পুলিশ সোর্সদের যত অপকর্ম ১: ফাঁস করে দেয়া হচ্ছে অভিযানের তথ্য

সোর্সমানি হিসেবে নেয়া হয় মাদক * মাসোয়ারা না দিলে মাদক ব্যবসায়ীদের পুলিশে সোপর্দ করা হয় * ঘুরে বেড়ায় পুলিশের হ্যান্ডকাফ নিয়ে * হত্যাসহ বিভিন্ন মামলার আসামিরাই সোর্স * কতিপয় পুলিশ সদস্যের যোগসাজশ

প্রকাশ : ২৯ মে ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  সিরাজুল ইসলাম

প্রতীকি ছবি: সংগৃহীত

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অধীনে আটটি অপরাধ বিভাগের সংশ্লিষ্ট থানাগুলোর সোর্স বা ফর্মারা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এ সোর্সরাই মাদকবিরোধী অভিযানের তথ্য ফাঁস করে দিচ্ছেন। এ কারণে ভেস্তে যাচ্ছে অনেক অভিযান।

সম্প্রতি রাজধানীর জেনেভা ক্যাম্প, কড়াইল বস্তি, কমলাপুর এবং টিটিপাড়া বস্তিসহ কয়েকটি স্থানে হাজার হাজার র‌্যাব-পুলিশের বড় অভিযান পরিচালিত হলেও তেমন কোনো সফলতা পাওয়া যায়নি। অভিযানে বেশকিছু মাদকসেবী ও খুচরা বিক্রেতা গ্রেফতার হলেও বড় মাদক ব্যবসায়ীরা ধরা পড়েননি। আগেই অভিযানের খবর পেয়ে তারা পালিয়ে যান। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো যুগান্তরকে এসব তথ্য জানিয়েছে।

সূত্র জানায়, পুলিশ সোর্সরা শুধু মাদক ব্যবসায়ীদের সহযোগিতাই করে না, অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে নিজেরাই সরাসরি মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তাদের নামে বেশ কয়েকটি করে মাদক, চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, মারামারি, এমনকি হত্যা মামলাও রয়েছে।

ডিএমপির একজন উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তার দেয়া তথ্য অনুযায়ী, মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নিয়মিত মাসোয়ারা আদায় করে সোর্সরা। যেসব মাদক ব্যবসায়ী তাদের টাকা দিতে না চান তাদের পুলিশে সোপর্দ করে সোর্সরা। তাই মাদক ব্যবসায়ীরা কখনও কখনও পুলিশের চেয়ে কথিত সোর্সদের বেশি ভয় পান।

সূত্র আরও জানায়, রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে অসাধু পুলিশ সদস্যদের যোগসাজশে সোর্সরা নানা অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। পুলিশের কাছ থেকে হ্যান্ডকাফ নিয়ে তা দেখিয়ে গ্রেফতারের ভয় দেখিয়ে মানুষের কাছ থেকে আদায় করে অর্থ। হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়ার অভিযোগও উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে। অনেক সময় সোর্সমানি হিসেবে তারা পুলিশের কাছ থেকে ইয়াবাসহ নানা ধরনের মাদক

নিচ্ছে। ওই মাদক তারা বিক্রি করছে মাদকসেবীদের কাছে। তাছাড়া প্রায়ই সোর্সদের ভুয়া তথ্যে অভিযানে গিয়ে পুলিশ সদস্যদের অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতির মুখে পড়তে হচ্ছে।

শনিবার রাতে রাজধানীর শিশুমেলার সামনে থেকে রবিউল ইসলাম সানি নামে সপ্তম শ্রেণী পড়ুয়া এক কিশোরের লাশ উদ্ধার করা হয়। সানির মা আকলিমার অভিযোগ, পল্লবী থানা পুলিশের দুই সোর্স সোহেল ওরফে বিল্লু এবং সায়মন বাসা থেকে ডেকে নিয়ে সানিকে হত্যা করে। পরে বিষয়টিকে সড়ক দুর্ঘটনা বলে চালিয়ে দেয়। ঘটনার পর থেকে পুলিশের ওই দুই সোর্স পলাতক। এ বিষয়ে শেরেবাংলা নগর থানার ওসি জিজি বিশ্বাস যুগান্তরকে বলেন, পুলিশের দুই সোর্সকে গ্রেফতারে চেষ্টা চলছে। বিষয়টি নিয়ে পল্লবী থানা পুলিশের সহযোগিতা চেয়ে চিঠি দেয়া হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজধানীর মিরপুর মডেল থানা পুলিশের সোর্স ফয়সাল, খ্রিস্টান বাবু, রিপন, জসিম, ফিরোজ এবং নাসির সরাসরি মাদক ব্যবসায় জড়িত। এদের মধ্যে ফয়সাল ইয়াবার বড় ডিলার। সে নিজেই টেকনাফ থেকে ইয়াবা আনে। এলাকায় সে কোটিপতি ফয়সাল হিসেবে পরিচিত।

স্থানীয়দের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ভাসানটেক থানা এলাকায় মাদক ডিলার হিসেবে পরিচিত আবুল কাশেম পুলিশের অন্যতম প্রধান সোর্স হিসেবে কাজ করে। স্থানীয় মিনহাজুল আবেদিনকে সঙ্গে নিয়ে এ এলাকার পিআরপি স্কুলের পাশে মাদক স্পট পরিচালনা করেন আবুল কাশেম।

আর আবুল কাশেমকে ম্যানেজ করে মিরপুর-১৪ নম্বর মোড় সংলগ্ন খালের দুই পাশে গড়ে ওঠা বাগানবাড়ি বস্তিতে ইয়াবা ও হেরোইন ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে বাচ্চু ও তার চার সহযোগী। নিউ অরচার্ড স্কুল গলির একটি নির্মাণাধীন অ্যাপার্টমেন্টের ভেতরে ইয়াবা বেচাকেনা হয়।

এ স্পটটির নিয়ন্ত্রণ করে আবুল কাশেম ও তার স্ত্রী শাহিদা বেগম। পুলিশ সোর্সদের টাকা দিয়ে ভাসানটেকের মাদক ব্যবসায়ী কালা বাবুলের ছেলে ইমু, স্ত্রী রান্জু বেগম, কচুক্ষেতের লাইলি বেগম মাদক ব্যবসা অব্যাহত রেখেছেন।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, কাফরুলে শাহীন, তামান্না তামু, বাবু, সুমন, মোশারফ, সালাম, রাজু ও আলমগীর পুলিশের সোর্স পরিচয়ে দাপটের সঙ্গে অপরাধ কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। এদের মধ্যে সালামের নামে অস্ত্র মামলাসহ বেশ কয়েকটি মামলা আছে। শাহআলীতে রকি, গলাকাটা সালাম এবং টিটু সরাসরি মাদক ব্যবসায় জড়িত। রূপনগরে আফজাল এবং মনসুর পুলিশের যোগসাজশে মাদক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।

পল্লবীতে হায়দার, আপন, সোহেল, ফাউল রুবেল, বাবলা, ড্রাইভার হেলাল, অমিন, আরমান, সায়মন, মামুন, ইকবাল, শাহিন গুণ্ডা শাহিন, সেলিম, ইব্রাহিম, বাবু ওরফে ললিতা বাবু, পিচ্চি বাবু, হায়দার, ইয়াবা সুজন, পানটু শামীম, বাচ্চু শামীম, টিটু, সাইফুল, ভিডিও জাহাঙ্গীর, দেলোয়ার, তারেক ও রাজু সোর্স পরিচয়ে মাদক ব্যবসাসহ নানা অপকর্ম চালাচ্ছে। এদের মধ্যে তারেক এবং সাইফুল হেরোইন মামলায় প্রায় ৮ মাস জেল খেটে সম্প্রতি ছাড়া পেয়েছে।

তারেকের নামে মাদক মামলার পাশাপাশি হত্যা মামলাও রয়েছে। ভিডিও জাহাঙ্গীর নিজের বাসাকেই ইয়াবার হাট বানিয়েছে। তার সঙ্গে পুলিশের মিরপুর বিভাগের একজন অতিরিক্ত উপকমিশনারের সুসম্পর্ক রয়েছে। সোর্সদের সঙ্গে পল্লবী থানার এসআই বিল্লাল হোসাইন, মাজেদুল ইসলাম ও এসআই সাইফুল ইসলামের ঘনিষ্ঠতা বেশি বলে এক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে মিরপুরের এক ব্যবসায়ী জানান, এ এলাকায় কিছু সোর্স পুলিশের চেয়েও বেশি দাপট দেখায়। মানুষের সঙ্গে যা ইচ্ছা তা ব্যবহার করে। সোর্সদের ম্যানেজ করে মিরপুর বিহারি পল্লীতে হত্যা মামলার আসামি শহিদ ও তার তিন ভাই মাদক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। পুলিশও এ টাকার ভাগ পায়।

বাপ্পী নামে পল্লবীর এক বাসিন্দা জানান, ১২ নম্বর বৃন্দাবন বস্তির বাসিন্দা তার ভাই বাবুল হোসেন। বস্তির পাশেই রিকশার গ্যারেজ দেখাশোনা করেন। ৭ এপ্রিল বিকালে অন্যদিনের মতোই কাজে ব্যস্ত ছিলেন তিনি। সামান্য দূরে লোকজনের হইচই শুনে কৌতূহলবশত সেখানে যান। দেখতে পান, পুলিশের সোর্স বাবু ৪-৫ জন পুরুষের দেহ তল্লাশি করছেন। এ সময় এসআই বিল্লাল হোসেনের নেতৃত্বে পুলিশের একটি টিম সেখানে ছিল।

পুলিশ সদস্যদের সামনে বাবুলকেও তল্লাশি করা হয়। অযথা তল্লাশি করায় বাবুলের সঙ্গে সোর্স বাবুর কথাকাটাকাটি হয়। পরে বাবুর সহযোগিতায় বাবুলকে জোর করে পুলিশের গাড়িতে তুলে নেয়া হয়।

বাপ্পী জানান, বাবুলকে কেন আটক করা হল জানতে চাইলে বাবুলের স্ত্রীকে পুলিশ জানায়, ওর নামে ওয়ারেন্ট আছে। বাবুলকে থানায় নেয়ার পর সোর্সের মাধ্যমে তার পরিবারের কাছে এক লাখ টাকা দাবি করা হয়। টাকার জন্য বাবুলের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেনদরবার করেন এএসআই সাইফুল ইসলাম। একপর্যায়ে বলা হয়, বাবুলকে ছাড়তে হলে অন্তত ৩০ হাজার টাকা লাগবে। বাবুলের পরিবারের সদস্যরা ওই টাকা জোগাড় করতে পারেননি। তাই আটকের দু’দিন পর ৯ এপ্রিল বাবুলের বিরুদ্ধে মাদক মামলা দেয়া হয়। ওই মামলার ১ নম্বর সাক্ষী করা হয়েছে পুলিশের সেই সোর্স বাবুকে। ‘সাজানো’ মাদক মামলায় এখন জেল খাটছেন বাবুল।

যুগান্তরের মিরপুর প্রতিনিধি জানান, ঢাকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়ে সম্প্রতি বরিশাল থেকে মিরপুরের শাহ আলী মাজার জিয়ারতে যান সান চক্রবর্তী। হঠাৎ তাকে ঘিরে ফেলে রাজধানীর শাহ আলী থানার উপ-পরিদর্শক সাইফুজ্জামানের নেতৃত্বে একটি দল। তার পকেট থেকে বের করা হয় দুই পুরিয়া গাঁজা। এ ঘটনায় হকচকিত সান। কারণ, তার পকেটে কোনো গাঁজা ছিল না। পুলিশ কিভাবে পকেট থেকে গাঁজা বের করল?

এরই মধ্যে সানের পরিবারকে ফোন দিয়ে বিকাশে চাওয়া হয় ২০ হাজার টাকা। দ্রুত টাকা পাঠানোর জন্য বরিশালে সানের পরিবারকে দেয়া হয় একটি বিকাশ নম্বর। রকি নামের এক সোর্স নিজেকে ‘পুলিশের লোক’ পরিচয় দিয়ে সানের পরিবারকে ফোন দিয়ে বিকাশে ২০ হাজার টাকা দিতে বলে। পরে ঢাকায় অবস্থান করা এক আত্মীয় শাহআলী থানায় গিয়ে ছয় হাজার টাকার বিনিময়ে সানকে ছাড়িয়ে নেন।

পুলিশ সোর্সের অপকর্মের বিষয়ে জানাতে চাইলে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারের উপ-কমিশনার (ডিসি) মাসুদুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, পুলিশের কোনো সদস্য অপরাধমূলক কাজে জড়িত হলে তাকে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হয়। এক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেয়া হয় না। বিষয়টি নিয়ে ডিএমপি সদর দফতরের অবস্থান জিরো টলারেন্স। তিনি জানান, নানা ঘটনার প্রেক্ষাপটে পুলিশের সোর্সনির্ভরতা অনেক কমে গেছে। এখনও যারা সোর্স হিসেবে কাজ করে তারা যাতে কোনো ধরনের অপকর্মে জড়াতে না পারে সে বিষয়টি কঠোরভাবে মনিটরিং করা হচ্ছে।