অনেক ‘পদক্ষেপ’, তবুও সহিংসতার আশঙ্কা
jugantor
আজ ৯৮৬ ইউপিতে ভোট
অনেক ‘পদক্ষেপ’, তবুও সহিংসতার আশঙ্কা

  অনলাইন ডেস্ক  

২৮ নভেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

অনেক ‘পদক্ষেপ’, তবুও সহিংসতার আশঙ্কা

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ঘিরে নির্বাচন কমিশন (ইসি) নানা পদক্ষেপ নিলেও সহিংসতা বন্ধ হচ্ছে না। তৃতীয় ধাপের ভোটগ্রহণ উপলক্ষ্যে শুক্রবার সকাল থেকে নির্বাচনি মাঠে নেমেছেন পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি ও কোস্টগার্ডের ৫০ হাজারের বেশি সদস্য। এছাড়াও রয়েছেন নির্বাহী ও জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটরাও। সহিংসতা বন্ধে মাঠপ্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কঠোর অবস্থান নিতে নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। এমন নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্যেও শুক্র ও শনিবার টাঙ্গাইলের নাগরপুর ও ভোলার দৌলতখানে সহিংসতায় দুজনের মৃত্যু হয়। এছাড়া লক্ষ্মীপুর, পাবনাসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রতিপক্ষের ওপর হামলা, প্রার্থীর বাড়িতে গুলিবর্ষণসহ বেশকিছু সহিংস ঘটনা ঘটেছে। ভোটকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে সহিংসতার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে একটি গোয়েন্দা সংস্থা। এমন পরিস্থিতিতে আজ তৃতীয় ধাপে ৯৮৬ ইউনিয়ন পরিষদ ও নয় পৌরসভা নির্বাচনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত টানা ভোটগ্রহণ চলবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

আরও জানা যায়, ৩৩টি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোট হবে। বাকি ৯৫৩টিতে কাগজের ব্যালটে ভোট হবে। দুর্গম ও যাতায়াতে সমস্যা এমন ইউপিতে শুক্রবার কেন্দ্রে কেন্দ্রে ব্যালট পেপারসহ নির্বাচনি সরঞ্জাম পাঠানো হয়েছে। বাকিগুলোয় আজ সকালে ব্যালট পেপার পাঠানো হবে। এ ধাপে এক হাজার ইউনিয়ন পরিষদে ভোট হওয়ার কথা ছিল। একশজন চেয়ারম্যানসহ ৫৬৯ জন সাধারণ ও সংরক্ষিত নারী সদস্য বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় পাওয়ায় সংশ্লিষ্ট পদগুলোয় ভোটের প্রয়োজন হবে না। এর মধ্যে চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার ১৪টিতে চেয়ারম্যান, সাধারণ সদস্য ও সংরক্ষিত সদস্যরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতা জয় পেয়েছেন।

তৃতীয় ধাপের ভোট সুষ্ঠু হবে-এমন প্রত্যাশা করলেও সহিংসতার আশঙ্কা উড়িয়ে দেননি নির্বাচন কমিশন সচিব মো. হুমায়ুন কবীর খোন্দকার। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন প্রত্যাশা করে ভোট ভালো হবে। এই মুহূর্তে কোনো আশঙ্কা নেই। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ডোর টু ডোর, বাড়ি-বাড়ি ও পাড়ায়-পাড়ায় প্রতিযোগিতা হয়। যে কোনো মুহূর্তে যে কোনো ঘটনা ঘটতে পারে। এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও জেলা প্রশাসনকে নির্দেশনা দেওয়া আছে। আশা করি গ্রহণযোগ্য ভোট হবে।

ইসির তথ্য অনুযায়ী, তৃতীয় ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ৫০ হাজার ১৪৬ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে চেয়ারম্যান ৪ হাজার ৪০৯ জন, সংরক্ষিত সদস্য ১১ হাজার ১০৫ ও সাধারণ সদস্য ৩৪ হাজার ৬৩২ জন। এতে ভোটকেন্দ্র ১০ হাজার ১৫৯ ও ভোটকক্ষ ৬১ হাজার ৮৩০টি। ভোটার রয়েছেন ২ কোটি ১ লাখ ৪৯ হাজার ২৭৮ জন। এ ধাপে ভোটের আগেই জয় পেয়েছেন ৫৬৯ জন প্রার্থী। গত চার ধাপের মধ্যে এ ধাপেই সবচেয়ে বেশিসংখ্যক জনপ্রতিনিধি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় পেলেন। তাদের মধ্যে ১০০ জন চেয়ারম্যান রয়েছেন। এছাড়া সংরক্ষিত নারী সদস্য পদে ১৩২ এবং সাধারণ সদস্য পদে ৩৩৭ জন রয়েছেন।

ইসির একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, এ নির্বাচনে বিএনপি দলীয়ভাবে অংশ না নিলেও দলটির অনেক প্রার্থী স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করছেন বলে নির্বাচন কমিশন মনে করছে। এছাড়া আওয়ামী লীগের একাধিক প্রার্থীও মাঠে রয়েছেন। সাধারণ সদস্য ও সংরক্ষিত সদস্য পদেও বিপুলসংখ্যক প্রার্থী রয়েছেন। এসব প্রার্থীই তাদের নিজেদের জয় নিশ্চিত করতে কেন্দ্রে ভোটার নিয়ে আসছেন। এতে বেশির ভাগ স্থানে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। কিছু জায়গায় সহিংস ঘটনা ঘটছে। নির্বাচন সামনে রেখে ব্যক্তিগত শত্রুতার জেরেও সহিংস ঘটনা ঘটছে। অনেক ঘটনা তাৎক্ষণিক ঘটনায় সেগুলোর বিষয়ে আগাম তথ্য থাকে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে। এ কারণে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ঘটছে।

শনিবার নির্বাচন ভবনে কমিশন সভা শেষে ইসি সচিবের সংবাদ সম্মেলনেও এ বিষয়টি উঠে আসে। ওই সময়ে এক প্রশ্নর জবাবে ইসি সচিব মো. হুমায়ুন কবীর খোন্দার সাংবাদিকদের বলেন, নির্বাচনে যারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন এবং তাদের অনুসারী আবেগপ্রবণ হয়ে সহিংসতায় জড়িত হয়ে পড়েন। শুধু নির্বাচনের কারণে সহিংসতা হচ্ছে-বিষয়টি তেমন নয়; পূর্বশত্রুতা, এলাকাভিত্তিক প্রভাববিস্তারকে কেন্দ্র করেও সহিংসতা হচ্ছে।

ইসি সূত্রে জানা যায়, তৃতীয় ধাপের ভোটগ্রহণ উপলক্ষ্যে শনিবার পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি ও কোস্টগার্ড সদস্যরা মাঠে নেমেছেন। প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদের পুলিশের একটি মোবাইল ফোর্স ও প্রতি তিন ইউনিয়ন পরিষদের জন্য একটি স্ট্রাইকিং ফোর্স রয়েছে। এছাড়া নির্বাচন হচ্ছে এমন উপজেলাগুলোয় র‌্যাবের দুটি মোবাইল ও একটি স্ট্রাইকিং ফোর্স, বিজিবির দুই প্লাটুন মোবাইল ও এক প্লাটুন স্ট্রাইকিং এবং উপকূলীয় জেলাগুলোয় দুই প্লাটুন মোবাইল ও এক প্লাটুন স্ট্রাইকিং ফোর্স মাঠে রয়েছে। ভোট কেন্দ্রের পাহারায় থাকবেন পাঁচজন পুলিশ ও ১৭ জন আনসার সদস্য।

আরও জানা গেছে, নির্বাচনে সহিংসতা বেড়ে যাওয়ায় উদ্বিগ্ন নির্বাচন কমিশন সম্প্রতি সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোয় গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কেএম নূরুল হুদা। সম্প্রতি নির্বাচন ভবনে অনুষ্ঠিত সভায় ওই নির্দেশনা দেওয়া হয়। এছাড়া স্থানীয় প্রশাসনকে প্রয়োজন অনুসারে টহল পুলিশ ও র‌্যাব বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে ইসি। সরকারি কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো সদস্য পক্ষপাত করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তবুও সহিংসতা থামাতে পারছে না ইসি।

সূত্র জানায়, তৃতীয় ধাপে ৬২ জেলার ১২২ উপজেলায় আজ ভোট হচ্ছে। ইতোমধ্যে স্থানীয় প্রশাসনের চাহিদা অনুযায়ী ২১ জেলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্ধারিত হারের অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এর মধ্যে মুন্সীগঞ্জে ২৪ প্লাটুন, কক্সবাজারে ১২ প্লাটুন, চাঁদপুরে ১০ প্লাটুন অতিরিক্ত বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এরপরও অনেক জেলায় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংসতার আশঙ্কা রয়েছে ভোটারদের মধ্যে।

এ বিষয়ে শনিবার নির্বাচন ভবনে ইসি সচিব মো. হুমায়ুন কবীর খোন্দার সাংবাদিকদের বলেন, নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তা, জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা, পুলিশ ও ম্যাজিস্ট্রেটরা সম্পৃক্ত থাকেন। যদি কোথাও তারা মনে করেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য অতিরিক্ত ফোর্স লাগবে, তা আমরা দিয়ে থাকি। এ সময় তিনি উদাহরণ টেনে বলেন, জেলা পর্যায় থেকে আমাদের কাছে ৩৬২ প্লাটুন বিজিবি ও ২৯০টি র‌্যাবের টিম চেয়েছে, তা আমরা অনুমোদন করে দিয়েছি। প্রায় সব জেলায় চাহিদা অনুযায়ী দিয়েছি। নির্বাচনে অস্ত্রের ব্যবহার বন্ধে নেওয়া পদক্ষেপ সম্পর্কে তিনি বলেন, নির্বাচনে বৈধ অস্ত্র প্রদর্শন যাতে না করা হয়, সেজন্য জেলা ম্যাজিস্ট্রেটরা প্রজ্ঞাপন করে থাকেন। অবৈধ অস্ত্রের তথ্য হয়তো আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে নেই। আমরা নির্দেশনা দিয়েছি অবৈধ অস্ত্রের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় নেই। অবৈধ অস্ত্র প্রদর্শন হলেই ব্যবস্থা নিতে হবে।

নির্বাচনে কোথাও কোথাও পুলিশের বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ প্রসঙ্গে সচিব বলেন, সরকারি কর্মকর্তারা আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে তাদেরকে তাৎক্ষণিক প্রত্যাহার করতে সংশ্লিষ্ট বিভাগকে অনুরোধ করি। নির্বাচনি আইন অনুযায়ী যদি ব্যবস্থা নিতে হয়, তাহলে সেই ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করি। আমাদের কাছে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছি, প্রত্যাহার করে নিয়েছি। আমরা তিনজন এমপিকে নোটিশ দিয়েছি এবং পাঁচজন কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করে নিয়েছি।

গুজব চালিয়ে সহিংসতার আশঙ্কা : এদিকে তৃতীয় ধাপের ইউপি নির্বাচন ঘিরে সহিংসতা এড়াতে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে মাঠপর্যায়ে কড়া নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। লিখিত নির্দেশনার পাশাপাশি ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বিভিন্ন ইউনিটপ্রধান এবং সংশ্লিষ্ট জেলার এসপিদের সঙ্গে কথা বলেছেন উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তারা। গোয়েন্দাদের আশঙ্কা-সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার চালিয়ে বা গুজব ছড়িয়ে আইনশৃঙ্খলার অবনতির চেষ্টা চলতে পারে। তাই এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

এদিকে গোয়েন্দা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১১ ও ২০১৬ সালের তুলনায় চলমান ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে হতাহতের সংখ্যা কম। এবার নিহতের সংখ্যা ৩৩ জন। সহিংসতার ঘটনায় গ্রেফতার করা হয়েছে ৬১৫ জনকে। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে ৪৭৮টি। সবচেয়ে বেশি মামলা হয়েছে বরিশাল বিভাগে (১৪১টি)। সবচেয়ে কম মামলা হয়েছে ময়মনসিংহে (১১টি)। সবচেয়ে বেশি নিহত হয়েছেন ঢাকায় (১২ জন)। ময়মনসিংহ, সিলেট ও রংপুর বিভাগে কেউ নিহত হননি। গোয়েন্দাদের পর্যবেক্ষণ, চলমান ইউপি নির্বাচনে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার কার্যক্রম খুবই কম। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার শৈথিল্যে সহিংসতা বাড়ার আশঙ্কা আছে। পরিসংখ্যান তুলে ধরে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ বছর নির্বাচনি সহিংসতায় অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার বেশি হচ্ছে। প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপে নির্বাচনি সহিংসতায় ৩১ জনই নিহত হয়েছেন গুলিবিদ্ধ হয়ে। তাই নিয়মিত অস্ত্র উদ্ধারের পাশাপাশি বিশেষ অভিযান জোরদার করতে হবে।

জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) কামরুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, রোবরার (আজ) থেকে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া তৃতীয় ধাপের ইউপি নির্বাচনকে ঘিরে যাতে কোনো ধরনের সহিংসতা না হয়, সেজন্য পুলিশবাহিনী প্রস্তুত আছে। নির্বাচনি আচরণবিধির যাতে কোনো ব্যত্যয় না ঘটে, এ বিষয়ে মাঠ পুলিশকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। কেউ যাতে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার করতে না পারে, সেজন্য বিশেষ দৃষ্টি রাখতে বলা হয়েছে।

আজ ৯৮৬ ইউপিতে ভোট

অনেক ‘পদক্ষেপ’, তবুও সহিংসতার আশঙ্কা

 অনলাইন ডেস্ক 
২৮ নভেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
অনেক ‘পদক্ষেপ’, তবুও সহিংসতার আশঙ্কা
ফাইল ছবি

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ঘিরে নির্বাচন কমিশন (ইসি) নানা পদক্ষেপ নিলেও সহিংসতা বন্ধ হচ্ছে না। তৃতীয় ধাপের ভোটগ্রহণ উপলক্ষ্যে শুক্রবার সকাল থেকে নির্বাচনি মাঠে নেমেছেন পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি ও কোস্টগার্ডের ৫০ হাজারের বেশি সদস্য। এছাড়াও রয়েছেন নির্বাহী ও জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটরাও। সহিংসতা বন্ধে মাঠপ্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কঠোর অবস্থান নিতে নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। এমন নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্যেও শুক্র ও শনিবার টাঙ্গাইলের নাগরপুর ও ভোলার দৌলতখানে সহিংসতায় দুজনের মৃত্যু হয়। এছাড়া লক্ষ্মীপুর, পাবনাসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রতিপক্ষের ওপর হামলা, প্রার্থীর বাড়িতে গুলিবর্ষণসহ বেশকিছু সহিংস ঘটনা ঘটেছে। ভোটকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে সহিংসতার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে একটি গোয়েন্দা সংস্থা। এমন পরিস্থিতিতে আজ তৃতীয় ধাপে ৯৮৬ ইউনিয়ন পরিষদ ও নয় পৌরসভা নির্বাচনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত টানা ভোটগ্রহণ চলবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

আরও জানা যায়, ৩৩টি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোট হবে। বাকি ৯৫৩টিতে কাগজের ব্যালটে ভোট হবে। দুর্গম ও যাতায়াতে সমস্যা এমন ইউপিতে শুক্রবার কেন্দ্রে কেন্দ্রে ব্যালট পেপারসহ নির্বাচনি সরঞ্জাম পাঠানো হয়েছে। বাকিগুলোয় আজ সকালে ব্যালট পেপার পাঠানো হবে। এ ধাপে এক হাজার ইউনিয়ন পরিষদে ভোট হওয়ার কথা ছিল। একশজন চেয়ারম্যানসহ ৫৬৯ জন সাধারণ ও সংরক্ষিত নারী সদস্য বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় পাওয়ায় সংশ্লিষ্ট পদগুলোয় ভোটের প্রয়োজন হবে না। এর মধ্যে চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার ১৪টিতে চেয়ারম্যান, সাধারণ সদস্য ও সংরক্ষিত সদস্যরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতা জয় পেয়েছেন।

তৃতীয় ধাপের ভোট সুষ্ঠু হবে-এমন প্রত্যাশা করলেও সহিংসতার আশঙ্কা উড়িয়ে দেননি নির্বাচন কমিশন সচিব মো. হুমায়ুন কবীর খোন্দকার। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন প্রত্যাশা করে ভোট ভালো হবে। এই মুহূর্তে কোনো আশঙ্কা নেই। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ডোর টু ডোর, বাড়ি-বাড়ি ও পাড়ায়-পাড়ায় প্রতিযোগিতা হয়। যে কোনো মুহূর্তে যে কোনো ঘটনা ঘটতে পারে। এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও জেলা প্রশাসনকে নির্দেশনা দেওয়া আছে। আশা করি গ্রহণযোগ্য ভোট হবে।

ইসির তথ্য অনুযায়ী, তৃতীয় ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ৫০ হাজার ১৪৬ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে চেয়ারম্যান ৪ হাজার ৪০৯ জন, সংরক্ষিত সদস্য ১১ হাজার ১০৫ ও সাধারণ সদস্য ৩৪ হাজার ৬৩২ জন। এতে ভোটকেন্দ্র ১০ হাজার ১৫৯ ও ভোটকক্ষ ৬১ হাজার ৮৩০টি। ভোটার রয়েছেন ২ কোটি ১ লাখ ৪৯ হাজার ২৭৮ জন। এ ধাপে ভোটের আগেই জয় পেয়েছেন ৫৬৯ জন প্রার্থী। গত চার ধাপের মধ্যে এ ধাপেই সবচেয়ে বেশিসংখ্যক জনপ্রতিনিধি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় পেলেন। তাদের মধ্যে ১০০ জন চেয়ারম্যান রয়েছেন। এছাড়া সংরক্ষিত নারী সদস্য পদে ১৩২ এবং সাধারণ সদস্য পদে ৩৩৭ জন রয়েছেন।

ইসির একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, এ নির্বাচনে বিএনপি দলীয়ভাবে অংশ না নিলেও দলটির অনেক প্রার্থী স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করছেন বলে নির্বাচন কমিশন মনে করছে। এছাড়া আওয়ামী লীগের একাধিক প্রার্থীও মাঠে রয়েছেন। সাধারণ সদস্য ও সংরক্ষিত সদস্য পদেও বিপুলসংখ্যক প্রার্থী রয়েছেন। এসব প্রার্থীই তাদের নিজেদের জয় নিশ্চিত করতে কেন্দ্রে ভোটার নিয়ে আসছেন। এতে বেশির ভাগ স্থানে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। কিছু জায়গায় সহিংস ঘটনা ঘটছে। নির্বাচন সামনে রেখে ব্যক্তিগত শত্রুতার জেরেও সহিংস ঘটনা ঘটছে। অনেক ঘটনা তাৎক্ষণিক ঘটনায় সেগুলোর বিষয়ে আগাম তথ্য থাকে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে। এ কারণে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ঘটছে।

শনিবার নির্বাচন ভবনে কমিশন সভা শেষে ইসি সচিবের সংবাদ সম্মেলনেও এ বিষয়টি উঠে আসে। ওই সময়ে এক প্রশ্নর জবাবে ইসি সচিব মো. হুমায়ুন কবীর খোন্দার সাংবাদিকদের বলেন, নির্বাচনে যারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন এবং তাদের অনুসারী আবেগপ্রবণ হয়ে সহিংসতায় জড়িত হয়ে পড়েন। শুধু নির্বাচনের কারণে সহিংসতা হচ্ছে-বিষয়টি তেমন নয়; পূর্বশত্রুতা, এলাকাভিত্তিক প্রভাববিস্তারকে কেন্দ্র করেও সহিংসতা হচ্ছে।

ইসি সূত্রে জানা যায়, তৃতীয় ধাপের ভোটগ্রহণ উপলক্ষ্যে শনিবার পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি ও কোস্টগার্ড সদস্যরা মাঠে নেমেছেন। প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদের পুলিশের একটি মোবাইল ফোর্স ও প্রতি তিন ইউনিয়ন পরিষদের জন্য একটি স্ট্রাইকিং ফোর্স রয়েছে। এছাড়া নির্বাচন হচ্ছে এমন উপজেলাগুলোয় র‌্যাবের দুটি মোবাইল ও একটি স্ট্রাইকিং ফোর্স, বিজিবির দুই প্লাটুন মোবাইল ও এক প্লাটুন স্ট্রাইকিং এবং উপকূলীয় জেলাগুলোয় দুই প্লাটুন মোবাইল ও এক প্লাটুন স্ট্রাইকিং ফোর্স মাঠে রয়েছে। ভোট কেন্দ্রের পাহারায় থাকবেন পাঁচজন পুলিশ ও ১৭ জন আনসার সদস্য।

আরও জানা গেছে, নির্বাচনে সহিংসতা বেড়ে যাওয়ায় উদ্বিগ্ন নির্বাচন কমিশন সম্প্রতি সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোয় গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কেএম নূরুল হুদা। সম্প্রতি নির্বাচন ভবনে অনুষ্ঠিত সভায় ওই নির্দেশনা দেওয়া হয়। এছাড়া স্থানীয় প্রশাসনকে প্রয়োজন অনুসারে টহল পুলিশ ও র‌্যাব বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে ইসি। সরকারি কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো সদস্য পক্ষপাত করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তবুও সহিংসতা থামাতে পারছে না ইসি।

সূত্র জানায়, তৃতীয় ধাপে ৬২ জেলার ১২২ উপজেলায় আজ ভোট হচ্ছে। ইতোমধ্যে স্থানীয় প্রশাসনের চাহিদা অনুযায়ী ২১ জেলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্ধারিত হারের অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এর মধ্যে মুন্সীগঞ্জে ২৪ প্লাটুন, কক্সবাজারে ১২ প্লাটুন, চাঁদপুরে ১০ প্লাটুন অতিরিক্ত বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এরপরও অনেক জেলায় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংসতার আশঙ্কা রয়েছে ভোটারদের মধ্যে।

এ বিষয়ে শনিবার নির্বাচন ভবনে ইসি সচিব মো. হুমায়ুন কবীর খোন্দার সাংবাদিকদের বলেন, নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তা, জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা, পুলিশ ও ম্যাজিস্ট্রেটরা সম্পৃক্ত থাকেন। যদি কোথাও তারা মনে করেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য অতিরিক্ত ফোর্স লাগবে, তা আমরা দিয়ে থাকি। এ সময় তিনি উদাহরণ টেনে বলেন, জেলা পর্যায় থেকে আমাদের কাছে ৩৬২ প্লাটুন বিজিবি ও ২৯০টি র‌্যাবের টিম চেয়েছে, তা আমরা অনুমোদন করে দিয়েছি। প্রায় সব জেলায় চাহিদা অনুযায়ী দিয়েছি। নির্বাচনে অস্ত্রের ব্যবহার বন্ধে নেওয়া পদক্ষেপ সম্পর্কে তিনি বলেন, নির্বাচনে বৈধ অস্ত্র প্রদর্শন যাতে না করা হয়, সেজন্য জেলা ম্যাজিস্ট্রেটরা প্রজ্ঞাপন করে থাকেন। অবৈধ অস্ত্রের তথ্য হয়তো আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে নেই। আমরা নির্দেশনা দিয়েছি অবৈধ অস্ত্রের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় নেই। অবৈধ অস্ত্র প্রদর্শন হলেই ব্যবস্থা নিতে হবে।

নির্বাচনে কোথাও কোথাও পুলিশের বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ প্রসঙ্গে সচিব বলেন, সরকারি কর্মকর্তারা আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে তাদেরকে তাৎক্ষণিক প্রত্যাহার করতে সংশ্লিষ্ট বিভাগকে অনুরোধ করি। নির্বাচনি আইন অনুযায়ী যদি ব্যবস্থা নিতে হয়, তাহলে সেই ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করি। আমাদের কাছে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছি, প্রত্যাহার করে নিয়েছি। আমরা তিনজন এমপিকে নোটিশ দিয়েছি এবং পাঁচজন কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করে নিয়েছি।

গুজব চালিয়ে সহিংসতার আশঙ্কা : এদিকে তৃতীয় ধাপের ইউপি নির্বাচন ঘিরে সহিংসতা এড়াতে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে মাঠপর্যায়ে কড়া নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। লিখিত নির্দেশনার পাশাপাশি ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বিভিন্ন ইউনিটপ্রধান এবং সংশ্লিষ্ট জেলার এসপিদের সঙ্গে কথা বলেছেন উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তারা। গোয়েন্দাদের আশঙ্কা-সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার চালিয়ে বা গুজব ছড়িয়ে আইনশৃঙ্খলার অবনতির চেষ্টা চলতে পারে। তাই এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

এদিকে গোয়েন্দা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১১ ও ২০১৬ সালের তুলনায় চলমান ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে হতাহতের সংখ্যা কম। এবার নিহতের সংখ্যা ৩৩ জন। সহিংসতার ঘটনায় গ্রেফতার করা হয়েছে ৬১৫ জনকে। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে ৪৭৮টি। সবচেয়ে বেশি মামলা হয়েছে বরিশাল বিভাগে (১৪১টি)। সবচেয়ে কম মামলা হয়েছে ময়মনসিংহে (১১টি)। সবচেয়ে বেশি নিহত হয়েছেন ঢাকায় (১২ জন)। ময়মনসিংহ, সিলেট ও রংপুর বিভাগে কেউ নিহত হননি। গোয়েন্দাদের পর্যবেক্ষণ, চলমান ইউপি নির্বাচনে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার কার্যক্রম খুবই কম। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার শৈথিল্যে সহিংসতা বাড়ার আশঙ্কা আছে। পরিসংখ্যান তুলে ধরে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ বছর নির্বাচনি সহিংসতায় অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার বেশি হচ্ছে। প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপে নির্বাচনি সহিংসতায় ৩১ জনই নিহত হয়েছেন গুলিবিদ্ধ হয়ে। তাই নিয়মিত অস্ত্র উদ্ধারের পাশাপাশি বিশেষ অভিযান জোরদার করতে হবে।

জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) কামরুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, রোবরার (আজ) থেকে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া তৃতীয় ধাপের ইউপি নির্বাচনকে ঘিরে যাতে কোনো ধরনের সহিংসতা না হয়, সেজন্য পুলিশবাহিনী প্রস্তুত আছে। নির্বাচনি আচরণবিধির যাতে কোনো ব্যত্যয় না ঘটে, এ বিষয়ে মাঠ পুলিশকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। কেউ যাতে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার করতে না পারে, সেজন্য বিশেষ দৃষ্টি রাখতে বলা হয়েছে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন