লিটন-মুশফিকের ব্যাটে সোনাঝরা রোদ
jugantor
লিটন-মুশফিকের ব্যাটে সোনাঝরা রোদ
প্রথমদিন শেষে বাংলাদেশ ২৫৩/৪ * (লিটন ১১৩* ও মুশফিকুর ৮২*)

  জ্যোতির্ময় মণ্ডল, চট্টগ্রাম থেকে  

২৭ নভেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সোনাঝরা

ভারত-মিয়ানমার সীমান্তে ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে চট্টগ্রাম। শুক্রবার ভোর রাতে চট্টলার মানুষ আতঙ্কে নেমে আসে পথে। ভয় স্বাভাবিক হতে না হতে সাগরিকার বিটাক মোড় সংলগ্ন হোমল্যান্ড কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের কারখানায় অগ্নিকাণ্ড। ধোঁয়ায় ঢেকে যায় স্টেডিয়ামসহ পুরো এলাকা। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে খেলার মাঠেও। তার থেকেও বড় দাবানলে তখন পুড়ছে বাংলাদেশের টপঅর্ডার। সাগরিকায় সেই দাবানল থামান টি ২০ সিরিজে ব্রাত্য লিটন দাস ও মুশফিকুর রহিম। জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে শেষ বিকালের সোনাঝরা রোদে আরও চকচক করে ওঠে লিটন ও মুশফিকের ব্যাট। প্রথম টেস্টের প্রথমদিনের সকালে মৃত্যুকূপে পড়ে ৪৯ রানেই নেই হয়ে যায় চার উইকেট। এমন ভয়াল দিন স্বস্তির হাসিতে শেষ করল বাংলাদেশ। এই ফরম্যাটে দারুণ ছন্দে থাকা লিটন (১১৩*) অভিষেক সেঞ্চুরির দেখা পেলেন। দলের দুঃসময়ে আবারও ঢাল হয়ে দাঁড়ালেন মুশফিক (৮২*)। পঞ্চম উইকেটে দুজনের রেকর্ড অবিচ্ছিন্ন ২০৪ রানের জুটিতে প্রথমদিনটা নিজেদের করে নিল স্বাগতিকরা। দিনের আলো নিভে আসায় প্রথম দিন পাঁচ ওভার কম খেলা হয়েছে, স্বাগতিকদের স্কোর ২৫৩/৪।

করোনাকালে ঢাকার বাইরে শুধু খেলা হয়েছে চট্টগ্রামে। এর আগে জহুর আহমেদে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে একটি টেস্ট হলেও দর্শক প্রবেশের অনুমতি ছিল না। সাদা পোশাকের ক্রিকেটে কাল প্রায় ছয় হাজার দর্শক ছিল। সকালে বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের গল্প শুনে সমর্থকরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। কিন্তু দুপুর গড়ানোর পর উপস্থিতি বাড়তে থাকে। বদলে যায় ড্রেসিংরুমের চেহারাও। সকালের উইকেট দেখে ধারাভাষ্যকাররা বারবার বলেছেন, দারুণ ব্যাটিং উইকেট। টস-ভাগ্য সহায় হওয়ায় মুমিনুল হক ব্যাটিং নেন। এ নিয়ে টানা চার ম্যাচে বাবর আজমের বিপক্ষে টস জিতল বাংলাদেশ। পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজ দিয়ে ঘরের মাটিতে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের যাত্রাও শুরু হলো এই টেস্ট দিয়ে। টি ২০তে টানা ব্যর্থতায় অস্বস্তিকর আবহের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। চট্টগ্রাম টেস্টে ব্যাটিংয়ে নেমে দ্রুত চার উইকেট হারিয়ে মনে হচ্ছিল সংস্করণ বদলালেও ব্যর্থতার চক্রেই বন্দি তারা। ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরি ছুঁয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে লিটন। সেঞ্চুরি থেকে বেশি দূরে নেই বাংলাদেশের বিপদের ত্রাতা মুশফিক। অথচ, তার আগের গল্পটা কি বিভীষিকাময়!

টি ২০ ক্রিকেটে প্রথমবার সুযোগ পেয়েও সাইফ হাসানের কেটেছে ভীষণ হতাশার মধ্য দিয়ে। তবে সাদা পোশাকের ক্রিকেটে কাল শুরুটা ছিল কিছুটা আগ্রাসী। কিন্তু টেস্টের মতো হলো না। ১২ বল খেলে তিনটি চারও মেরেছিলেন। শাহিন শাহ আফ্রিদির হঠাৎ লাফিয়ে ওঠা বলে ব্যাট ছোঁয়াতে গিয়ে শর্ট ফাইন-লেগে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন। করেন ১৪ রান। ১৪তেই আটকে গেছেন সাদমান ইসলাম ও নাজমুল হোসেন শান্তও। সাদমান শূন্যতে ফিরতে পারতেন। শাহিন শাহর বল তার ব্যাটের কানায় লাগলেও পাকিস্তানের কেউ টের পাননি। অধিনায়ক মুমিনুল হক আউট হন ছয় রান করে। আগের তিন টেস্টে দুই সেঞ্চুরি করা নাজমুল হোসেন সম্ভাবনা জাগিয়েও ফেরেন ফাহিম আশরাফের বলে।

তখনই টি ২০ বিশ্বকাপে বাজে পারফরম্যান্সের কারণে পাকিস্তানের বিপক্ষে সুযোগ না পাওয়া মুশফিক-লিটন জুটির শুরু। লিটনকে টেস্ট দলে নেওয়ার কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গালমন্দ শুনতে হয়েছে নির্বাচকদের। সেই লিটনেই হতাশার শুরু কাটিয়ে আলো-ঝলমলে দিনের দেখা পেল বাংলাদেশ। আগে দুবার নড়বড়ে নব্বইয়ে আউট হয়েছেন এই উইকেটকিপার-ব্যাটার। কালও ৯৫ রানের পর তাকে নার্ভাস দেখাল। তার আগে অবশ্য ৬৭ রানে একবার ‘জীবন’ পান। শাহীন শাহর বল পুল করতে গেলে সাজিদ খানের হাতে পড়ে, তবে তালুবন্দি করতে ব্যর্থ হন তিনি। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। আগের দুবার ছক্কায় চেষ্টায় সুযোগ হাতছাড়া হলেও এবার সেই পথে হাঁটেননি তিনি। সিঙ্গেল নিয়ে ১৯৯ বলে তিন অঙ্কের ম্যাজিক ফিগারে পৌঁছে যান লিটন। তিনি ফিফটি করেছিলেন ৯৫ বলে।

টি ২০ সিরিজে বাদ পড়াটা মুশফিকের বুকে শূল হয়ে বিঁধেছে। জবাব দিলেন ব্যাটেই। তিনিও সেঞ্চুরির পথে। শেষ বেলায় উইকেট না হারানোর চেষ্টায় রানের গতি কিছুটা কমিয়ে দেন। টেস্টে বাংলাদেশের দু’শ ছোঁয়া ১২ জুটির অর্ধেকটাতেই থাকলেন মুশফিক। পঞ্চম উইকেটে পাকিস্তানের বিপক্ষে এটি বাংলাদেশের প্রথম দু’শ রানের জুটি। ২০১১ সালে ঢাকায় সাকিব আল হাসান ও শাহরিয়ার নাফীসের ১৮০ ছিল আগের সেরা। ২০৭ বলে এসেছিল জুটির একশ। ৪০৮ বলে এসেছে দু’শ। একটা সময় মুশফিক ও লিটনের রান ছিল কাছাকাছি। দিনের খেলাও শেষ হয়েছে পাঁচ ওভার আগে। তাড়াহুড়ো করে উইকেট না হারানোর চেষ্টায় মুশফিক সফল হলেন দারুণভাবে। ১৯০ বলে ১০ চারের ইনিংসে অপরাজিত ৮২ রানে। টি ২০-তে যাদের নিয়ে সবচেয়ে বেশি সমালোচনা হয়েছে, ফরম্যাট বদলের সঙ্গে সেই দু’জনই বাংলাদেশকে আনন্দে ভাসালেন। স্বস্তি নিয়ে আজ দ্বিতীয় দিন শুরু করবে বাংলাদেশ। (স্কোর কার্ড খেলার পাতায়)

লিটন-মুশফিকের ব্যাটে সোনাঝরা রোদ

প্রথমদিন শেষে বাংলাদেশ ২৫৩/৪ * (লিটন ১১৩* ও মুশফিকুর ৮২*)
 জ্যোতির্ময় মণ্ডল, চট্টগ্রাম থেকে 
২৭ নভেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
সোনাঝরা
পঞ্চম উইকেটে ২০৪ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটির পথে বাংলাদেশের দুই ব্যাটিং হিরো মুশফিকুর রহিম (বাঁয়ে) ও লিটন দাস। শুক্রবার পাকিস্তানের বিপক্ষে চট্টগ্রাম টেস্টের প্রথমদিনে -যুগান্তর

ভারত-মিয়ানমার সীমান্তে ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে চট্টগ্রাম। শুক্রবার ভোর রাতে চট্টলার মানুষ আতঙ্কে নেমে আসে পথে। ভয় স্বাভাবিক হতে না হতে সাগরিকার বিটাক মোড় সংলগ্ন হোমল্যান্ড কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের কারখানায় অগ্নিকাণ্ড। ধোঁয়ায় ঢেকে যায় স্টেডিয়ামসহ পুরো এলাকা। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে খেলার মাঠেও। তার থেকেও বড় দাবানলে তখন পুড়ছে বাংলাদেশের টপঅর্ডার। সাগরিকায় সেই দাবানল থামান টি ২০ সিরিজে ব্রাত্য লিটন দাস ও মুশফিকুর রহিম। জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে শেষ বিকালের সোনাঝরা রোদে আরও চকচক করে ওঠে লিটন ও মুশফিকের ব্যাট। প্রথম টেস্টের প্রথমদিনের সকালে মৃত্যুকূপে পড়ে ৪৯ রানেই নেই হয়ে যায় চার উইকেট। এমন ভয়াল দিন স্বস্তির হাসিতে শেষ করল বাংলাদেশ। এই ফরম্যাটে দারুণ ছন্দে থাকা লিটন (১১৩*) অভিষেক সেঞ্চুরির দেখা পেলেন। দলের দুঃসময়ে আবারও ঢাল হয়ে দাঁড়ালেন মুশফিক (৮২*)। পঞ্চম উইকেটে দুজনের রেকর্ড অবিচ্ছিন্ন ২০৪ রানের জুটিতে প্রথমদিনটা নিজেদের করে নিল স্বাগতিকরা। দিনের আলো নিভে আসায় প্রথম দিন পাঁচ ওভার কম খেলা হয়েছে, স্বাগতিকদের স্কোর ২৫৩/৪।

করোনাকালে ঢাকার বাইরে শুধু খেলা হয়েছে চট্টগ্রামে। এর আগে জহুর আহমেদে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে একটি টেস্ট হলেও দর্শক প্রবেশের অনুমতি ছিল না। সাদা পোশাকের ক্রিকেটে কাল প্রায় ছয় হাজার দর্শক ছিল। সকালে বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের গল্প শুনে সমর্থকরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। কিন্তু দুপুর গড়ানোর পর উপস্থিতি বাড়তে থাকে। বদলে যায় ড্রেসিংরুমের চেহারাও। সকালের উইকেট দেখে ধারাভাষ্যকাররা বারবার বলেছেন, দারুণ ব্যাটিং উইকেট। টস-ভাগ্য সহায় হওয়ায় মুমিনুল হক ব্যাটিং নেন। এ নিয়ে টানা চার ম্যাচে বাবর আজমের বিপক্ষে টস জিতল বাংলাদেশ। পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজ দিয়ে ঘরের মাটিতে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের যাত্রাও শুরু হলো এই টেস্ট দিয়ে। টি ২০তে টানা ব্যর্থতায় অস্বস্তিকর আবহের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। চট্টগ্রাম টেস্টে ব্যাটিংয়ে নেমে দ্রুত চার উইকেট হারিয়ে মনে হচ্ছিল সংস্করণ বদলালেও ব্যর্থতার চক্রেই বন্দি তারা। ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরি ছুঁয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে লিটন। সেঞ্চুরি থেকে বেশি দূরে নেই বাংলাদেশের বিপদের ত্রাতা মুশফিক। অথচ, তার আগের গল্পটা কি বিভীষিকাময়!

টি ২০ ক্রিকেটে প্রথমবার সুযোগ পেয়েও সাইফ হাসানের কেটেছে ভীষণ হতাশার মধ্য দিয়ে। তবে সাদা পোশাকের ক্রিকেটে কাল শুরুটা ছিল কিছুটা আগ্রাসী। কিন্তু টেস্টের মতো হলো না। ১২ বল খেলে তিনটি চারও মেরেছিলেন। শাহিন শাহ আফ্রিদির হঠাৎ লাফিয়ে ওঠা বলে ব্যাট ছোঁয়াতে গিয়ে শর্ট ফাইন-লেগে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন। করেন ১৪ রান। ১৪তেই আটকে গেছেন সাদমান ইসলাম ও নাজমুল হোসেন শান্তও। সাদমান শূন্যতে ফিরতে পারতেন। শাহিন শাহর বল তার ব্যাটের কানায় লাগলেও পাকিস্তানের কেউ টের পাননি। অধিনায়ক মুমিনুল হক আউট হন ছয় রান করে। আগের তিন টেস্টে দুই সেঞ্চুরি করা নাজমুল হোসেন সম্ভাবনা জাগিয়েও ফেরেন ফাহিম আশরাফের বলে।

তখনই টি ২০ বিশ্বকাপে বাজে পারফরম্যান্সের কারণে পাকিস্তানের বিপক্ষে সুযোগ না পাওয়া মুশফিক-লিটন জুটির শুরু। লিটনকে টেস্ট দলে নেওয়ার কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গালমন্দ শুনতে হয়েছে নির্বাচকদের। সেই লিটনেই হতাশার শুরু কাটিয়ে আলো-ঝলমলে দিনের দেখা পেল বাংলাদেশ। আগে দুবার নড়বড়ে নব্বইয়ে আউট হয়েছেন এই উইকেটকিপার-ব্যাটার। কালও ৯৫ রানের পর তাকে নার্ভাস দেখাল। তার আগে অবশ্য ৬৭ রানে একবার ‘জীবন’ পান। শাহীন শাহর বল পুল করতে গেলে সাজিদ খানের হাতে পড়ে, তবে তালুবন্দি করতে ব্যর্থ হন তিনি। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। আগের দুবার ছক্কায় চেষ্টায় সুযোগ হাতছাড়া হলেও এবার সেই পথে হাঁটেননি তিনি। সিঙ্গেল নিয়ে ১৯৯ বলে তিন অঙ্কের ম্যাজিক ফিগারে পৌঁছে যান লিটন। তিনি ফিফটি করেছিলেন ৯৫ বলে।

টি ২০ সিরিজে বাদ পড়াটা মুশফিকের বুকে শূল হয়ে বিঁধেছে। জবাব দিলেন ব্যাটেই। তিনিও সেঞ্চুরির পথে। শেষ বেলায় উইকেট না হারানোর চেষ্টায় রানের গতি কিছুটা কমিয়ে দেন। টেস্টে বাংলাদেশের দু’শ ছোঁয়া ১২ জুটির অর্ধেকটাতেই থাকলেন মুশফিক। পঞ্চম উইকেটে পাকিস্তানের বিপক্ষে এটি বাংলাদেশের প্রথম দু’শ রানের জুটি। ২০১১ সালে ঢাকায় সাকিব আল হাসান ও শাহরিয়ার নাফীসের ১৮০ ছিল আগের সেরা। ২০৭ বলে এসেছিল জুটির একশ। ৪০৮ বলে এসেছে দু’শ। একটা সময় মুশফিক ও লিটনের রান ছিল কাছাকাছি। দিনের খেলাও শেষ হয়েছে পাঁচ ওভার আগে। তাড়াহুড়ো করে উইকেট না হারানোর চেষ্টায় মুশফিক সফল হলেন দারুণভাবে। ১৯০ বলে ১০ চারের ইনিংসে অপরাজিত ৮২ রানে। টি ২০-তে যাদের নিয়ে সবচেয়ে বেশি সমালোচনা হয়েছে, ফরম্যাট বদলের সঙ্গে সেই দু’জনই বাংলাদেশকে আনন্দে ভাসালেন। স্বস্তি নিয়ে আজ দ্বিতীয় দিন শুরু করবে বাংলাদেশ। (স্কোর কার্ড খেলার পাতায়)

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন