সাড়ে ৯ বছরে ছাড় ১৪৫ কোটি ডলার
jugantor
পদ্মা সেতুতে নিজস্ব উৎস থেকে জোগান
সাড়ে ৯ বছরে ছাড় ১৪৫ কোটি ডলার

  যুগান্তর প্রতিবেদন   

২৬ জুন ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

পদ্মা বহুমুখী সেতুতে নিজস্ব উৎস থেকে ডলারের জোগান দিতে গিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ নিতে হয়েছে। এ চ্যালেঞ্জ শক্তভাবে মোকাবিলাও করা হয়েছে।

বিশেষ করে রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় বাড়িয়ে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বাড়ানো হয়েছে। এতে পদ্মা সেতুতে বড় অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রার জোগান দেওয়া হলেও মুদ্রা বাজারে কোনো অস্থিরতা দেখা দেয়নি।

কিন্তু করোনাপরবর্তী পরিস্থিতি ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে অস্থিরতা তৈরি করছে। যেটিও বিচক্ষণতার সঙ্গে মোকাবিলা করা হচ্ছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করে।

পদ্মা সেতুর মোট ব্যয় কয়েক দফায় বেড়ে ৩৫৬ কোটি ডলার বা ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। এর মধ্যে বৈদেশিক মুদ্রায় জোগান দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ২৪০ কোটি ডলার।

বাকি অর্থ স্থানীয় মুদ্রা টাকায় দেওয়া হবে। বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদার মধ্যে ইতোমধ্যে ১৪৫ কোটি ডলার ছাড় করা হয়েছে। আরও বাকি রয়েছে ৯৫ কোটি ডলার।

এগুলো পর্যায়ক্রমে দেওয়া হবে। এর মধ্যে রয়েছে-এলসির বকেয়া, নির্মাণ ও সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ফি ও অন্যান্য আমদানি খাতের ব্যয়।

বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন বন্ধ করে দিলে সরকার নিজস্ব অর্থেই এই সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়। ২০১২ সালের মে মাসে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে একটি বৈঠকে সরকারের নীতিনির্ধারকরা উপস্থিত ছিলেন।

ওই বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর ড. আতিউর রহমানও ছিলেন। ওই বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী নিজস্ব অর্থে পদ্মা সেতু করার বিষয়টি তোলেন। বলেন, নিজস্বভাবে কি বৈদেশিক মুদ্রা জোগান দেওয়া যাবে না? সব বৈদেশিক মুদ্রা তো একসঙ্গে লাগবে না।

উত্তরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর বলেছিলেন, যে বৈদেশিক মুদ্রা লাগবে সেগুলো একসঙ্গে দিতে হবে না। পর্যায়ক্রমে লাগবে। এর মধ্যে রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় বাড়ছে। ফলে রিজার্ভও বাড়ছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার জোগান নিজস্বভাবেই দেওয়া সম্ভব হবে।

২০১২ সালের ৪ জুলাই প্রধানমন্ত্রী নিজস্ব অর্থে এ সেতু নির্মাণের ঘোষণা দেন। এরপরই শুরু হয় সেতু নির্মাণে অর্থায়ন প্রক্রিয়ার কৌশল প্রণয়ন। এর মধ্যে বৈদেশিক মুদ্রার জোগান দেওয়ার বিষয়ে শুরু হয় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।

তখন সেতুর ব্যয় অনুযায়ী দেশীয় উৎস থেকে বৈদেশিক মুদ্রার জোগান দেওয়ার কথা ছিল ১৪০ কোটি ডলার। ধীরে ধীরে এটি দেওয়া সম্ভব হবে বলে সরকারকে আশ্বস্ত করা হয়। এর মধ্যে সেতুর অন্যান্য কাজ এগিয়ে চলে।

সরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে তখন রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্স আহরণ ও বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভে জোগান দেওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রণী ব্যাংক এগিয়ে ছিল। যে কারণে পদ্মা সেতুতে বৈদেশিক মুদ্রার জোগান দিতে অগ্রণী ব্যাংককে বেছে নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

ওই বছরেই অগ্রণী ব্যাংকের গুলশান শাখায় পদ্মা সেতুর একটি হিসাব খোলা হয়। এর ভিত্তিতে ২০১৪ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি পদ্মা সেতুতে অর্থায়নের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রথম বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়।

ওই বৈঠকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর ড. আতিউর রহমান, বৈদেশিক মুদ্রা নীতি বিভাগ, বৈদেশিক মুদ্রা বিনিয়োগ বিভাগ, ফরেক্স রিজার্ভ অ্যান্ড ট্রেজারি বিভাগের কর্মকর্তা, পদ্মা সেতু প্রকল্পের কর্মকর্তা ও অগ্রণী ব্যাংকের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

ওই সভায় সিন্থান্ত হয়েছিল, অগ্রণী ব্যাংক নিজস্ব তহবিল থেকে পদ্মা সেতুতে বৈদেশিক মুদ্রার জোগান দেবে। তাদের কাছে চাহিদা অনুযায়ী বৈদেশিক মুদ্রা না থাকলে বাজার থেকে কিনবে।

বাজারে পর্যাপ্ত মুদ্রা না থাকলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ থেকে জোগান দেবে। কেননা তখন দেশের রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্স বাড়ছিল। এতে রিজার্ভে ইতিবাচক প্রভাব পড়ছিল।

যেহেতু পদ্মা সেতুর মতো বড় প্রকল্পে অর্থায়ন করতে হবে, সে কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকও রিজার্ভ বাড়ানোর দিকে মনোযোগী হয়। ২০০৬ সালে বিএনপি যখন ক্ষমতা ছাড়ে তখন রিজার্ভ ছিল ৩৪৯ কোটি ডলার।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২০০৯ সালের শুরুর দিকে ক্ষমতা ছাড়ার সময় রিজার্ভ ছিল ৫১৫ কোটি ডলার। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর রিজার্ভ আরও বাড়তে থাকে।

২০১৪ সালের জুনে রিজার্ভ ছিল ১ হাজার ৫৩১ কোটি ডলার। ২০১৪ সালে তা আরও বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ১৫১ কোটি ডলারে।

গত বছরের রিজার্ভ বেড়ে সর্বোচ্চ ৪ হাজার ৭০০ কোটি ডলারে উঠেছে। এখন আমদানি ব্যয় বাড়ায় ও রেমিট্যান্স কমায় রিজার্ভ ৪ হাজার ১৬০ কোটি ডলারে নেমে এসেছে।

সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু করতে বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে নিশ্চয়তাপত্র দিতে হয়। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রাও পাঠাতে হয়। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী দেশ থেকে নিয়মের বাইরে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে অনুমোদন নিতে হয়।

কিন্তু পদ্মা সেতুর ক্ষেত্রে এ অনুমোদন একবারে অগ্রণী ব্যাংককে দেওয়া হয়। অর্থাৎ যতবার বৈদেশিক মুদ্রা পাঠানোর প্রয়োজন হবে ততবারই তারা পাঠাতে পারবে।

নতুন করে কোনো অনুমোদন লাগবে না। বৈদেশিক মুদ্রা পাঠানোর পর শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জানাতে হবে। পদ্মা সেতুর কারণে বৈদেশিক মুদ্রা নীতি শিথিল করা হয়।

এছাড়া একই কারণে বড় অঙ্কের ঋণ সীমা ও এলসি খোলার নীতিমালাও শিথিল করা হয়। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী কোনো ব্যাংক একক কোনো গ্রাহককে তার মূলধনের ৩৫ শতাংশের বেশি ঋণ দিতে পারে না।

খেলাপি ঋণ বেশি হলে আরও কম দিতে পারবে। পদ্মা সেতুতে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে সবই বড় অঙ্কের। এ কারণে পদ্মা সেতুর ক্ষেত্রে ওই নিয়ম শিথিল করা হয়।

যে কারণে সেতুতে বড় অঙ্কের ঋণ ও এলসি খুলতে পেরেছে অগ্রণী ব্যাংক। এছাড়া পদ্মা সেতুর বিষয়ে যে কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষমতা সংশ্লিষ্ট বিভাগের মহাব্যবস্থাপকদের (বর্তমানে পরিচালক) কাছে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। ফলে পদ্মা সেতুতে অর্থায়নে জটিলতা অনেক কমে গিয়েছিল।

সূত্র জানায়, পদ্মা সেতুতে মোট ৩৫৬ কোটি ডলার বা ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকার অর্থায়ন প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে বৈদেশিক মুদ্রায় দিতে হয় ২৪০ কোটি ডলার। বাকি অর্থ স্থানীয় মুদ্রায়।

২০১৩ থেকে এখন পর্যন্ত অগ্রণী ব্যাংক নিজস্ব উৎস থেকে ১৪৫ কোটি ডলারের জোগান দিয়েছে। আরও ৯৫ কোটি ডলার দিতে হবে। এ ডলারও অগ্রণী ব্যাংক আগাম ব্যবস্থা করেছে।

২০১৩ সাল থেকে পদ্মা সেতুতে ডলারের জোগান শুরু হয়। ওই বছরে দেওয়া হয় ৬২ লাখ ৬০ হাজার ডলার। এরপর থেকে জোগান বাড়তে থাকে। জুন পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে ৫ কোটি ৫৫ লাখ ডলার।

বাকি অর্থ দেওয়া হয়েছে ২০১৪ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে। সাড়ে ৯ বছরে প্রতিবছর গড়ে ১৫ কোটি ২৫ লাখ ডলার করে দেওয়া হয়েছে। পুরো অর্থই অগ্রণী ব্যাংক নিজস্ব উৎস থেকে দিয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে পদ্মা সেতুর জন্য কোনো ধার করেনি। তবে অন্যান্য দেনা শোধে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ডলার কিনেছে। ২০১৩ থেকে ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত বাজারে পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ ছিল।

ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে বেশি ডলার কিনেছে। ছাড়তে হয়েছে কম। পদ্মা সেতুতে বৈদেশিক মুদ্রার জোগান দিতে গিয়ে অগ্রণী ব্যাংকের প্রধান নজর ছিল রেমিট্যান্সের দিকে।

যে কারণে সরকার যখন ২ শতাংশ প্রণোদনা ঘোষণা দিয়েছিল তখন তারা আরও ১ শতাংশ বাড়িয়ে ৩ শতাংশ দিয়েছে। এতে তাদের রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে। যা দিয়ে বৈদেশিক মুদ্রায় ভারসাম্য এনেছে।

পদ্মা সেতুতে নিজস্ব উৎস থেকে জোগান

সাড়ে ৯ বছরে ছাড় ১৪৫ কোটি ডলার

 যুগান্তর প্রতিবেদন  
২৬ জুন ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

পদ্মা বহুমুখী সেতুতে নিজস্ব উৎস থেকে ডলারের জোগান দিতে গিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ নিতে হয়েছে। এ চ্যালেঞ্জ শক্তভাবে মোকাবিলাও করা হয়েছে।

বিশেষ করে রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় বাড়িয়ে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বাড়ানো হয়েছে। এতে পদ্মা সেতুতে বড় অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রার জোগান দেওয়া হলেও মুদ্রা বাজারে কোনো অস্থিরতা দেখা দেয়নি।

কিন্তু করোনাপরবর্তী পরিস্থিতি ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে অস্থিরতা তৈরি করছে। যেটিও বিচক্ষণতার সঙ্গে মোকাবিলা করা হচ্ছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করে। 

পদ্মা সেতুর মোট ব্যয় কয়েক দফায় বেড়ে ৩৫৬ কোটি ডলার বা ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। এর মধ্যে বৈদেশিক মুদ্রায় জোগান দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ২৪০ কোটি ডলার।

বাকি অর্থ স্থানীয় মুদ্রা টাকায় দেওয়া হবে। বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদার মধ্যে ইতোমধ্যে ১৪৫ কোটি ডলার ছাড় করা হয়েছে। আরও বাকি রয়েছে ৯৫ কোটি ডলার।

এগুলো পর্যায়ক্রমে দেওয়া হবে। এর মধ্যে রয়েছে-এলসির বকেয়া, নির্মাণ ও সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ফি ও অন্যান্য আমদানি খাতের ব্যয়। 

বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন বন্ধ করে দিলে সরকার নিজস্ব অর্থেই এই সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়। ২০১২ সালের মে মাসে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে একটি বৈঠকে সরকারের নীতিনির্ধারকরা উপস্থিত ছিলেন।

ওই বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর ড. আতিউর রহমানও ছিলেন। ওই বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী নিজস্ব অর্থে পদ্মা সেতু করার বিষয়টি তোলেন। বলেন, নিজস্বভাবে কি বৈদেশিক মুদ্রা জোগান দেওয়া যাবে না? সব বৈদেশিক মুদ্রা তো একসঙ্গে লাগবে না। 

উত্তরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর বলেছিলেন, যে বৈদেশিক মুদ্রা লাগবে সেগুলো একসঙ্গে দিতে হবে না। পর্যায়ক্রমে লাগবে। এর মধ্যে রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় বাড়ছে। ফলে রিজার্ভও বাড়ছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার জোগান নিজস্বভাবেই দেওয়া সম্ভব হবে। 

২০১২ সালের ৪ জুলাই প্রধানমন্ত্রী নিজস্ব অর্থে এ সেতু নির্মাণের ঘোষণা দেন। এরপরই শুরু হয় সেতু নির্মাণে অর্থায়ন প্রক্রিয়ার কৌশল প্রণয়ন। এর মধ্যে বৈদেশিক মুদ্রার জোগান দেওয়ার বিষয়ে শুরু হয় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।

তখন সেতুর ব্যয় অনুযায়ী দেশীয় উৎস থেকে বৈদেশিক মুদ্রার জোগান দেওয়ার কথা ছিল ১৪০ কোটি ডলার। ধীরে ধীরে এটি দেওয়া সম্ভব হবে বলে সরকারকে আশ্বস্ত করা হয়। এর মধ্যে সেতুর অন্যান্য কাজ এগিয়ে চলে।

সরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে তখন রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্স আহরণ ও বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভে জোগান দেওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রণী ব্যাংক এগিয়ে ছিল। যে কারণে পদ্মা সেতুতে বৈদেশিক মুদ্রার জোগান দিতে অগ্রণী ব্যাংককে বেছে নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

ওই বছরেই অগ্রণী ব্যাংকের গুলশান শাখায় পদ্মা সেতুর একটি হিসাব খোলা হয়। এর ভিত্তিতে ২০১৪ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি পদ্মা সেতুতে অর্থায়নের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রথম বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়।

ওই বৈঠকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর ড. আতিউর রহমান, বৈদেশিক মুদ্রা নীতি বিভাগ, বৈদেশিক মুদ্রা বিনিয়োগ বিভাগ, ফরেক্স রিজার্ভ অ্যান্ড ট্রেজারি বিভাগের কর্মকর্তা, পদ্মা সেতু প্রকল্পের কর্মকর্তা ও অগ্রণী ব্যাংকের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

ওই সভায় সিন্থান্ত হয়েছিল, অগ্রণী ব্যাংক নিজস্ব তহবিল থেকে পদ্মা সেতুতে বৈদেশিক মুদ্রার জোগান দেবে। তাদের কাছে চাহিদা অনুযায়ী বৈদেশিক মুদ্রা না থাকলে বাজার থেকে কিনবে।

বাজারে পর্যাপ্ত মুদ্রা না থাকলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ থেকে জোগান দেবে। কেননা তখন দেশের রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্স বাড়ছিল। এতে রিজার্ভে ইতিবাচক প্রভাব পড়ছিল।

যেহেতু পদ্মা সেতুর মতো বড় প্রকল্পে অর্থায়ন করতে হবে, সে কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকও রিজার্ভ বাড়ানোর দিকে মনোযোগী হয়। ২০০৬ সালে বিএনপি যখন ক্ষমতা ছাড়ে তখন রিজার্ভ ছিল ৩৪৯ কোটি ডলার।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২০০৯ সালের শুরুর দিকে ক্ষমতা ছাড়ার সময় রিজার্ভ ছিল ৫১৫ কোটি ডলার। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর রিজার্ভ আরও বাড়তে থাকে।

২০১৪ সালের জুনে রিজার্ভ ছিল ১ হাজার ৫৩১ কোটি ডলার। ২০১৪ সালে তা আরও বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ১৫১ কোটি ডলারে।

গত বছরের রিজার্ভ বেড়ে সর্বোচ্চ ৪ হাজার ৭০০ কোটি ডলারে উঠেছে। এখন আমদানি ব্যয় বাড়ায় ও রেমিট্যান্স কমায় রিজার্ভ ৪ হাজার ১৬০ কোটি ডলারে নেমে এসেছে।

সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু করতে বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে নিশ্চয়তাপত্র দিতে হয়। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রাও পাঠাতে হয়। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী দেশ থেকে নিয়মের বাইরে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে অনুমোদন নিতে হয়।

কিন্তু পদ্মা সেতুর ক্ষেত্রে এ অনুমোদন একবারে অগ্রণী ব্যাংককে দেওয়া হয়। অর্থাৎ যতবার বৈদেশিক মুদ্রা পাঠানোর প্রয়োজন হবে ততবারই তারা পাঠাতে পারবে।

নতুন করে কোনো অনুমোদন লাগবে না। বৈদেশিক মুদ্রা পাঠানোর পর শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জানাতে হবে। পদ্মা সেতুর কারণে বৈদেশিক মুদ্রা নীতি শিথিল করা হয়।

এছাড়া একই কারণে বড় অঙ্কের ঋণ সীমা ও এলসি খোলার নীতিমালাও শিথিল করা হয়। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী কোনো ব্যাংক একক কোনো গ্রাহককে তার মূলধনের ৩৫ শতাংশের বেশি ঋণ দিতে পারে না।

খেলাপি ঋণ বেশি হলে আরও কম দিতে পারবে। পদ্মা সেতুতে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে সবই বড় অঙ্কের। এ কারণে পদ্মা সেতুর ক্ষেত্রে ওই নিয়ম শিথিল করা হয়।

যে কারণে সেতুতে বড় অঙ্কের ঋণ ও এলসি খুলতে পেরেছে অগ্রণী ব্যাংক। এছাড়া পদ্মা সেতুর বিষয়ে যে কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষমতা সংশ্লিষ্ট বিভাগের মহাব্যবস্থাপকদের (বর্তমানে পরিচালক) কাছে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। ফলে পদ্মা সেতুতে অর্থায়নে জটিলতা অনেক কমে গিয়েছিল। 

সূত্র জানায়, পদ্মা সেতুতে মোট ৩৫৬ কোটি ডলার বা ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকার অর্থায়ন প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে বৈদেশিক মুদ্রায় দিতে হয় ২৪০ কোটি ডলার। বাকি অর্থ স্থানীয় মুদ্রায়।

২০১৩ থেকে এখন পর্যন্ত অগ্রণী ব্যাংক নিজস্ব উৎস থেকে ১৪৫ কোটি ডলারের জোগান দিয়েছে। আরও ৯৫ কোটি ডলার দিতে হবে। এ ডলারও অগ্রণী ব্যাংক আগাম ব্যবস্থা করেছে।

২০১৩ সাল থেকে পদ্মা সেতুতে ডলারের জোগান শুরু হয়। ওই বছরে দেওয়া হয় ৬২ লাখ ৬০ হাজার ডলার। এরপর থেকে জোগান বাড়তে থাকে। জুন পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে ৫ কোটি ৫৫ লাখ ডলার।

বাকি অর্থ দেওয়া হয়েছে ২০১৪ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে। সাড়ে ৯ বছরে প্রতিবছর গড়ে ১৫ কোটি ২৫ লাখ ডলার করে দেওয়া হয়েছে। পুরো অর্থই অগ্রণী ব্যাংক নিজস্ব উৎস থেকে দিয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে পদ্মা সেতুর জন্য কোনো ধার করেনি। তবে অন্যান্য দেনা শোধে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ডলার কিনেছে। ২০১৩ থেকে ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত বাজারে পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ ছিল।

ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে বেশি ডলার কিনেছে। ছাড়তে হয়েছে কম। পদ্মা সেতুতে বৈদেশিক মুদ্রার জোগান দিতে গিয়ে অগ্রণী ব্যাংকের প্রধান নজর ছিল রেমিট্যান্সের দিকে।

যে কারণে সরকার যখন ২ শতাংশ প্রণোদনা ঘোষণা দিয়েছিল তখন তারা আরও ১ শতাংশ বাড়িয়ে ৩ শতাংশ দিয়েছে। এতে তাদের রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে। যা দিয়ে বৈদেশিক মুদ্রায় ভারসাম্য এনেছে।
 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন