প্রাণিত করে বদরের ঐশী শক্তি

  ড. হাফেজ এবিএম হিজবুল্লাহ ০৩ জুন ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বদর
ফাইল ফটো

হিজরি দ্বিতীয় সন। সতেরোই রমজান। এ দিন সংঘটিত হয় ইসলাম ও কুফরের মাঝে প্রথম জিহাদ বা যুদ্ধ। এ দিন ফয়সালা হয়ে যায় কে আছে সত্যের পথে আর কে আছে মিথ্যার পথে। এ জন্যই এ দিনকে বলা হয় ‘ইয়াওমুল ফুরকান’ (সুরা আনফাল : ২১)। অর্থাৎ সত্য-মিথ্যার নির্ণয়কারী দিন। মদিনা থেকে ৮০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে বদর নামক স্থানে সংঘটিত হয় এ জিহাদ।

মক্কার জনপদ। এখানেই রয়েছে আল্লাহর ঘর বায়তুল্লাহ। কাবাগৃহ নামে সবার কাছে পরিচিত। এ ঘর তাওহিদের (একত্ববাদ) নিদর্শন হলেও ধর্মীয় আবহ বলতে মূর্তিপূজা ছাড়া আর কিছুই ছিল না। ঘরে ঘরে মূর্তি আর মূর্তি। আল্লাহর ঘরেও মূর্তি। একটি-দুটি নয়। ভেতরে-বাইরে মিলে ৩৬০টি মূর্তি। যেন মূর্তির নগরী মক্কা।

এক সময় তাওহিদের দাওয়াত আসে। সর্বজনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব ‘আল আমিন’ উপাধিতে ভূষিত মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর ওপর অর্পিত রিসালাতের দায়িত্ব পালনে প্রথমে গোপনে পরে প্রকাশ্যে তাওহিদের দাওয়াত দিতে শুরু করেন।

মক্কাবাসী এ দাওয়াতে সাড়া দেয়নি। বরং মক্কার প্রভাবশালী ব্যক্তিরা এর বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লেগে যায়। বাধা দিতে থাকে এ দাওয়াতি কার্যক্রমে। এমনকি যারা এ দাওয়াতে সাড়া দেয় তাদের নানাভাবে নির্যাতন করতে থাকে।

নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও তাদের নির্যাতন থেকে মুক্তি পাননি। কিন্তু সত্য প্রচারকারীদের কোনো প্রতিরোধের অনুমতি ছিল না। নির্দেশ ছিল শুধুই ধৈর্য ধারণ করার।

মক্কায় মুসলিমদের ওপর ক্রমেই নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে চলল। অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নির্যাতিত মুসলিমদের হিজরতের তথা দেশত্যাগের অনুমতি দিলেন। আশ্রয়স্থল হিসেবে হাবশাকে উপযোগী সাব্যস্ত করলেন। দুই দফায় বিপুলসংখ্যক মুসলমান হাবশার পথ ধরলেন। সর্বশেষ হিজরতের জন্য মদিনাকে নির্ধারণ করলেন।

মদিনাবাসী (আনসার) তাদের সর্বান্তকরণে গ্রহণ করলেন। শেষ ধাপ হিসেবে নবীজি (সা.) নিজেও মদিনা হিজরত করেন। অন্যান্য স্থানে যারা ছিলেন তাদেরও মদিনা আসার নির্দেশ দিলেন।

ইসলামের নতুন এক অধ্যায় রচিত হল। মসজিদে নববী নির্মিত হল। আনসার-মুহাজিরদের মাঝে ইসলামী ভ্রাতৃত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত হল। মদিনায় বসবাসকারী ইহুদিদের সঙ্গে চুক্তি করা হল। এবার নজর দেয়া হল মদিনার বাইরের দিকে।

ছোটখাটো অভিযানের মাধ্যমে আশপাশের জনগোষ্ঠীকে ইসলামের শক্তি-সামর্থ্যরে জানান দেয়ার সূচনা করা হল। ইতিমধ্যে মাজলুমদের পক্ষে সশস্ত্র প্রতিরোধেরও অনুমতি দেয়া হয়েছে। (সুরা হাজ্জ : ২৯)।

এরই ধারাবাহিকতায় খবর এলো আবু সুফিয়ানের (পরে ইসলাম গ্রহণ করে তিনি হয়ে যান হজরত আবু সুফিয়ান রা.) নেতৃত্বে একটি ব্যবসায়িক কাফেলা শাম থেকে মক্কার পথে রয়েছে। নবীজি (সা.) সিদ্ধান্ত নিলেন তাদের ধাওয়া করা হবে।

তাদের সম্পদ জব্দ করা হবে। এর মাধ্যমে মক্কায় মুহাজিরদের থেকে ছিনিয়ে নেয়া সম্পদের কিছুটা হলেও পুনরুদ্ধার করা হবে। সামর্থ্য অনুযায়ী প্রস্তুতি নিয়ে অভিযানে যাত্রা শুরু করল মুসলিম বাহিনী। নেতৃত্বে থাকলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।

মুসলিম বাহিনীর খবর পেয়ে আবু সুফিয়ান সাহায্যের জন্য মক্কায় লোক পাঠান। মক্কায় শুরু হয় রণপ্রস্তুতি। সামর্থ্যরে দিক থেকে মুশরিক বাহিনী ছিল বিপুল সমরাস্ত্রে সজ্জিত। সঙ্গে তাদের প্রায় এক হাজার সদস্য। একশ’ ঘোড়া ও ১৭০টি উট। সে সময়ের জন্য আরবের এ ছিল এক বিশাল বাহিনী।

অন্যদিকে মুসলিম বাহিনীর শক্তি তাদের তুলনায় নগণ্য। মুজাহিদের সংখ্যা মাত্র ৩১৩ জন। ঘোড়া মাত্র দুটি। উট ৭০টি। অস্ত্রশস্ত্র বলতে কিছুই নেই। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছা ছিল ভিন্ন। তাঁর ইচ্ছা ও সিদ্ধান্তই যে প্রথম ও শেষ কথা এর মাধ্যমে তা প্রমাণিত হল।

যুদ্ধে করণীয় নির্ধারণে পরামর্শ সভা ডাকলেন রাসূলুল্লাহ (সা.)। মুহাজিরদের তিনজন এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করলেন। কিন্তু আনসারদের কেউ কোনো প্রতিক্রিয়া জানালেন না। নবীজি (সা.) আহ্বান জানালেন, ‘হে লোকরা আমাকে পরামর্শ দাও।’ কারণ ছিল, দ্বিতীয় আকাবায় আনসাররা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মদিনার ভেতরে সাহায্যের প্রতিশ্র“তি দিয়েছিলেন।

মদিনার বাইরের কোনো প্রতিশ্র“তি ছিল না। এ কারণে তারা প্রতিরোধে বিরত থাকলে কিছু বলার ছিল না। কিন্তু বিচক্ষণ আনসার নেতা সা’দ ইবন মুআয বুঝতে পারেন, তাদেরই আহবান জানানো হয়েছে পরামর্শ দেয়ার জন্য। এগিয়ে এলেন তিনি। বললেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা আপনার ওপর ঈমান এনেছি এবং আপনাকে সত্য হিসেবে গ্রহণ করেছি। এর ওপর আমরা আনুগত্যের ও আপনাকে সর্বাÍক সহযোগিতার ওয়াদা করেছি।

তাই আপনি আপনার ইচ্ছানুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করুন। কসম সেই সত্তার যিনি আপনাকে সত্য দিয়ে প্রেরণ করেছেন। আপনি যদি আমাদের নিয়ে সাগরে ঝাঁপিয়ে পড়েন আমরাও আপনার সঙ্গে সাগরে ঝাঁপিয়ে পড়ব। আমাদের একজনও পিছপা হবে না। যুদ্ধে আমরা অত্যন্ত ধৈর্যশীল। শত্র“ দর্শনে আমরা অভ্যস্ত। আশা করছি আল্লাহ আমাদের দিয়ে এমন কার্যক্রম দেখাবেন যাতে আপনার চোখ শীতল হয়ে যাবে।’ (আর রাহীকুল মাখতুম)।

এতে নবীজি (সা.) খুশি হয়ে নির্দেশ দেন, ‘এগিয়ে চলো এবং সুসংবাদ গ্রহণ করো। আল্লাহ আমার সঙ্গে দুটি কাফেলার (আবু সুফিয়ান ও আবু জাহলের কাফেলা) যে কোনো একটির ওয়াদা করেছেন। আল্লাহর কসম! আমি যেন দেখতে পাচ্ছি প্রতিপক্ষের বিপর্যয়ের দৃশ্য।’

জিহাদের ময়দানে আসমানি সাহায্য নেমে এলো। দুই অসম শক্তির মোকাবেলায় বিজয়ী হল অপেক্ষাকৃত দুর্বল দল। বিজয় হল সত্যের ঝাণ্ডাবাহী তাওহিদী বাহিনী। প্রথম সারির নেতারাসহ প্রতিপক্ষের ৭০ জন নিহত হল। যুদ্ধবন্দি হল ৭০ জন। অপরদিকে মুসলিম বাহিনীর ১৪ জন শহীদ হন।

বদরের জিহাদ ঈমানী শক্তির এক অনবদ্য উপাখ্যান। পার্থিব শক্তির মোকাবেলায় এক আল্লাহর ওপর ঈমান ও আস্থা বেশি কার্যকর হয়েছে। কোনো পার্থিব শক্তির ওপর নয়, মুমিন এক আল্লাহর ওপর ভরসা করে। প্রতি রমজানে বদরের জিহাদ আমাদের সেই ঈমান শক্তি অর্জনের প্রেরণা দিয়ে যায়।

লেখক : অধ্যাপক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter