, সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ২০১৯ সালে গঠিত উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটির বেশিরভাগ সুপারিশ এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। এছাড়া সড়ক পরিবহণ আইন-২০১৮-এর প্রয়োগ চলছে কার্যত সীমিত আকারে।

এ কারণে সড়ক দুর্ঘটনা থামছে না। সবশেষ বৃহস্পতিবার ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়িচাপায় ব্যবসায়ী আহসান কবির খান নিহত হন।

এর আগেরদিন বুধবার সকালে ঢাকা দক্ষিণ সিটির ময়লার গাড়িচাপায় নটর ডেম কলেজ শিক্ষার্থী নাঈম হাসান নিহত হন। এ দুটি ঘটনায় উত্তাল রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা।

২০১৮ সালের ২৯ জুলাই রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে দ্রুতগতির দুই বাসের সংঘর্ষে রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী রাজীব ও দিয়া নিহত হন।

এ ঘটনায় ১০ শিক্ষার্থী আহত হন। এর পরিপ্রেক্ষিতে গড়ে উঠা তীব্র শিক্ষার্থী অন্দোলনের মুখে সড়ক পরিবহণ আইন-২০১৮ পাশ হয়। কিন্তু বিধিমালা না হওয়ায় আইনটি কার্যকর করা যাচ্ছিল না। এরই মধ্যে ২০১৯ সালের ১৯ মার্চ রাজধানীর প্রগতি সরণির জেব্রাক্রসিংয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) ছাত্র আবরার আহমেদ চৌধুরী নিহত হন। আবারও শুরু হয় ছাত্র আন্দোলন। এ প্রেক্ষাপটে উদ্যোগ নেওয়া হয় সড়ক পরিবহণ আইন-২০১৮ কার্যকরের।

কিন্তু শুরুতেই হোঁচট খায় নতুন আইন। ২০১৯ সালের ১ নভেম্বর থেকে আইনটি প্রয়োগ করতে গেলে নানা বাধার মুখে পড়েন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।

পরে এটি সীমিত আকারে কার্যকর শুরু হয়। ২০২০ সালের জুলাই থেকে আইনটি পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকরের কথা থাকলেও তা হচ্ছে না বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সড়ক পরিবহণ আইন-২০১৮ সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বিষয়টি নিয়ে সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলে আলোচনা চলছে।

বেশ কয়েকটি বৈঠকও হয়েছে। এখনো চূড়ান্ত কিছু হয়নি। এ কারণে এখনো কার্যত সীমিত আকারে (সাজা-জরিমানার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ না দিয়ে এর নিচে বা সর্বনিু দেওয়া হচ্ছে) ওই আইনের বাস্তবায়ন চলছে।

অপরদিকে সড়ক পরিবহণ সেক্টরে শৃঙ্খলা আনা ও দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে ২০১৯ সালে এ সংক্রান্ত কমিটির দেওয়া ১১১ সুপারিশের মধ্যে বেশিরভাগই বাস্তবায়ন হয়নি।

যেগুলো বাস্তবায়ন হয়েছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে-সড়ক পরিবহণ আইনের বিধিমালা জারি, মোটরসাইকেল চালকদের হেলমেট পরিধান করা এবং গাড়ির বাম্পার অ্যাঙ্গেল খুলে ফেলা। এছাড়া চালক প্রশিক্ষণে সরকারি খরচে ইন্সট্রাক্টর তৈরির কার্যক্রমও চলমান আছে। এক হাজার ৪০০ ইন্সট্রাক্টর তৈরির কথা থাকলেও এ পর্যন্ত তিনশর কাছাকাছি ইন্সট্রাক্টর তৈরি করা হয়েছে। এছাড়া ‘নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলন’র পক্ষ থেকে ২০ জন ইন্সট্রাক্টর তৈরি করা হয়েছে।

বাস্তবায়ন না হওয়া সুপারিশগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-সড়ক নিরাপত্তার বিষয়টি স্কুলের পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত করা, সড়ক উন্নয়নে নেওয়া প্রকল্পের ৫ শতাংশ অর্থ সড়ক নিরাপত্তার জন্য রাখা, জেলা ও উপজেলা সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের ক্ষমতা বৃদ্ধি, ইন্সট্রাক্টর নিয়োগে সরকারি বিভিন্ন বাহিনীর অবসরপ্রাপ্তদের অগ্রাধিকার দেওয়া, চাকরিতে নারী চালকদের অগ্রাধিকার দেওয়া, ট্রাফিক পুলিশের জন্য উন্নত প্রশিক্ষণ, রাজধানী থেকে রিকশা তুলে দেওয়া, রাইড শেয়ারিং কোম্পানির জন্য গাড়ির সংখ্যা বেঁধে দেওয়া, শুধু লাইসেন্সধারী চালকদের কাছে মোটরসাইকেল বিক্রি করা, দৈনিক ভিত্তিতে চালক নিয়োগ না দেওয়া, চালকদের সুনির্দিষ্ট মজুরি নির্ধারণ, রাস্তায় প্রতিযোগিতা বন্ধ করতে বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন এবং সড়কে ডিজিটাল মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ‘নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলন’র প্রতিষ্ঠাতা ইলিয়াস কাঞ্চন যুগান্তরকে বলেন, দীর্ঘদিনেও সড়ক পরিবহণ আইন-২০১৮ পুরোপুরি কার্যকর না করা এবং সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে দেওয়া সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন না হওয়ার বিষয় দুটি খুবই দুঃখজনক। আইন কার্যকর এবং সুপারিশ বাস্তবায়ন না হওয়ার কারণেই ঘটছে একের পর এক দুর্ঘটনা। আসলে কী সবই দুর্ঘটনা? আগেরদিন ময়লার গাড়িচাপায় ছাত্র মারা গেল। পরদিন আবার ময়লার গাড়ির ধাক্কায় ব্যবসায়ী নিহত হওয়ার ঘটনা অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এসব প্রশ্নের উত্তর সরকারকেই বের করতে হবে। ময়লার গাড়ি চলার কথা রাতে। দিনে কেন চলবে? তিনি বলেন, শিক্ষার্থী রাজীব, দিয়া এবং আবরার নিহতের পর সরকারের নীতিনির্ধারকরা বলেছিলেন, ছাত্র আন্দোলন তাদের চোখ খুলে দিয়েছে। এখন কী তাদের চোখ বন্ধ হয়ে গেছে?

সাবেক মন্ত্রী শাজাহান খানের নেতৃত্বে গঠিত উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি ২০১৯ সালে যে ১১১টি সুপারিশ দিয়েছিল সেগুলোর মধ্যে ৫০টি ২০১৯ সালেই বাস্তবায়ন হওয়ার কথা ছিল। ২০২১ সালের মধ্যে ৩২টি ও ২০২৪ সালের মধ্যে ২৯টি সুপারিশ বাস্তবায়নের কথা বলা হয় কমিটির প্রতিবেদনে। ২০১৯ সালের ৫ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের সর্বশেষ সভায় ওই কমিটির প্রতিবেদন গ্রহণ করে তা বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এজন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে সভাপতি করে ৩৩ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্সও গঠন করা হয়। টাস্কফোর্সের সদস্য ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, সুপারিশ বাস্তবায়নে তেমন কোনো কাজই হয়নি। করোনাভাইরাস সংক্রমণের আগে ৬টি কমিটি করা হয়। করোনাভাইরাস সংক্রমণ শুরুর পর কাজ থেমে আছে।

টাস্কফোর্সের সদস্য, পরিবহণ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক শামসুল হক যুগান্তরকে বলেন, সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে আগেও অনেক কমিটি সুপারিশ দিয়েছে। আমরাও দিয়েছি। কিন্তু ওইসব সুপারিশ বাস্তবায়ন হয় না। আমাদের বড় ভুল ছিল-অতীতের সুপারিশগুলো কেন বাস্তবায়ন হয়নি, তা জানতে চাইনি। এ কারণে অতীতের মতো আমাদের সুপারিশগুলোও আলোর মুখ দেখেনি। তিনি বলেন, এভাবে সমস্যার সমাধান আসবে না। যার কাজ তাকেই করতে হবে। এটি বিআরটিএর কাজ। তা না করে এটি দেওয়া হয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে। যাদের কাজ তারা সক্ষম না হলে, অন্যের ওপর চাপিয়ে দিয়ে লাভ হয় না। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ধাপে ধাপে অগ্রসর হয়ে সড়কে যে প্রক্রিয়ায় শৃঙ্খলা এনেছে, আমরা তার ধারেকাছেও নেই। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, এ পর্যন্ত টাস্কফোর্সের তিনটি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রথম সভাতেই আমি বলেছিলাম, এসব সভা করে কোনো লাভ হবে না।

অধ্যাপক শামসুল হক বলেন, কেউই আসল কাজ করতে চায় না। যেখানে টাকা আছে, সবাই সেখানে যেতে চায়। এ কারণেই চালকদের প্রশিক্ষণের দিকে সবার নজর। কারণ, এখানে লেকচার দিলেই টাকা পাওয়া যায়। কিন্তু প্রশিক্ষণের পর চালকরা কীভাবে গাড়ি চালাচ্ছেন, সে বিষয়ে কোনো মনিটরিং হচ্ছে না।

সাবেক মন্ত্রী ও সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোসংক্রান্ত কমিটির প্রধান শাজাহান খান যুগান্তরকে বলেন, আমাদের দেওয়া ১১১ সুপারিশের কিছু বাস্তবায়ন হয়েছে। তবে কতগুলো বাস্তবায়ন হয়েছে তা-এ মুহূর্তে বলতে পারব না। কারণ, অনেকদিন ধরে এ সংক্রান্ত সভা হয় না। এ বিষয়ে একটি রিভিও সভা আহ্বান করা হবে বলেও তিনি জানান।

বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ মজুমদার বলেন, যখন কোনো আইন সংসদে পাশ হয়, তখন তা পুরোপুরি কার্যকরের জন্যই পাশ হয়। আইন সংশোধনের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন উল্লেখ করে তিনি জানান, সড়কে অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী সাজা হচ্ছে।

বিআরটিএর পরিচালক শেখ মোহাম্মদ মাহবুব-ই-রাব্বানী যুগান্তরকে বলেন, সুপারিশ বাস্তবায়ন একটি চলমান প্রক্রিয়া। সড়কে শৃঙ্খলা আনয়নে কিছু সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়েছে। কিছু সুপারিশের এক-তৃতীয়াংশ এবং কিছুর ৫০ ভাগ বাস্তবায়ন হয়েছে। তবে বেশিরভাগ সুপারিশ বাস্তবায়ন চলমান অবস্থায় আছে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগের প্রধান মুনিবুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, ২০১৯ সালের নভেম্বরে যখন আমরা আইনটি কার্যকর করতে যাই, তখন অনেক বাধা আসে। এর প্রেক্ষাপটে সরকার ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত আইনটি সীমিত আকারে প্রয়োগের নির্দেশ দেয়। পুলিশ ২০২০ সালের জুনের পর থেকে কঠোরভাবে আইনটি প্রয়োগ শুরু করে।

ইতোমধ্যে পরিবহণ মালিক এবং শ্রমিকদের পক্ষ থেকে আইনটি সংশোধনে সরকারের উচ্চপর্যায়ে যোগাযোগ করা হয়েছে। এ মুহূর্তে চলমান আইনটি পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

ঝরছে তরুণ-তাজা প্রাণ

১১১ সুপারিশের বেশির ভাগই বাস্তবায়ন হয়নি

 সিরাজুল ইসলাম 
২৬ নভেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের সড়ক-মহাসড়কে প্রতিনিয়ত তরুণ-তাজা প্রাণ ঝরছে। কোনো একটা ঘটনায় ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হলে বা অন্দোলন গড়ে উঠলে পরিস্থিতি সামাল দিতে কমিটি গঠন করা হয়।

তাৎক্ষণিক নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু কিছুদিন পরই সবাই সবকিছু ভুলে যান। স্থায়ী সমাধান হয় না কিছুতেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যার কাজ তাকে করতে না দিয়ে অন্যের ঘাড়ে চাপানো হয়।

এ কারণেই সমস্যার কোনো সমাধান হয় না। এদিকে, সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ২০১৯ সালে গঠিত উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটির বেশিরভাগ সুপারিশ এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। এছাড়া সড়ক পরিবহণ আইন-২০১৮-এর প্রয়োগ চলছে কার্যত সীমিত আকারে।

এ কারণে সড়ক দুর্ঘটনা থামছে না। সবশেষ বৃহস্পতিবার ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়িচাপায় ব্যবসায়ী আহসান কবির খান নিহত হন।

এর আগেরদিন বুধবার সকালে ঢাকা দক্ষিণ সিটির ময়লার গাড়িচাপায় নটর ডেম কলেজ শিক্ষার্থী নাঈম হাসান নিহত হন। এ দুটি ঘটনায় উত্তাল রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা।

২০১৮ সালের ২৯ জুলাই রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে দ্রুতগতির দুই বাসের সংঘর্ষে রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী রাজীব ও দিয়া নিহত হন।

এ ঘটনায় ১০ শিক্ষার্থী আহত হন। এর পরিপ্রেক্ষিতে গড়ে উঠা তীব্র শিক্ষার্থী অন্দোলনের মুখে সড়ক পরিবহণ আইন-২০১৮ পাশ হয়। কিন্তু বিধিমালা না হওয়ায় আইনটি কার্যকর করা যাচ্ছিল না। এরই মধ্যে ২০১৯ সালের ১৯ মার্চ রাজধানীর প্রগতি সরণির জেব্রাক্রসিংয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) ছাত্র আবরার আহমেদ চৌধুরী নিহত হন। আবারও শুরু হয় ছাত্র আন্দোলন। এ প্রেক্ষাপটে উদ্যোগ নেওয়া হয় সড়ক পরিবহণ আইন-২০১৮ কার্যকরের।

কিন্তু শুরুতেই হোঁচট খায় নতুন আইন। ২০১৯ সালের ১ নভেম্বর থেকে আইনটি প্রয়োগ করতে গেলে নানা বাধার মুখে পড়েন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।

পরে এটি সীমিত আকারে কার্যকর শুরু হয়। ২০২০ সালের জুলাই থেকে আইনটি পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকরের কথা থাকলেও তা হচ্ছে না বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সড়ক পরিবহণ আইন-২০১৮ সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বিষয়টি নিয়ে সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলে আলোচনা চলছে।

বেশ কয়েকটি বৈঠকও হয়েছে। এখনো চূড়ান্ত কিছু হয়নি। এ কারণে এখনো কার্যত সীমিত আকারে (সাজা-জরিমানার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ না দিয়ে এর নিচে বা সর্বনিু দেওয়া হচ্ছে) ওই আইনের বাস্তবায়ন চলছে।

অপরদিকে সড়ক পরিবহণ সেক্টরে শৃঙ্খলা আনা ও দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে ২০১৯ সালে এ সংক্রান্ত কমিটির দেওয়া ১১১ সুপারিশের মধ্যে বেশিরভাগই বাস্তবায়ন হয়নি।

যেগুলো বাস্তবায়ন হয়েছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে-সড়ক পরিবহণ আইনের বিধিমালা জারি, মোটরসাইকেল চালকদের হেলমেট পরিধান করা এবং গাড়ির বাম্পার অ্যাঙ্গেল খুলে ফেলা। এছাড়া চালক প্রশিক্ষণে সরকারি খরচে ইন্সট্রাক্টর তৈরির কার্যক্রমও চলমান আছে। এক হাজার ৪০০ ইন্সট্রাক্টর তৈরির কথা থাকলেও এ পর্যন্ত তিনশর কাছাকাছি ইন্সট্রাক্টর তৈরি করা হয়েছে। এছাড়া ‘নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলন’র পক্ষ থেকে ২০ জন ইন্সট্রাক্টর তৈরি করা হয়েছে।

বাস্তবায়ন না হওয়া সুপারিশগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-সড়ক নিরাপত্তার বিষয়টি স্কুলের পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত করা, সড়ক উন্নয়নে নেওয়া প্রকল্পের ৫ শতাংশ অর্থ সড়ক নিরাপত্তার জন্য রাখা, জেলা ও উপজেলা সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের ক্ষমতা বৃদ্ধি, ইন্সট্রাক্টর নিয়োগে সরকারি বিভিন্ন বাহিনীর অবসরপ্রাপ্তদের অগ্রাধিকার দেওয়া, চাকরিতে নারী চালকদের অগ্রাধিকার দেওয়া, ট্রাফিক পুলিশের জন্য উন্নত প্রশিক্ষণ, রাজধানী থেকে রিকশা তুলে দেওয়া, রাইড শেয়ারিং কোম্পানির জন্য গাড়ির সংখ্যা বেঁধে দেওয়া, শুধু লাইসেন্সধারী চালকদের কাছে মোটরসাইকেল বিক্রি করা, দৈনিক ভিত্তিতে চালক নিয়োগ না দেওয়া, চালকদের সুনির্দিষ্ট মজুরি নির্ধারণ, রাস্তায় প্রতিযোগিতা বন্ধ করতে বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন এবং সড়কে ডিজিটাল মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ‘নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলন’র প্রতিষ্ঠাতা ইলিয়াস কাঞ্চন যুগান্তরকে বলেন, দীর্ঘদিনেও সড়ক পরিবহণ আইন-২০১৮ পুরোপুরি কার্যকর না করা এবং সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে দেওয়া সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন না হওয়ার বিষয় দুটি খুবই দুঃখজনক। আইন কার্যকর এবং সুপারিশ বাস্তবায়ন না হওয়ার কারণেই ঘটছে একের পর এক দুর্ঘটনা। আসলে কী সবই দুর্ঘটনা? আগেরদিন ময়লার গাড়িচাপায় ছাত্র মারা গেল। পরদিন আবার ময়লার গাড়ির ধাক্কায় ব্যবসায়ী নিহত হওয়ার ঘটনা অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এসব প্রশ্নের উত্তর সরকারকেই বের করতে হবে। ময়লার গাড়ি চলার কথা রাতে। দিনে কেন চলবে? তিনি বলেন, শিক্ষার্থী রাজীব, দিয়া এবং আবরার নিহতের পর সরকারের নীতিনির্ধারকরা বলেছিলেন, ছাত্র আন্দোলন তাদের চোখ খুলে দিয়েছে। এখন কী তাদের চোখ বন্ধ হয়ে গেছে?

সাবেক মন্ত্রী শাজাহান খানের নেতৃত্বে গঠিত উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি ২০১৯ সালে যে ১১১টি সুপারিশ দিয়েছিল সেগুলোর মধ্যে ৫০টি ২০১৯ সালেই বাস্তবায়ন হওয়ার কথা ছিল। ২০২১ সালের মধ্যে ৩২টি ও ২০২৪ সালের মধ্যে ২৯টি সুপারিশ বাস্তবায়নের কথা বলা হয় কমিটির প্রতিবেদনে। ২০১৯ সালের ৫ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের সর্বশেষ সভায় ওই কমিটির প্রতিবেদন গ্রহণ করে তা বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এজন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে সভাপতি করে ৩৩ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্সও গঠন করা হয়। টাস্কফোর্সের সদস্য ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, সুপারিশ বাস্তবায়নে তেমন কোনো কাজই হয়নি। করোনাভাইরাস সংক্রমণের আগে ৬টি কমিটি করা হয়। করোনাভাইরাস সংক্রমণ শুরুর পর কাজ থেমে আছে।

টাস্কফোর্সের সদস্য, পরিবহণ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক শামসুল হক যুগান্তরকে বলেন, সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে আগেও অনেক কমিটি সুপারিশ দিয়েছে। আমরাও দিয়েছি। কিন্তু ওইসব সুপারিশ বাস্তবায়ন হয় না। আমাদের বড় ভুল ছিল-অতীতের সুপারিশগুলো কেন বাস্তবায়ন হয়নি, তা জানতে চাইনি। এ কারণে অতীতের মতো আমাদের সুপারিশগুলোও আলোর মুখ দেখেনি। তিনি বলেন, এভাবে সমস্যার সমাধান আসবে না। যার কাজ তাকেই করতে হবে। এটি বিআরটিএর কাজ। তা না করে এটি দেওয়া হয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে। যাদের কাজ তারা সক্ষম না হলে, অন্যের ওপর চাপিয়ে দিয়ে লাভ হয় না। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ধাপে ধাপে অগ্রসর হয়ে সড়কে যে প্রক্রিয়ায় শৃঙ্খলা এনেছে, আমরা তার ধারেকাছেও নেই। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, এ পর্যন্ত টাস্কফোর্সের তিনটি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রথম সভাতেই আমি বলেছিলাম, এসব সভা করে কোনো লাভ হবে না।

অধ্যাপক শামসুল হক বলেন, কেউই আসল কাজ করতে চায় না। যেখানে টাকা আছে, সবাই সেখানে যেতে চায়। এ কারণেই চালকদের প্রশিক্ষণের দিকে সবার নজর। কারণ, এখানে লেকচার দিলেই টাকা পাওয়া যায়। কিন্তু প্রশিক্ষণের পর চালকরা কীভাবে গাড়ি চালাচ্ছেন, সে বিষয়ে কোনো মনিটরিং হচ্ছে না।

সাবেক মন্ত্রী ও সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোসংক্রান্ত কমিটির প্রধান শাজাহান খান যুগান্তরকে বলেন, আমাদের দেওয়া ১১১ সুপারিশের কিছু বাস্তবায়ন হয়েছে। তবে কতগুলো বাস্তবায়ন হয়েছে তা-এ মুহূর্তে বলতে পারব না। কারণ, অনেকদিন ধরে এ সংক্রান্ত সভা হয় না। এ বিষয়ে একটি রিভিও সভা আহ্বান করা হবে বলেও তিনি জানান।

বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ মজুমদার বলেন, যখন কোনো আইন সংসদে পাশ হয়, তখন তা পুরোপুরি কার্যকরের জন্যই পাশ হয়। আইন সংশোধনের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন উল্লেখ করে তিনি জানান, সড়কে অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী সাজা হচ্ছে।

বিআরটিএর পরিচালক শেখ মোহাম্মদ মাহবুব-ই-রাব্বানী যুগান্তরকে বলেন, সুপারিশ বাস্তবায়ন একটি চলমান প্রক্রিয়া। সড়কে শৃঙ্খলা আনয়নে কিছু সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়েছে। কিছু সুপারিশের এক-তৃতীয়াংশ এবং কিছুর ৫০ ভাগ বাস্তবায়ন হয়েছে। তবে বেশিরভাগ সুপারিশ বাস্তবায়ন চলমান অবস্থায় আছে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগের প্রধান মুনিবুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, ২০১৯ সালের নভেম্বরে যখন আমরা আইনটি কার্যকর করতে যাই, তখন অনেক বাধা আসে। এর প্রেক্ষাপটে সরকার ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত আইনটি সীমিত আকারে প্রয়োগের নির্দেশ দেয়। পুলিশ ২০২০ সালের জুনের পর থেকে কঠোরভাবে আইনটি প্রয়োগ শুরু করে।

ইতোমধ্যে পরিবহণ মালিক এবং শ্রমিকদের পক্ষ থেকে আইনটি সংশোধনে সরকারের উচ্চপর্যায়ে যোগাযোগ করা হয়েছে। এ মুহূর্তে চলমান আইনটি পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন