গাজীপুর সিটি নির্বাচন

বিতর্কমুক্ত জয় চায় আওয়ামী লীগ

দ্বন্দ্ব-বিবাদ ভুলে নৌকাকে বিজয়ী করতে শেখ হাসিনার নির্দেশ * থানা ও অঞ্চলভিত্তিক দায়িত্ব বণ্টন

  মাহবুব হাসান ২২ মে ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

গাজীপুর

খুলনা সিটিতে জয় হয়েছে। এবার গাজীপুরের পালা। বিতর্কের ঊর্ধ্বে থেকেই একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে এখানে জয় চায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। দলটির নীতিনির্ধারকরা বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিরসনে কেন্দ্রীয় নেতাদের উচ্চপর্যায়ের একটি টিম রোববার গাজীপুর গিয়ে স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছে। পাশাপাশি আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও ঐক্যবদ্ধ হয়ে রাজধানী ঢাকার নিকটবর্তী এ সিটি নির্বাচনে দলীয় মেয়র প্রার্থীকে জিতিয়ে আনতে দলীয় নেতাকর্মীদের নির্দেশ দিয়েছেন।

আওয়ামী লীগ সূত্র জানায়, ১৫ মে নির্বাচনের দিন ধরে যে প্রচারণা ও কৌশল নেয়া হয়েছিল সেগুলো বিশ্লেষণ করছেন দলটির নেতারা। জাতীয় নির্বাচনের আগে রাজধানী ঢাকার খুব কাছের এ মহানগরীতে নৌকাকে বিজয়ী দেখতে চান তারা। এজন্য অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিরসন, প্রচারণায় গুরুত্ব এবং ভোটে প্রভাব বিস্তারকারী নেতাদের মাঠে নামানোর জন্য কাজ শুরু হয়েছে। দলটির নেতারা বলছেন, দুই কারণে এখানে দলের নজর বেশি। প্রথমত, দলের ভেতরে ছোটখাটো অনৈক্য-বিবাদ-দ্বন্দ্ব থাকলে তা নির্বাচন উপলক্ষে নিরসন হয়ে যাবে। দ্বিতীয়ত, এ নির্বাচনী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নেতাকর্মীরা জাতীয় নির্বাচনের জন্যও প্রস্তুত হয়ে যাবেন।

গুরুত্বের বিষয়টি বোঝা যায় যখন দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বয়ং মন্ত্রিসভার বৈঠকে অনির্ধারিত আলোচনায় এ নিয়ে কথা বলেন। সোমবার মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে অনির্ধারিত আলোচনায় তিনি বলেন, খুলনা সিটি কর্পোরেশনে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধ ছিল বলেই জয় এসেছে। একইভাবে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনেও ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।

বৈঠকে গাজীপুর আওয়ামী লীগ নেতা মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক এবং নারী ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকিকে উদ্দেশে করে শেখ হাসিনা বলেন, সেখানে যেন কোনো ঝামেলা না হয়। কোনো অজুহাত শুনতে চাই না। সবাইকে মনে রাখতে হবে, আমাদের প্রতীক নৌকা।

তিনি বলেন, দলীয় কোনো কোন্দল যাতে না থাকে, সে বিষয়টি দেখতে হবে। কে প্রার্থী এটা বাদ দিয়ে নৌকার প্রার্থীর পক্ষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। এ সময় তিনি গাজীপুরের দলীয় সংসদ সদস্য (এমপি) ও নেতাকর্মীদের নিয়ে নৌকার প্রার্থীর পক্ষে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে তাদের দু’জনকে নির্দেশ দেন।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ যুগান্তরকে বলেন, জাতীয় নির্বাচনের আগে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন তাদের কাছে অতীব গুরুত্বপূর্ণ। এ নির্বাচনের মাধ্যমে নেতাকর্মীরা নৌকার জন্য কাজ করতে মাঠে নামবেন। এতে স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি-দ্বন্দ্ব-বিবাদ থাকলে তার নিরসন হবে। একই সঙ্গে তারা জাতীয় নির্বাচনে কাজ করার জন্য প্রস্তুত হয়ে যাবেন। তাছাড়া আওয়ামী লীগ সরকার স্থানীয় সরকার কাঠামোকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে। যে কারণে স্থানীয় নির্বাচন সমসময়ই আওয়ামী লীগের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।

আওয়ামী লীগ সূত্র জানায়, সম্প্রতি গণভবনে অনুষ্ঠিত এক অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে গাজীপুর সিটি নির্বাচনে নৌকার প্রার্থীকে জয়ী করতে কেন্দ্রীয় নেতাদের নির্দেশ দেন দলটির সভাপতি শেখ হাসিনা। এরই পরিপ্রেক্ষিতে রোববার গাজীপুরে সরিজমিনে যান দুই প্রেসিডিয়াম সদস্যসহ সংশ্লিষ্ট নেতারা। সেখানে গাজীপুর জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন তারা। স্থানীয় সংসদ সদস্য জাহিদ আহসান রাসেলের বাসভবনে অনুষ্ঠিত এ বৈঠক প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. আবদুর রাজ্জাক, কর্নেল (অব.) ফারুক খান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ, ডা. দীপু মনি, জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাংস্কৃতিক সম্পাদক অসীম কুমার উকিল, সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন, খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, ব্যারিস্টার মুহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল ও তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক আফজাল হোসেন উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া সেখানে আরও ছিলেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী ও গাজীপুর জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি আ ক ম মোজাম্মেল হক, দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদ সদস্য আকতারাজ্জামান, দলের মেয়র প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলমসহ গাজীপুর জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের কয়েকজন শীর্ষ নেতা। বৈঠকে দলীয় অভ্যন্তরীণ কোন্দল মিটিয়ে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে কিভাবে নৌকার প্রার্থীকে বিজয়ী করা যায় এবং এলাকার সমস্যা ও সাংগঠনিক সমস্যা দূর করা যায়- তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

ওই বৈঠকে উপস্থিত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় এক নেতা যুগান্তরকে জানান, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনে বিজয়ের জন্য প্রচারণার কৌশল নিয়ে আলোচনা করেছেন তারা। সেখানে ৮টি থানার জন্য স্থানীয় কয়েকজন নেতাকে দায়িত্ব ভাগ করে দেয়া হয়েছে। এছাড়া অঞ্চলভিত্তিক যারা নেতা রয়েছেন তাদেরকে নিজ নিজ অঞ্চলের ভোটারদের নিজেদের পক্ষে আনতে প্রয়োজনীয় প্রচারণা চালানোর দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। স্থানীয় আওয়ামী লীগের চাওয়া ও কৌশলকে অগ্রাধিকার দিয়েই সার্বিক প্রস্তুতি ও প্রচারে কাজ চলবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

জানতে চাইলে ড. আবদুর রাজ্জাক বলেন, নির্বাচনী কৌশল প্রণয়ন ও নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত করতে তারা গাজীপুরে গিয়েছিলেন। এ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনকে তারা সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন। তিনি বলেন, খুলনায় বিজয় প্রমাণ করে নিজেরা ঐক্যবদ্ধ থেকে দলীয় প্রার্থীর জন্য কাজ করলে বিজয় অবশ্যম্ভাবী। এ সিটিতে আমরা সেটাই করব। আওয়ামী লীগের নিজস্ব যে ভোটব্যাংক রয়েছে সেটা নিশ্চিত করতে পারলে এবং সবাই একজোট হয়ে নৌকার জন্য কাজ করলে আওয়ামী লীগ বিপুল ব্যবধানে বিজয়ী হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

আওয়ামী লীগ সূত্র জানায়, ১৫ মে নির্বাচন হওয়ার লক্ষ্যে যে প্রচারণা শুরু হয়েছিল সেখান থেকেও শিক্ষা নেয়া হচ্ছে। নতুন করে প্রচারণার কৌশল সাজানো হচ্ছে। আর গাজীপুরে যেসব আওয়ামী লীগ নেতা ভোটে প্রভাব বিস্তার করেন তাদের সক্রিয়ভাবে প্রার্থীর জন্য মাঠে নামানো হবে। গাজীপুর নির্বাচন সংশ্লিষ্ট আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় এক নেতা যুগান্তরকে বলেন, এ জেলা ‘দ্বিতীয় গোপালগঞ্জ’। এখানে সব সময়ই নৌকার ভোট বেশি। নৌকার প্রার্থীরা জয়ী হন। সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে যেসব ক্ষেত্রে কাজ করা দরকার, সেসব জায়গায় কাজ চলছে। সূত্র জানায়, রোববারের বৈঠকে কাউন্সিলর প্রার্থীদের বিষয় যে যার যার মতো নির্বাচন করবে বলে সিদ্ধান্ত হয়। দল কারও পক্ষে অবস্থান নেবে না বা তৎপরতা চালাবে না বলে সবাই একমত হন। মেয়র প্রার্থীর বিজয়ের স্বার্থেই এ সিদ্ধান্ত হয় বলে সূত্র জানায়। এছাড়া ১৮ জুনের আগে যেহেতু আনুষ্ঠানিক প্রচার-প্রচারণা করা যাবে না, তাই এদিন পর্যন্ত বিভিন্ন সামাজিকব অনুষ্ঠানের মাধ্যমে কার্যক্রম চালানোর জন্য স্থানীয় আওয়ামী লীগকে নির্দেশ দেয়া হয়। সূত্র জানায়, গাজীপুর শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের আগে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা সাবেক গাজীপুর পৌরসভা ও এর অধুনালুপ্ত ৯টি ওয়ার্ডের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এবং গাজীপুরের তৃণমূলের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।

এ নির্বাচনে জিততে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে দুটি নির্বাচনী সমন্বয় টিম করা হয়। স্থানীয়ভাবে করা সমন্বয় টিমটির প্রধান করা হয় গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি আজমত উল্লাহ খানকে। কেন্দ্রীয়ভাবে করা টিমের প্রধান করা হয় যুগ্ম সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানককে। পরে আওয়ামী লীগ সভাপতি নিজে কেন্দ্রীয় টিমে দুই প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. আবদুর রাজ্জাক এবং কর্নেল ফারুক খানসহ ঢাকা বিভাগীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডা. দীপু মনিকে অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দেন। ড. আবদুর রাজ্জাক এবং কর্নেল ফারুক খান ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করে সফলতার পরিচয় দিয়েছেন।

গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন ২৬ জুন অনুষ্ঠিত হবে। প্রার্থীরা প্রচারের সুযোগ পাবেন ১৮ জুন থেকে। এর আগে ইসির তফসিল অনুসারে ১৫ মে গাজীপুর ও খুলনা সিটি কর্পোরেশনে ভোট হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সাভারের শিমুলিয়া ইউনিয়নের ছয়টি মৌজা সিটি কর্পোরেশনে অন্তর্ভুক্তির প্রজ্ঞাপন ও নির্বাচনের তফসিলের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে ৬ মে গাজীপুর সিটি নির্বাচনের তফসিলের কার্যক্রম তিন মাসের জন্য স্থগিত করেন হাইকোর্ট। এ আদেশের বিরুদ্ধে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী এবং নির্বাচন কমিশন পৃথক তিনটি আবেদন করে। শুনানি শেষে ১০ মে আপিল বিভাগ এ নির্বাচন নিয়ে হাইকোর্টের দেয়া আদেশ স্থগিত করে ২৮ জুনের মধ্যে এ নির্বাচন করতে বলেন।

ঘটনাপ্রবাহ : গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন ২০১৮

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter