ঢাকা মহানগরের ৪৪ আদালতের চিত্র

পাঁচ বছর ধরে ঝুলছে ২৫ হাজার মাদক মামলা

  হাসিব বিন শহিদ ০২ জুন ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

দায়রা জজ আদালত

নোয়াখালী সদরের গাংচিল গ্রামের বাসিন্দা মো. রাসেল। ১৩ বছর আগে র‌্যাবের অভিযানে রাজধানীর বিমানবন্দর এলাকা থেকে ৯ বোতল ফেনসিডিলসহ তিনি গ্রেফতার হন। র‌্যাব-১ এর তৎকালীন উপসহকারী পরিচালক শহীদ কামাল বাদী হয়ে রাসেলের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে বিমানবন্দর থানায় মামলা করেন।

২১ দিন পরই ২০০৫ সালের ২৯ এপ্রিল আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। আসামির স্থায়ী ঠিকানা যাচাই না করেই অভিযোগপত্র জমা দেয়ার অভিযোগ রয়েছে থানার তৎকালীন এসআই শাহজাহান ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে। মাস-তিনেকের মধ্যে বিচার শুরু হলেও দীর্ঘ ১৩ বছরে ৯ জন সাক্ষীর মধ্যে বাদী শহীদ কামাল ও করপোরাল হাবিবুর রহমান ও নায়েক গাজিউর রহমান সাক্ষ্য দিয়েছেন মাত্র।

বাকিদের মধ্যে সুইপার দিদার, টং দোকানি হারুন, বাস কাউন্টারের সুপারভাইজার আবদুল মান্নান, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের প্রধান রাসায়নিক পরীক্ষক দুলাল কৃষ্ণ সাহা, বিমানবন্দর থানার এসআই বিলাত মেহের ও তদন্ত কর্মকর্তা শাহজাহান ভূঁইয়া আজও সাক্ষ্য দেননি।

সাক্ষ্য না দেয়ায় আদালত তাদের বিরুদ্ধে অজামিনযোগ্য পরোয়ানাও জারি করে। ঢাকার পরিবেশ আদালতে বিচারাধীন ওই মামলায় দফায় দফায় সময় চেয়ে আবেদন করে চলেছে রাষ্ট্রপক্ষ।

২০১০ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বিচারক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, ‘একাধিকবার সাক্ষীদের প্রতি সমন ও পরোয়ানা জারির পরও কোনো ফল আসেনি। অথচ সাক্ষীদের হাজির করা কোনো দুরূহ কাজ ছিল না। বিমানবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেননি। ফলে বিচার নিষ্পত্তিতে বিলম্ব ঘটছে। এটি কোনোভাবেই কাম্য নয়।’

বিচার বিলম্বিত হওয়ায় মামলার একমাত্র আসামি রাসেল জামিন নিয়ে এখন লাপাত্তা।

কেবল এই একটি মামলাই নয়, ঢাকা মহানগরের ৪৪টি আদালতে বিচারের জন্য অপেক্ষমাণ প্রায় ৫০ হাজার মামলা। এর মধ্যে সাক্ষীর অভাবে ২৫ হাজার মাদকের মামলার বিচার ৫ বছরের বেশি সময় ধরে ঝুলছে।

সূত্র বলছে, ১৯৯৯ সাল থেকে পহেলা জানুয়ারি পর্যন্ত মহানগর আদালতগুলোয় বিচারাধীন ৮০ হাজার ৬৬০টি ফৌজদারি মামলার মধ্যে ৪৮ হাজার ১৯৬টি মামলাই মাদকের। ৫-১০ বছরের মধ্যে বিচারাধীন মাদকের মামলার সংখ্যা ১৫ হাজার ৮১৩টি। ১০ বছর কিংবা তার বিশি সময় আদালতে ঝুলছে এমন মামলার সংখ্যা ৯ হাজার ৪৩২টি।

এমনকি এক বছরে (২০১৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০১৮ সালের ১ জানুয়ারি) বিচারের জন্য আসা মোট ফৌজদারি মামলার ৮১ শতাংশই মাদকের। এক বছরে ৮ হাজার ১৮১টি ফৌজদারি মামলার মধ্যে মাদকের মামলা ৬ হাজার ৬৮০টি।

বিচারাধীন মাদকের মামলাগুলোর মধ্যে ২৪ বছরের পুরনো মামলাও রয়েছে! সাক্ষী হাজির করতে না পারায় এ বিলম্ব। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সাক্ষী খুঁজে পাওয়া যায় না এবং অনেক সময় আদালতকে জানানোও হয় না।

ফৌজদারি আইনের ১৭১(২) উপধারায় বলা আছে, সাক্ষী হাজির করা পুলিশের কাজ। সাক্ষীদের আদালতে হাজির না করার পেছনে আসামিদের ভূমিকা থাকার অভিযোগও রয়েছে। বিচার প্রলম্বিত হলে এর সুবিধা পায় আসামি পক্ষই।

কথা হয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের মহাপরিচালক মো. জামাল উদ্দীন আহমেদের সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, অধিদফতর গত বছর মাদক আইনে মামলা করেছে ১১ হাজার ৬১২টি। মার্চ পর্যন্ত মামলা হয়েছে ৩ হাজার ২৮৯টি। এর মধ্যে ২ হাজার ৫৪৪টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ১৬ মামলায় আসামিদের সাজাও হয়েছে।

এছাড়া পুলিশ, র‌্যাবসহ অন্যসব সংস্থা মিলে মাদক আইনে মামলা করেছে ১ লাখ ৬ হাজার ৫৪৬টি। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মাদকবিরোধী আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হলেও কিছু ত্রুটি রয়ে গেছে। যাদের মাদকের গডফাদার বলা হয়, তাদের আইনে সোপর্দের ব্যবস্থা বর্তমান আইনে নেই।

বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক যুগান্তরকে বলেন, মূলত সরকারি কৌঁসুলি ও পুলিশের ব্যর্থতায় মামলা নিষ্পত্তি হচ্ছে না। পৃথিবীর সব দেশে মামলা পরিচালনাকারী আইনজীবীরা ক্যাডারভুক্ত হন। আমাদের দেশে ল’ ক্যাডার সার্ভিস আজও চালু হয়নি। এটা হলে একদিকে যেমন জবাবদিহিতা থাকে, অপরদিকে দক্ষতা-যোগ্যতাও থাকে।

আমাদের দেশে পাবলিক প্রসিকিউটর নিয়োগ হয় রাজনৈতিক ও সাময়িকভাবে। সরকার বদল হলে তারাও বদলায়। ফলে পেশাগত দক্ষতা-যোগ্যতার দিকে তারা মনোযোগী নন। সামগ্রিক সিস্টেমে পরিবর্তন আনতে হবে। আদালতে সাক্ষী হাজির ও জব্দ বস্তু প্রদর্শন করাও পুলিশের দায়িত্ব। ভাসমানদের সাক্ষী করায় তাদের অনেক সময় খুঁজেও পায় না পুলিশ।

২০টি মাদক মামলার নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ওইসব মামলায় সাক্ষী হিসেবে ৪০ জন পুলিশ সদস্য ও অর্ধশতাধিক জব্দ তালিকার সাক্ষীকে খুঁজে না পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। চার্জশিটে উল্লিখিত সাক্ষীদের স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানায় প্রথমে সমন পাঠানো হয়েছে এবং পরে তাদের বিরুদ্ধে অজামিনযোগ্য পরোয়ানাও জারি করা হয়েছে।

সবমিলিয়ে ওইসব মামলার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত বলে শঙ্কা সংশ্লিষ্টদের। এসব দুর্বলতার ফলে আসামিদের একটি অংশ জামিনে বের হয়ে পুরনো অপরাধে জড়াচ্ছেন। আরেকটি অংশ বিনা বিচারে বছরের পর বছর জেলে থাকছে।

ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি কাজী নজিবুল্লাহ হিরু যুগান্তরকে বলেন, সাধারণত মাদক মামলায় পুলিশ চার্জশিটে ভাসমান লোকদের সাক্ষী করে। ফলে তাদের খুঁজে পাওয়া যায় না। অনেকে আছেন যারা পরে সাক্ষ্য দিতে চান না। পুলিশের খামখেয়ালিও আছে।

থানা পুলিশ সমনে আগ্রহী না হয়ে ওয়ারেন্ট নিয়ে বেশি ব্যস্ত থাকেন। ‘ম্যানেজ’ করে সাক্ষীদের অনুপস্থিতি নিশ্চিত করার অভিযোগও আছে। তিনি বলেন, মামলা ঝুলে থাকায় সব দায় পুলিশের নয়। একটি নির্দিষ্ট সময় পর সাক্ষী না এলে মামলা নিষ্পত্তির ক্ষমতা বিচারককে দেয়া আছে।

কথা হয় ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি আবদুল্লাহ আবুর সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, অনেক সময় সাক্ষীরা প্রভাবিত হয়ে আদালতে উল্টো সাক্ষী দেন। মাদক মামলায় জব্দ তালিকার সাক্ষী খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তাদের হাজির করতে পারছে না পুলিশ। নাম-ঠিকানা, ফোন নম্বর দেয়া থাকলেও অনেক সময় তাদের খুঁজে পাওয়া যায় না। এর সুবিধা নেয় আসামিপক্ষ।

সাক্ষী হাজিরের দায়িত্ব পুলিশের। আর মামলার চার্জশিট দেয়ও পুলিশ। তারাই নাম-ঠিকানা যাচাই-বাছাই করে চার্জশিটে সাক্ষীদের নাম অন্তর্ভুক্ত করেন। আবার সাক্ষী হাজিরের সময় হলে পুলিশই তাদের দেয়া ঠিকানায় সাক্ষী খুঁজে পান না। সবক্ষেত্রে এটি মেনে নেয়া যায় না।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দফতরের এআইজি সহেলী ফেরদৌস যুগান্তরকে বলেন, সাধারণ বিচারে প্রচুর সময় লেগে যায়। যখন কোনো তদন্ত কর্মকর্তাকে সাক্ষীর জন্য তলব করা হয়, তখন দেখা যায়, তার দুই থেকে তিনবার দফতর বদল হয়েছে। তখন পুরনো ঠিকানায় না পেয়ে নতুন ঠিকানায় যায়।

ফলে আদালতের ধার্য দিন পার হয়ে যায়। কখনও কখনও তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্য নিশ্চিত হয় না। তবে অনেক সময় আদালত থেকে সঠিক সময়ে ওই সমনগুলো থানায় আসে না। তবে সাক্ষীদের ইমেইল বা ফোনে সময় পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করলে সাক্ষীদের হাজিরা নিশ্চিত করা যায়।

২৪ বছরের পুরনো মামলা : ঢাকা মহানগরের একটি আদালতে মাদক আইনে ২৪ বছরের পুরনো একটি মামলা এখনও বিচারাধীন। ১৯৯৪ সালের ১৯ এপ্রিল গোপন সংবাদের ভিত্তিতে রাজধানীর ইসলামপুর এলাকায় ক্রশউন হোটেলে অভিযান চালায় সিআইডি পুলিশ।

অভিযানে মেহেদী হাসান ও মো. ইউসুফের কাছ থেকে ৫০০ গ্রাম হেরোইন উদ্ধার করা হয়। পরে সিআইডির পরিদর্শক শেখ আলী হায়দার বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন। যার নম্বর-৩০(০৪)৯৪। ৮ বছর পর ২০০২ সালের ১৯ আগস্ট দুই আসামির বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করেন আদালত।

তারপর ১৬ বছর গত হয়েছে, কিন্তু সাক্ষী হাজির করা যায়নি। ১১ জন সাক্ষীর মধ্যে মাত্র ৩ জন সাক্ষ্য দিয়েছে। অবশিষ্ট সাক্ষীদের মধ্যে তৎকালীন ডিএমপির সিআইডির পুলিশ পরিদর্শক পরিতোষ বণিক, কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রাম থানার তুলা পুষ্করিণী গ্রামের মো. শাহজাহান ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার কসবা থানার শ্যামবাড়ী গ্রামের মো. ইউনুস চৌধুরী রয়েছে। বাকি ৬, ৭, ৮ ও ৯ নম্বর সাক্ষীর নাম-ঠিকানা চার্জশিটেই স্পষ্ট নয়। সর্বশেষ গত ২০ মার্চ এ মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য দিন ধার্য ছিল ঢাকার চতুর্থ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে।

ঘটনাপ্রবাহ : মাদকবিরোধী অভিযান ২০১৮

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter