দাম্পত্য কলহে খুন অভিনেত্রী শিমু
jugantor
দাম্পত্য কলহে খুন অভিনেত্রী শিমু

  যুগান্তর প্রতিবেদন  

১৯ জানুয়ারি ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

পারিবারিক ও দাম্পত্য কলহের জেরে ঢাকাই সিনেমার অভিনেত্রী রাইমা ইসলাম শিমু (৪০) খুন হয়েছেন। সোমবার সকাল ১০টার দিকে কেরানীগঞ্জের হযরতপুর সেতুর কাছে আলিয়াপুরের রাস্তার পাশ থেকে শিমুর বস্তাবন্দি খণ্ডিত লাশ উদ্ধার করা হয়। রোববার রাতে কলাবাগান থানায় শিমুর নিখোঁজের তথ্য দিয়ে স্বামী সাখাওয়াত আলীম নোবেল সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন-মাওয়ায় শুটিংয়ের কথা বলে রোববার সকালে বাসা থেকে বের হয়ে তার স্ত্রী আর বাসায় ফেরেননি। এদিকে শিমুর বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধারের পর কেরানীগঞ্জ মডেল থানার পুলিশ তদন্তে নামে। শিমুর ভাইয়ের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে রাতেই শিমুর স্বামী নোবেল ও তার বাল্যবন্ধু এসএমওয়াই আব্দুল্লাহ ফরহাদকে পুলিশ আটক করে। রাতভর জিজ্ঞাসাবাদে খুনের দায় স্বীকার করেন নোবেল। আটককালে তাদের কাছ থেকে একটি প্রাইভেট কার জব্দ করা হয়। প্রাথমিক তদন্তে গাড়ির ব্যাকডালায় রক্তের চিহ্ন পাওয়া যায়। শিমুর মৃত্যুর বিষয়ে মঙ্গলবার নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের অবহিত করেন ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মারুফ হোসেন সরদার। তিনি বলেন, পারিবারিক ও দাম্পত্য কলহের জেরে শিমুকে হত্যা করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে এ হত্যার দায় স্বীকার করেছেন নোবেল। শিমুর বড় ভাই কেরানীগঞ্জ থানায় একটি হত্যা মামলা করেন।

জানা যায়, শনিবার সকাল ১০টার দিকে শিমু বাসা থেকে বের হন। রোববার রাতে শিমুর এক বান্ধবী বাসায় ফোনে জানান, সকাল থেকে শিমুর ফোন বন্ধ থাকায় তার সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। এরপর কোথাও তাকে পরিবারের সদস্যরা খুঁজে পায়নি। মঙ্গলবার শিমুর বড় ভাই শহীদুল ইসলাম বাদী হয়ে কেরানীগঞ্জ থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় নোবেল ও ফরহাদের নাম উল্লেখ করে আরও কয়েকজনকে অজ্ঞাতনামা হিসাবে আসামি করা হয়েছে। শিমু হত্যার সঙ্গে আর কারও সংশ্লিষ্টতা আছে কি না জানতে পুলিশ নোবেল ও ফরহাদকে ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে মঙ্গলবার আদালতে পাঠায়। শুনানি শেষে চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট রাবেয়া বেগম তাদের তিন দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

কেরানীগঞ্জ থেকে লাশ উদ্ধারের পর তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার করে পুলিশ শিমুর লাশ শনাক্ত করে। এরপর ঘটনাস্থল শিমুর গ্রিন রোডের বাসা থেকে অন্যসব আলামতের পাশাপাশি সাদা রঙের কিছু সুতা জব্দ করে পুলিশ। শিমুর লাশ মোড়ানো বস্তাটির সেলাইয়ের সুতার সঙ্গে বাসায় পাওয়া সুতার মিল খুঁজে পেয়ে পুলিশ নিশ্চিত হয়-নিজ বাসাতেই শিমু খুন হয়েছেন। এরপরই পুলিশ শিমুর স্বামী নোবেল এবং তার বন্ধু ফরহাদকে আটক করে। জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে নোবেল খুনের দায় স্বীকার করে।

নোবেলের বরাত দিয়ে পুলিশের তদন্ত সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র যুগান্তরকে জানায়, ফরহাদের মালিকানাধীন ৩৪ গ্রিন রোডের ভবনের একটি ফ্ল্যাটে নোবেল ও শিমু থাকেন। দীর্ঘদিন ধরে বেকার থাকলেও কিছুদিন আগে শিমু একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের মার্কেটিং বিভাগে চাকরি নেন। নোবেলের সন্দেহ সেখানকার এক কর্মকর্তার সঙ্গে শিমুর সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। এ নিয়ে দাম্পত্য কলহ লেগেই থাকত। পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, নোবেল স্বীকার করেছেন দীর্ঘদিন ধরে ইয়াবা নেশা করায় তিনি শারীরিকভাবে কিছুটা অক্ষম। শনিবার মধ্যরাতে তাদের মধ্যে তুমুল ঝগড়া হয়। দুজনের মধ্যে হাতাহাতির একপর্যায়ে শিমুর গলা চেপে ধরেন নোবেল। এতে শিমু নিস্তেজ হয়ে পড়েন।

পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে নোবেল জানান, এ সময় পাশের রুমে তার ছোট সন্তান ঘুমাচ্ছিল। ওলেভেলে পড়া বড় সন্তান তখন বাসায় ছিল না। নোবেল জানান, শিমু যে মারা যাবেন তা তিনি বুঝতে পারেননি। তিনি বলেন, যখন তার গলা ছেড়ে দিই, তখন দেখি তিনি নিস্তেজ হয়ে গেছেন। এরপর সারা রাত লাশের পাশে বসে থাকি। বুঝতে পারছিলাম না কী করব। রোববার সকালে বন্ধু ফরহাদকে ফোন করে বাসায় নিয়ে আসি। তাকে বিস্তারিত জানাই। এরপর দুজনে মিলে লাশ বস্তাবন্দি করে কোথাও ফেলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। প্রথমে একটি বস্তায় লাশ ভরার চেষ্টা করি। কিন্তু জায়গা না হওয়ায় আরেকটি বস্তা যুক্ত করে মাঝখানে সেলাই করে লাশ বস্তাবন্দি করি। সকালে বাড়ির সিকিউরিটি গার্ডকে নাশতা আনার কথা বলে বাইরে পাঠিয়ে দিই। এরপর বাড়ির বিদ্যুতের মেইন সুইচ বন্ধ করে দিই। ফলে সিসি টিভি ক্যামেরাও বন্ধ হয়ে যায়। দুইজন মিলে লাশ গাড়িতে ওঠাই। এরপর নাশতা খেয়ে গাড়ি নিয়ে মিরপুর, রূপনগর ও দিয়াবাড়ি এলাকায় ঘুরি। কিন্তু লাশ ফেলার মতো নির্জন স্থান কোথাও পাই না। এ অবস্থায় লাশ নিয়ে আবার বাড়িতে আসি। তিনি জানান, রোববার সারা দিন লাশ গাড়িতেই ছিল। যাতে দুর্গন্ধ না ছড়ায়, এজন্য লাশে ব্লিচিং পাউডার দিয়েছিলাম। এদিন রাতে কেরানীগঞ্জের হযরতপুর সেতুর কাছে আলিয়াপুর এলাকায় রাস্তার পাশে লাশ ফেলে দিয়ে আমি ও ফরহাদ চলে আসি। ফিরে এসে কলাবাগান থানায় জিডি করি।

জিডিতে নোবেল উল্লেখ করেন, রোববার সকালে শিমু কাউকে কিছু না জানিয়ে বাসা থেকে বের হন। এরপর তিনি আর বাসায় ফেরেননি। সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেও তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। কেন জিডি করেছেন-এমন প্রশ্নের জবাবে নোবেল জানান, স্ত্রী হত্যার দায় থেকে নিজেকে রক্ষা করতে তিনি এমন চেষ্টা করেছেন।

নোবেলের বন্ধু ফরহাদ সম্পর্কে পুলিশ জানায়, তিনিও নেশাগ্রস্ত। নোবেল ও ফরহাদ একসঙ্গে নেশা করেন। শাহবাগ এলাকায় বাসা হলেও বেশির ভাগ সময়ই নোবেলের সঙ্গে ফরহাদ সময় কাটান। ফরহাদের স্ত্রী তাকে ডিভোর্স দিয়ে চলে গেছেন। নোবেলকে শিমুর লাশ গুম করার পরামর্শ ফরহাদই দেন এবং লাশ ফেলতে সহায়তা করেন।

রাইমা ইসলাম শিমু ঢাকাই সিনেমায় পার্শ্ব অভিনেত্রীর ভূমিকায় অভিনয় করতেন। ১৯৯৮ সালে ‘বর্তমান’ সিনেমার মধ্য দিয়ে বরিশালের মেয়ে শিমুর চলচ্চিত্রে অভিষেক হয়। এরপর তিনি ২৫টির মতো সিনেমায় অভিনয় করেন। সিনেমার পাশাপা?শি তিনি ক?য়েক?টি টি?ভি নাটকেও অভিনয় করেন। ২০০৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘জামাই শ্বশুর’ সিনেমায় অভিনয়ের পর তিনি অভিনয়ে অনিয়মিত হয়ে পড়েন। তবে নাট্য প্রযোজনার সঙ্গে তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন। বাংলা?দেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সহযোগী সদস্য ছি?লেন তিনি। ২০১৭ সালের চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির কার্যকরী কমিটির এক সিদ্ধান্তে পূর্ণাঙ্গ সদস্যপদ ও ভোটাধিকার বাতিল করা ১৮৪ জন অভিনয়শিল্পীর মধ্যে তিনিও একজন। ভোটাধিকার ফিরে পেতে তিনি ওই সময়কার কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন।

ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকের বক্তব্য : মঙ্গলবার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে শিমুর লাশের ময়নাতদন্ত হয়েছে। ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ডা. সুহেল মাহমুদ যুগান্তরকে জানান, শিমুর গলায় দাগ পাওয়া গেছে। এতে ধারণা করা হচ্ছে-তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে। ডিএনএ নমুনাসহ অন্যসব নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। মৃত্যুর আগে তিনি ধর্ষিত হয়েছেন কি না, তা যাচাই করার জন্যও আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে।

আইনি ব্যবস্থা নিচ্ছেন জায়েদ খান : অভিনেত্রী শিমু হত্যার খবর প্রকাশ্যে আসার পর চিত্রনায়ক জায়েদ খানের বিরুদ্ধে কয়েকজন চলচ্চিত্রকর্মী অভিযোগের আঙুল তোলেন। তবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই জানা যায়, শিমুকে হত্যা করেছেন তার স্বামী নোবেল। এদিকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নাম জড়ানোর অভিযোগে আইনি ব্যবস্থা নিচ্ছেন বলে যুগান্তরকে জানিয়েছেন চিত্রনায়ক জায়েদ খান। তিনি বলেন, ২৮ জানুয়ারি শিল্পী সমিতির নির্বাচন। এ নির্বাচনকে বানচাল করার জন্য তিন-চারজন মানুষ নোংরা রাজনীতি করা শুরু করেছেন। ইচ্ছাকৃতভাবে শিমু খুনের সঙ্গে আমার নাম জড়িয়ে নির্বাচনের পরিবেশ নষ্ট করতে উঠেপড়ে লেগেছেন। আমার সম্মানহানি করায় তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিচ্ছি।

দাম্পত্য কলহে খুন অভিনেত্রী শিমু

 যুগান্তর প্রতিবেদন 
১৯ জানুয়ারি ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

পারিবারিক ও দাম্পত্য কলহের জেরে ঢাকাই সিনেমার অভিনেত্রী রাইমা ইসলাম শিমু (৪০) খুন হয়েছেন। সোমবার সকাল ১০টার দিকে কেরানীগঞ্জের হযরতপুর সেতুর কাছে আলিয়াপুরের রাস্তার পাশ থেকে শিমুর বস্তাবন্দি খণ্ডিত লাশ উদ্ধার করা হয়। রোববার রাতে কলাবাগান থানায় শিমুর নিখোঁজের তথ্য দিয়ে স্বামী সাখাওয়াত আলীম নোবেল সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন-মাওয়ায় শুটিংয়ের কথা বলে রোববার সকালে বাসা থেকে বের হয়ে তার স্ত্রী আর বাসায় ফেরেননি। এদিকে শিমুর বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধারের পর কেরানীগঞ্জ মডেল থানার পুলিশ তদন্তে নামে। শিমুর ভাইয়ের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে রাতেই শিমুর স্বামী নোবেল ও তার বাল্যবন্ধু এসএমওয়াই আব্দুল্লাহ ফরহাদকে পুলিশ আটক করে। রাতভর জিজ্ঞাসাবাদে খুনের দায় স্বীকার করেন নোবেল। আটককালে তাদের কাছ থেকে একটি প্রাইভেট কার জব্দ করা হয়। প্রাথমিক তদন্তে গাড়ির ব্যাকডালায় রক্তের চিহ্ন পাওয়া যায়। শিমুর মৃত্যুর বিষয়ে মঙ্গলবার নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের অবহিত করেন ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মারুফ হোসেন সরদার। তিনি বলেন, পারিবারিক ও দাম্পত্য কলহের জেরে শিমুকে হত্যা করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে এ হত্যার দায় স্বীকার করেছেন নোবেল। শিমুর বড় ভাই কেরানীগঞ্জ থানায় একটি হত্যা মামলা করেন।

জানা যায়, শনিবার সকাল ১০টার দিকে শিমু বাসা থেকে বের হন। রোববার রাতে শিমুর এক বান্ধবী বাসায় ফোনে জানান, সকাল থেকে শিমুর ফোন বন্ধ থাকায় তার সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। এরপর কোথাও তাকে পরিবারের সদস্যরা খুঁজে পায়নি। মঙ্গলবার শিমুর বড় ভাই শহীদুল ইসলাম বাদী হয়ে কেরানীগঞ্জ থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় নোবেল ও ফরহাদের নাম উল্লেখ করে আরও কয়েকজনকে অজ্ঞাতনামা হিসাবে আসামি করা হয়েছে। শিমু হত্যার সঙ্গে আর কারও সংশ্লিষ্টতা আছে কি না জানতে পুলিশ নোবেল ও ফরহাদকে ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে মঙ্গলবার আদালতে পাঠায়। শুনানি শেষে চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট রাবেয়া বেগম তাদের তিন দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

কেরানীগঞ্জ থেকে লাশ উদ্ধারের পর তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার করে পুলিশ শিমুর লাশ শনাক্ত করে। এরপর ঘটনাস্থল শিমুর গ্রিন রোডের বাসা থেকে অন্যসব আলামতের পাশাপাশি সাদা রঙের কিছু সুতা জব্দ করে পুলিশ। শিমুর লাশ মোড়ানো বস্তাটির সেলাইয়ের সুতার সঙ্গে বাসায় পাওয়া সুতার মিল খুঁজে পেয়ে পুলিশ নিশ্চিত হয়-নিজ বাসাতেই শিমু খুন হয়েছেন। এরপরই পুলিশ শিমুর স্বামী নোবেল এবং তার বন্ধু ফরহাদকে আটক করে। জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে নোবেল খুনের দায় স্বীকার করে।

নোবেলের বরাত দিয়ে পুলিশের তদন্ত সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র যুগান্তরকে জানায়, ফরহাদের মালিকানাধীন ৩৪ গ্রিন রোডের ভবনের একটি ফ্ল্যাটে নোবেল ও শিমু থাকেন। দীর্ঘদিন ধরে বেকার থাকলেও কিছুদিন আগে শিমু একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের মার্কেটিং বিভাগে চাকরি নেন। নোবেলের সন্দেহ সেখানকার এক কর্মকর্তার সঙ্গে শিমুর সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। এ নিয়ে দাম্পত্য কলহ লেগেই থাকত। পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, নোবেল স্বীকার করেছেন দীর্ঘদিন ধরে ইয়াবা নেশা করায় তিনি শারীরিকভাবে কিছুটা অক্ষম। শনিবার মধ্যরাতে তাদের মধ্যে তুমুল ঝগড়া হয়। দুজনের মধ্যে হাতাহাতির একপর্যায়ে শিমুর গলা চেপে ধরেন নোবেল। এতে শিমু নিস্তেজ হয়ে পড়েন।

পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে নোবেল জানান, এ সময় পাশের রুমে তার ছোট সন্তান ঘুমাচ্ছিল। ওলেভেলে পড়া বড় সন্তান তখন বাসায় ছিল না। নোবেল জানান, শিমু যে মারা যাবেন তা তিনি বুঝতে পারেননি। তিনি বলেন, যখন তার গলা ছেড়ে দিই, তখন দেখি তিনি নিস্তেজ হয়ে গেছেন। এরপর সারা রাত লাশের পাশে বসে থাকি। বুঝতে পারছিলাম না কী করব। রোববার সকালে বন্ধু ফরহাদকে ফোন করে বাসায় নিয়ে আসি। তাকে বিস্তারিত জানাই। এরপর দুজনে মিলে লাশ বস্তাবন্দি করে কোথাও ফেলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। প্রথমে একটি বস্তায় লাশ ভরার চেষ্টা করি। কিন্তু জায়গা না হওয়ায় আরেকটি বস্তা যুক্ত করে মাঝখানে সেলাই করে লাশ বস্তাবন্দি করি। সকালে বাড়ির সিকিউরিটি গার্ডকে নাশতা আনার কথা বলে বাইরে পাঠিয়ে দিই। এরপর বাড়ির বিদ্যুতের মেইন সুইচ বন্ধ করে দিই। ফলে সিসি টিভি ক্যামেরাও বন্ধ হয়ে যায়। দুইজন মিলে লাশ গাড়িতে ওঠাই। এরপর নাশতা খেয়ে গাড়ি নিয়ে মিরপুর, রূপনগর ও দিয়াবাড়ি এলাকায় ঘুরি। কিন্তু লাশ ফেলার মতো নির্জন স্থান কোথাও পাই না। এ অবস্থায় লাশ নিয়ে আবার বাড়িতে আসি। তিনি জানান, রোববার সারা দিন লাশ গাড়িতেই ছিল। যাতে দুর্গন্ধ না ছড়ায়, এজন্য লাশে ব্লিচিং পাউডার দিয়েছিলাম। এদিন রাতে কেরানীগঞ্জের হযরতপুর সেতুর কাছে আলিয়াপুর এলাকায় রাস্তার পাশে লাশ ফেলে দিয়ে আমি ও ফরহাদ চলে আসি। ফিরে এসে কলাবাগান থানায় জিডি করি।

জিডিতে নোবেল উল্লেখ করেন, রোববার সকালে শিমু কাউকে কিছু না জানিয়ে বাসা থেকে বের হন। এরপর তিনি আর বাসায় ফেরেননি। সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেও তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। কেন জিডি করেছেন-এমন প্রশ্নের জবাবে নোবেল জানান, স্ত্রী হত্যার দায় থেকে নিজেকে রক্ষা করতে তিনি এমন চেষ্টা করেছেন।

নোবেলের বন্ধু ফরহাদ সম্পর্কে পুলিশ জানায়, তিনিও নেশাগ্রস্ত। নোবেল ও ফরহাদ একসঙ্গে নেশা করেন। শাহবাগ এলাকায় বাসা হলেও বেশির ভাগ সময়ই নোবেলের সঙ্গে ফরহাদ সময় কাটান। ফরহাদের স্ত্রী তাকে ডিভোর্স দিয়ে চলে গেছেন। নোবেলকে শিমুর লাশ গুম করার পরামর্শ ফরহাদই দেন এবং লাশ ফেলতে সহায়তা করেন।

রাইমা ইসলাম শিমু ঢাকাই সিনেমায় পার্শ্ব অভিনেত্রীর ভূমিকায় অভিনয় করতেন। ১৯৯৮ সালে ‘বর্তমান’ সিনেমার মধ্য দিয়ে বরিশালের মেয়ে শিমুর চলচ্চিত্রে অভিষেক হয়। এরপর তিনি ২৫টির মতো সিনেমায় অভিনয় করেন। সিনেমার পাশাপা?শি তিনি ক?য়েক?টি টি?ভি নাটকেও অভিনয় করেন। ২০০৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘জামাই শ্বশুর’ সিনেমায় অভিনয়ের পর তিনি অভিনয়ে অনিয়মিত হয়ে পড়েন। তবে নাট্য প্রযোজনার সঙ্গে তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন। বাংলা?দেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সহযোগী সদস্য ছি?লেন তিনি। ২০১৭ সালের চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির কার্যকরী কমিটির এক সিদ্ধান্তে পূর্ণাঙ্গ সদস্যপদ ও ভোটাধিকার বাতিল করা ১৮৪ জন অভিনয়শিল্পীর মধ্যে তিনিও একজন। ভোটাধিকার ফিরে পেতে তিনি ওই সময়কার কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন।

ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকের বক্তব্য : মঙ্গলবার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে শিমুর লাশের ময়নাতদন্ত হয়েছে। ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ডা. সুহেল মাহমুদ যুগান্তরকে জানান, শিমুর গলায় দাগ পাওয়া গেছে। এতে ধারণা করা হচ্ছে-তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে। ডিএনএ নমুনাসহ অন্যসব নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। মৃত্যুর আগে তিনি ধর্ষিত হয়েছেন কি না, তা যাচাই করার জন্যও আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে।

আইনি ব্যবস্থা নিচ্ছেন জায়েদ খান : অভিনেত্রী শিমু হত্যার খবর প্রকাশ্যে আসার পর চিত্রনায়ক জায়েদ খানের বিরুদ্ধে কয়েকজন চলচ্চিত্রকর্মী অভিযোগের আঙুল তোলেন। তবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই জানা যায়, শিমুকে হত্যা করেছেন তার স্বামী নোবেল। এদিকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নাম জড়ানোর অভিযোগে আইনি ব্যবস্থা নিচ্ছেন বলে যুগান্তরকে জানিয়েছেন চিত্রনায়ক জায়েদ খান। তিনি বলেন, ২৮ জানুয়ারি শিল্পী সমিতির নির্বাচন। এ নির্বাচনকে বানচাল করার জন্য তিন-চারজন মানুষ নোংরা রাজনীতি করা শুরু করেছেন। ইচ্ছাকৃতভাবে শিমু খুনের সঙ্গে আমার নাম জড়িয়ে নির্বাচনের পরিবেশ নষ্ট করতে উঠেপড়ে লেগেছেন। আমার সম্মানহানি করায় তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিচ্ছি।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন