উত্তরাঞ্চলে বন্যা সিলেট-সুনামগঞ্জে কমছে পানি
jugantor
উত্তরাঞ্চলে বন্যা সিলেট-সুনামগঞ্জে কমছে পানি

  যুগান্তর ডেস্ক  

২৪ জুন ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সিলেট-সুনামগঞ্জসহ পূর্বাঞ্চলের অধিকাংশ স্থানে ধীরে ধীরে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। তবে উত্তরাঞ্চলের অনেক নদ-নদীর পানি বাড়ছে। ফলে অনেক স্থানে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। বৃহস্পতিবার দেশের ভেতরে এবং উজানে বৃষ্টি না হওয়ায় সিলেট-সুনামগঞ্জে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। তবে উজান থেকে পানি নেমে আসার কারণে মধ্যাঞ্চলের রাজবাড়ী, শরীয়তপুর, মাদারীপুর এবং মধ্য-পূর্বাঞ্চলীয় জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বন্যার অবনতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র (এফএফডব্লিউসি) বলেছে, বন্যাকবলিত সিলেট-সুনামগঞ্জের অধিকাংশ স্থান থেকে আগামী পাঁচ দিনে পানি নেমে যেতে পারে।

এদিকে কয়েক দিনের বন্যায় সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দারা। যাতায়াত ব্যবস্থা ভালো না হওয়ায় সেখানে সরকারি-বেসরকারি ত্রাণ সহায়তা পৌঁচ্ছে না। সড়কের আশপাশের পানিবন্দি মানুষেরা বারবার ত্রাণ পেলেও প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষজন ত্রাণ সহায়তা পাচ্ছেন না। নৌকা দেখলেই তারা ভিড় করছেন। ত্রাণ পাওয়ার আশায় তারা দৌড়ঝাঁপ করছেন। এ ছাড়া দূরবর্তী অনেক আশ্রয়কেন্দ্রে খাবারের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। বন্যাদুর্গত এলাকায় ডায়রিয়ার প্রকোপও বেড়েছে। প্রত্যন্ত ও দুর্গম এলাকায় খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশনের অভাবে মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র (এফএফডব্লিউসি) বন্যার ওপর পাঁচ দিনব্যাপী তথ্য প্রকাশ করেছে। এতে দেখা যাচ্ছে-আগামী ২৮ জুনের দিকে কেবল সিলেটের বিয়ানীবাজারের শেওলায় কুশিয়ারা, সুনামগঞ্জের দিরাই পয়েন্টে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, নেত্রকোনার খালিয়াজুড়িতে সুরমার নিচের অংশ বা ধনু নদী বিপৎসীমার উপরে থাকবে। আর সব স্থান থেকে নেমে যাবে বন্যার পানি। তবে আগামী ৪৮ ঘণ্টায় তিস্তা বেসিন বাদে দেশের অভ্যন্তরে এবং উজানের বিভিন্ন অংশে ভারি থেকে অতি ভারি বর্ষণের আশঙ্কা কম। এ সময়ে ভারতের হিমালয় পাদদেশীয় পশ্চিমবঙ্গে বা জলপাইগুড়ি, সিকিমে মাঝারি থেকে ভারি বৃষ্টির পূর্বাভাস আছে। এর ফলে ওই সময় তিস্তা নদীর পানি সমতল বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার কাছাকাছি অবস্থান করতে পারে। তিস্তাপাড়ের নীলফামারি ও লালমানিরহাটের নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির তৈরি হতে পারে। অপর দিকে গঙ্গা-পদ্মা নদীর পানি সমতল স্থিতিশীল থাকতে পারে। কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বন্যা পরিস্থিতিও একইভাবে স্থিতিশীল থাকতে পারে। তবে রাজবাড়ী, শরীয়তপুর ও মাদারীপুর জেলার নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।

কানাডার সাসকাচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি গবেষক ও বিশেষজ্ঞ মোস্তফা কামাল পলাশ বলেন, যে জেট স্ট্রিমের কারণে সিলেট বিভাগে ‘রেকর্ড ব্রেকিং’ (অতীতের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের রেকর্ড ভেঙে) বৃষ্টি ও বন্যা হলো, সেই একই জেট স্ট্রিমের কারণে গত ৪৮ ঘণ্টায় দক্ষিণ চীনে রেকর্ড ব্রেকিং বৃষ্টি হয়েছে। এ কারণে সেখানে ব্যাপক বন্যা শুরু হয়েছে।

সিলেট : স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় সিলেটের মানুষ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন। কেউ আশ্রয়কেন্দ্রে কেউবা সড়কের পাশে ঝুপড়ি ঘরে আছেন। আট দিন ধরে অনেকেই খেয়ে না খেয়ে দিন যাপন করছেন। সিলেট শহর থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরের শান্তিগঞ্জে বৃহস্পতিবার সকালে গিয়ে দেখা যায়-বন্যায় পৈতৃক ভিটা-মাটি হারিয়ে শতাধিক পরিবার খোলা আকাশের নিচে সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কের পাশে ঝুপড়ি ঘরে বাস করছেন। তাদের হাজারো গবাদিপশু সড়কে অবস্থান করছে। এদিকে, পানি কিছুটা কমায় অনেকেই বাড়িতে ফিরছেন।

আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে এখনো ১৭টি পরিবারের অর্ধশতাধিক মানুষ বাস করছেন। এর মধ্যে প্রথম দিকে স্থানীয় প্রশাসন ৫ কেজি চাল, ১ কেজি ডাল, কিছু মুড়ি, চিরা, গুড় দিয়েছিল। এরপর আর কোনো ত্রাণ পাননি। তবে বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তি মাঝে-মধ্যে কিছু শুকনো খাবার দিয়ে যান। যা দিয়ে তারা এক প্রকার খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন। নিজ নির্বাচনি এলাকার দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান। নিজ বাড়িতে মুন্সী আরফান আলী বৈঠক খানায় আশ্রয় দিয়েছেন বানভাসিদের।

পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. বেনজীর আহমেদ সিলেট ও সুনামগঞ্জের বন্যাদুর্গত এলাকা ঘুরে দেখেছেন। বৃহস্পতিবার তিনি বন্যাদুর্গত মানুষের খোঁজখবর নেন। বন্যাদুর্গতদের তিনি ত্রাণ সহায়তাও দেন। যেকোনো দুর্যোগে অসহায় মানুষের পাশে পুলিশের থাকার আশ্বাস দেন তিনি। হেলিকপ্টারযোগে প্রথমে সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে যান ড. বেনজীর আহমেদ। দুপুরে সেখান থেকে তিনি সিলেটের উদ্দেশে রওনা হন। সিলেট বিমানবন্দরে পৌঁছে বিমানবন্দরের পাশের সাহেববাজার এলাকায় তিনি ত্রাণ বিতরণ করেন।

পাগলা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের আশ্রয়কেন্দ্রে থাকাকালে কাদিপুরের দুজন মারা গেছে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে একজন পুরুষ ও একজন মহিলা। তিনি জানান, কলেজ ভবনের দ্বিতীয়তলায় পাশাপাশি থাকতেন আব্দুল আহাদ ও রহিম উদ্দিনের পরিবার। এক দিনের ব্যবধানে আব্দুল আহাদ ও রহিম উদ্দিনের স্ত্রী পারমিছ মারা গেছেন। সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগে পারমিছ মারা যান। এক দিনের ব্যবধানে দুজনের মৃত্যুতে ওই আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা লোকজনের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।

জকিগঞ্জের ৯টি ইউনিয়নে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সুরমা-কুশিয়ারা নদীর পানি বেড়ে বিপৎসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে প্রায় দুই লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন গ্রাম ও নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দারা। অনেক এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে সরকারি-বেসরকারি ত্রাণ সহায়তা যাচ্ছে না। গ্রামাঞ্চলের পানিবন্দি মানুষের অভিযোগ-সড়কের আশপাশে যারা পানিবন্দি রয়েছেন তারা বারবার ত্রাণ পাচ্ছেন। কিন্তু গ্রামের ভেতরের পানিবন্দি লোকজন ত্রাণ সহায়তা পাচ্ছেন না। খাবারের জন্য নিম্নাঞ্চলের মানুষ মারাত্মক কষ্টের মধ্যে দিনরাত কাটাচ্ছেন। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় কেউ ত্রাণের নৌকা নিয়ে যায় না। দূরবর্তী অনেক আশ্রয়কেন্দ্রেও খাবারের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।

জগন্নাথপুর (সুনামগঞ্জ) : জগন্নাথপুরে ধীরে ধীরে পানি কমলেও পানিবন্দি মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। সরেজমিন কয়েকটি আশ্রয়কেন্দ্র ঘুরে দেখা যায়, আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে মানুষের উপচেপড়া ভিড়। এসব কেন্দ্রে তিন দিন ধরে সরকারি কোনো ত্রাণ সহায়তা পৌঁছেনি। ফলে মানুষের মধ্যে ত্রাণের জন্য হাহাকার চলছে। জগন্নাথপুর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা সাজেদুল ইসলাম বলেন, বন্যার্তদের মাঝে ত্রাণ সহায়তা পৌঁছে দিতে আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করছি।

হবিগঞ্জ : কুশিয়ারা নদীর পানি প্রবল বেগে নবীগঞ্জ ও আজমিরীগঞ্জ উপজেলায় প্রবেশ করায় বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বুধবার থেকে নতুন করে বাহুবল উপজেলার কিছু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বানিয়াচং ও লাখাই উপজেলায়ও পানি বাড়ছে। উপজেলাগুলোর বাঁধের বিভিন্ন স্থানে ভাঙন দেখা দেয়।

বানিয়াচং উপজেলায় হু হু করে পানি বাড়ছে। ঘরবন্দি হয়ে পড়েছেন লাখো মানুষ। উপজেলার ১২৬টি আশ্রয়কেন্দ্রে উঠেছেন ১৩ হাজার বানভাসি মানুষ। বন্যাকবলিত মানুষের সংখ্যা বেশি হওয়ায় অনেকে সহায়তা না পেয়ে অনাহারে-অর্ধাহারে দিনাতিপাত করছেন।

বড়লেখা (মৌলভীবাজার) : দেশের সর্ববৃহৎ হাওড় হাকালুকি হাওড়ের পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। আট দিন ধরে অবর্ণনীয় দুর্ভোগে পড়েছেন পানিবন্দি লক্ষাধিক বানভাসি মানুষ। বৃহস্পতিবার পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়কমন্ত্রী শাহাব উদ্দিন বড়লেখা উপজেলার বন্যাকবলিত বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেছেন। এ সময় তিনি বন্যাদুর্গতদের মাঝে দেড় হাজার প্যাকেট খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করেন।

নেত্রকোনা : বুধবার ও বৃহস্পতিবার বৃষ্টি না হওয়ায় বন্যার পানি কমছে। তবে রাস্তাঘাট, ঘরবাড়িতে এখনো বন্যার পানি রয়ে গেছে। পানি কিছুটা কমায় জনমনে স্বস্তি ফিরেছে। তবে আশ্রয়কেন্দ্র ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে ত্রাণ পৌঁছাচ্ছে না। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, শুধু আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে রয়েছে প্রশাসনের নজরদারি। এক সপ্তাহ ধরে দুর্ভোগে রয়েছে ১০টি উপজেলার অন্তত ১২ লাখ মানুষ। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে প্রতিদিন রান্না করা খিচুড়ি ও শুকনো খাবার দেওয়া হচ্ছে। একেকটি আশ্রয়কেন্দ্রে গত এক সপ্তাহে একাধিকবার খাবার দেওয়া হয়েছে। একই স্থানে বারবার ত্রাণ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু দুর্গম এলাকায় ত্রাণ অথবা চিকিৎসা সামগ্রী পৌঁছাচ্ছে না।

এক সপ্তাহের বন্যায় জেলার ১০টি উপজেলায় ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে শিশুর সংখ্যাই বেশি। নেত্রকোনা আধুনিক সদর হাসপাতালসহ নয়টি উপজেলায় বৃহস্পতিবার পর্যন্ত শতাধিক ডায়রিয়া রোগী ভর্তি হয়েছেন। নেত্রকোনা সিভিল সার্জন মো. সেলিম মিয়া বলেন, বন্যার কারণে ডায়রিয়া রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ৮৬টি ইউনিয়নে একটি করে মেডিকেল টিম গঠন করে চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিত রয়েছে।

কেন্দুয়া (নেত্রকোনা) : বন্যার পানি কমলেও বাড়িঘরে বানভাসি মানুষজন ফিরতে পারছেন না। কাজকর্ম হারিয়ে অনেকে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে তারা খুব দুর্ভোগের মধ্যে আছেন। আবার যারা বাড়িঘর ছাড়েননি তারা বেশি খাবার কষ্টে আছেন। নৌকা দেখলেই ত্রাণ পাওয়ার আশায় অসহায় মানুষগুলো দৌড়ঝাঁপ করেন।

উত্তরাঞ্চলে বন্যা সিলেট-সুনামগঞ্জে কমছে পানি

 যুগান্তর ডেস্ক 
২৪ জুন ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সিলেট-সুনামগঞ্জসহ পূর্বাঞ্চলের অধিকাংশ স্থানে ধীরে ধীরে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। তবে উত্তরাঞ্চলের অনেক নদ-নদীর পানি বাড়ছে। ফলে অনেক স্থানে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। বৃহস্পতিবার দেশের ভেতরে এবং উজানে বৃষ্টি না হওয়ায় সিলেট-সুনামগঞ্জে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। তবে উজান থেকে পানি নেমে আসার কারণে মধ্যাঞ্চলের রাজবাড়ী, শরীয়তপুর, মাদারীপুর এবং মধ্য-পূর্বাঞ্চলীয় জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বন্যার অবনতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র (এফএফডব্লিউসি) বলেছে, বন্যাকবলিত সিলেট-সুনামগঞ্জের অধিকাংশ স্থান থেকে আগামী পাঁচ দিনে পানি নেমে যেতে পারে।

এদিকে কয়েক দিনের বন্যায় সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দারা। যাতায়াত ব্যবস্থা ভালো না হওয়ায় সেখানে সরকারি-বেসরকারি ত্রাণ সহায়তা পৌঁচ্ছে না। সড়কের আশপাশের পানিবন্দি মানুষেরা বারবার ত্রাণ পেলেও প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষজন ত্রাণ সহায়তা পাচ্ছেন না। নৌকা দেখলেই তারা ভিড় করছেন। ত্রাণ পাওয়ার আশায় তারা দৌড়ঝাঁপ করছেন। এ ছাড়া দূরবর্তী অনেক আশ্রয়কেন্দ্রে খাবারের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। বন্যাদুর্গত এলাকায় ডায়রিয়ার প্রকোপও বেড়েছে। প্রত্যন্ত ও দুর্গম এলাকায় খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশনের অভাবে মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র (এফএফডব্লিউসি) বন্যার ওপর পাঁচ দিনব্যাপী তথ্য প্রকাশ করেছে। এতে দেখা যাচ্ছে-আগামী ২৮ জুনের দিকে কেবল সিলেটের বিয়ানীবাজারের শেওলায় কুশিয়ারা, সুনামগঞ্জের দিরাই পয়েন্টে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, নেত্রকোনার খালিয়াজুড়িতে সুরমার নিচের অংশ বা ধনু নদী বিপৎসীমার উপরে থাকবে। আর সব স্থান থেকে নেমে যাবে বন্যার পানি। তবে আগামী ৪৮ ঘণ্টায় তিস্তা বেসিন বাদে দেশের অভ্যন্তরে এবং উজানের বিভিন্ন অংশে ভারি থেকে অতি ভারি বর্ষণের আশঙ্কা কম। এ সময়ে ভারতের হিমালয় পাদদেশীয় পশ্চিমবঙ্গে বা জলপাইগুড়ি, সিকিমে মাঝারি থেকে ভারি বৃষ্টির পূর্বাভাস আছে। এর ফলে ওই সময় তিস্তা নদীর পানি সমতল বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার কাছাকাছি অবস্থান করতে পারে। তিস্তাপাড়ের নীলফামারি ও লালমানিরহাটের নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির তৈরি হতে পারে। অপর দিকে গঙ্গা-পদ্মা নদীর পানি সমতল স্থিতিশীল থাকতে পারে। কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বন্যা পরিস্থিতিও একইভাবে স্থিতিশীল থাকতে পারে। তবে রাজবাড়ী, শরীয়তপুর ও মাদারীপুর জেলার নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।

কানাডার সাসকাচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি গবেষক ও বিশেষজ্ঞ মোস্তফা কামাল পলাশ বলেন, যে জেট স্ট্রিমের কারণে সিলেট বিভাগে ‘রেকর্ড ব্রেকিং’ (অতীতের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের রেকর্ড ভেঙে) বৃষ্টি ও বন্যা হলো, সেই একই জেট স্ট্রিমের কারণে গত ৪৮ ঘণ্টায় দক্ষিণ চীনে রেকর্ড ব্রেকিং বৃষ্টি হয়েছে। এ কারণে সেখানে ব্যাপক বন্যা শুরু হয়েছে।

সিলেট : স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় সিলেটের মানুষ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন। কেউ আশ্রয়কেন্দ্রে কেউবা সড়কের পাশে ঝুপড়ি ঘরে আছেন। আট দিন ধরে অনেকেই খেয়ে না খেয়ে দিন যাপন করছেন। সিলেট শহর থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরের শান্তিগঞ্জে বৃহস্পতিবার সকালে গিয়ে দেখা যায়-বন্যায় পৈতৃক ভিটা-মাটি হারিয়ে শতাধিক পরিবার খোলা আকাশের নিচে সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কের পাশে ঝুপড়ি ঘরে বাস করছেন। তাদের হাজারো গবাদিপশু সড়কে অবস্থান করছে। এদিকে, পানি কিছুটা কমায় অনেকেই বাড়িতে ফিরছেন।

আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে এখনো ১৭টি পরিবারের অর্ধশতাধিক মানুষ বাস করছেন। এর মধ্যে প্রথম দিকে স্থানীয় প্রশাসন ৫ কেজি চাল, ১ কেজি ডাল, কিছু মুড়ি, চিরা, গুড় দিয়েছিল। এরপর আর কোনো ত্রাণ পাননি। তবে বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তি মাঝে-মধ্যে কিছু শুকনো খাবার দিয়ে যান। যা দিয়ে তারা এক প্রকার খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন। নিজ নির্বাচনি এলাকার দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান। নিজ বাড়িতে মুন্সী আরফান আলী বৈঠক খানায় আশ্রয় দিয়েছেন বানভাসিদের।

পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. বেনজীর আহমেদ সিলেট ও সুনামগঞ্জের বন্যাদুর্গত এলাকা ঘুরে দেখেছেন। বৃহস্পতিবার তিনি বন্যাদুর্গত মানুষের খোঁজখবর নেন। বন্যাদুর্গতদের তিনি ত্রাণ সহায়তাও দেন। যেকোনো দুর্যোগে অসহায় মানুষের পাশে পুলিশের থাকার আশ্বাস দেন তিনি। হেলিকপ্টারযোগে প্রথমে সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে যান ড. বেনজীর আহমেদ। দুপুরে সেখান থেকে তিনি সিলেটের উদ্দেশে রওনা হন। সিলেট বিমানবন্দরে পৌঁছে বিমানবন্দরের পাশের সাহেববাজার এলাকায় তিনি ত্রাণ বিতরণ করেন।

পাগলা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের আশ্রয়কেন্দ্রে থাকাকালে কাদিপুরের দুজন মারা গেছে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে একজন পুরুষ ও একজন মহিলা। তিনি জানান, কলেজ ভবনের দ্বিতীয়তলায় পাশাপাশি থাকতেন আব্দুল আহাদ ও রহিম উদ্দিনের পরিবার। এক দিনের ব্যবধানে আব্দুল আহাদ ও রহিম উদ্দিনের স্ত্রী পারমিছ মারা গেছেন। সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগে পারমিছ মারা যান। এক দিনের ব্যবধানে দুজনের মৃত্যুতে ওই আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা লোকজনের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।

জকিগঞ্জের ৯টি ইউনিয়নে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সুরমা-কুশিয়ারা নদীর পানি বেড়ে বিপৎসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে প্রায় দুই লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন গ্রাম ও নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দারা। অনেক এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে সরকারি-বেসরকারি ত্রাণ সহায়তা যাচ্ছে না। গ্রামাঞ্চলের পানিবন্দি মানুষের অভিযোগ-সড়কের আশপাশে যারা পানিবন্দি রয়েছেন তারা বারবার ত্রাণ পাচ্ছেন। কিন্তু গ্রামের ভেতরের পানিবন্দি লোকজন ত্রাণ সহায়তা পাচ্ছেন না। খাবারের জন্য নিম্নাঞ্চলের মানুষ মারাত্মক কষ্টের মধ্যে দিনরাত কাটাচ্ছেন। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় কেউ ত্রাণের নৌকা নিয়ে যায় না। দূরবর্তী অনেক আশ্রয়কেন্দ্রেও খাবারের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।

জগন্নাথপুর (সুনামগঞ্জ) : জগন্নাথপুরে ধীরে ধীরে পানি কমলেও পানিবন্দি মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। সরেজমিন কয়েকটি আশ্রয়কেন্দ্র ঘুরে দেখা যায়, আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে মানুষের উপচেপড়া ভিড়। এসব কেন্দ্রে তিন দিন ধরে সরকারি কোনো ত্রাণ সহায়তা পৌঁছেনি। ফলে মানুষের মধ্যে ত্রাণের জন্য হাহাকার চলছে। জগন্নাথপুর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা সাজেদুল ইসলাম বলেন, বন্যার্তদের মাঝে ত্রাণ সহায়তা পৌঁছে দিতে আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করছি।

হবিগঞ্জ : কুশিয়ারা নদীর পানি প্রবল বেগে নবীগঞ্জ ও আজমিরীগঞ্জ উপজেলায় প্রবেশ করায় বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বুধবার থেকে নতুন করে বাহুবল উপজেলার কিছু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বানিয়াচং ও লাখাই উপজেলায়ও পানি বাড়ছে। উপজেলাগুলোর বাঁধের বিভিন্ন স্থানে ভাঙন দেখা দেয়।

বানিয়াচং উপজেলায় হু হু করে পানি বাড়ছে। ঘরবন্দি হয়ে পড়েছেন লাখো মানুষ। উপজেলার ১২৬টি আশ্রয়কেন্দ্রে উঠেছেন ১৩ হাজার বানভাসি মানুষ। বন্যাকবলিত মানুষের সংখ্যা বেশি হওয়ায় অনেকে সহায়তা না পেয়ে অনাহারে-অর্ধাহারে দিনাতিপাত করছেন।

বড়লেখা (মৌলভীবাজার) : দেশের সর্ববৃহৎ হাওড় হাকালুকি হাওড়ের পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। আট দিন ধরে অবর্ণনীয় দুর্ভোগে পড়েছেন পানিবন্দি লক্ষাধিক বানভাসি মানুষ। বৃহস্পতিবার পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়কমন্ত্রী শাহাব উদ্দিন বড়লেখা উপজেলার বন্যাকবলিত বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেছেন। এ সময় তিনি বন্যাদুর্গতদের মাঝে দেড় হাজার প্যাকেট খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করেন।

নেত্রকোনা : বুধবার ও বৃহস্পতিবার বৃষ্টি না হওয়ায় বন্যার পানি কমছে। তবে রাস্তাঘাট, ঘরবাড়িতে এখনো বন্যার পানি রয়ে গেছে। পানি কিছুটা কমায় জনমনে স্বস্তি ফিরেছে। তবে আশ্রয়কেন্দ্র ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে ত্রাণ পৌঁছাচ্ছে না। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, শুধু আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে রয়েছে প্রশাসনের নজরদারি। এক সপ্তাহ ধরে দুর্ভোগে রয়েছে ১০টি উপজেলার অন্তত ১২ লাখ মানুষ। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে প্রতিদিন রান্না করা খিচুড়ি ও শুকনো খাবার দেওয়া হচ্ছে। একেকটি আশ্রয়কেন্দ্রে গত এক সপ্তাহে একাধিকবার খাবার দেওয়া হয়েছে। একই স্থানে বারবার ত্রাণ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু দুর্গম এলাকায় ত্রাণ অথবা চিকিৎসা সামগ্রী পৌঁছাচ্ছে না।

এক সপ্তাহের বন্যায় জেলার ১০টি উপজেলায় ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে শিশুর সংখ্যাই বেশি। নেত্রকোনা আধুনিক সদর হাসপাতালসহ নয়টি উপজেলায় বৃহস্পতিবার পর্যন্ত শতাধিক ডায়রিয়া রোগী ভর্তি হয়েছেন। নেত্রকোনা সিভিল সার্জন মো. সেলিম মিয়া বলেন, বন্যার কারণে ডায়রিয়া রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ৮৬টি ইউনিয়নে একটি করে মেডিকেল টিম গঠন করে চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিত রয়েছে।

কেন্দুয়া (নেত্রকোনা) : বন্যার পানি কমলেও বাড়িঘরে বানভাসি মানুষজন ফিরতে পারছেন না। কাজকর্ম হারিয়ে অনেকে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে তারা খুব দুর্ভোগের মধ্যে আছেন। আবার যারা বাড়িঘর ছাড়েননি তারা বেশি খাবার কষ্টে আছেন। নৌকা দেখলেই ত্রাণ পাওয়ার আশায় অসহায় মানুষগুলো দৌড়ঝাঁপ করেন।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন