১৯ দিনেও শুরু হয়নি বোরো ধান সংগ্রহ

মন্ত্রণালয়ের কাজে ধীরগতি ফড়িয়াদের পোয়াবারো

মণপ্রতি কৃষকের লোকসান ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা * দেড় লাখ টন ধানের মধ্যে ১৫ হাজার টনের বিভাজন দিয়েছে খাদ্য মন্ত্রণালয়

  উবায়দুল্লাহ বাদল ২২ মে ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

খাদ্য অধিদফতর
ছবি: সংগৃহীত

বোরো কাটার মৌসুম প্রায় শেষ হলেও ধান কেনা শুরু করতে পারেনি সরকার। খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির বৈঠকে দেড় লাখ টন ধান কেনার সিদ্ধান্ত হয় দেড় মাস আগে। ২ মে থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত এই ধান কেনার কথা। কিন্তু ১৯ দিন পার হলেও এখন পর্যন্ত সারা দেশে ধান সংগ্রহের অনুমতি দিচ্ছে না খাদ্য মন্ত্রণালয়।

বোরো সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রার বিভাজন চেয়ে খাদ্য অধিদফতর চিঠি দিলেও কাক্সিক্ষত সাড়া দিচ্ছে না মন্ত্রণালয়। এ পর্যন্ত ৯ জেলায় মাত্র ১৫ হাজার ২০০ টন বোরো সংগ্রহের অনুমতি দিলেও ওইসব জেলায় এখনও শুরু হয়নি ধান কেনা।

সারা দেশে সরকারিভাবে কেনা শুরু না হওয়ায় ধানের দাম পড়ে গেছে। ফলে কৃষক বাধ্য হয়ে উৎপাদন খরচের চেয়ে মণপ্রতি ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা লোকসানে ফড়িয়া ও মিলারদের কাছে ধান বিক্রি করছেন। এবার ধানের বাম্পার ফলন হলেও হাসি নেই কৃষকের মুখে। তাদের অভিযোগ- সরকার সঠিক সময়ে ধান কিনলে এ অবস্থার সৃষ্টি হতো না। ফড়িয়া ও মিলারদের অনৈতিক সুবিধা দিতেই ধান কিনতে গড়িমসি করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে এমন তথ্য।

এ প্রসঙ্গে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব শাহাবুদ্দিন আহমদ রোববার যুগান্তরকে বলেন, ‘হাওর এলাকাসহ কয়েকটি জেলার বোরো ধান কেনার অনুমতি দেয়া হয়েছে। অধিক বৃষ্টির কারণে ব্যাপক আকারে কেনা হচ্ছে না।’ সরকার ধান না কেনায় ফড়িয়া বা মিলারদের কাছে কৃষকরা কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন- এমন অভিযোগের ব্যাপারে খাদ্য সচিব বিষয়টি নিয়ে খাদ্য অধিদফতরের মহাপরিচালকের সঙ্গে কথা বলবেন বলে জানান।

এ প্রসঙ্গে খাদ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক বদরুল হাসান নিজ দফতরে যুগান্তরকে বলেন, ‘এমপিএমসির বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমরা ধান কিনতে মন্ত্রণালয়ের কাছে সারা দেশের বিভাজন চেয়েছি। কিন্তু মন্ত্রণালয় হাওরের তিনটি জেলাসহ কয়েকটি জেলায় ধান সংগ্রহের অনুমতি দিয়েছে। তাদের অনুমতি বা বিভাজন না পেলে আমরা ধান কিনতে পারব না।’

সাধারণত বোরোর ভরা মৌসুমে বাজার চাঙ্গা রাখার লক্ষ্যেই সংগ্রহ মূল্য নির্ধারণ করে দেয়া হয়। ৮ এপ্রিল খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির (এফপিএমসি) বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়- চলতি বছর বোরো মৌসুমে কেজিপ্রতি ২৬ টাকা দরে দেড় লাখ টন ধান কিনবে সরকার। ২ মে থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সরকারিভাবে এই ধান সংগ্রহ করা হবে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯ এপ্রিল সারা দেশের সংগ্রহযোগ্য বোরো ধানের বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলাওয়ারি লক্ষ্যমাত্রার বিভাজন চেয়ে চিঠি দেয় খাদ্য অধিদফতর। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে কাঙ্ক্ষিত সাড়া দিচ্ছে না মন্ত্রণালয়।

সম্প্রতি ৯টি জেলায় মাত্র ১৫ হাজার ২০০ টনের বিভাজন দিয়েছে মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে সুনামগঞ্জে ৬ হাজার টন, হবিগঞ্জে ৩ হাজার, কিশোরগঞ্জে ২ হাজার ২০০, ভোলায় ১ হাজার ৪৫০, বরিশালে ১ হাজার ৪২০, পিরোজপুরে ৫৪০, পটুয়াখালীতে ৩০০, ঝালকাঠিতে ২২০ এবং বরগুনায় ৭০ টন। কিন্তু এসব জেলায় এখনও ধান সংগ্রহ শুরু হয়নি বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা। বাকি জেলাগুলোয় কবে নাগাদ বোরো সংগ্রহ হবে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কেউই নিশ্চিত করতে পারছে না। অথচ হাওরে বোরো ধান কাটা প্রায় শেষ। আন্যান্য অঞ্চলেও প্রায় ৮০ শতাংশ ধান কাটা হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের কর্মকর্তারা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সরকার কৃষকের কাছ থেকে কাক্সিক্ষত মাত্রায় ধান না কেনায় বেকায়দায় পড়েছেন তারা। এ ধান মজুদ রাখার পর্যাপ্ত জায়গা নেই তাদের। সারা দেশে থেমে থেমে প্রতিদিনই ঝড়বৃষ্টি হচ্ছে। অনেক কৃষক জমির লিজ, সেচ, সার ও কীটনাশকের টাকা জোগান দিতে পারছেন না। ধারদেনা করে মহাজনের কাছ থেকে সুদে টাকা নিয়ে ধান চাষ করেছিলেন।

এ সুদের টাকাও দিতে পারছেন না। তাই কৃষক উপায় না দেখে কম দামে ধান বিক্রি করছেন। সরকারি হিসাবেই এবার এক মণ ধান উৎপাদনের খরচ হয়েছে ৯৬০ টাকা। সরকার প্রতি মণ ধানের মূল্য বেঁধে দিয়েছে ১ হাজার ৪০ টাকা। অথচ এলাকা ভেদে প্রতি মণ ধান কৃষককে বিক্রি করতে হচ্ছে ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকা দরে। অর্থাৎ প্রতিমণ ধানে কৃষক ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা লোকসান দিচ্ছেন।

সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার বারোকুড়ি গ্রামের আরজত আলী ক্ষোভ প্রকাশ করে যুগান্তরকে বলেন, ‘সরকার কখন ধান কিনবো, আর কখন ধানের দাম বাড়বো; এর আগেই আমরা শেষ। এইডা কোনো কথা হইতে পারে না। আমরা ধান বেইচাহারলে, সরকার ধানের দাম বাড়াইবো; আর লাভ করবো ব্যবসায়ীরা।’

জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জের সবুজপুর গ্রামের কৃষক মুজিবুর রহমানের কথায়, ‘আমরা যে খরচ কইরা গিরস্থি করছি, এহন ধানের দাম কম হওয়ায় লাভের মুখ দেখতাছি না। ধান লইয়া বাজারে গেলে যে দর ব্যবসায়ীরা কয়, সে দরে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হই। কারণ সংসারের খরচ মেটাতে ধান বিক্রি করতে হয়।’ একই জেলার ইসলামপুর উপজেলার মলমগঞ্জ গ্রামের ধান ব্যবসায়ী আবদুল আজিজ জানান, তারা এখন সর্বোচ্চ ৬০০ টাকা মণ দরে ধান কিনছেন। কিছুদিন মজুদ রেখে ধানের দাম বাড়লে প্রতি মণ ধান ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা লাভে সরকারি গুদামে বিক্রি করবেন।

চলতি বোরো মৌসুমে হাওরে ধানের ফলন ভালো হলেও কৃষক উৎপাদিত ধানের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছে হাওর অ্যাডভোকেসি প্লাটফর্ম (হ্যাপ)। ১৩ মে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এক সংবাদ সম্মেলনে তারা বলেন, সরকারের নির্ধারিত মূল্য মণপ্রতি ১ হাজার ৪০ টাকার প্রায় অর্ধেক দামে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষক।

হাওর অ্যাডভোকেসি প্লাটফর্মের যুগ্ম আহ্বায়ক শরিফুজ্জামান শরিফ এ প্রসঙ্গে যুগান্তরকে বলেন, হাওর অঞ্চলের কৃষকের ধান বিক্রির জন্য পর্যাপ্ত ক্রয় কেন্দ্র ও সংরক্ষণের জায়গা নেই। বাধ্য হয়ে কৃষক কম দামে ফড়িয়াদের কাছে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। সরকার ১ হাজার ৪০ টাকা মন দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে। কিন্তু হাওরের কৃষক কোথাও কোথাও ৫৫০ টাকা মনেও ধান বিক্রি করছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক খাদ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, বরাবরই সরকার ধান সংগ্রহ অভিযানে নামে দেরিতে। ফলে সরকারের ধান সংগ্রহ অভিযান কৃষকের উপকারে আসে না। বরং তা একশ্রেণীর মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবসায়ী ও চালকল মালিকদের মুনাফা লোটার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

এবার দর নির্ধারণসহ সংগ্রহ অভিযানের ঘোষণা আগে দেয়া হলেও এখনও পুরোদমে ধান কেনা শুরু না হওয়ায় কৃষকের লাভবান হওয়ার সুযোগ তেমন থাকছে না। লোকসান দিয়েই তাদের ধান বিক্রি করতে হচ্ছে। অথচ যখন সরকার পুরোদমে ধান কেনা শুরু করবে, তখন কৃষকের কাছে নয়, ধান থাকবে ফড়িয়া, দালাল ও মিলারদের কাছে। তাদের কাছ থেকেই ধান কিনবে সরকার। ফলে মুনাফা যাবে ফড়িয়াদের পকেটে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×