সিলেটে ক্ষত রেখে নামছে পানি, চরম দুর্ভোগ
jugantor
সিলেটে ক্ষত রেখে নামছে পানি, চরম দুর্ভোগ
বাড়িঘর, সড়ক, বাঁধ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ব্যাপক ক্ষতি * নেত্রকোনায় পানিবৃদ্ধি অব্যাহত, দিশেহারা কৃষক

  যুগান্তর ডেস্ক  

২৩ মে ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দুর্ভোগ

বন্যায় অনেকটা বিরান সিলেটের নিম্নাঞ্চল। টানা ১১ দিন ধরে পানিবন্দি ১৩ উপজেলার প্রায় ১২ লাখ মানুষ। রোববার থেকে বন্যার পানি কমতে শুরু করেছে; কিন্তু রেখে যাচ্ছে দগদগে ক্ষত। দেড় সপ্তাহে বন্যার তাণ্ডবে ধসে গেছে বহু বাড়িঘর, সড়ক-সেতু। ভেসে গেছে গবাদি পশু, পুকুরের মাছ, খেতের ফসল। বিভিন্ন বাঁধের অন্তত ৩৫টি স্থানে ভেঙে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এক হাজারের বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এখনও বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে গৃহহীন ১০ হাজারের বেশি পরিবার। পর্যাপ্ত ত্রাণের অভাবে বন্যার্তদের মাঝে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। সিলেটের জকিগঞ্জে ভাঙা বাঁধ দিয়ে এখনও লোকালয়ে পানি ঢুকছে। সুনামগঞ্জের উজানে থাকা উপজেলাগুলোয় বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও ভাটিতে বাড়ছে পানি। নেত্রকোনায় পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় ধান ও অন্যান্য ফসল নিয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষক।

এদিকে ভারতের পূর্বাঞ্চলে বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের পানির একটি অংশ নেমে আসছে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা হয়ে। এতে দেশের উত্তরের জেলা নীলফামারী, কুড়িগ্রাম ও সিরাজগঞ্জে বন্যার পদধ্বনি শুনতে পাওয়া যাচ্ছে। ইতোমধ্যে এসব এলাকার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এখন উজানে আরও বৃষ্টি হলে বন্যা কবলিত হতে পারে উত্তরাঞ্চল। যদিও এখন পর্যন্ত বিপৎসীমার নিচে প্রবাহিত হচ্ছে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা এবং এর শাখা নদীগুলো।

বন্যা পূর্বাভাস সতর্কীকরণ কেন্দ্রের (এফএফডব্লিউসি) প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে-সুরমা, কুশিয়ারা, পুরাতন সুরমা ও সোমেশ্বরী ছয়টি পয়েন্টে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এগুলোর মধ্যে শুধু সোমেশ্বরীর পানি নেত্রকোনার কলমাকান্দায় ১৯ সেন্টিমিটার বেড়েছে। সেখানে বিপৎসীমার ২৩ সেন্টিমিটার ওপরে আছে নদীটি। সুরমা নদী কানাইঘাটে বিপৎসীমার ৮৪ সেন্টিমিটার আর সিলেটে ১২ সেন্টিমিটার ওপরে আছে। কুশিয়ারা অমলশীদে ১৩১ ও শেওলায় ৪৭ সেন্টিমিটার ওপরে আছে। সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে পুরাতন সুরমা ৭ সেন্টিমিটার আর সোমেশ্বরী নেত্রকোনার কলমাকান্দায় ২৩ সেন্টিমিটার ওপরে আছে।

এফএফডব্লিউসি জানায়, আবহাওয়া সংস্থাগুলোর গাণিতিক মডেলভিত্তিক পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামী ২৪ ঘণ্টায় দেশের উত্তরাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং তৎসংলগ্ন ভারতের আসাম, মেঘালয়, হিমালয় পাদদেশীয় পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরা প্রদেশের কিছু স্থানে মাঝারি থেকে ভারি বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা আছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর (বিএমডি) জানায়, ঢাকাসহ প্রায় সারা দেশেই কালবৈশাখী দাপট চলছে। সঙ্গে আছে ঝড়ো হাওয়া। রাজশাহী আর খুলনা বাদে প্রায় সব বিভাগই গত ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টি পেয়েছে। কোথাও ছিল মাঝারি ধরনের ভারি বৃষ্টি। কোথাও ভারি বৃষ্টিও হয়েছে। আরেক বিজ্ঞপ্তিতে সংস্থাটি দেশের ১২টি জেলার নদীবন্দরে ১ নম্বর সতর্ক সংকেত জারি করেছে। জেলাগুলো হলো-ঢাকা, ময়মনসিংহ, ফরিদপুর, মাদারীপুর, খুলনা, বরিশাল, পটুয়াখালী, নোয়াখালী, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজার। এসব অঞ্চলের উপর দিয়ে পশ্চিম বা উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে ৪৫-৬০ কিলোমিটার বেগে অস্থায়ীভাবে দমকা বা ঝড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টি বা বজ সহ বৃষ্টি হতে পারে।

ব্যুরো ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-

সিলেট : জেলার মোট ১০৭২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্যা কবলিত। জেলা মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অফিস সূত্র জানায়, সিলেটের ১৩টি উপজেলার মধ্যে ৫১৪টি উচ্চ বিদ্যালয় বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে। এরমধ্যে ৮০টি বিদ্যালয়ে আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। বন্যার পানিতে ডুবে আছে ২৩৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। পাঠদান বন্ধ আরও ১৯৭টিতে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কোম্পানীগঞ্জ ও জকিগঞ্জ উপজেলা। কোম্পানীগঞ্জের ১৯ প্রতিষ্ঠানে এবং জকিগঞ্জে ১১টিতে আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। জেলা শিক্ষা অফিসার আবু সাইদ মো. আব্দুল ওয়াদুদ যুগান্তরকে জানান, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বিদ্যালয়গুলোতে প্রাথমিকভাবে প্রায় আড়াই কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। পানি পুরোপুরি নেমে গেলে প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা যাবে।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্র জানায়, রোববার পর্যন্ত ৫৫৮টি প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে। এরমধ্যে কানাইঘাট উপজেলায় ১৬৩টি, জকিগঞ্জে ১৩৫টি ও গোয়াইনঘাটে ৮৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয় পানিতে নিমজ্জিত।

সিলেটের শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী নজরুল হাকিম জানান, সিলেটের ৭ শতাধিক স্কুলে পাঠদান বন্ধ রয়েছে। সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. মজিবুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, সিলেটের প্রায় ১২ লাখ মানুষ বন্যা কবলিত হয়েছেন। এরমধ্যে আশ্রয়কেন্দ্রে আছে ১০ হাজারের বেশি পরিবার।

জেলা প্রশাসন যুগান্তরকে জানায়, ১৩টি উপজেলার মধ্যে ১২টি উপজেলার ৮৬টি ইউনিয়ন সম্পূর্ণ প্লাবিত হয়েছে। আউশ ১ হাজার ৪২১ হেক্টর ও বোরো ফসলের ১ হাজার ৭০০ হেক্টর বীজতলা নষ্ট হয়েছে। গ্রীষ্মকালীন সবজির ১ হাজার ৩৩৪ হেক্টর জমি পানিতে ডুবে গেছে। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ জানান, বন্যার পানিতে ৮ হাজার ৩২২টি মৎস্য খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এলজিইডি সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ইনামুল কবীর জানান, বন্যায় ১১১টি সড়কের ২৬৭ কিলোমিটার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সদর উপজেলা ও কোম্পানীগঞ্জে ২টি কালভার্ট ভেঙেছে। সড়ক থেকে পুরোপুরি পানি না নামায় ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ নির্ধারণ করা যায়নি।

সড়ক ও জনপথ বিভাগ সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, সিলেটের ১০টি প্রধান সড়কের ৭২ কিলোমিটার প্লাবিত হয়েছে। এরমধ্যে ৫টি সড়কে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ আছে।

সিলেটের সিভিল সার্জন ডা. শাহারিয়ার হোসেন জানান, ৪৪টি কমিউনিটি ক্লিনিক এখনও পানির নিচে। উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রেও পানি। ফলে চিকিৎসা সেবা ব্যাহত হচ্ছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সিলেটের প্রধান প্রকৌশলী এসএম শহীদুল ইসলাম জানান, জেলার বিভিন্ন বাঁধের অন্তত ৩৫ স্থানে ভেঙে লোকালয়ে পানি ঢুকেছে।

এদিকে সিলেটের জকিগঞ্জের অমলসীদে বরাক, সুরমা, কুশিয়ারার ত্রিমোহনার পাশের ডাইকের ভাঙন রোববার আরও বেড়েছে। ভাঙা অংশ দিয়ে লোকালয়ে পানি ঢুকছে।

সুনামগঞ্জ : দুদিন ধরে বৃষ্টিপাত ও উজানের ঢল কম থাকায় সুনামগঞ্জে বন্য কবলিত উপজেলাগুলো থেকে পানি কমতে শুরু করেছে। জেলার প্রধান নদী সুরমায় সবচেয়ে দ্রুত পানি কমছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সুরমায় পানি কমেছে ১৮ সেন্টিমিটার। তবে হাওড়ের দিকে পানি কমছে ধীরগতিতে। অপরদিকে সুনামগঞ্জের ভাটির উপজেলা দিরাই, শাল্লা, জগন্নাথপুর ও জামালগঞ্জের নদ-নদীতে পানি বৃদ্ধির খবর পাওয়া যাচ্ছে। দিরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদুর রহমান বলেন, উজানে পানি কমায় দিরাই উপজেলায় পানির চাপ বেড়েছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে দু-এক দিনের মধ্যে দিরাই বন্যাকবলিত হতে পারে। শাল্লা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আবু তালেব বলেন, এই উপজেলায় ২৪ ঘণ্টায় অন্তত তিন ফুট পানি বেড়েছে। ছাতকের ইউএনও মামুনুর রহমান বলেন, উপজেলায় ১০টি আশ্রয়কেন্দ্রে ১৩০টি পরিবার আছে। পানি কমায় ছাতক-সিলেট সড়কে যান চলাচল শুরু হয়েছে। একইভাবে দোয়ারাবাজার উপজেলায় ৭টি আশ্রয়কেন্দ্রে আছে ৬০টি পরিবার।

দোয়ারাবাজার উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান দেওয়ান আল তানভির আশরাফী চৌধুরী বাবু বলেন, দোয়ারাবাজারে পানি কমছে, তবে সেটা খুবই ধীরে। যে কারণে মানুষের ভোগান্তি হচ্ছে বেশি।

নেত্রকোনা, দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা : কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে ঘরে তোলা ভেজা ধান নিয়ে বিপাকে পড়েছেন দুর্গাপুর উপজেলার কৃষক। উপজেলার গাঁওকান্দিয়া গ্রামের কৃষক মাওলানা মনজুরুল হক বলেন, ‘কয়েক দিন ধরে টানা বৃষ্টিতে ধান শুকাতে পারছি না, সারা দিনই বৃষ্টি হচ্ছে, আমার প্রায় একশ মণ ধান নষ্ট হতে চলছে, অনেক ধান পচে যাওয়ায় এখন তা গোখাদ্যে পরিণত হয়েছে। কলমাকান্দা উপজেলায় উব্দাখালী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নদনদীর পানি হাওড়ে প্রবেশ করায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন বাসিন্দারা। শ্রমিক সংকটের কারণে উপজেলার শতকরা প্রায় ৩০ ভাগ বোরো ধান কৃষক ঘরে তুলতে পারেননি।

ভাঙ্গুড়া (পাবনা) : আধা পাকা অবস্থায় রয়েছে খেতের ধান। এই অবস্থায় ধান গোলায় তুললে এক-চতুর্থাংশ কম হবে ফলন। তবু ধান কেটে বাড়ি নিয়ে যাচ্ছে পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলার কৃষকেরা। বৃষ্টিতে হঠাৎ নিচু জমিতে পানি ওঠায় কৃষকরা ধান কাটা শুরু করেছেন। দেশের বিভিন্ন জায়গায় বন্যার ভয়াবহতা দেখে আতঙ্কিত তারা।

ধোবাউড়া (ময়মনসিংহ) : বতিহালা গ্রামের কৃষক আলাউদ্দিন বলেন, ধান কেটে ঘরে এনে খুবই বিপদে আছি। বৃষ্টির কারণে ঘরের ধান নষ্ট হচ্ছে, খড় পচে যাচ্ছে। ধোবাউড়া গ্রামের কৃষক সাদ্দাম হোসেন বলেন, ধান কেটে উঠানে রেখে দিয়েছি, রোদ না থাকায় ধান পচে যাচ্ছে।

সিলেটে ক্ষত রেখে নামছে পানি, চরম দুর্ভোগ

বাড়িঘর, সড়ক, বাঁধ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ব্যাপক ক্ষতি * নেত্রকোনায় পানিবৃদ্ধি অব্যাহত, দিশেহারা কৃষক
 যুগান্তর ডেস্ক 
২৩ মে ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
দুর্ভোগ
জকিগঞ্জের আমলশীদে তিন নদীর মোহনায় বেড়িবাঁধ ভেঙে ঢুকছে পানি। রোববারের ছবি -যুগান্তর

বন্যায় অনেকটা বিরান সিলেটের নিম্নাঞ্চল। টানা ১১ দিন ধরে পানিবন্দি ১৩ উপজেলার প্রায় ১২ লাখ মানুষ। রোববার থেকে বন্যার পানি কমতে শুরু করেছে; কিন্তু রেখে যাচ্ছে দগদগে ক্ষত। দেড় সপ্তাহে বন্যার তাণ্ডবে ধসে গেছে বহু বাড়িঘর, সড়ক-সেতু। ভেসে গেছে গবাদি পশু, পুকুরের মাছ, খেতের ফসল। বিভিন্ন বাঁধের অন্তত ৩৫টি স্থানে ভেঙে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এক হাজারের বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এখনও বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে গৃহহীন ১০ হাজারের বেশি পরিবার। পর্যাপ্ত ত্রাণের অভাবে বন্যার্তদের মাঝে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। সিলেটের জকিগঞ্জে ভাঙা বাঁধ দিয়ে এখনও লোকালয়ে পানি ঢুকছে। সুনামগঞ্জের উজানে থাকা উপজেলাগুলোয় বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও ভাটিতে বাড়ছে পানি। নেত্রকোনায় পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় ধান ও অন্যান্য ফসল নিয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষক।

এদিকে ভারতের পূর্বাঞ্চলে বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের পানির একটি অংশ নেমে আসছে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা হয়ে। এতে দেশের উত্তরের জেলা নীলফামারী, কুড়িগ্রাম ও সিরাজগঞ্জে বন্যার পদধ্বনি শুনতে পাওয়া যাচ্ছে। ইতোমধ্যে এসব এলাকার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এখন উজানে আরও বৃষ্টি হলে বন্যা কবলিত হতে পারে উত্তরাঞ্চল। যদিও এখন পর্যন্ত বিপৎসীমার নিচে প্রবাহিত হচ্ছে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা এবং এর শাখা নদীগুলো।

বন্যা পূর্বাভাস সতর্কীকরণ কেন্দ্রের (এফএফডব্লিউসি) প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে-সুরমা, কুশিয়ারা, পুরাতন সুরমা ও সোমেশ্বরী ছয়টি পয়েন্টে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এগুলোর মধ্যে শুধু সোমেশ্বরীর পানি নেত্রকোনার কলমাকান্দায় ১৯ সেন্টিমিটার বেড়েছে। সেখানে বিপৎসীমার ২৩ সেন্টিমিটার ওপরে আছে নদীটি। সুরমা নদী কানাইঘাটে বিপৎসীমার ৮৪ সেন্টিমিটার আর সিলেটে ১২ সেন্টিমিটার ওপরে আছে। কুশিয়ারা অমলশীদে ১৩১ ও শেওলায় ৪৭ সেন্টিমিটার ওপরে আছে। সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে পুরাতন সুরমা ৭ সেন্টিমিটার আর সোমেশ্বরী নেত্রকোনার কলমাকান্দায় ২৩ সেন্টিমিটার ওপরে আছে।

এফএফডব্লিউসি জানায়, আবহাওয়া সংস্থাগুলোর গাণিতিক মডেলভিত্তিক পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামী ২৪ ঘণ্টায় দেশের উত্তরাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং তৎসংলগ্ন ভারতের আসাম, মেঘালয়, হিমালয় পাদদেশীয় পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরা প্রদেশের কিছু স্থানে মাঝারি থেকে ভারি বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা আছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর (বিএমডি) জানায়, ঢাকাসহ প্রায় সারা দেশেই কালবৈশাখী দাপট চলছে। সঙ্গে আছে ঝড়ো হাওয়া। রাজশাহী আর খুলনা বাদে প্রায় সব বিভাগই গত ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টি পেয়েছে। কোথাও ছিল মাঝারি ধরনের ভারি বৃষ্টি। কোথাও ভারি বৃষ্টিও হয়েছে। আরেক বিজ্ঞপ্তিতে সংস্থাটি দেশের ১২টি জেলার নদীবন্দরে ১ নম্বর সতর্ক সংকেত জারি করেছে। জেলাগুলো হলো-ঢাকা, ময়মনসিংহ, ফরিদপুর, মাদারীপুর, খুলনা, বরিশাল, পটুয়াখালী, নোয়াখালী, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজার। এসব অঞ্চলের উপর দিয়ে পশ্চিম বা উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে ৪৫-৬০ কিলোমিটার বেগে অস্থায়ীভাবে দমকা বা ঝড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টি বা বজ সহ বৃষ্টি হতে পারে।

ব্যুরো ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-

সিলেট : জেলার মোট ১০৭২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্যা কবলিত। জেলা মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অফিস সূত্র জানায়, সিলেটের ১৩টি উপজেলার মধ্যে ৫১৪টি উচ্চ বিদ্যালয় বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে। এরমধ্যে ৮০টি বিদ্যালয়ে আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। বন্যার পানিতে ডুবে আছে ২৩৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। পাঠদান বন্ধ আরও ১৯৭টিতে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কোম্পানীগঞ্জ ও জকিগঞ্জ উপজেলা। কোম্পানীগঞ্জের ১৯ প্রতিষ্ঠানে এবং জকিগঞ্জে ১১টিতে আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। জেলা শিক্ষা অফিসার আবু সাইদ মো. আব্দুল ওয়াদুদ যুগান্তরকে জানান, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বিদ্যালয়গুলোতে প্রাথমিকভাবে প্রায় আড়াই কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। পানি পুরোপুরি নেমে গেলে প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা যাবে।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্র জানায়, রোববার পর্যন্ত ৫৫৮টি প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে। এরমধ্যে কানাইঘাট উপজেলায় ১৬৩টি, জকিগঞ্জে ১৩৫টি ও গোয়াইনঘাটে ৮৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয় পানিতে নিমজ্জিত।

সিলেটের শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী নজরুল হাকিম জানান, সিলেটের ৭ শতাধিক স্কুলে পাঠদান বন্ধ রয়েছে। সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. মজিবুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, সিলেটের প্রায় ১২ লাখ মানুষ বন্যা কবলিত হয়েছেন। এরমধ্যে আশ্রয়কেন্দ্রে আছে ১০ হাজারের বেশি পরিবার।

জেলা প্রশাসন যুগান্তরকে জানায়, ১৩টি উপজেলার মধ্যে ১২টি উপজেলার ৮৬টি ইউনিয়ন সম্পূর্ণ প্লাবিত হয়েছে। আউশ ১ হাজার ৪২১ হেক্টর ও বোরো ফসলের ১ হাজার ৭০০ হেক্টর বীজতলা নষ্ট হয়েছে। গ্রীষ্মকালীন সবজির ১ হাজার ৩৩৪ হেক্টর জমি পানিতে ডুবে গেছে। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ জানান, বন্যার পানিতে ৮ হাজার ৩২২টি মৎস্য খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এলজিইডি সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ইনামুল কবীর জানান, বন্যায় ১১১টি সড়কের ২৬৭ কিলোমিটার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সদর উপজেলা ও কোম্পানীগঞ্জে ২টি কালভার্ট ভেঙেছে। সড়ক থেকে পুরোপুরি পানি না নামায় ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ নির্ধারণ করা যায়নি।

সড়ক ও জনপথ বিভাগ সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, সিলেটের ১০টি প্রধান সড়কের ৭২ কিলোমিটার প্লাবিত হয়েছে। এরমধ্যে ৫টি সড়কে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ আছে।

সিলেটের সিভিল সার্জন ডা. শাহারিয়ার হোসেন জানান, ৪৪টি কমিউনিটি ক্লিনিক এখনও পানির নিচে। উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রেও পানি। ফলে চিকিৎসা সেবা ব্যাহত হচ্ছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সিলেটের প্রধান প্রকৌশলী এসএম শহীদুল ইসলাম জানান, জেলার বিভিন্ন বাঁধের অন্তত ৩৫ স্থানে ভেঙে লোকালয়ে পানি ঢুকেছে।

এদিকে সিলেটের জকিগঞ্জের অমলসীদে বরাক, সুরমা, কুশিয়ারার ত্রিমোহনার পাশের ডাইকের ভাঙন রোববার আরও বেড়েছে। ভাঙা অংশ দিয়ে লোকালয়ে পানি ঢুকছে।

সুনামগঞ্জ : দুদিন ধরে বৃষ্টিপাত ও উজানের ঢল কম থাকায় সুনামগঞ্জে বন্য কবলিত উপজেলাগুলো থেকে পানি কমতে শুরু করেছে। জেলার প্রধান নদী সুরমায় সবচেয়ে দ্রুত পানি কমছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সুরমায় পানি কমেছে ১৮ সেন্টিমিটার। তবে হাওড়ের দিকে পানি কমছে ধীরগতিতে। অপরদিকে সুনামগঞ্জের ভাটির উপজেলা দিরাই, শাল্লা, জগন্নাথপুর ও জামালগঞ্জের নদ-নদীতে পানি বৃদ্ধির খবর পাওয়া যাচ্ছে। দিরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদুর রহমান বলেন, উজানে পানি কমায় দিরাই উপজেলায় পানির চাপ বেড়েছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে দু-এক দিনের মধ্যে দিরাই বন্যাকবলিত হতে পারে। শাল্লা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আবু তালেব বলেন, এই উপজেলায় ২৪ ঘণ্টায় অন্তত তিন ফুট পানি বেড়েছে। ছাতকের ইউএনও মামুনুর রহমান বলেন, উপজেলায় ১০টি আশ্রয়কেন্দ্রে ১৩০টি পরিবার আছে। পানি কমায় ছাতক-সিলেট সড়কে যান চলাচল শুরু হয়েছে। একইভাবে দোয়ারাবাজার উপজেলায় ৭টি আশ্রয়কেন্দ্রে আছে ৬০টি পরিবার।

দোয়ারাবাজার উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান দেওয়ান আল তানভির আশরাফী চৌধুরী বাবু বলেন, দোয়ারাবাজারে পানি কমছে, তবে সেটা খুবই ধীরে। যে কারণে মানুষের ভোগান্তি হচ্ছে বেশি।

নেত্রকোনা, দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা : কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে ঘরে তোলা ভেজা ধান নিয়ে বিপাকে পড়েছেন দুর্গাপুর উপজেলার কৃষক। উপজেলার গাঁওকান্দিয়া গ্রামের কৃষক মাওলানা মনজুরুল হক বলেন, ‘কয়েক দিন ধরে টানা বৃষ্টিতে ধান শুকাতে পারছি না, সারা দিনই বৃষ্টি হচ্ছে, আমার প্রায় একশ মণ ধান নষ্ট হতে চলছে, অনেক ধান পচে যাওয়ায় এখন তা গোখাদ্যে পরিণত হয়েছে। কলমাকান্দা উপজেলায় উব্দাখালী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নদনদীর পানি হাওড়ে প্রবেশ করায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন বাসিন্দারা। শ্রমিক সংকটের কারণে উপজেলার শতকরা প্রায় ৩০ ভাগ বোরো ধান কৃষক ঘরে তুলতে পারেননি।

ভাঙ্গুড়া (পাবনা) : আধা পাকা অবস্থায় রয়েছে খেতের ধান। এই অবস্থায় ধান গোলায় তুললে এক-চতুর্থাংশ কম হবে ফলন। তবু ধান কেটে বাড়ি নিয়ে যাচ্ছে পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলার কৃষকেরা। বৃষ্টিতে হঠাৎ নিচু জমিতে পানি ওঠায় কৃষকরা ধান কাটা শুরু করেছেন। দেশের বিভিন্ন জায়গায় বন্যার ভয়াবহতা দেখে আতঙ্কিত তারা।

ধোবাউড়া (ময়মনসিংহ) : বতিহালা গ্রামের কৃষক আলাউদ্দিন বলেন, ধান কেটে ঘরে এনে খুবই বিপদে আছি। বৃষ্টির কারণে ঘরের ধান নষ্ট হচ্ছে, খড় পচে যাচ্ছে। ধোবাউড়া গ্রামের কৃষক সাদ্দাম হোসেন বলেন, ধান কেটে উঠানে রেখে দিয়েছি, রোদ না থাকায় ধান পচে যাচ্ছে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন