ভাঙল অনশন আন্দোলন চলবে
jugantor
শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়
ভাঙল অনশন আন্দোলন চলবে

  সিলেট ব্যুরো  

২৭ জানুয়ারি ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

প্রিয় শিক্ষকের অনুরোধে অনশন স্থগিত

সিলেট শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যের পদত্যাগ দাবিতে এক সপ্তাহ অনশন করার পর অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল ও তার স্ত্রী অধ্যাপক ইয়াসমিন হকের অনুরোধে ২৮ শিক্ষার্থী অনশন প্রত্যাহার করেছেন।

বুধবার সকাল ১০টা ২০ মিনিটে পানি খাইয়ে অনশন ভাঙান এই শিক্ষক দম্পতি। শিক্ষার্থীদের দাবি পূরণে সরকারের ওপর মহলের আশ্বাস পেয়েই তারা সিলেটে আসেন। আর শিক্ষার্থীরা তাদের প্রিয় দুই শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে অনশন থেকে সরে আসেন। তবে উপাচার্যের পদত্যাগ দাবিতে অন্যান্য কর্মসূচি চালু রাখার কথা জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।

অনশন ভাঙিয়ে ড. জাফর ইকবাল বলেন, ‘এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যৌক্তিক আন্দোলন করে আসছে। কিন্তু প্রশাসন আন্দোলনকে ভণ্ডুল করতে যেসব পথ বেছে নিয়েছে তা অমানবিক, নিষ্ঠুর ও দানবীয়। আর এই শিক্ষার্থীদের দাবি সরকার না মানলে সেটা হবে তার ও দেশের প্রগতিশীল মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা।’

ড. জাফর ইকবালের অনুরোধে অনশন ভাঙা এবং তার বক্তব্য সম্পর্কে জানতে উপাচার্যকে ফোন দিয়েও পাওয়া যায়নি। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের অনশন কর্মসূচি নিয়ে আমরা খুব চিন্তিত ছিলাম। সমস্যা সমাধান হওয়ায় একটু হালকা লাগছে।’

উপাচার্যের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত এসেছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা মূলত সরকারের বিষয়। তবে আমার জানামতে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো এ ধরনের কোনো পদক্ষেপ নেই।’

জানা যায়, উপাচার্যের পদত্যাগ দাবিতে আমরণ অনশনে থাকা শিক্ষার্থীদের মৃত্যু হলেও ঘরে ফিরবেন না বলে জানিয়েছিলেন। এই অনড় অবস্থান দেখে সরকারের উচ্চপর্যায়ের একটি দল ড. জাফর ইকবালের বাসায় যায়।

প্রতিনিধি দলের সদস্যরা শিক্ষার্থীদের দাবি মানার আশ্বাস দিয়ে জাফর ইকবালকে অনশন ভাঙানোর উদ্যোগ নিতে বলেন। এরপরই জুমে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন ড. জাফর ইকবাল ও ইয়াসমিন হক।

কথা বলে শিক্ষার্থীদের আস্থার স্থানটি পরীক্ষা করে নেন এবং ক্যাম্পাসে আসার প্রস্তাব দেন। আর এই প্রস্তাব শিক্ষার্থীরা গ্রহণ করেন। এরপর মঙ্গলবার রাত ১০টায় ঢাকা থেকে সড়কপথে সিলেটের উদ্দেশে রওয়ানা হন জাফর ইকবাল ও ইয়াসমিন হক।

দীর্ঘপথ ভ্রমণ করেও কোনো বিশ্রাম না নিয়ে ভোর পৌনে চারটার দিকে তারা সোজা চলে যান অনশনকারীদের কাছে। সেখানে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পুরো ঘটনার বর্ণনা শুনে এই শিক্ষক দম্পতি অনেকটা হতবাক হয়ে যান।

তারা বলেন, ‘এত সুন্দর একটি আন্দোলনকে নিয়ে সরকারের কাছে ভুল বার্তা পাঠানো হয়েছে। সরকার এসব কিছুই জানে না।’ তারা শিক্ষার্থীদের আশ্বাস দেন সরকারের উচ্চ মহলে সত্য ঘটনাটি তুলে ধরার।

প্রিয় দুই শিক্ষককে কাছে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন শিক্ষার্থীরা। তাদের কাছে উপাচার্য ফরিদ উদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগও করেন শিক্ষার্থীরা।

এ সময় জাফর ইকবাল শিক্ষার্থীদের বলেন, ‘সরকারের উচ্চ পর্যায়ের এক প্রতিনিধি দলের সঙ্গে আমার আলোচনা হয়েছে। তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তোমরা যা চাইছ, যে দাবি তোমাদের, সেটা পূরণ হবে। তোমাদের অসিলায় বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ঠিক হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘তোমরা কেন তোমাদের জীবন অপচয় করবা? তোমাদের বাঁচতে হবে। তোমরা ইতোমধ্যেই বিজয়ী হয়ে গেছ। সারা দেশের মানুষ তোমাদের পক্ষে দাঁড়িয়েছে। দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিদের ঘুম হারাম করে দিয়েছ। জীবন অনেক মূল্যবান। তুচ্ছ বিষয়ে জীবন অপচয় করা যাবে না।’

অনশন স্থল থেকে চিকিৎসক দল ফিরিয়ে নেওয়া, শিক্ষার্থীদের খাবার ও চিকিৎসা সহায়তায় অর্থদানকারীদের গ্রেফতারের বিষয়টি শুনে ক্ষোভে ফেটে পড়েন জাফর ইকবাল।

তিনি পকেট থেকে ১০ হাজার টাকা বের করে শিক্ষার্থীদের সহায়তা দিয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের ছবি তুলতে বলেন। তিনি বলেন, এই আমি সহায়তা দিলাম আমাকেও গ্রেফতার করা হোক।

এ সময় আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন জাফর ইকবাল। তিনি বলেন, ‘যারা এসব কাজ করেছে তারা চেয়েছিল শিক্ষার্থীদের খুন করতে। তারা যেন চিকিৎসাসেবা না পেয়ে মারা যায় সেটাই চেয়েছিল প্রশাসন।

’ এ সময় তিনি গ্রেফতারকৃতদের দ্রুত মুক্তি দাবি করেন। শেষে তার অনুরোধে অনড় অবস্থান থেকে সরে আসেন শিক্ষার্থীরা।

তখন উপাচার্যের বাসভবনের সামনে ৮ জন অনশনরত ছিলেন। বাকিরা ছিলেন হাসপাতালে। সকাল ১০টায় তাদের অনশনস্থলে নিয়ে আসা হয়। এরপরই ড. জাফর ইকবাল ও ইয়াসমিন হক অনশন ভাঙানোর প্রক্রিয়া শুরু করেন।

এক এক করে ২৮ জনকে পানি খাইয়ে অনশন ভাঙান তারা। এ সময় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। অনেক শিক্ষার্থী প্রিয় শিক্ষক দম্পতিকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকেন। ড. জাফর ইকবাল ও ইয়াসমিন হকও কান্না ধরে রাখতে পারেননি।

এ সময় শিক্ষার্থীরা বলেন, ‘আমরা এই উপাচার্যকে আর এই ক্যাম্পাসে চাই না। আমরা এই উপাচার্য ফরিদ উদ্দিনের কাছে নিজেদের নিরাপদ মনে করছি না।’ তখন ড. জাফর ইকবাল বলেন, ‘যে মানুষ এসব দেখেও নিজের জায়গায় অনড় থাকেন, তাকে আমি মানুষ বলতে চাই না, সে দানব। ওই মানুষের জন্য তোমাদের জীবন যাওয়ার কোনো মানেই হয় না। তোমাদের জীবন অনেক মূল্যবান।’

তরুণদের প্রতিটি আন্দোলনের সঙ্গে আছেন জানিয়ে ড. জাফর ইকবাল বলেন, ‘সরকারের ঊর্ধ্বতন মহল থেকে আমাদের নিশ্চিত করা হয়েছে যে, তোমাদের দাবি মানা হবে। দুটি মামলাই উঠানো হবে। আর সে কারণেই আমরা এসেছি। নিশ্চিত না হলেও আমরা আসতাম, কিন্তু তোমাদের অনশন ভাঙতে বলতে পারতাম না। তোমরা যে কাজটা করেছ, নিশ্চিত থেকো, তোমাদের কারণে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়, ভিসি সিস্টেমটা ঠিক হবে। তোমরা ৩৪ জন ভিসির ঘুম হারাম করে দিয়েছ।’

অনশন ভাঙানোর পর ড. জাফর ইকবাল সাংবাদিকদের বলেন, ‘এখানে আসার আগে আমার সঙ্গে সরকারের উচ্চমহল কথা বলেছে। আমি তাদের অনুরোধ করব, তারা আমাকে যে কথা দিয়েছেন সে কথাগুলো যেন রক্ষা করেন। আমি আর এই ছাত্রদের ভেতর কোনো পার্থক্য নেই। আমাকে যে কথা দেওয়া হয়েছে তা যদি রক্ষা না হয়, তাহলে বুঝে নেব তারা শুধু ছাত্রদের সঙ্গে নয়, আমার সঙ্গে এবং এই দেশের যত প্রগতিশীল মানুষ আছে সবার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। আমি আশা করব তারা আমাকে যে কথা দিয়েছেন সে কথাগুলো রাখবেন।’

উপাচার্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘একজন শিক্ষকের এ রকম মেরুদণ্ডহীন হওয়ার কোনো কারণ নাই।’ উপাচার্য ফরিদের পদত্যাগের দাবিতে শিক্ষার্থীদের অনশন করার দরকার নেই জানিয়ে জনপ্রিয় এই শিক্ষক বলেন, ‘এই আন্দোলনের জন্য অনশন করার দরকার নাই। কারণ এ ধরনের মানুষের জন্য প্রাণ দেওয়া সমীচীন না।’

বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্কের অবনতির বিষয়টিকে দুঃখজনক আখ্যা দিয়ে জাফর ইকবাল বলেন, ‘যখন পুলিশের হামলা হয়েছে, তখন শিক্ষকদের সামনে ঝাঁপিয়ে পড়া উচিত ছিল। বলা উচিত ছিল, খবরদার, তোমরা এগুলো করতে পারবে না আমাদের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে। একজন শিক্ষকও তা করেননি।’

এ সময় অধ্যাপক ইয়াসমিন হক বলেন, ‘স্টুডেন্টদের গায়ে পুলিশ হাত দেবে, কিন্তু টিচার কিছু বলবে না, টিচার হিসেবে আমার কাছে এর কোনো মাফ নাই।’

এরপর গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন অনশনকারী অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী জাহিদুল ইসলাম অপূর্ব। তিনি বলেন, ‘অনশন থেকে সরে এলেও আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাব। উপাচার্যের পদত্যাগ না হওয়া পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন চলবে। দ্রুতই নিজেরা বসে আন্দোলনের ধরন ও কর্মসূচি ঠিক করব।’

একই কথা বলেন অনশনকারী শাহরিয়ার আবেদিন। তিনি জানান, ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল ও ইয়াসমিন হক সারা দেশের শিক্ষার্থীদের প্রাণের মানুষ। তাদের কথায় বিশ্বাস না করলে নিজেদেরই অবিশ্বাস করা হবে। এই দুজনকে আমরা এতটা শ্রদ্ধা করি যে, তারা যে আশ্বাস দিয়েছেন তা সরকার অবশ্যই পূরণ করবে। তারপরও এই নির্লজ্জ উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনের অন্য কর্মসূচিগুলো চলমান থাকবে।

অহিংস আন্দোলন চালিয়ে যাবেন শিক্ষার্থীরা : রাত সাড়ে ১০টার দিকে সংবাদ সম্মেলন করেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। তারা জানান, দাবি আদায়ের আগ পর্যন্ত অহিংস আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।

সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনরত শিক্ষার্থী মোহাইমিনুল বাশার রাজ বলেন, আমরা আজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে সব অবরোধ তুলে দেব। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকসহ সব ফটক খুলে দেব। তবে যতদিন আমাদের দাবি আদায় না হচ্ছে ততদিন আমরা ক্যাম্পাসে অবস্থান করে সব সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, রোড পেইন্টিং এবং সভা-সমাবেশের মাধ্যমে আমাদের আন্দোলন চালিয়ে যাব।

প্রাক্তন ৫ শিক্ষার্থীর জামিন : আন্দোলনে অর্থ জোগান দেওয়ার অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন পাঁচ শিক্ষার্থী জামিন পেয়েছেন। বুধবার সন্ধ্যায় সিলেট মহানগর জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-২ এর বিচারক সুমন ভূঁইয়া তাদের জামিন মঞ্জুর করেন।

এর আগে গ্রেফতারের নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে তাদের মুক্তি দাবি করে বিবৃতি দেয় শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি।

সোমবার ও মঙ্গলবার ঢাকার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে প্রাক্তন ৫ শিক্ষার্থীকে গ্রেফতার করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডি। পরে তাদের সিলেট পুলিশে হস্তান্তর করা হয়। মঙ্গলবার রাতে সিলেটের জালালাবাদ থানায় তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়।

উপাচার্যের পদত্যাগ দাবিতে বিভিন্ন স্থানে কর্মসূচি : বরিশাল ব্যুরো জানায়, শাবি উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে বরিশালে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। নগরীর অশ্বিনী কুমার হলের সামনে বুধবার দুপুর ১২টায় এ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।

ইবি (ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়) প্রতিনিধি জানান, শাবি শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি জানিয়েছেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ও ভূগোল বিভাগের প্রভাষক ইনজামুল হক।

এদিন দুপুরে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকসংলগ্ন ‘মৃত্যুঞ্জয়ী মুজিব’ ম্যুরালের সামনে প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে ‘শাবিপ্রবির ভিসির পদত্যাগ চাই’ লেখা প্ল্যাকার্ড বহন করেন। কাপাসিয়া (গাজীপুর) প্রতিনিধি জানান, উপাচার্য ফরিদ উদ্দিন আহমেদের পদত্যাগ দাবিতে কাপাসিয়ায় ছাত্রদল প্রতীকী অনশন কর্মসূচি পালন করে।

কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে বুধবার দুপুরে কাপাসিয়া উপজেলা ছাত্রদল ও কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ শাখা ছাত্রদল এই কর্মসূচির অয়োজন করে। সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, শাবি শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সংহতি জানিয়ে সমাবেশ করেছে সুনামগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতি। এদিন সকালে জেলা আইনজীবী সমিতি ভবনের সামনে কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।

শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়

ভাঙল অনশন আন্দোলন চলবে

 সিলেট ব্যুরো 
২৭ জানুয়ারি ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
প্রিয় শিক্ষকের অনুরোধে অনশন স্থগিত
সিলেটে শাবিপ্রবির উপাচার্যের পদত্যাগ দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পানি খাইয়ে অনশন ভাঙাচ্ছেন ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল। বুধবার সকালে -যুগান্তর

সিলেট শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যের পদত্যাগ দাবিতে এক সপ্তাহ অনশন করার পর অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল ও তার স্ত্রী অধ্যাপক ইয়াসমিন হকের অনুরোধে ২৮ শিক্ষার্থী অনশন প্রত্যাহার করেছেন।

বুধবার সকাল ১০টা ২০ মিনিটে পানি খাইয়ে অনশন ভাঙান এই শিক্ষক দম্পতি। শিক্ষার্থীদের দাবি পূরণে সরকারের ওপর মহলের আশ্বাস পেয়েই তারা সিলেটে আসেন। আর শিক্ষার্থীরা তাদের প্রিয় দুই শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে অনশন থেকে সরে আসেন। তবে উপাচার্যের পদত্যাগ দাবিতে অন্যান্য কর্মসূচি চালু রাখার কথা জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। 

অনশন ভাঙিয়ে ড. জাফর ইকবাল বলেন, ‘এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যৌক্তিক আন্দোলন করে আসছে। কিন্তু প্রশাসন আন্দোলনকে ভণ্ডুল করতে যেসব পথ বেছে নিয়েছে তা অমানবিক, নিষ্ঠুর ও দানবীয়। আর এই শিক্ষার্থীদের দাবি সরকার না মানলে সেটা হবে তার ও দেশের প্রগতিশীল মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা।’ 

ড. জাফর ইকবালের অনুরোধে অনশন ভাঙা এবং তার বক্তব্য সম্পর্কে জানতে উপাচার্যকে ফোন দিয়েও পাওয়া যায়নি। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের অনশন কর্মসূচি নিয়ে আমরা খুব চিন্তিত ছিলাম। সমস্যা সমাধান হওয়ায় একটু হালকা লাগছে।’

উপাচার্যের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত এসেছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা মূলত সরকারের বিষয়। তবে আমার জানামতে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো এ ধরনের কোনো পদক্ষেপ নেই।’ 

জানা যায়, উপাচার্যের পদত্যাগ দাবিতে আমরণ অনশনে থাকা শিক্ষার্থীদের মৃত্যু হলেও ঘরে ফিরবেন না বলে জানিয়েছিলেন। এই অনড় অবস্থান দেখে সরকারের উচ্চপর্যায়ের একটি দল ড. জাফর ইকবালের বাসায় যায়।

প্রতিনিধি দলের সদস্যরা শিক্ষার্থীদের দাবি মানার আশ্বাস দিয়ে জাফর ইকবালকে অনশন ভাঙানোর উদ্যোগ নিতে বলেন। এরপরই জুমে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন ড. জাফর ইকবাল ও ইয়াসমিন হক।

কথা বলে শিক্ষার্থীদের আস্থার স্থানটি পরীক্ষা করে নেন এবং ক্যাম্পাসে আসার প্রস্তাব দেন। আর এই প্রস্তাব শিক্ষার্থীরা গ্রহণ করেন। এরপর মঙ্গলবার রাত ১০টায় ঢাকা থেকে সড়কপথে সিলেটের উদ্দেশে রওয়ানা হন জাফর ইকবাল ও ইয়াসমিন হক।

দীর্ঘপথ ভ্রমণ করেও কোনো বিশ্রাম না নিয়ে ভোর পৌনে চারটার দিকে তারা সোজা চলে যান অনশনকারীদের কাছে। সেখানে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পুরো ঘটনার বর্ণনা শুনে এই শিক্ষক দম্পতি অনেকটা হতবাক হয়ে যান।

তারা বলেন, ‘এত সুন্দর একটি আন্দোলনকে নিয়ে সরকারের কাছে ভুল বার্তা পাঠানো হয়েছে। সরকার এসব কিছুই জানে না।’ তারা শিক্ষার্থীদের আশ্বাস দেন সরকারের উচ্চ মহলে সত্য ঘটনাটি তুলে ধরার।

প্রিয় দুই শিক্ষককে কাছে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন শিক্ষার্থীরা। তাদের কাছে উপাচার্য ফরিদ উদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগও করেন শিক্ষার্থীরা।

এ সময় জাফর ইকবাল শিক্ষার্থীদের বলেন, ‘সরকারের উচ্চ পর্যায়ের এক প্রতিনিধি দলের সঙ্গে আমার আলোচনা হয়েছে। তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তোমরা যা চাইছ, যে দাবি তোমাদের, সেটা পূরণ হবে। তোমাদের অসিলায় বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ঠিক হবে।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘তোমরা কেন তোমাদের জীবন অপচয় করবা? তোমাদের বাঁচতে হবে। তোমরা ইতোমধ্যেই বিজয়ী হয়ে গেছ। সারা দেশের মানুষ তোমাদের পক্ষে দাঁড়িয়েছে। দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিদের ঘুম হারাম করে দিয়েছ। জীবন অনেক মূল্যবান। তুচ্ছ বিষয়ে জীবন অপচয় করা যাবে না।’ 

অনশন স্থল থেকে চিকিৎসক দল ফিরিয়ে নেওয়া, শিক্ষার্থীদের খাবার ও চিকিৎসা সহায়তায় অর্থদানকারীদের গ্রেফতারের বিষয়টি শুনে ক্ষোভে ফেটে পড়েন জাফর ইকবাল।

তিনি পকেট থেকে ১০ হাজার টাকা বের করে শিক্ষার্থীদের সহায়তা দিয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের ছবি তুলতে বলেন। তিনি বলেন, এই আমি সহায়তা দিলাম আমাকেও গ্রেফতার করা হোক।

এ সময় আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন জাফর ইকবাল। তিনি বলেন, ‘যারা এসব কাজ করেছে তারা চেয়েছিল শিক্ষার্থীদের খুন করতে। তারা যেন চিকিৎসাসেবা না পেয়ে মারা যায় সেটাই চেয়েছিল প্রশাসন।

’ এ সময় তিনি গ্রেফতারকৃতদের দ্রুত মুক্তি দাবি করেন। শেষে তার অনুরোধে অনড় অবস্থান থেকে সরে আসেন শিক্ষার্থীরা।

তখন উপাচার্যের বাসভবনের সামনে ৮ জন অনশনরত ছিলেন। বাকিরা ছিলেন হাসপাতালে। সকাল ১০টায় তাদের অনশনস্থলে নিয়ে আসা হয়। এরপরই ড. জাফর ইকবাল ও ইয়াসমিন হক অনশন ভাঙানোর প্রক্রিয়া শুরু করেন।

এক এক করে ২৮ জনকে পানি খাইয়ে অনশন ভাঙান তারা। এ সময় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। অনেক শিক্ষার্থী প্রিয় শিক্ষক দম্পতিকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকেন। ড. জাফর ইকবাল ও ইয়াসমিন হকও কান্না ধরে রাখতে পারেননি। 

এ সময় শিক্ষার্থীরা বলেন, ‘আমরা এই উপাচার্যকে আর এই ক্যাম্পাসে চাই না। আমরা এই উপাচার্য ফরিদ উদ্দিনের কাছে নিজেদের নিরাপদ মনে করছি না।’ তখন ড. জাফর ইকবাল বলেন, ‘যে মানুষ এসব দেখেও নিজের জায়গায় অনড় থাকেন, তাকে আমি মানুষ বলতে চাই না, সে দানব। ওই মানুষের জন্য তোমাদের জীবন যাওয়ার কোনো মানেই হয় না। তোমাদের জীবন অনেক মূল্যবান।’ 

তরুণদের প্রতিটি আন্দোলনের সঙ্গে আছেন জানিয়ে ড. জাফর ইকবাল বলেন, ‘সরকারের ঊর্ধ্বতন মহল থেকে আমাদের নিশ্চিত করা হয়েছে যে, তোমাদের দাবি মানা হবে। দুটি মামলাই উঠানো হবে। আর সে কারণেই আমরা এসেছি। নিশ্চিত না হলেও আমরা আসতাম, কিন্তু তোমাদের অনশন ভাঙতে বলতে পারতাম না। তোমরা যে কাজটা করেছ, নিশ্চিত থেকো, তোমাদের কারণে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়, ভিসি সিস্টেমটা ঠিক হবে। তোমরা ৩৪ জন ভিসির ঘুম হারাম করে দিয়েছ।’ 

অনশন ভাঙানোর পর ড. জাফর ইকবাল সাংবাদিকদের বলেন, ‘এখানে আসার আগে আমার সঙ্গে সরকারের উচ্চমহল কথা বলেছে। আমি তাদের অনুরোধ করব, তারা আমাকে যে কথা দিয়েছেন সে কথাগুলো যেন রক্ষা করেন। আমি আর এই ছাত্রদের ভেতর কোনো পার্থক্য নেই। আমাকে যে কথা দেওয়া হয়েছে তা যদি রক্ষা না হয়, তাহলে বুঝে নেব তারা শুধু ছাত্রদের সঙ্গে নয়, আমার সঙ্গে এবং এই দেশের যত প্রগতিশীল মানুষ আছে সবার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। আমি আশা করব তারা আমাকে যে কথা দিয়েছেন সে কথাগুলো রাখবেন।’ 

উপাচার্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘একজন শিক্ষকের এ রকম মেরুদণ্ডহীন হওয়ার কোনো কারণ নাই।’ উপাচার্য ফরিদের পদত্যাগের দাবিতে শিক্ষার্থীদের অনশন করার দরকার নেই জানিয়ে জনপ্রিয় এই শিক্ষক বলেন, ‘এই আন্দোলনের জন্য অনশন করার দরকার নাই। কারণ এ ধরনের মানুষের জন্য প্রাণ দেওয়া সমীচীন না।’ 

বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্কের অবনতির বিষয়টিকে দুঃখজনক আখ্যা দিয়ে জাফর ইকবাল বলেন, ‘যখন পুলিশের হামলা হয়েছে, তখন শিক্ষকদের সামনে ঝাঁপিয়ে পড়া উচিত ছিল। বলা উচিত ছিল, খবরদার, তোমরা এগুলো করতে পারবে না আমাদের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে। একজন শিক্ষকও তা করেননি।’

এ সময় অধ্যাপক ইয়াসমিন হক বলেন, ‘স্টুডেন্টদের গায়ে পুলিশ হাত দেবে, কিন্তু টিচার কিছু বলবে না, টিচার হিসেবে আমার কাছে এর কোনো মাফ নাই।’ 

এরপর গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন অনশনকারী অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী জাহিদুল ইসলাম অপূর্ব। তিনি বলেন, ‘অনশন থেকে সরে এলেও আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাব। উপাচার্যের পদত্যাগ না হওয়া পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন চলবে। দ্রুতই নিজেরা বসে আন্দোলনের ধরন ও কর্মসূচি ঠিক করব।’ 

একই কথা বলেন অনশনকারী শাহরিয়ার আবেদিন। তিনি জানান, ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল ও ইয়াসমিন হক সারা দেশের শিক্ষার্থীদের প্রাণের মানুষ। তাদের কথায় বিশ্বাস না করলে নিজেদেরই অবিশ্বাস করা হবে। এই দুজনকে আমরা এতটা শ্রদ্ধা করি যে, তারা যে আশ্বাস দিয়েছেন তা সরকার অবশ্যই পূরণ করবে। তারপরও এই নির্লজ্জ উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনের অন্য কর্মসূচিগুলো চলমান থাকবে। 

অহিংস আন্দোলন চালিয়ে যাবেন শিক্ষার্থীরা : রাত সাড়ে ১০টার দিকে সংবাদ সম্মেলন করেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। তারা জানান, দাবি আদায়ের আগ পর্যন্ত অহিংস আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।

সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনরত শিক্ষার্থী মোহাইমিনুল বাশার রাজ বলেন, আমরা আজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে সব অবরোধ তুলে দেব। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকসহ সব ফটক খুলে দেব। তবে যতদিন আমাদের দাবি আদায় না হচ্ছে ততদিন আমরা ক্যাম্পাসে অবস্থান করে সব সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, রোড পেইন্টিং এবং সভা-সমাবেশের মাধ্যমে আমাদের আন্দোলন চালিয়ে যাব।

প্রাক্তন ৫ শিক্ষার্থীর জামিন : আন্দোলনে অর্থ জোগান দেওয়ার অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন পাঁচ শিক্ষার্থী জামিন পেয়েছেন। বুধবার সন্ধ্যায় সিলেট মহানগর জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-২ এর বিচারক সুমন ভূঁইয়া তাদের জামিন মঞ্জুর করেন।

এর আগে গ্রেফতারের নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে তাদের মুক্তি দাবি করে বিবৃতি দেয় শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি। 

সোমবার ও মঙ্গলবার ঢাকার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে প্রাক্তন ৫ শিক্ষার্থীকে গ্রেফতার করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডি। পরে তাদের সিলেট পুলিশে হস্তান্তর করা হয়। মঙ্গলবার রাতে সিলেটের জালালাবাদ থানায় তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়। 

উপাচার্যের পদত্যাগ দাবিতে বিভিন্ন স্থানে কর্মসূচি : বরিশাল ব্যুরো জানায়, শাবি উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে বরিশালে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। নগরীর অশ্বিনী কুমার হলের সামনে বুধবার দুপুর ১২টায় এ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।

ইবি (ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়) প্রতিনিধি জানান, শাবি শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি জানিয়েছেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ও ভূগোল বিভাগের প্রভাষক ইনজামুল হক।

এদিন দুপুরে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকসংলগ্ন ‘মৃত্যুঞ্জয়ী মুজিব’ ম্যুরালের সামনে প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে ‘শাবিপ্রবির ভিসির পদত্যাগ চাই’ লেখা প্ল্যাকার্ড বহন করেন। কাপাসিয়া (গাজীপুর) প্রতিনিধি জানান, উপাচার্য ফরিদ উদ্দিন আহমেদের পদত্যাগ দাবিতে কাপাসিয়ায় ছাত্রদল প্রতীকী অনশন কর্মসূচি পালন করে।

কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে বুধবার দুপুরে কাপাসিয়া উপজেলা ছাত্রদল ও কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ শাখা ছাত্রদল এই কর্মসূচির অয়োজন করে। সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, শাবি শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সংহতি জানিয়ে সমাবেশ করেছে সুনামগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতি। এদিন সকালে জেলা আইনজীবী সমিতি ভবনের সামনে কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।
 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন