রাতের ভোট কেউ দেখেনি অভিযোগও পড়েনি
jugantor
জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রসঙ্গে সিইসি
রাতের ভোট কেউ দেখেনি অভিযোগও পড়েনি

  যুগান্তর প্রতিবেদন  

২৮ জানুয়ারি ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ভোট

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আগের রাতে কেউ ভোট পড়তে দেখেননি বলে দাবি করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কেএম নূরুল হুদা। তিনি বলেন, এটি একটি অভিযোগ হিসাবে আছে। কোনো রাজনৈতিক দল এ অভিযোগ নিয়ে আদালতে যায়নি। আদালতের নির্দেশ না থাকায় নির্বাচন কমিশনও (ইসি) কোনো তদন্ত করেনি। ওই নির্বাচনে অনেক কেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়েছে। এটা অস্বাভাবিক বলে স্বীকার করেন সিইসি। তিনি বলেন, নির্বাচনের গেজেট প্রকাশের পর তা তদন্ত করার এখতিয়ার আইনে নেই। নির্বাচনের পরপরই তথ্যউপাত্ত নিয়ে কেউ ইসির কাছে অভিযোগ করেনি বলেও জানান তিনি। বৃহস্পতিবার ‘আরএফইডি টক উইথ সিইসি’ অনুষ্ঠানে কেএম নূরুল হুদা এসব কথা বলেন।

অনুষ্ঠানে পাঁচ বছরের কাজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন সিইসি। নির্বাচন কমিশন নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করায় সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার ড. এটিএম শামসুল হুদা এবং সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারের তীব্র সমালোচনাও করেন কেএম নূরুল হুদা। তাদের বিরুদ্ধে সংবিধান লঙ্ঘন ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ আনেন। একইসঙ্গে দাবি করেন, তার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশনের পাঁচ বছর দায়িত্ব পালনে রাজনৈতিক প্রভাব ও চাপ ছিল না। বর্তমান ইসির ওপর আস্থা আছে বলেই ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ ভোট পড়ছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, রাজনৈতিক সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন করা কঠিন তবে সম্ভব। নির্বাচনে সংঘাতপূর্ণ পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা ইসির নেই। এজন্য সবার সহনশীল হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। এক প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, তার আমেরিকার ভিসা বাতিল হয়নি। তবে সন্তানরা আমেরিকায় থাকলেও করোনাভাইরাস সংক্রমণ থাকায় এই মুহূর্তে তিনি সেখানে যাবেন না। প্রসঙ্গত, আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি বর্তমান কমিশনের মেয়াদ শেষ হচ্ছে।

নির্বাচন কমিশনে কর্মরত সাংবাদিকদের সংগঠন রিপোর্টার্স ফোরাম ফর ইলেকশন অ্যান্ড ডেমোক্রেসি-আরএফইডি এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। সংগঠনের সভাপতি চ্যানেল আইয়ের বিশেষ প্রতিনিধি সোমা ইসলামের সভাপতিত্বে এ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন সাধারণ সম্পাদক দৈনিক যুগান্তরের সিনিয়র রিপোর্টার কাজী জেবেল। এতে নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিব অশোক কুমার দেবনাথ ও যুগ্ম-সচিব এসএম আসাদুজ্জামান উপস্থিত ছিলেন।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন মহলে সমালোচনা চলছে। এ বিষয়ে সিইসি বলেন, নির্বাচন কমিশন মোস্ট কমপ্লেক্স ইনস্টিটিউশন। এখানে আহামরি কিছু করে, বাহাবা নিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। করোনার কারণে আমি অনেক কিছু করতে পারিনি। তবে আইনের বাইরে যাইনি। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কারের কোনো উপাদান নাই। যে ব্যবস্থা প্রচলিত আছে তা নির্বাচন পরিচালনার জন্য যথাযথ।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাতে ভোট হয়েছে- এমন প্রশ্নের জবাবে কেএম নূরুল হুদা বলেন, এটা অভিযোগ আকারে থেকে গেল। এই অভিযোগের তদন্ত আদালতের নির্দেশনা ছাড়া হয় না। অভিযোগের ভিত্তিতে কনক্লুসিভ কিছু বলতে পারি না। আমি তো দেখিনি। আপনারাও দেখেননি। আপনারা কী দেখেছেন? আদালতের নির্দেশে তদন্ত হলে হয়তো সত্য বেরিয়ে আসত। সেক্ষেত্রে হয়তো আদালতের নির্দেশে সারা দেশে নির্বাচন বন্ধ হয়ে যেত। রাজনৈতিক দল কেন সেই সুযোগ (আদালতে দ্বারস্থ) নেয়নি, আমি তা বলতে পারব না। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এখন তদন্ত করার সুযোগ নেই। আমাদের কাছে ফলাফল সঙ্গে সঙ্গে আসে না। শত শত কেন্দ্রের ফল একীভূত করে আমাদের কাছে পাঠায়। তখন অনেক সময় চলে যায়। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নির্বাচনের পরপরই তথ্যউপাত্ত নিয়ে অভিযোগ আসলে ব্যবস্থা নেওয়া যায়। কেউ অভিযোগ নিয়ে আসেননি। তিনি বলেন, রিটার্নিং কর্মকর্তা ফলাফল পাঠানোর পর আরপিওর ৩৯(৪) ধারা অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন গেজেট প্রকাশ করে।

নির্বাচন কমিশন গঠন আইন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সিইসি বলেন, আইন সবার পছন্দ হবে-এমন কোনো কথা নেই। কোনোদিনও হতে পারে না। আইনের অধীনে বিধি করার কথা আছে। আরও কিছু অন্তর্র্ভুক্ত, সংযোজন, বিয়োজন করা দরকার থাকলে হয়তো সরকার বিধিতে অন্তর্র্ভুক্ত করবে। ড. শামসুল হুদার খসড়া আইনেও সার্চ কমিটির বিষয় ছিল।

সাবেক সিইসি ও সুজন সম্পাদকের সমালোচনা করে কেএম নূরুল হুদা বলেন, শামসুল হুদা সাহেব সেদিন কিছু ছবক দিলেন। তিনি বললেন, নির্বাচন কমিশনের অনেক কাজ করার কথা ছিল, কিন্তু করেনি। নানা কাজ করে বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসাবে তার এ কথাগুলো আমার কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব সংসদ ভেঙে দেওয়ার পর ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করা। তিনি নির্বাচন করেছিলেন ৬৯০ দিন পরে। এই সাংবিধানিক ব্যত্যয় ঘটানোর অধিকার তাকে কে দিয়েছিল? ওই যে তখন একটা সরকার ছিল, কোনো গণতন্ত্র ছিল না, গণতান্ত্রিক সরকার ছিল না, ছিল একটা ইমার্জেন্সি সরকার। সেই কারণে সেটা করেছেন। সেই পরিবেশ, পরিস্থিতি তো গণতান্ত্রিক সরকারের সময় সম্ভব না। সংবিধান অনুযায়ী আমাদের ঠিকঠিক ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করতে হবে এবং আমরা তা করেছি। সিইসি আরও বলেন, ‘তিনি (ড. হুদা) বদিউল আলম মজুমদারকে নিয়োগ দিয়েছিলেন কিসের ভিত্তিতে? সেখানে কী কোনো বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছিল, কোনো যোগ্যতার ভিত্তিতে দেওয়া হয়েছিল? তাহলে লক্ষ লক্ষ টাকা তাকে কীভাবে দিলেন? সুতরাং ভেবেচিন্তে কথা বলা উচিত। যেখানে কাজ করে গেছেন, একেবারে সবকিছুর ঊর্ধ্বে আদর্শ ব্যক্তি হিসাবে, মডেল ব্যক্তি হিসাবে চলে গেছেন, এটা হতে পারে না।’

বদিউল আলম মজুমদার ইসিতে কাজ না পেয়ে সমালোচনা করছেন জানিয়ে কেএম নূরুল হুদা বলেন, উনার বিরুদ্ধে প্রায় ১ কোটি টাকা আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ আছে। কাজ না করেই টাকা নেওয়ার অভিযোগ আছে। কমিশন সভায় তার বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ আছে। আমি সিইসির দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি আমাকে বারবার টেলিফোন করেন, সাক্ষাৎ করেন। হলফনামা বই আকারে প্রকাশের বিষয়টি আমাকে জানান। আমি তাকে বললাম, এই কাজ (হলনামা বই আকারে প্রকাশ) করা কী দরকার? এটা তো ওয়েবসাইটে আছে। এটা নিয়ে বই করার তো কিছু দেখছিনা। আমি তো মনে করি ঝালমুড়ির ঠোঙা বানানো ছাড়া এটার কোনো কাজ নাই। একপর্যায়ে তিনি আমার উপর রাগ করে চলে গেলেন। এরপর থেকে যখন সুযোগ পান সমালোচনা করেন। নানা কথাবার্তা বলেন।

নির্বাচনে সংঘাত বন্ধ করতে না পারা ইসির ব্যর্থতা কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, নির্বাচনের সংঘাতপূর্ণ পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা কমিশনের নেই। যতক্ষণ পর্যন্ত না প্রার্থী, জনগণ, রাজনৈতিক দল ও নির্বাচন পরিচালনাকারীদের সমর্থকরা সহনশীল আচরণ করেন ততক্ষণ সংঘাত বন্ধ হবে না। রাতে রাতে সংঘাত হয়েছে, নির্বাচনের আগে সংঘাত হয়েছে, নির্বাচনের দিনে সংঘাত হয়েছে, ব্যালট বক্স ছিনতাই করা হয়েছে-এটাই অতৃপ্তি । এগুলো ফৌজদারি বিষয়, মানুষের সহনশীলতার বিষয়। মানুষ সহনশীল না হলে কখনো এই পরিবেশ ঠিক হবে না। এ সংঘাত নতুন না, আগেও ছিল। পরবর্তীতে যারাই কমিশনার হিসাবে আসুক স্থানীয় সরকার পর্যায়ে নির্বাচনে সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। এটা বন্ধ করতে সংশ্লিষ্ট সকলকে সহনশীল আচরণ করতে হবে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রাজনৈতিক কোনো চাপ কখনই কোথাও ছিল না। রাজনৈতিক দলের প্রভাবে প্রভাবিত হইনি। একাধিক সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করেছি। আদালতে গিয়ে তাদের জামিন নিতে হয়েছে। কুমিল্লা ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আমাদের যে অবস্থান ছিল, অন্য সব নির্বাচনেই একই অবস্থান ছিল। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ৭০ থেকে ৭৫ ভাগ ভোট পড়েছে। গ্রামগঞ্জে পোস্টার ছেয়ে গেছে। একটা পোস্টারের ওপর আরেকটি পোস্টার পড়ে না। পোস্টারের কারণে আকাশ দেখা যায় না। এর অর্থ হচ্ছে প্রচুর প্রতিযোগিতা হচ্ছে। এটা ইসির ওপর আস্থার একটি উদাহরণ।

অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদারকে এক হাত নেন সিইসি। তার প্রসঙ্গে কেএম নূরুল হুদা বলেন, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হলে ইসির কী করার আছে। এটা তো প্রার্থীদের সিদ্ধান্ত, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। বিনা ভোটে নির্বাচিত কেনো হলো এটা দেখার কোনো এখতিয়ার ইসির নেই। উনি ব্যক্তিগত এজেন্ডা থেকে এসব কথা বলেন। তিনি একজন রোগাক্রান্ত ব্যক্তি। কখনো আইসিইউ, সিসিইউতে থাকেন। তিনি সিঙ্গাপুরে ট্রিটমেন্ট করেছেন, ভারতে ট্রিটমেন্ট করেছেন। বছরে প্রায় ৩০-৪০ লাখ টাকা চিকিৎসায় ব্যয় করেন, যা ইসি বহন করে। এখন আইসিইউ, সিসিইউ নিজস্ব অসুস্থতা থেকে এসব কথা বলেন কিনা তা জানি না।

জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রসঙ্গে সিইসি

রাতের ভোট কেউ দেখেনি অভিযোগও পড়েনি

 যুগান্তর প্রতিবেদন 
২৮ জানুয়ারি ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
ভোট
মিট দ্য প্রেসে বৃহস্পতিবার বক্তব্য দিচ্ছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নূরুল হুদা -যুগান্তর

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আগের রাতে কেউ ভোট পড়তে দেখেননি বলে দাবি করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কেএম নূরুল হুদা। তিনি বলেন, এটি একটি অভিযোগ হিসাবে আছে। কোনো রাজনৈতিক দল এ অভিযোগ নিয়ে আদালতে যায়নি। আদালতের নির্দেশ না থাকায় নির্বাচন কমিশনও (ইসি) কোনো তদন্ত করেনি। ওই নির্বাচনে অনেক কেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়েছে। এটা অস্বাভাবিক বলে স্বীকার করেন সিইসি। তিনি বলেন, নির্বাচনের গেজেট প্রকাশের পর তা তদন্ত করার এখতিয়ার আইনে নেই। নির্বাচনের পরপরই তথ্যউপাত্ত নিয়ে কেউ ইসির কাছে অভিযোগ করেনি বলেও জানান তিনি। বৃহস্পতিবার ‘আরএফইডি টক উইথ সিইসি’ অনুষ্ঠানে কেএম নূরুল হুদা এসব কথা বলেন। 

অনুষ্ঠানে পাঁচ বছরের কাজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন সিইসি। নির্বাচন কমিশন নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করায় সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার ড. এটিএম শামসুল হুদা এবং সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারের তীব্র সমালোচনাও করেন কেএম নূরুল হুদা। তাদের বিরুদ্ধে সংবিধান লঙ্ঘন ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ আনেন। একইসঙ্গে দাবি করেন, তার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশনের পাঁচ বছর দায়িত্ব পালনে রাজনৈতিক প্রভাব ও চাপ ছিল না। বর্তমান ইসির ওপর আস্থা আছে বলেই ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ ভোট পড়ছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, রাজনৈতিক সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন করা কঠিন তবে সম্ভব। নির্বাচনে সংঘাতপূর্ণ পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা ইসির নেই। এজন্য সবার সহনশীল হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। এক প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, তার আমেরিকার ভিসা বাতিল হয়নি। তবে সন্তানরা আমেরিকায় থাকলেও করোনাভাইরাস সংক্রমণ থাকায় এই মুহূর্তে তিনি সেখানে যাবেন না। প্রসঙ্গত, আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি বর্তমান কমিশনের মেয়াদ শেষ হচ্ছে।

নির্বাচন কমিশনে কর্মরত সাংবাদিকদের সংগঠন রিপোর্টার্স ফোরাম ফর ইলেকশন অ্যান্ড ডেমোক্রেসি-আরএফইডি এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। সংগঠনের সভাপতি চ্যানেল আইয়ের বিশেষ প্রতিনিধি সোমা ইসলামের সভাপতিত্বে এ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন সাধারণ সম্পাদক দৈনিক যুগান্তরের সিনিয়র রিপোর্টার কাজী জেবেল। এতে নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিব অশোক কুমার দেবনাথ ও যুগ্ম-সচিব এসএম আসাদুজ্জামান উপস্থিত ছিলেন। 

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন মহলে সমালোচনা চলছে। এ বিষয়ে সিইসি বলেন, নির্বাচন কমিশন মোস্ট কমপ্লেক্স ইনস্টিটিউশন। এখানে আহামরি কিছু করে, বাহাবা নিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। করোনার কারণে আমি অনেক কিছু করতে পারিনি। তবে আইনের বাইরে যাইনি। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কারের কোনো উপাদান নাই। যে ব্যবস্থা প্রচলিত আছে তা নির্বাচন পরিচালনার জন্য যথাযথ। 

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাতে ভোট হয়েছে- এমন প্রশ্নের জবাবে কেএম নূরুল হুদা বলেন, এটা অভিযোগ আকারে থেকে গেল। এই অভিযোগের তদন্ত আদালতের নির্দেশনা ছাড়া হয় না। অভিযোগের ভিত্তিতে কনক্লুসিভ কিছু বলতে পারি না। আমি তো দেখিনি। আপনারাও দেখেননি। আপনারা কী দেখেছেন? আদালতের নির্দেশে তদন্ত হলে হয়তো সত্য বেরিয়ে আসত। সেক্ষেত্রে হয়তো আদালতের নির্দেশে সারা দেশে নির্বাচন বন্ধ হয়ে যেত। রাজনৈতিক দল কেন সেই সুযোগ (আদালতে দ্বারস্থ) নেয়নি, আমি তা বলতে পারব না। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এখন তদন্ত করার সুযোগ নেই। আমাদের কাছে ফলাফল সঙ্গে সঙ্গে আসে না। শত শত কেন্দ্রের ফল একীভূত করে আমাদের কাছে পাঠায়। তখন অনেক সময় চলে যায়। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নির্বাচনের পরপরই তথ্যউপাত্ত নিয়ে অভিযোগ আসলে ব্যবস্থা নেওয়া যায়। কেউ অভিযোগ নিয়ে আসেননি। তিনি বলেন, রিটার্নিং কর্মকর্তা ফলাফল পাঠানোর পর আরপিওর ৩৯(৪) ধারা অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন গেজেট প্রকাশ করে। 

নির্বাচন কমিশন গঠন আইন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সিইসি বলেন, আইন সবার পছন্দ হবে-এমন কোনো কথা নেই। কোনোদিনও হতে পারে না। আইনের অধীনে বিধি করার কথা আছে। আরও কিছু অন্তর্র্ভুক্ত, সংযোজন, বিয়োজন করা দরকার থাকলে হয়তো সরকার বিধিতে অন্তর্র্ভুক্ত করবে। ড. শামসুল হুদার খসড়া আইনেও সার্চ কমিটির বিষয় ছিল। 

সাবেক সিইসি ও সুজন সম্পাদকের সমালোচনা করে কেএম নূরুল হুদা বলেন, শামসুল হুদা সাহেব সেদিন কিছু ছবক দিলেন। তিনি বললেন, নির্বাচন কমিশনের অনেক কাজ করার কথা ছিল, কিন্তু করেনি। নানা কাজ করে বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসাবে তার এ কথাগুলো আমার কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব সংসদ ভেঙে দেওয়ার পর ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করা। তিনি নির্বাচন করেছিলেন ৬৯০ দিন পরে। এই সাংবিধানিক ব্যত্যয় ঘটানোর অধিকার তাকে কে দিয়েছিল? ওই যে তখন একটা সরকার ছিল, কোনো গণতন্ত্র ছিল না, গণতান্ত্রিক সরকার ছিল না, ছিল একটা ইমার্জেন্সি সরকার। সেই কারণে সেটা করেছেন। সেই পরিবেশ, পরিস্থিতি তো গণতান্ত্রিক সরকারের সময় সম্ভব না। সংবিধান অনুযায়ী আমাদের ঠিকঠিক ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করতে হবে এবং আমরা তা করেছি। সিইসি আরও বলেন, ‘তিনি (ড. হুদা) বদিউল আলম মজুমদারকে নিয়োগ দিয়েছিলেন কিসের ভিত্তিতে? সেখানে কী কোনো বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছিল, কোনো যোগ্যতার ভিত্তিতে দেওয়া হয়েছিল? তাহলে লক্ষ লক্ষ টাকা তাকে কীভাবে দিলেন? সুতরাং ভেবেচিন্তে কথা বলা উচিত। যেখানে কাজ করে গেছেন, একেবারে সবকিছুর  ঊর্ধ্বে আদর্শ ব্যক্তি হিসাবে, মডেল ব্যক্তি হিসাবে চলে গেছেন, এটা হতে পারে না।’ 

বদিউল আলম মজুমদার ইসিতে কাজ না পেয়ে সমালোচনা করছেন জানিয়ে কেএম নূরুল হুদা বলেন, উনার বিরুদ্ধে প্রায় ১ কোটি টাকা আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ আছে। কাজ না করেই টাকা নেওয়ার অভিযোগ আছে। কমিশন সভায় তার বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ আছে। আমি সিইসির দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি আমাকে বারবার টেলিফোন করেন, সাক্ষাৎ করেন। হলফনামা বই আকারে প্রকাশের বিষয়টি আমাকে জানান। আমি তাকে বললাম, এই কাজ (হলনামা বই আকারে প্রকাশ) করা কী দরকার? এটা তো ওয়েবসাইটে আছে। এটা নিয়ে বই করার তো কিছু দেখছিনা। আমি তো মনে করি ঝালমুড়ির ঠোঙা বানানো ছাড়া এটার কোনো কাজ নাই। একপর্যায়ে তিনি আমার উপর রাগ করে চলে গেলেন। এরপর থেকে যখন সুযোগ পান সমালোচনা করেন। নানা কথাবার্তা বলেন।

নির্বাচনে সংঘাত বন্ধ করতে না পারা ইসির ব্যর্থতা কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, নির্বাচনের সংঘাতপূর্ণ পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা কমিশনের নেই। যতক্ষণ পর্যন্ত না প্রার্থী, জনগণ, রাজনৈতিক দল ও নির্বাচন পরিচালনাকারীদের সমর্থকরা সহনশীল আচরণ করেন ততক্ষণ সংঘাত বন্ধ হবে না। রাতে রাতে সংঘাত হয়েছে, নির্বাচনের আগে সংঘাত হয়েছে, নির্বাচনের দিনে সংঘাত হয়েছে, ব্যালট বক্স ছিনতাই করা হয়েছে-এটাই অতৃপ্তি । এগুলো ফৌজদারি বিষয়, মানুষের সহনশীলতার বিষয়। মানুষ সহনশীল না হলে কখনো এই পরিবেশ ঠিক হবে না। এ সংঘাত নতুন না, আগেও ছিল। পরবর্তীতে যারাই কমিশনার হিসাবে আসুক স্থানীয় সরকার পর্যায়ে নির্বাচনে সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। এটা বন্ধ করতে সংশ্লিষ্ট সকলকে সহনশীল আচরণ করতে হবে। 

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রাজনৈতিক কোনো চাপ কখনই কোথাও ছিল না। রাজনৈতিক দলের প্রভাবে প্রভাবিত হইনি। একাধিক সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করেছি। আদালতে গিয়ে তাদের জামিন নিতে হয়েছে। কুমিল্লা ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আমাদের যে অবস্থান ছিল, অন্য সব নির্বাচনেই একই অবস্থান ছিল। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ৭০ থেকে ৭৫ ভাগ ভোট পড়েছে। গ্রামগঞ্জে পোস্টার ছেয়ে গেছে। একটা পোস্টারের ওপর আরেকটি পোস্টার পড়ে না। পোস্টারের কারণে আকাশ দেখা যায় না। এর অর্থ হচ্ছে প্রচুর প্রতিযোগিতা হচ্ছে। এটা ইসির ওপর আস্থার একটি উদাহরণ।

অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদারকে এক হাত নেন সিইসি। তার প্রসঙ্গে কেএম নূরুল হুদা বলেন, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হলে ইসির কী করার আছে। এটা তো প্রার্থীদের সিদ্ধান্ত, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। বিনা ভোটে নির্বাচিত কেনো হলো এটা দেখার কোনো এখতিয়ার ইসির নেই। উনি ব্যক্তিগত এজেন্ডা থেকে এসব কথা বলেন। তিনি একজন রোগাক্রান্ত ব্যক্তি। কখনো আইসিইউ, সিসিইউতে থাকেন। তিনি সিঙ্গাপুরে ট্রিটমেন্ট করেছেন, ভারতে ট্রিটমেন্ট করেছেন। বছরে প্রায় ৩০-৪০ লাখ টাকা চিকিৎসায় ব্যয় করেন, যা ইসি বহন করে। এখন আইসিইউ, সিসিইউ নিজস্ব অসুস্থতা থেকে এসব কথা বলেন কিনা তা জানি না।
 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন