কেউ দাবায়ে রাখতে পারেনি পারবে না
jugantor
জনসভায় প্রধানমন্ত্রী
কেউ দাবায়ে রাখতে পারেনি পারবে না

  হাসিবুল হাসান, শিবচর থেকে  

২৬ জুন ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

প্রধানমন্ত্রী

আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, পদ্মা সেতু নির্মাণে যারা বাধা দিয়েছিল, তাদের একটা জবাব আমরা দিয়েছি। তাদের একটা উপযুক্ত জবাব আমরা পদ্মা সেতুর মধ্য দিয়ে দিতে পারলাম যে, বাংলাদেশও পারে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, ‘আমাদের কেউ দাবায়ে রাখতে পারবা না।’ কেউ দাবায়ে রাখতে পারেনি, পারবে না; আমরা বিজয়ী হয়েছি।

শনিবার পদ্মা সেতুর উদ্বোধন উপলক্ষ্যে মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার কাঁঠালবাড়ীর বাংলাবাজার ইলিয়াস আহমেদ চৌধুরী ফেরিঘাট প্রান্তে আওয়ামী লীগ আয়োজিত জনসভায় তিনি এসব কথা বলেন। সভাপতির বক্তব্যে শেখ হাসিনা আরও বলেন, নিজের জীবন দিয়ে হলেও আগামী প্রজন্মের জন্য উন্নত জীবন নিশ্চিত করব।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০০১ সালে আমরা পদ্মা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলাম। খালেদা জিয়া এসে তা বন্ধ করে দেন। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ শুরু করে। তখন খালেদা জিয়ারা বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ কোনোদিন নাকি পদ্মা সেতুর কাজ করতে পারবে না।

আমি তাকে (খালেদা জিয়া) বলব-আসুন, দেখুন পদ্মা সেতু নির্মাণ হয়েছে কিনা। অনেক জ্ঞানী-গুণী অর্থনীতিবিদ, আমলারা বলেছেন-নিজেদের টাকায় পদ্মা সেতু সম্ভব নয়। আজ নিজেদের টাকায় কীভাবে করতে পারলাম? এ সময় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ বিরোধিতাকারী ‘জ্ঞানী-গুণী’দের পদ্মা সেতু দেখার আমন্ত্রণ জানান প্রধানমন্ত্রী।

পদ্মা পারে আয়োজিত বিশাল এ জনসভায় শত ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত ও বাধা মোকাবিলা করে স্বপ্নের পদ্মা সেতু নিজস্ব অর্থায়নে নির্মাণের নানা চিত্র তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। জনগণের শক্তি, সাহস ও অনুপ্রেরণার জন্যই তার পক্ষে এটা করা সম্ভব হয়েছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, নিজেদের অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ, দেশের জনগণ আমার পাশে দাঁড়িয়েছে বলেই সম্ভব হয়েছে। সারা দেশের মানুষ পাশে দাঁড়িয়েছে। পদ্মা সেতু প্রমাণ করে-জনগণের শক্তিই বড় শক্তি। আমি সেটাই বিশ্বাস করি।

আবেগজড়িত কণ্ঠে প্রধানমন্ত্রী বলেন-বাবা-মা, ভাই সব হারিয়ে পেয়েছি আপনাদের। আপনাদের পাশে আমি আছি, আপনাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য, আপনাদের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য আমি যে কোনো ত্যাগ স্বীকারে সব সময় প্রস্তুত।

আমি আপনাদের প্রয়োজনে আমার নিজের জীবনটাও দেব। আরও উন্নত জীবন যেন আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরা পায়, সে ব্যবস্থা আমি করব। আজ আপনাদের কাছে এটাই আমার ওয়াদা।

দুপুর ১২টা ৫১ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী জনসভাস্থলে এসে পৌঁছে হাত নেড়ে জনসমুদ্রে থাকা কয়েক লাখ মানুষকে শুভেচ্ছার জবাব দেন। এ সময় তারা করতালি ও স্লোগান দিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে অভিবাদন জানান। বক্তব্য শেষে আবেগে উদ্বেলিত প্রধানমন্ত্রী নিজেই ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান ধরলে জনসমুদ্রে থাকা মানুষের গগনবিদারী এ স্লোগানে গোটা এলাকা প্রকম্পিত হয়ে ওঠে।

এর আগে দুপুর ১২টা ৩৫ মিনিটে জাজিরা প্রান্তে ফলক উন্মোচন করেন প্রধানমন্ত্রী। উদ্বোধনী ফলক ও ম্যুরাল-২ উন্মোচন করে মোনাজাতে অংশগ্রহণ করেন তিনি। পরে তিনি জনসমাবেশে আসেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মঞ্চে আসার পর বক্তৃতা করেন চিফ হুইপ নূর-ই আলম চৌধুরী এবং আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।

এর আগে বক্তৃতা করেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ড. আবদুর রাজ্জাক, শাজাহান খান, জাহাঙ্গীর কবির নানক, আবদুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক এসএম কামাল হোসেন, শেখ হেলাল এমপি প্রমুখ।

প্রধানমন্ত্রী কাঁঠালবাড়ীর জনসভায় পৌঁছাতেই মঞ্চে বাজানো হয় বাংলাদেশের লোকগানের উজ্জ্বল নক্ষত্র শিল্পী আবদুল আলীমের ‘সর্বনাশা পদ্মা নদীরে’ গানটি। এরপর বেজে ওঠে, ‘ও নদীরে একটি কথা শুধাই শুধু তোমারে’ গানটি।

ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠে পুরো জনসভা। মঞ্চে এসে হাত নেড়ে নেতাকর্মীদের শুভেচ্ছা জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনা দুপুর ১টা ৯ মিনিটে বক্তৃতা শুরু করে ১টা ২৩ মিনিটে শেষ করেন।

১৪ মিনিট জনসভায় ভাষণ দেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও অনুষ্ঠানের সভাপতি। সভা যৌথভাবে পরিচালনা করেন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম ও প্রচার সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপ।

জনসভা শেষে পদ্মা সেতুর শরীয়তপুরের জাজিরা প্রান্তের সার্ভিস এরিয়া-২-এর উদ্দেশে সড়কপথে যাত্রা করেন প্রধানমন্ত্রী। বিকাল ৫টায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হেলিকপ্টারে জাজিরা থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওয়ানা হন।

নির্বিঘ্নে চলতে পারবেন : বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুর অর্থায়ন থেকে সরে যাওয়ার পর জনগণের ‘সাহস ও শক্তি নিয়েই’ সেতুর কাজ শুরু করেছিলেন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজ আলহামদুলিল্লাহ, আমরা সেই পদ্মা সেতু নির্মাণ করেছি।

আর আপনাদের কষ্ট করতে হবে না। এই খরস্রোতা পদ্মা নদী পার হতে গিয়ে আর কাউকে সন্তান হারাতে হবে না, বাবা-মা, ভাইবোনকে হারাতে হবে না। আজ সেখানে আপনারা নির্বিঘ্নে চলতে পারবেন। সেই ব্যবস্থা আমরা করেছি।

দুর্নীতি নয়, বরং ড. মুহাম্মদ ইউনূসের তদবিরেই পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন থেকে বিশ্বব্যাংক সরে গিয়েছিল মন্তব্য করেন সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা। দুর্নীতির সেই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে তিনি বলেন, কে দুর্নীতি করেছে? এই সেতু আমাদের প্রাণের সেতু। যে সেতুর সঙ্গে আমার দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের ভাগ্য জড়িত, সেই সেতু করতে গিয়ে কেন দুর্নীতি হবে?

অনেকে বিঘ্ন সৃষ্টির চেষ্টা করেছে : জাতীয় সংসদে তখন তার (শেখ হাসিনা) ঘোষণা ছিল ‘বাংলাদেশ বসে থাকবে না, আমরা নিজের টাকায় এই পদ্মা সেতু তৈরি করব’ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অনেকে অনেকভাবে বিঘ্ন সৃষ্টির চেষ্টা করেছে এবং তাদের একটা ধারণা ছিল যে বাংলাদেশ নিজের টাকায় এই সেতু নির্মাণ করতে পারবে না।

কিন্তু তিনি জনগণের শক্তিতে আস্থা রেখেছিলেন। পদ্মা সেতুর অর্থায়ন বন্ধের পর তার উদ্যোগে জনগণ ব্যাপকভাবে এগিয়ে আসে এবং তার মাঝেও শক্তি সঞ্চারিত করেছে বলেই আজ পদ্মা সেতু নির্মাণ সম্ভব হয়েছে। তিনি মহান সৃষ্টিকর্তার কাছেও এজন্য শোকরিয়া জানান।

বিশ্বব্যাংককে বাদ দিয়ে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ সম্ভব নয় বলে অনেকেই নিরুৎসাহিত করেছিলেন। তাদের উদ্দেশ করে প্রধানমন্ত্রী পালটা প্রশ্ন করে বলেন, আজকে কীভাবে করতে পারলাম? বাস্তবে আপনারা, এই দেশের জনগণ আমাকে সমর্থন দিয়েছেন, পাশে থেকেছেন। জনগণের শক্তিই সবচেয়ে বড় শক্তি। আমি সেটাই বিশ্বাস করি।

দুঃখ ঘুচে যাবে : আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দক্ষিণবঙ্গের ব্যাপক উন্নয়ন করার চিত্র তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, আমাদের প্রত্যেকটা এলাকা এত দুর্গম ছিল, আজকে সেখানে রাস্তাঘাট, পুল-ব্রিজ করেছি বলেই সব জায়গায় যোগাযোগ স্থাপন হয়েছে।

বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলে। এই এলাকার মানুষ যেন নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারে, সেজন্য পায়রা পর্যন্ত আমরা সেতু বানিয়ে দিয়েছি। এখন নিশ্চিন্তে মানুষ চলাফেরা করতে পারে। স্বপ্নের পদ্মা সেতু নির্মিত হওয়ায় দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যাপক গতি আসার সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, সারা দেশে আমরা অর্থনৈতিক অঞ্চল করছি। আজকে পদ্মা সেতু হয়েছে। এখানেও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল হবে, শিল্পাঞ্চল হবে, কর্মসংস্থান হবে, কলকারখানা হবে, আমাদের ফসল উৎপাদন হবে।

সেই ফসল আমরা প্রক্রিয়াজাত করতে পারব। দেশে-বিদেশে রপ্তানি করতে পারব। এখানে যে মাছ হবে, তা আমরা প্রক্রিয়াজাত করে দেশে-বিদেশে পাঠাতে পারব। বাংলাদেশের মানুষের দুঃখ ঘুচে যাবে। ভাগ্য পরিবর্তন হবে।

আজকের দিনটি ‘বিশেষ’ : খাদ্যের চাহিদা পূরণে সবাইকে ফসল উৎপাদনের দিকে জোর দিতে এবং আগামী বর্ষাকালে এ অঞ্চলে বন্যা হতে পারে বলে সতর্ক করে দিয়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, এখন থেকে আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি, আপনারাও প্রস্তুতি নিতে থাকেন।

যে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার শক্তি বাংলাদেশ রাখে। দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জন্য আজকের দিনটি ‘বিশেষ’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই শরীয়তপুরে যখন এসেছি, তখন কী ছিল? লঞ্চে এসেছি, লঞ্চ নষ্ট হয়ে গেছে। নৌকায় করে একেকটা এলাকায় গিয়েছি, মিটিং করেছি।

আজকে সেই শরীয়তপুরের অবস্থা পালটে গেছে। কারণ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসায় রাস্তাঘাট, পুল-ব্রিজের উন্নয়ন হয়েছে। মাদারীপুরেও একই অবস্থা ছিল। গোপালগঞ্জ যেতে ২২ ঘণ্টা সময় লাগত। প্রত্যেকটা এলাকা এত দুর্গম ছিল। রাস্তাঘাট করেছি বলেই যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন হয়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলে।

জাতির পিতাকে স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতা যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গড়ার যাত্রা যখন শুরু করলেন, মাত্র সাড়ে তিন বছর হাতে সময় পেয়েছিলেন। এই সময়ে ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশ করেন।

যখন দেশের দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়ে তৃণমূল পর্যন্ত ক্ষমতা নিয়ে যান, দুর্ভাগ্য তখন জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যা করা হলো। তিনি বলেন, ওই সময়ে রেহানা ও আমি বিদেশে ছিলাম। দেশে আসতে পারিনি।

১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগ আমাকে সভাপতি নির্বাচিত করে। শত বাধা পেরিয়ে আমি আপনাদের মাঝে আসি। আমার লক্ষ্য জাতির পিতার সেই স্বপ্ন পূরণ করা। বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করা।

দেশের মানুষের জন্য উন্নত জীবন নিশ্চিত করা। অনেক চড়াই-উতরাই পার হয়ে আজকে আমরা বাংলাদেশের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পেরেছি। আজকে বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ।

আজকে আমরা বিনা পয়সায় বই দিচ্ছি। প্রতিটি এলাকায় স্কুল করে দিচ্ছি, কলেজ করে দিচ্ছি। বিশ্ববিদ্যালয় করে দিয়ে শিক্ষার দ্বার উন্মোচন করেছি। কমিউনিটি ক্লিনিক করে দিয়ে মানুষের ঘরের কাছে চিকিৎসা সেবার ব্যবস্থা করেছি।

গত ১৩ বছরে দেশের ব্যাপক উন্নয়ন ও দেশের চেহারা বদলে দেওয়ার চিত্র লাখো জনতার উদ্দেশে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, আমার ওয়াদা ছিল প্রত্যেক ঘরে আলো জ্বলবে। আজ বাংলাদেশের প্রতিটি ঘরে আমরা বিদ্যুৎ পৌঁছে দিয়েছি।

ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তুলব বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম। আজ ডিজিটাল বাংলাদেশ। সবার হাতে মোবাইল ফোন, সবাই আজ অনলাইনে কেনাবেচা করতে পারেন-সেই ব্যবস্থা আমরা করেছি। মানুষের জীবন-জীবিকার ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। উন্নত জীবন যাতে সবাই পায়, সেই ব্যবস্থা আমরা করব।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে পেরেছি। এই একটা কারণে বাংলাদেশের জনগণ ভোট দিয়েছে। নির্বাচিত হয়েছি এবং এ দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে কাজ করে যাচ্ছি। উপস্থিত জনগণকে প্রশ্ন করে তিনি বলেন, এই বাংলাদেশের জনগণ, আপনারা আমাকে সমর্থন দিয়েছেন।

পাশে দাঁড়িয়েছেন। জনগণের শক্তি সব থেকে বড় শক্তি। কী বলেন আপনারা? জনসমুদ্র থেকে সবাই হাত তুলে ‘হ্যাঁ’ বলার পর প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণের শক্তি বড় শক্তি, আমি সেটাই বিশ্বাস করেছি।

প্রধানমন্ত্রী এ সময় করোনাভাইরাস এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পাশাপাশি সবার টিকা গ্রহণ এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষাবিধি মেনে চলারও পরামর্শ দেন। পাশাপাশি দেশের এক ইঞ্চি জমিও যাতে অনাবাদি না থাকে, তা নিশ্চিত করারও আহ্বান জানান তিনি।

প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যের শেষাংশে এই রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে কষ্ট করে জনসভাস্থলে সবাইকে আসায় এবং দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষা করায় শুভেচ্ছা জানিয়ে কবির ভাষায় বলেন-‘নিঃস্ব আমি, রিক্ত আমি, দেবার কিছুই নেই/ আছে শুধু ভালোবাসা দিয়ে গেলাম তাই।/’ তিনি সবার সুস্থতা ও মঙ্গল কামনা করে দেশকে যেন এভাবেই এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেন, সেজন্য সবার কাছে দোয়া প্রার্থনাও করেন।

ওবায়দুল কাদের : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মঞ্চে আসার পর বক্তৃতা করেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহণ, যোগাযোগ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং সংসদের চিফ হুইপ নূর-ই আলম চৌধুরী লিটন এমপি।

জনসভায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, বঙ্গবন্ধুকন্যা আপস করেননি। সাহসের সঙ্গে এগিয়ে গেছেন, চক্রান্ত আর সব বাধাকে অতিক্রম করে তিনি জানিয়ে দিয়েছেন-বাঙালি বীরের জাতি।

নিজের নামে পদ্মা সেতু করতে দেননি উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজকে নিজের নাম পদ্মার সঙ্গে যুক্ত করেননি। কিন্তু বাংলার জনগণ জানে, বাংলার জনগণের হৃদয়ে আজকে তিনি যে স্মৃতি, যে আবেগ, যে ভালোবাসা গেঁথে দিলেন-যতদিন এ পদ্মা সেতু থাকবে, যতদিন এখানে চন্দ্র-সূর্য উদয় হবে, ততদিন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা আপনাকেও স্মরণ করবে।

বিএনপির মুখে আজ শ্রাবণের আকাশের মেঘ জড়ো হয়েছে মন্তব্য করে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন, আজকে সবাই খুশি, সবার মুখে আনন্দের হাসি আর বিএনপির মুখে শ্রাবণের আকাশের মেঘ। এত ষড়যন্ত্র, এত কূটচাল, তারপরও শেখ হাসিনা পদ্মা সেতু করে ফেললেন? তাই মির্জা ফখরুলদের মন খারাপ। বুকে বড় ব্যথা, জ্বালায় জ্বালায় মরছে তারা।

এর আগে বক্তৃতা করেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ড. আবদুর রাজ্জাক, শাজাহান খান, অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক, আবদুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক এসএম কামাল হোসেন, শেখ হেলাল এমপি প্রমুখ।

সভা যৌথভাবে পরিচালনা করেন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম ও প্রচার সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপ। প্রধানমন্ত্রীর কন্যা এবং অটিজম ও নিউরোডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডার সংক্রান্ত জাতীয় উপদেষ্টা কমিটির চেয়ারপারসন সায়মা ওয়াজেদ পুতুল এ সময় মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠান শেষে প্রধানমন্ত্রী হেলিকপ্টারে জাজিরা থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওয়ানা হন।

জনসভায় প্রধানমন্ত্রী

কেউ দাবায়ে রাখতে পারেনি পারবে না

 হাসিবুল হাসান, শিবচর থেকে 
২৬ জুন ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
প্রধানমন্ত্রী
মাদারীপুরের কাঁঠালবাড়ীতে শনিবার আওয়ামী লীগের জনসভায় জনতার উদ্দেশে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা -পিএমও

আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, পদ্মা সেতু নির্মাণে যারা বাধা দিয়েছিল, তাদের একটা জবাব আমরা দিয়েছি। তাদের একটা উপযুক্ত জবাব আমরা পদ্মা সেতুর মধ্য দিয়ে দিতে পারলাম যে, বাংলাদেশও পারে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, ‘আমাদের কেউ দাবায়ে রাখতে পারবা না।’ কেউ দাবায়ে রাখতে পারেনি, পারবে না; আমরা বিজয়ী হয়েছি। 

শনিবার পদ্মা সেতুর উদ্বোধন উপলক্ষ্যে মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার কাঁঠালবাড়ীর বাংলাবাজার ইলিয়াস আহমেদ চৌধুরী ফেরিঘাট প্রান্তে আওয়ামী লীগ আয়োজিত জনসভায় তিনি এসব কথা বলেন। সভাপতির বক্তব্যে শেখ হাসিনা আরও বলেন, নিজের জীবন দিয়ে হলেও আগামী প্রজন্মের জন্য উন্নত জীবন নিশ্চিত করব।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০০১ সালে আমরা পদ্মা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলাম। খালেদা জিয়া এসে তা বন্ধ করে দেন। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ শুরু করে। তখন খালেদা জিয়ারা বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ কোনোদিন নাকি পদ্মা সেতুর কাজ করতে পারবে না।

আমি তাকে (খালেদা জিয়া) বলব-আসুন, দেখুন পদ্মা সেতু নির্মাণ হয়েছে কিনা। অনেক জ্ঞানী-গুণী অর্থনীতিবিদ, আমলারা বলেছেন-নিজেদের টাকায় পদ্মা সেতু সম্ভব নয়। আজ নিজেদের টাকায় কীভাবে করতে পারলাম? এ সময় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ বিরোধিতাকারী ‘জ্ঞানী-গুণী’দের পদ্মা সেতু দেখার আমন্ত্রণ জানান প্রধানমন্ত্রী।

পদ্মা পারে আয়োজিত বিশাল এ জনসভায় শত ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত ও বাধা মোকাবিলা করে স্বপ্নের পদ্মা সেতু নিজস্ব অর্থায়নে নির্মাণের নানা চিত্র তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। জনগণের শক্তি, সাহস ও অনুপ্রেরণার জন্যই তার পক্ষে এটা করা সম্ভব হয়েছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, নিজেদের অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ, দেশের জনগণ আমার পাশে দাঁড়িয়েছে বলেই সম্ভব হয়েছে। সারা দেশের মানুষ পাশে দাঁড়িয়েছে। পদ্মা সেতু প্রমাণ করে-জনগণের শক্তিই বড় শক্তি। আমি সেটাই বিশ্বাস করি। 

আবেগজড়িত কণ্ঠে প্রধানমন্ত্রী বলেন-বাবা-মা, ভাই সব হারিয়ে পেয়েছি আপনাদের। আপনাদের পাশে আমি আছি, আপনাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য, আপনাদের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য আমি যে কোনো ত্যাগ স্বীকারে সব সময় প্রস্তুত।

আমি আপনাদের প্রয়োজনে আমার নিজের জীবনটাও দেব। আরও উন্নত জীবন যেন আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরা পায়, সে ব্যবস্থা আমি করব। আজ আপনাদের কাছে এটাই আমার ওয়াদা। 

দুপুর ১২টা ৫১ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী জনসভাস্থলে এসে পৌঁছে হাত নেড়ে জনসমুদ্রে থাকা কয়েক লাখ মানুষকে শুভেচ্ছার জবাব দেন। এ সময় তারা করতালি ও স্লোগান দিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে অভিবাদন জানান। বক্তব্য শেষে আবেগে উদ্বেলিত প্রধানমন্ত্রী নিজেই ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান ধরলে জনসমুদ্রে থাকা মানুষের গগনবিদারী এ স্লোগানে গোটা এলাকা প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। 

এর আগে দুপুর ১২টা ৩৫ মিনিটে জাজিরা প্রান্তে ফলক উন্মোচন করেন প্রধানমন্ত্রী। উদ্বোধনী ফলক ও ম্যুরাল-২ উন্মোচন করে মোনাজাতে অংশগ্রহণ করেন তিনি। পরে তিনি জনসমাবেশে আসেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মঞ্চে আসার পর বক্তৃতা করেন চিফ হুইপ নূর-ই আলম চৌধুরী এবং আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।

এর আগে বক্তৃতা করেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ড. আবদুর রাজ্জাক, শাজাহান খান, জাহাঙ্গীর কবির নানক, আবদুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক এসএম কামাল হোসেন, শেখ হেলাল এমপি প্রমুখ।

প্রধানমন্ত্রী কাঁঠালবাড়ীর জনসভায় পৌঁছাতেই মঞ্চে বাজানো হয় বাংলাদেশের লোকগানের উজ্জ্বল নক্ষত্র শিল্পী আবদুল আলীমের ‘সর্বনাশা পদ্মা নদীরে’ গানটি। এরপর বেজে ওঠে, ‘ও নদীরে একটি কথা শুধাই শুধু তোমারে’ গানটি।

ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠে পুরো জনসভা। মঞ্চে এসে হাত নেড়ে নেতাকর্মীদের শুভেচ্ছা জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনা দুপুর ১টা ৯ মিনিটে বক্তৃতা শুরু করে ১টা ২৩ মিনিটে শেষ করেন।

১৪ মিনিট জনসভায় ভাষণ দেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও অনুষ্ঠানের সভাপতি। সভা যৌথভাবে পরিচালনা করেন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম ও প্রচার সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপ।

জনসভা শেষে পদ্মা সেতুর শরীয়তপুরের জাজিরা প্রান্তের সার্ভিস এরিয়া-২-এর উদ্দেশে সড়কপথে যাত্রা করেন প্রধানমন্ত্রী। বিকাল ৫টায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হেলিকপ্টারে জাজিরা থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওয়ানা হন।

নির্বিঘ্নে চলতে পারবেন : বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুর অর্থায়ন থেকে সরে যাওয়ার পর জনগণের ‘সাহস ও শক্তি নিয়েই’ সেতুর কাজ শুরু করেছিলেন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজ আলহামদুলিল্লাহ, আমরা সেই পদ্মা সেতু নির্মাণ করেছি।

আর আপনাদের কষ্ট করতে হবে না। এই খরস্রোতা পদ্মা নদী পার হতে গিয়ে আর কাউকে সন্তান হারাতে হবে না, বাবা-মা, ভাইবোনকে হারাতে হবে না। আজ সেখানে আপনারা নির্বিঘ্নে চলতে পারবেন। সেই ব্যবস্থা আমরা করেছি। 

দুর্নীতি নয়, বরং ড. মুহাম্মদ ইউনূসের তদবিরেই পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন থেকে বিশ্বব্যাংক সরে গিয়েছিল মন্তব্য করেন সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা। দুর্নীতির সেই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে তিনি বলেন, কে দুর্নীতি করেছে? এই সেতু আমাদের প্রাণের সেতু। যে সেতুর সঙ্গে আমার দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের ভাগ্য জড়িত, সেই সেতু করতে গিয়ে কেন দুর্নীতি হবে? 

অনেকে বিঘ্ন সৃষ্টির চেষ্টা করেছে : জাতীয় সংসদে তখন তার (শেখ হাসিনা) ঘোষণা ছিল ‘বাংলাদেশ বসে থাকবে না, আমরা নিজের টাকায় এই পদ্মা সেতু তৈরি করব’ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অনেকে অনেকভাবে বিঘ্ন সৃষ্টির চেষ্টা করেছে এবং তাদের একটা ধারণা ছিল যে বাংলাদেশ নিজের টাকায় এই সেতু নির্মাণ করতে পারবে না।

কিন্তু তিনি জনগণের শক্তিতে আস্থা রেখেছিলেন। পদ্মা সেতুর অর্থায়ন বন্ধের পর তার উদ্যোগে জনগণ ব্যাপকভাবে এগিয়ে আসে এবং তার মাঝেও শক্তি সঞ্চারিত করেছে বলেই আজ পদ্মা সেতু নির্মাণ সম্ভব হয়েছে। তিনি মহান সৃষ্টিকর্তার কাছেও এজন্য শোকরিয়া জানান।

বিশ্বব্যাংককে বাদ দিয়ে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ সম্ভব নয় বলে অনেকেই নিরুৎসাহিত করেছিলেন। তাদের উদ্দেশ করে প্রধানমন্ত্রী পালটা প্রশ্ন করে বলেন, আজকে কীভাবে করতে পারলাম? বাস্তবে আপনারা, এই দেশের জনগণ আমাকে সমর্থন দিয়েছেন, পাশে থেকেছেন। জনগণের শক্তিই সবচেয়ে বড় শক্তি। আমি সেটাই বিশ্বাস করি। 

দুঃখ ঘুচে যাবে : আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দক্ষিণবঙ্গের ব্যাপক উন্নয়ন করার চিত্র তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, আমাদের প্রত্যেকটা এলাকা এত দুর্গম ছিল, আজকে সেখানে রাস্তাঘাট, পুল-ব্রিজ করেছি বলেই সব জায়গায় যোগাযোগ স্থাপন হয়েছে।

বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলে। এই এলাকার মানুষ যেন নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারে, সেজন্য পায়রা পর্যন্ত আমরা সেতু বানিয়ে দিয়েছি। এখন নিশ্চিন্তে মানুষ চলাফেরা করতে পারে। স্বপ্নের পদ্মা সেতু নির্মিত হওয়ায় দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যাপক গতি আসার সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, সারা দেশে আমরা অর্থনৈতিক অঞ্চল করছি। আজকে পদ্মা সেতু হয়েছে। এখানেও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল হবে, শিল্পাঞ্চল হবে, কর্মসংস্থান হবে, কলকারখানা হবে, আমাদের ফসল উৎপাদন হবে।

সেই ফসল আমরা প্রক্রিয়াজাত করতে পারব। দেশে-বিদেশে রপ্তানি করতে পারব। এখানে যে মাছ হবে, তা আমরা প্রক্রিয়াজাত করে দেশে-বিদেশে পাঠাতে পারব। বাংলাদেশের মানুষের দুঃখ ঘুচে যাবে। ভাগ্য পরিবর্তন হবে।

আজকের দিনটি ‘বিশেষ’ : খাদ্যের চাহিদা পূরণে সবাইকে ফসল উৎপাদনের দিকে জোর দিতে এবং আগামী বর্ষাকালে এ অঞ্চলে বন্যা হতে পারে বলে সতর্ক করে দিয়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, এখন থেকে আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি, আপনারাও প্রস্তুতি নিতে থাকেন।

যে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার শক্তি বাংলাদেশ রাখে। দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জন্য আজকের দিনটি ‘বিশেষ’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই শরীয়তপুরে যখন এসেছি, তখন কী ছিল? লঞ্চে এসেছি, লঞ্চ নষ্ট হয়ে গেছে। নৌকায় করে একেকটা এলাকায় গিয়েছি, মিটিং করেছি।

আজকে সেই শরীয়তপুরের অবস্থা পালটে গেছে। কারণ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসায় রাস্তাঘাট, পুল-ব্রিজের উন্নয়ন হয়েছে। মাদারীপুরেও একই অবস্থা ছিল। গোপালগঞ্জ যেতে ২২ ঘণ্টা সময় লাগত। প্রত্যেকটা এলাকা এত দুর্গম ছিল। রাস্তাঘাট করেছি বলেই যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন হয়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলে।

জাতির পিতাকে স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতা যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গড়ার যাত্রা যখন শুরু করলেন, মাত্র সাড়ে তিন বছর হাতে সময় পেয়েছিলেন। এই সময়ে ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশ করেন।

যখন দেশের দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়ে তৃণমূল পর্যন্ত ক্ষমতা নিয়ে যান, দুর্ভাগ্য তখন জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যা করা হলো। তিনি বলেন, ওই সময়ে রেহানা ও আমি বিদেশে ছিলাম। দেশে আসতে পারিনি।

১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগ আমাকে সভাপতি নির্বাচিত করে। শত বাধা পেরিয়ে আমি আপনাদের মাঝে আসি। আমার লক্ষ্য জাতির পিতার সেই স্বপ্ন পূরণ করা। বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করা।

দেশের মানুষের জন্য উন্নত জীবন নিশ্চিত করা। অনেক চড়াই-উতরাই পার হয়ে আজকে আমরা বাংলাদেশের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পেরেছি। আজকে বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ।

আজকে আমরা বিনা পয়সায় বই দিচ্ছি। প্রতিটি এলাকায় স্কুল করে দিচ্ছি, কলেজ করে দিচ্ছি। বিশ্ববিদ্যালয় করে দিয়ে শিক্ষার দ্বার উন্মোচন করেছি। কমিউনিটি ক্লিনিক করে দিয়ে মানুষের ঘরের কাছে চিকিৎসা সেবার ব্যবস্থা করেছি।

গত ১৩ বছরে দেশের ব্যাপক উন্নয়ন ও দেশের চেহারা বদলে দেওয়ার চিত্র লাখো জনতার উদ্দেশে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, আমার ওয়াদা ছিল প্রত্যেক ঘরে আলো জ্বলবে। আজ বাংলাদেশের প্রতিটি ঘরে আমরা বিদ্যুৎ পৌঁছে দিয়েছি।

ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তুলব বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম। আজ ডিজিটাল বাংলাদেশ। সবার হাতে মোবাইল ফোন, সবাই আজ অনলাইনে কেনাবেচা করতে পারেন-সেই ব্যবস্থা আমরা করেছি। মানুষের জীবন-জীবিকার ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। উন্নত জীবন যাতে সবাই পায়, সেই ব্যবস্থা আমরা করব।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে পেরেছি। এই একটা কারণে বাংলাদেশের জনগণ ভোট দিয়েছে। নির্বাচিত হয়েছি এবং এ দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে কাজ করে যাচ্ছি। উপস্থিত জনগণকে প্রশ্ন করে তিনি বলেন, এই বাংলাদেশের জনগণ, আপনারা আমাকে সমর্থন দিয়েছেন।

পাশে দাঁড়িয়েছেন। জনগণের শক্তি সব থেকে বড় শক্তি। কী বলেন আপনারা? জনসমুদ্র থেকে সবাই হাত তুলে ‘হ্যাঁ’ বলার পর প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণের শক্তি বড় শক্তি, আমি সেটাই বিশ্বাস করেছি। 

প্রধানমন্ত্রী এ সময় করোনাভাইরাস এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পাশাপাশি সবার টিকা গ্রহণ এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষাবিধি মেনে চলারও পরামর্শ দেন। পাশাপাশি দেশের এক ইঞ্চি জমিও যাতে অনাবাদি না থাকে, তা নিশ্চিত করারও আহ্বান জানান তিনি।

প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যের শেষাংশে এই রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে কষ্ট করে জনসভাস্থলে সবাইকে আসায় এবং দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষা করায় শুভেচ্ছা জানিয়ে কবির ভাষায় বলেন-‘নিঃস্ব আমি, রিক্ত আমি, দেবার কিছুই নেই/ আছে শুধু ভালোবাসা দিয়ে গেলাম তাই।/’ তিনি সবার সুস্থতা ও মঙ্গল কামনা করে দেশকে যেন এভাবেই এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেন, সেজন্য সবার কাছে দোয়া প্রার্থনাও করেন।

ওবায়দুল কাদের : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মঞ্চে আসার পর বক্তৃতা করেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহণ, যোগাযোগ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং সংসদের চিফ হুইপ নূর-ই আলম চৌধুরী লিটন এমপি।

জনসভায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, বঙ্গবন্ধুকন্যা আপস করেননি। সাহসের সঙ্গে এগিয়ে গেছেন, চক্রান্ত আর সব বাধাকে অতিক্রম করে তিনি জানিয়ে দিয়েছেন-বাঙালি বীরের জাতি।

নিজের নামে পদ্মা সেতু করতে দেননি উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজকে নিজের নাম পদ্মার সঙ্গে যুক্ত করেননি। কিন্তু বাংলার জনগণ জানে, বাংলার জনগণের হৃদয়ে আজকে তিনি যে স্মৃতি, যে আবেগ, যে ভালোবাসা গেঁথে দিলেন-যতদিন এ পদ্মা সেতু থাকবে, যতদিন এখানে চন্দ্র-সূর্য উদয় হবে, ততদিন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা আপনাকেও স্মরণ করবে।

বিএনপির মুখে আজ শ্রাবণের আকাশের মেঘ জড়ো হয়েছে মন্তব্য করে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন, আজকে সবাই খুশি, সবার মুখে আনন্দের হাসি আর বিএনপির মুখে শ্রাবণের আকাশের মেঘ। এত ষড়যন্ত্র, এত কূটচাল, তারপরও শেখ হাসিনা পদ্মা সেতু করে ফেললেন? তাই মির্জা ফখরুলদের মন খারাপ। বুকে বড় ব্যথা, জ্বালায় জ্বালায় মরছে তারা।

এর আগে বক্তৃতা করেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ড. আবদুর রাজ্জাক, শাজাহান খান, অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক, আবদুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক এসএম কামাল হোসেন, শেখ হেলাল এমপি প্রমুখ।

সভা যৌথভাবে পরিচালনা করেন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম ও প্রচার সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপ। প্রধানমন্ত্রীর কন্যা এবং অটিজম ও নিউরোডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডার সংক্রান্ত জাতীয় উপদেষ্টা কমিটির চেয়ারপারসন সায়মা ওয়াজেদ পুতুল এ সময় মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠান শেষে প্রধানমন্ত্রী হেলিকপ্টারে জাজিরা থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওয়ানা হন।
 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন