প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন

ভোটের আগে গ্রামমুখী বাজেট

  মিজান চৌধুরী ১৯ মে ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাজেট
ছবি: সংগৃহীত

ভোটারদের খুশি করার সব উপকরণ রেখেই চূড়ান্ত হয়েছে আগামী ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেট। ভোটের আগের বাজেটে গ্রামমুখী বরাদ্দ বেশি দেয়ার পাশাপাশি সারা দেশের ভোটারদের করের চাপমুক্ত রাখা হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের দাবি পূরণে কমানো হচ্ছে কর্পোরেট কর হার।

বাড়ছে ব্যক্তি শ্রেণী আয়ের সীমাও। অগ্রাধিকার পাচ্ছে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) বাস্তবায়নে বিশেষ কয়েকটি মন্ত্রণালয়ও। চলতি অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি অর্জনকে ভিত্তি ধরে বৃত্ত ভেঙে ৮ শতাংশ উচ্চ প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যে যেতে নেয়া হচ্ছে সব ধরনের পদক্ষেপ।

গ্রামের মানুষদের প্রাধান্য দিয়ে কৃষি খাতে ভর্তুকি দেয়া হচ্ছে। দুস্থ মানুষকে চাল দিতে বাড়ানো হচ্ছে খাদ্যে ভর্তুকির পরিমাণ। পল্লী রেশনিং চালুর পরিকল্পনা আছে সরকারের শেষ বাজেটে। পাশাপাশি গ্রামের অতি দরিদ্র মানুষদের সহায়তার জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় বাড়ানো হচ্ছে আসন্ন বাজেটে।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে নতুন বাজেটের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য তুলে ধরেছেন অর্থমন্ত্রী। পাশাপাশি বাজেটের সম্ভাব্য আয়-ব্যয়ের রূপরেখা উপস্থাপন করা হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ৭ জুন বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত বাজেট পেশ করবেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।

এসব ভিশন সামনে রেখেই ১ লাখ ২৭ হাজার ৪২৫ কোটি টাকার ঘাটতি ধরে বাজেটের আকার ঠিক করা হয় ৪ লাখ ৬৮ হাজার ২০০ কোটি টাকা। বড় অঙ্কের ব্যয়ের জন্য আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ৩ লাখ ৪০ হাজার ৭৭৫ কোটি টাকা।

আগামী বাজেট হচ্ছে এ সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদের শেষ বাজেট। পাশাপাশি এ বাজেট হবে অর্থমন্ত্রীর ১২তম। এ বাজেট প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, এটি মনে করার কোনো কারণ নেই নতুন বাজেটটি নির্বাচনমুখী। এটা অন্যান্য বাজেটের ধারাবাহিকতা।

তিনি কর্পোরেট কর হার কমানো ও ব্যক্তি আয়ের করসীমা বাড়ানোর আভাস দিয়েছেন। শেষ বাজেটে গুরুত্ব দিয়েছেন মানবসম্পদ উন্নয়ন ও পরিবহন খাতে। বরাদ্দের দিক থেকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি এবং শিক্ষা খাতকে।

প্রস্তাবিত ২০১৮-১৯ বাজেটে ৩ লাখ ৪০ হাজার ৭৭৫ কোটি টাকা মোট রাজস্বের মধ্যে এনবিআর করের লক্ষ্য হচ্ছে ২ লাখ ৯৬ হাজার ২০১ কোটি টাকা। নন-এনবিআর কর ১১ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা এবং কর ছাড়া আয়ের খাত থেকে ৩৩ হাজার ১১২ কোটি টাকা আসবে।

সরকারের মধ্যমেয়াদি বাস্তবায়নযোগ্য এ বাজেটে রাজস্ব আদায়ের কৌশল হিসেবে কর পরিধি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা থাকছে। পাশাপাশি বিদ্যমান মূল্য সংযোজন কর আইনের আওতায় চালু হচ্ছে অটোমেশন পদ্ধতি। ক্রমান্বয়ে কর অব্যাহতি ও কর অবকাশ প্রত্যাহারের ঘোষণাও থাকবে।

সরকারের শেষ বাজেটে কয়েকটি বিষয়কে বেশ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। বিশেষ করে বাজেটের ঘাটতি মেটাতে চলতি অর্থবছরে সরকার বেশি ঋণ নিয়েছে ব্যাংক, সঞ্চয়পত্রসহ অন্যান্য উৎস থেকে। এতে পুরো আর্থিক খাতের ওপর বড় ধরনের চাপ পড়েছে।

তাই আগামীতে এ ধরনের চাপ কমাতে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে বৈদেশিক সহায়তার ওপর। এছাড়া অর্থনৈতিক উন্নয়ন, জীবনযাত্রার মান বাড়ানো ও দারিদ্র্যের হার কমাতে প্রবৃদ্ধির হারও বাড়ানোর কৌশল থাকছে। এজন্য মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি বিগত কয়েক বছরের বৃত্ত ভেঙে নতুন চ্যালেঞ্জের পথে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

সরকারের এ লক্ষ্য অর্জনে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশে উন্নীত করার মহাপরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এর প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে আগামী বাজেটে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ৮ শতাংশ। চলতি বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ৬৫ শতাংশ অর্জন হবে বলে সরকার অনুমান করছে। এ অর্জনকে ভিত্তি ধরে উচ্চ প্রবৃদ্ধির অর্জনের পথে যাচ্ছে সরকার।

নতুন বাজেটের মোট ব্যয় ৪ লাখ ৬৮ হাজার ২০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে পরিচালনাসহ অন্যান্য খাতে ব্যয়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ২ লাখ ৯৫ হাজার ২০০ কোটি টাকা। সরকারি বেতন-ভাতায় ৬৬ হাজার ২২৪ কোটি টাকা। ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় ৫১ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা।

ভর্তুকি ও প্রণোদনায় ৩১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা এবং সেবা খাতে ব্যয় হবে ৩০ হাজার ৫৬৫ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে পরিচালনা ব্যয়ের লক্ষ্য ধরা হয় ২ লাখ ৪৬ হাজার কোটি টাকা। ফলে আগামী বাজেটে এ খাতে ব্যয় বাড়ছে ৪৯ হাজার ২০০ কোটি টাকা।

জানা গেছে, আসন্ন বাজেটে সরকারের ১২ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন বৃদ্ধির (ইনক্রিমেন্ট) ঘোষণা দেয়ার সম্ভাবনা আছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগের এ বাজেটে চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা খাতে বেশি বরাদ্দ রাখা হচ্ছে।

আগামী বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫ শতাংশ। টাকার অঙ্কে এর সম্ভাব্য পরিমাণ ১ লাখ ২৭ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা। চলতি বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ হচ্ছে ১ লাখ ১২ হাজার ২৭৫ কোটি টাকা। ওই হিসাবে আগামীতে ঘাটতি বেশি দাঁড়াচ্ছে ১৫ হাজার ১৫০ কোটি টাকা।

নতুন ঘাটতি পূরণে ব্যাংকিং খাত থেকে সরকার ঋণ নিবে ৫৯ হাজার ২৮৩ কোটি টাকা। এটি চলতি বছরের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি। এছাড়া বৈদেশিক উৎস থেকে ৩৮ হাজার ৯৪৫ কোটি টাকা নেয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ঋণ হিসেবে ৪২ হাজার ৫৩৬ কোটি টাকা ও অনুদান ১০ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা।

একই বছরে বিদেশি ঋণ পরিশোধ করতে সরকার ব্যয় করবে ১৩ হাজার ৭৮০ কোটি টাকা। এছাড়া সরকার সঞ্চয়পত্র খাত থেকে ২৯ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। অবশ্য এটি চলতি বাজেটের তুলনায় ১৬ হাজার ৯০৩ কোটি টাকা কম।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, সরকার সঞ্চয়পত্র খাত থেকে ঋণ কম নেবে। যে কারণে ব্যাংকিং খাত থেকে বেশি ঋণ নিচ্ছে। কারণ সঞ্চয়পত্র খাত থেকে বেশি ঋণ নেয়া সরকারকে মাত্রাতিরিক্ত সুদ পরিশোধ করতে হয়। সুদ পরিশোধ করতে গিয়ে চাপ সৃষ্টি হয়। পাশাপাশি ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণ নিলে কম সুদ গুনতে হবে। সরকারের ব্যয়ও কমবে।

প্রস্তাবিত বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ধরা হয়েছে ১ লাখ ৭৩ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ১৯ হাজার ৬৬৯ কোটি টাকা বেশি। নতুন এডিপিতে প্রকল্প সহায়তার পরিমাণ হচ্ছে ৬০ হাজার কোটি টাকা।

বাকি ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা হচ্ছে স্থানীয় মুদ্রায় প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। এডিপিতে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে চলতি অর্থবছরের সমাপ্তির জন্য নির্ধারিত প্রকল্প, পদ্মা সেতুসহ ফাস্ট ট্রাক মনিটরিং, বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট প্রকল্প এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্র“তি প্রকল্পগুলো।

এই বিশাল বাজেট বাস্তবায়নে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ঘোষণা থাকছে। বিশেষ করে মূল্যস্ফীতি সহনশীল রাখা, বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে রাখা, মুদ্রা বিনিময় হার কাক্সিক্ষত পর্যায়ে রাখার কথা বলা হয়।

পাশাপাশি পদ্মা সেতুসহ ফাস্ট ট্রাক প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন, রাজস্ব খাতের পরিকল্পিত সংস্কার কার্যক্রমগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন, ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, রফতানি বাড়ানোর প্রয়াস অব্যাহত ও জোরদার এবং সঠিক সময়ে এডিবি বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাজেট বাস্তবায়ন করা হবে বলে প্রস্তাবিত বাজেটে বলা হয়েছে।

ঘটনাপ্রবাহ : বাজেট ২০১৮

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter