গাজীপুর সিটি নির্বাচন

খুলনার অভিজ্ঞতায় ভিন্ন কৌশলে বিএনপি

পোলিং এজেন্ট নিয়োগে কৌশলী ও প্রচারে সিনিয়র নেতাদের সমন্বয়ে স্পেশাল টিম থাকবে * জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ হাসান সরকারের

প্রকাশ : ২২ মে ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  তারিকুল ইসলাম

আসন্ন গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ভোট গ্রহণকে কেন্দ্র করে ভিন্ন কৌশল নিয়েছে বিএনপি। খুলনা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে এ সিটি নির্বাচনে জয় পেতে ব্যাপক পরিকল্পনা করেছে দলটি।

এরই অংশ হিসেবে গাজীপুর সিটি নির্বাচনে ভোটের দিন নেতাকর্মীদের মাঠে রাখতে ৫৭টি ওয়ার্ডে একটি করে কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ভোটের আগে যাতে পোলিং এজেন্টদের গ্রেফতার করে আতঙ্ক ছড়াতে না পারে, সে জন্য যাদের বিরুদ্ধে মামলা নেই- এমন নেতাকর্মীদের বাছাই করা হচ্ছে।

এ ছাড়া পোলিং এজেন্টদের সাহস ও উদ্দীপনা জোগাতে বিশেষ প্রশিক্ষণের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। নির্বাচনী প্রচার চালানোর ক্ষেত্রেও নতুন কৌশল নিয়েছে দলটি। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে সিনিয়র নেতারা সরাসরি প্রচারে অংশ নেবেন। এ জন্য ৫৭টি টিমের পাশাপাশি সিনিয়র নেতাদের সমন্বয়ে একটি স্পেশাল টিম গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে।

সোমবার গুলশানে বিএনপির চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে গাজীপুর সিটি নির্বাচন নিয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সভাপতিত্বে ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, বিএনপির প্রার্থী মুক্তিযোদ্ধা হাসান উদ্দিন সরকার, ঢাকা বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও গাজীপুর জেলা বিএনপির সভাপতি ফজলুল হক মিলন, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুস সালাম আজাদ, শহিদুল ইসলাম বাবুল, গাজীপুর জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শিল্পপতি মো. সোহরাব উদ্দিনসহ স্থানীয় ৫৭টি ওয়ার্ডের নেতাকর্মী। বৈঠকে গাজীপুরে ভোটের দিন যে কোনো পরিস্থিতির সৃষ্টি হোক না কেন- নেতাকর্মীরা মাঠে থাকবেন বলে কেন্দ্রের সিনিয়র নেতাদের প্রতিশ্র“তি দেন স্থানীয় নেতারা।

গাজীপুর নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সমন্বয়কারী বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন যুগান্তরকে বলেন, গাজীপুর নির্বাচনে বিএনপি থাকবে। খুলনা নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল যেভাবে ভোট ডাকাতি করে বিএনপির প্রার্থীর জয় ছিনিয়ে নিয়েছে; গাজীপুরে তা হতে দেয়া হবে না। তাই গাজীপুর সিটি নির্বাচন নিয়ে নতুন কৌশল নেবে বিএনপি।

তিনি বলেন, ক্ষমতাসীন দল গাজীপুরেও যদি ভোট কারচুপির চেষ্টা করে তাহলে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করবে বিএনপি। যদি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের সহায়তায় কারচুপি করে তাহলে তা জনগণই দেখবে।

বিএনপির মেয়র প্রার্থী মুক্তিযোদ্ধা হাসান উদ্দিন সরকার যুগান্তরকে বলেন, যেসব কৌশলে ক্ষমতাসীন দল খুলনায় কারচুপি করেছে, সেসব কৌশল প্রতিরোধে গাজীপুরে বিএনপির নেতাকর্মীরা মাঠে থাকবে। যে কোনো ত্যাগের বিনিময়ে নেতাকর্মীরা কারচুপি ঠেকাতে প্রস্তুত আছে। যারা সাহস ও উদ্দীপনা নিয়ে কেন্দ্রে থাকবে, তাদেরই পোলিং এজেন্ট হিসেবে নিয়োগ দেয়া হবে বলেও জানান তিনি।

সূত্র জানায়, গাজীপুর সিটি নির্বাচনের কৌশল নিয়ে সোমবার সকালে গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকটি দীর্ঘ চার ঘণ্টা ধরে চলে। বৈঠকে স্থানীয় নেতারা বলেন, খুলনা সিটি নির্বাচনে বিএনপির যেসব ভুল-ত্র“টি হয়েছে, গাজীপুরে তা হবে না। তাদের বিরুদ্ধে হামলা-মামলা যাই করা হোক না কেন তা মোকাবেলা করে ভোটের দিন মাঠে থাকবেন।

বৈঠকে উপস্থিত কেন্দ্রীয় এক নেতা যুগান্তরকে জানান, আগের চেয়ে গণসংযোগ বাড়ানোর সিদ্ধান্তও হয়েছে। এ ছাড়া গণসংযোগের ক্ষেত্রে ৫৭টি টিম ছাড়াও সিনিয়র নেতাদের নিয়ে স্পেশাল টিম গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। স্পেশাল টিমে স্থায়ী কমিটির সদস্যরা থাকবেন। স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে তারা নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেবেন। 

কেন্দ্রীয় ওই নেতা আরও জানান, বৈঠকে হাসান উদ্দিন সরকার বলেন, তিনি বেঁচে থাকতে গাজীপুর সিটি নির্বাচনে ভোট কারচুপি হতে দেবেন না। কারচুপি মোকাবেলার দায়িত্ব তার। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বিপুল ভোটে তিনি জয়ী হবেন বলেও কেন্দ্রীয় নেতাদের আশ্বস্ত করেন।

বিএনপি প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকারের প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট ও জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শিল্পপতি মো. সোহরাব উদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, খুলনা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে সরকারি দল কি করেছে, তা সারা দেশের মানুষ জেনেছে। গাজীপুরের মানুষ খুব সচেতন। এখানে নেতাকর্মীরা ভোটের দিন মাঠে থাকবে। দলের পোলিং এজেন্টরাও কেন্দ্রে থাকবেন।

গাজীপুর জেলা বিএনপির সভাপতি ফজলুল হক মিলন বলেন, খুলনা সিটি নির্বাচন থেকে শিক্ষা হয়েছে। ঢাকা কাছে থাকায় গাজীপুরের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। এখানে ধানের শীষের গণজোয়ার। নেতাকর্মী ভোটের দিন শেষ পর্যন্ত মাঠে থাকবে। তিনি বলেন, যদি সরকার ও নির্বাচন কমিশন তাদের দায়িত্ব পালন না করে বেপরোয়া আচরণ করে তাহলে ভিন্নকথা।

পোলিং এজেন্ট নিয়োগের ব্যাপারে তিনি বলেন, যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো মামলা নেই তাদেরই পোলিং এজেন্ট করা হবে। ইতিমধ্যে তাদের সাহস ও উদ্দীপনা জোগাতে বিএনপি কিছু পরিকল্পনাও করেছে। যাতে তারা সাহসের সঙ্গে ভোটের দিন শেষ পর্যন্ত থাকে।

এদিকে সোমবার রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী অভিযোগ করেন, গাজীপুরে এমপি-মন্ত্রীদের বৈঠক নির্বাচনী আচরণবিধির সম্পূর্ণ পরিপন্থী। তিনি বলেন, আসন্ন গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে রোববার টঙ্গীতে এক স্থানীয় এমপির বাসায় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের সভাপতিত্বে এমপি-মন্ত্রীদের বৈঠক হয়েছে। যা নির্বাচনী আচরণবিধির সম্পূর্ণ পরিপন্থী। এ ঘটনায় গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নিয়ে ক্ষমতাসীন মহলের এক গভীর নীলনকশার বীভৎস আভাস ফুটে উঠছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন, সহ-দফতর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপু, মুনির হোসেন, নির্বাহী কমিটির সদস্য আমিনুল ইসলাম প্রমুখ।

জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ : আসন্ন গাজীপুর সিটি নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকার দলীয় প্রার্থী অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ করেছেন বিএনপি প্রার্থী মুক্তিযোদ্ধা হাসান উদ্দিন সরকার। সোমবার আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে রিটার্নিং অফিসার বরাবর দরখাস্ত দিয়েছেন হাসান উদ্দিন সরকার। ওই অভিযোগের অনুলিপি তিনি প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও সচিব, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়কেও দিয়েছেন।

হাসান উদ্দিন সরকার অভিযোগপত্রে বলেন, “বিএনপি এ দেশের আপামর জনতার ভালোবাসায় সিক্ত নির্বাচনমুখী একটি রাজনৈতিক দল। গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আমি বিএনপি মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকে মেয়র পদপ্রার্থী। আমি এ পর্যন্ত নির্বাচনী আচরণবিধি যথাযথভাবে প্রতিপালন করে আসছি। অপরদিকে গাজীপুর সিটি নির্বাচনী প্রক্রিয়ার শুরু থেকেই আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থী ও তার সমর্থকরা একের পর এক আচরণবিধি লঙ্ঘন করে সুষ্ঠু নির্বাচনী পরিবেশ বিনষ্ট করছেন।

সোমবার আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলম নগরীর ৫৪ নম্বর ওয়ার্ডের টঙ্গী পাইলট স্কুল অ্যান্ড গার্লস কলেজে পাঠদান বন্ধ রেখে নির্বাচনী সভা করেন। ওই প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ ‘অভিভাবক সমাবেশের’ নামে এ নির্বাচনী সভার আয়োজন করেন। আওয়ামী লীগের সমর্থন নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষের সহোদর ভাই ৫৪ নম্বর ওয়ার্ডে ‘লাটিম’ প্রতীকে সাধারণ কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করছেন।

অধ্যক্ষ সোমবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত ‘অভিভাবক সমাবেশের’ নামে এবং দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে প্রায় আড়াইটা পর্যন্ত ‘শিক্ষকদের সঙ্গে মতবিনিময়’-এর নামে প্রতিষ্ঠানটিতে দিনভর পাঠদান বন্ধ রেখে ‘নৌকা’ ও ‘লাটিম’ প্রতীকের নির্বাচনী সভা করেন। সভায় প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি লাটিম ও নৌকার পক্ষে ভোট চান। প্রতিষ্ঠানটির নতুন ভবনের চার তলায় অভিভাবক সমাবেশের নামে আয়োজিত নির্বাচনী সভায় নৌকা প্রতীকের মেয়র প্রার্থী শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিক্ষাবৃত্তি প্রদানের অঙ্গীকার করেন।

সভায় একটি নির্ধারিত ছকে অভিভাবকদের নাম, স্বাক্ষর ও মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করা হয়। নির্বাচনে ভোটারদের স্বাক্ষর জাল করে জাল ভোট প্রয়োগসহ অসৎ উপায় অবলম্বনের জন্য এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে পরস্পর শোনা যাচ্ছে। অনুষ্ঠান চলাকালে স্কুলের বেতনভুক্ত কর্মচারীদের নৌকা প্রতীকের ব্যাজ ধারণে বাধ্য করা হয়। পরে একইভাবে ৪৭ নম্বর ওয়ার্ডে সাহাজ উদ্দিন সরকার স্কুল অ্যান্ড কলেজেও নৌকা প্রতীকের নির্বাচনী সভা করেন এই মেয়রপ্রার্থী।’

অভিযোগপত্রে তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘রোববারও নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করে স্থানীয় সংসদ সদস্যের বাস ভবনে মন্ত্রী-এমপিসহ সরকারি সুবিধাভোগী ব্যক্তিগণ নৌকা প্রতীকের পক্ষে নির্বাচনী সভা করেন - মর্মে সোমবার জাতীয় সংবাদপত্রগুলোতে খবর প্রকাশিত হয়েছে। অথচ নির্বাচন কমিশনের বেঁধে দেয়া সময়সূচী অনুযায়ী ১৮ জুন পর্যন্ত কোন ধরণের নির্বাচনী প্রচারণার সুযোগ নেই। প্রতিদ্বন্দ্বী মেয়রপ্রার্থীর কর্মকান্ড ‘সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন আচরণ বিধিমালা’ এর যথাক্রমে ২২, ২৪, ৩, ৫ ও ৪ নম্বর বিধির সুস্পষ্ট লঙ্গন।”

এ ছাড়া ৫৪ নম্বর ওয়ার্ডের বিএনপি সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী শেখ মো. আলেকও টঙ্গী পাইলট স্কুল অ্যান্ড গার্লস কলেজের অধ্যক্ষ মো. আলাউদ্দিন মিয়ার বিরুদ্ধে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ করে রিটার্নিং অফিসার বরাবর আবেদন দিয়েছেন।