সারা দেশে প্রতিবাদের ঝড়
jugantor
শিক্ষক হত্যা ও অধ্যক্ষ লাঞ্ছিত
সারা দেশে প্রতিবাদের ঝড়

  যুগান্তর ডেস্ক  

২৯ জুন ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সারা দেশে প্রতিবাদের ঝড়

সাভারের আশুলিয়ায় শিক্ষককে পিটিয়ে হত্যা এবং নড়াইলে কলেজ অধ্যক্ষের গলায় জুতার মালা পরিয়ে দেওয়ার ঘটনায় দেশজুড়ে প্রতিবাদের ঝড় বইছে। মঙ্গলবার রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন শহর এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতিবাদ সমাবেশ হয়েছে।

এসব প্রতিবাদ সমাবেশ থেকে অপরাধীদের দ্রুত বিচারের দাবি জানানো হয়। আশুলিয়ার হাজী ইউনুস আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক উৎপল কুমার সরকারকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা ফুঁসে উঠছেন।

শিক্ষক উৎপলের হত্যাকারীকে দ্রুত গ্রেফতার ও বিচারের দাবিতে আশুলিয়ার চিত্রশাইল এলাকার বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিলসহ নানা কর্মসূচি পালন করেছেন। হত্যাকারীকে গ্রেফতারসহ ছয় দফা দাবিতে আন্দোলন করছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।

এদিকে নড়াইল সদরের মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসের গলায় জুতার মালা পরিয়ে লাঞ্ছিত করার ঘটনার ৯ দিন পর মামলা করেছে পুলিশ। মামলার পর সোমবার রাতে জড়িত সন্দেহে তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অধ্যক্ষের গলায় জুতার মালা পরানোর ঘটনায় রিট আবেদন করতে বলেছেন হাইকোর্ট।

এ সম্পর্কে ব্যুরো ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-

ঢাবি : রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে আয়োজিত প্রতিবাদ সমাবেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থী, জগন্নাথ হলের শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় সংগঠনের সদস্যরা অংশ নেন। শিক্ষক নির্যাতনের সঙ্গে জড়িতদের বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীসহ সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।

সমাবেশে জগন্নাথ হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক মিহির লাল সাহা বলেন, আমি শিক্ষক হিসাবে এখানে বক্তব্য দিচ্ছি, আমি জানি না আমি কতটুকু নিরাপদ। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েও নিরাপত্তার কথা চিন্তা করছি। কারণ আমি সনাতন ধর্মাবলম্বী। সনাতন ধর্মের প্রত্যেক শিক্ষক আজ একরকম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। সাম্প্রদায়িকতাকে শিকড় থেকে তুলে আনা না গেলে এ সমস্যার সমাধান হবে না। এ বাংলাদেশ হয় পাকিস্তান হবে, নয় আফগানিস্তান হবে-এখনই সময় এর রশি টেনে ধরা। অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। জনসম্মুখে তাদের বিচার করা উচিত। তাহলেই শিক্ষা হবে।

জগন্নাথ হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি কাজল দাস বলেন, যে প্রজন্ম শিক্ষককে জুতার মালা গলায় পরায়, যে প্রজন্ম শিক্ষককে স্টাম্প দিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলতে পারে, সে প্রজন্মের লাগাম এখনই টেনে ধরতে হবে। যে প্রজন্মের শিক্ষাদীক্ষা ও গবেষণায় দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা, সেই প্রজন্ম আজ ইয়াবার নেশায় আসক্ত হয়ে শিক্ষকদের নির্যাতনসহ বিভিন্ন অপকর্মে জড়িয়ে যাচ্ছে।

এ ঘটনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা প্রতিবাদ না জানানোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, আজ আমরা লজ্জিত। যেখানে শিক্ষকসমাজের দাঁড়ানোর কথা, সেখানে আমরা দাঁড়িয়েছি।

জগন্নাথ হল ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক অতনু বর্মণ বলেন, যে শিক্ষকরা জাতির মেরুদণ্ড, স্টাম্পের আঘাতে তাদের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে শিক্ষকরা মন খুলে পড়াতে পারেন না। মনের ভাব প্রকাশ করতে গেলে কথিত ধর্ম অবমাননার অপবাদ দিয়ে গণপিটুনি দেওয়া হয়, নতুবা জেলে যেতে হয়। এ বিষদাঁত ভেঙে দিতে হবে। যেভাবে পারি, এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে।

এদিকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে নড়াইলের কলেজ শিক্ষক স্বপন কুমার বিশ্বাসের গলায় জুতার মালা পরানোর ঘটনায় রিট আবেদন নিয়ে আসতে বলেছেন হাইকোর্ট। এ বিষয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন আদালতের নজরে আনেন আইনজীবী পূর্ণিমা জাহান। তখন হাইকোর্ট বলেন, আপনারা রিট আবেদন নিয়ে আসুন। আমরা শুনব।

পরে পূর্ণিমা জাহান গণমাধ্যমকে বলেন, আগামীকাল বৃহস্পতিবার এ ঘটনায় আমরা রিট আবেদন করব।

আশুলিয়া (ঢাকা) : শিক্ষক উৎপলকে হত্যার প্রতিবাদে আশুলিয়ার চিত্রশাইল এলাকার হাজী ইউনুস আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং এর আশপাশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেছে। উৎপল হত্যাকারী বখাটে আশরাফুল ইসলাম জিতুকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেফতারসহ ছয় দফা দাবি তুলেছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।

দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে-বখাটে জিতুকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেফতার করতে হবে, জিতুর পরিবারের পলাতক সদস্যদের আইনের আওতায় আনতে হবে, নিহতের পরিবারকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিতে হবে, স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্থানীয় ও বাইরের শিক্ষার্থীদের মধ্যকার ভেদাভেদ দূর করতে আইন প্রণয়ন করতে এবং কিশোর গ্যাং ও কিশোর অপরাধ দূর করতে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

শনিবার শিক্ষক উৎপলের ওপর হামলার ঘটনার পর থেকে হাজী ইউনুছ আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজ বন্ধ রয়েছে। রোববার উৎপলের মারা যাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে ওই প্রতিষ্ঠানের সামনে শত শত শিক্ষার্থী জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করেন। যতক্ষণ পর্যন্ত বখাটে জিতু গ্রেফতার না হবে, ততক্ষণ আন্দোলন কর্মসূচি চলবে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

হাজী ইউনুছ আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীরা জানান, উৎপল স্যার শৃঙ্খলা কমিটির সভাপতি ছিলেন। তিনি বিভিন্ন সময় শিক্ষার্থীদের নিয়মশৃঙ্খলা ভঙ্গ ও ইভটিজিংয়ের বিষয়ে বখাটেদের শাসন করতেন। কয়েকদিন আগে এক ছাত্রীকে উত্ত্যক্ত করার জন্য ওই ছাত্রকে শাসন করেছিলেন উৎপল স্যার। মঙ্গলবার সকালেও ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাসহ সর্বস্তরের মানুষ জিতুর বিচার চেয়ে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করে।

রোববার উৎপলের ভাই অসীম কুমার সরকার বাদী হয়ে আশুলিয়া থানায় জিতুসহ কয়েকজনকে আসামি করে মামলা করেছেন। ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হুমায়ুন কবির বলেন, বখাটে ছাত্রকে গ্রেফতারে অভিযান চলছে।

নড়াইল : ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসের গলায় জুতার মালা পরিয়ে লাঞ্ছিত করার ঘটনার ৯ দিন পর পুলিশ সোমবার নড়াইল সদর থানায় মামলা করেছে। উপপরিদর্শক ও মির্জাপুর ফাঁড়ির ইনচার্জ শেখ মোহাম্মদ মোরছালিন ১৭০ থেকে ১৮০ জনের নামে মামলা করেন। সোমবার রাতেই জড়িত তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মঙ্গলবার নড়াইল সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শওকত কবীর এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

গ্রেফতার ব্যক্তিরা হলেন মির্জাপুর বাজারে মোবাইল ফোন ব্যবসায়ী বখাটে শাওন মুন্সী (জুতার মালা পরানোর ভিডিওতে লাল গেঞ্জি পরা শাওনকে চিহ্নিত করা হয়েছে), মির্জাপুর মধ্যপাড়ার মনিরুল ইসলাম এবং মির্জাপুর গ্রামের সৈয়দ রিমন আলী।

এদিকে স্বপন কুমারকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশনা দিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। চলতি দায়িত্ব থেকে তাকে সরিয়ে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এ চেষ্টা করা হলে মাউশি অনুমোদন দেবে না। বিক্ষোভের মধ্যে সোমবার কমিটি গঠনের কথা জানায় মাউশি।

চট্টগ্রাম : শিক্ষক উৎপল কুমার সরকারকে হত্যায় জড়িতদের শাস্তির দাবিতে মানববন্ধনের আয়োজন করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) ৪১তম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা। উৎপল চবির রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের ৪১তম ব্যাচের ছাত্র ছিলেন।

মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১২টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শহিদ মিনার প্রাঙ্গণে এ কর্মসূচি পালিত হয়। ‘আমার ভাই পরপারে, খুনি কেন বাইরে?’ শীর্ষক প্ল্যাকার্ড হাতে অনেককে প্রতিবাদ জানাতে দেখা যায়। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।

নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. রহমান নাসির উদ্দীন বলেন, আমাদের ভেতরে যে রক্তক্ষরণ হচ্ছে তা সারা দেশের মানুষের মধ্যে না হলে এটা দুঃখজনক। এ ঘটনা ২০২২ সালে এসেও আমাদের আইয়্যামে জাহেলিয়াতের যুগকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। আমরা সভ্যতার চরম অন্ধকার একটি পর্যায়ে বসবাস করছি। যেখানে একজন ছাত্রের হাতে শিক্ষক খুন হওয়ার চিত্র দেখতে হচ্ছে। এ ঘটনাকে শুধু সাধারণ একটি অপরাধ হিসাবে বিবেচনা করলে চলবে না।

রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. ভূঁইয়া মো. মনোয়ার কবির বলেন, একজন ছাত্রের হাতে শিক্ষক হত্যার চেয়ে দুঃখজনক বিষয় আর কী হতে পারে? শিক্ষকরা হচ্ছে ছাত্রদের মাথার তাজ স্বরূপ। কিন্তু ছাত্রের হাতে যখন একজন শিক্ষক খুন হন তখন বিষয়টি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অধ্যাপক ড. এনায়েত উল্ল্যাহ পাটোয়ারী বলেন, একজন শিক্ষককে লাঞ্ছিত করা মানে জাতিকে লাঞ্ছিত করা। এর বিচার না হওয়া পর্যন্ত রাজনীতি বিজ্ঞান পরিবার কর্মসূচি চালিয়ে যাবে।

বাংলাদেশ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি (বাকবিশিস) চট্টগ্রামের পক্ষ থেকে নগরীতে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। দুপুরে নগরীর চেরাগী পাহাড় মোড়ে বাকবিশিস নেতা অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর নেতৃত্বে বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। উৎপল কুমার সরকারের হত্যাকারীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেন তারা। একইসঙ্গে নড়াইলে স্বপন কুমার বিশ্বাসকে লাঞ্ছিত করার ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান।

সিলেট : সাম্প্রদায়িক উসকানি ছড়িয়ে নড়াইলে শিক্ষক স্বপন কুমার বিশ্বাসকে নির্যাতন ও সাভারে শিক্ষক উৎপল কুমার সরকারকে হত্যার প্রতিবাদে মঙ্গলবার সিলেটে বিক্ষোভ সমাবেশ হয়েছে। সিলেট নগরের কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার চত্বরে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট সিলেট ও সম্মিলিত নাট্য পরিষদ বিক্ষোভ সমাবেশের আয়োজন করে। সমাবেশের আগে প্রতিবাদ মিছিল নগরের রিকাবিবাজার এলাকার কবি নজরুল অডিটোরিয়াম থেকে শুরু হয়ে শহিদ মিনার চত্বরে শেষ হয়।

সমাবেশে প্রবীণ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব অধ্যাপক সুনির্মল দেব মিন বলেন, সারা দেশে একটি গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প ছড়াচ্ছে। তাদের টার্গেট এখন শিক্ষাঙ্গন। দেশের নানা জায়গায় সাম্প্রদায়িক উসকানি ছড়িয়ে শিক্ষকদের অপদস্থ ও হয়রানি করা হচ্ছে। এ সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ওই বিশেষ গোষ্ঠীকে পরাজিত করতে না পারলে বাংলাদেশের মূল চেতনাই পরাজিত হবে।

সম্মিলিত নাট্য পরিষদের সভাপতি মিশফাক আহমদ মিশুর সভাপতিত্বে ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক গৌতম চক্রবর্তীর সঞ্চালনায় সমাবেশে বক্তারা অপরাধীদের অবিলম্বে গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান।

বরিশাল : অধ্যক্ষকে হেনস্তার প্রতিবাদে নগরীর অশ্বিনী কুমার হলের সামনে প্রগতিশীল নাগরিক সমাজ, বরিশালের উদ্যোগে বিক্ষোভ সমাবেশ হয়েছে। কাজল দাসের সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য দেন সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) জেলার সদস্য সচিব ডা. মনীষা চক্রবর্তী, সদস্য সন্তু মিত্র, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের কেন্দ্রীয় সদস্য বিজন সিকদার ও মহানগর শাখার সদস্য লামিয়া সাইমন, গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিলের জেলা সংগঠক হুজাইফা রহমান ও বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সংগঠক রাকিব মাহমুদ প্রমুখ।

তারা বলেন, ধারাবাহিকভাবে হিন্দু শিক্ষকদের হামলা বিরূপ প্রভাব ফেলছে। বিজ্ঞানমুখী শিক্ষা তুলে ফেলে মৌলবাদীদের কথামতো মৌলবাদকে সম্পৃক্ত করায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এদের রুখতে না পারলে সমাজে বিষবাষ্পের মতো হিংসা ও সাম্প্রদায়িক ঘৃণা ছড়িয়ে পড়বে।

নরসিংদী : শিক্ষক উৎপল কুমার সরকারকে হত্যার প্রতিবাদ ও বিচারের দাবিতে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভা করেছে নরসিংদীর পলাশ শিল্পাঞ্চল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের শিক্ষকরা। মঙ্গলবার দুপুরে কলেজের মূল ফটকের সামনে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বক্তব্য দেন সহকারী অধ্যাপক মনির হোসেন, প্রভাষক জাকারিয়া মাহমুদ, ইসমাঈল জাবিরউল্লাহ, আমিনুল হক প্রমুখ। তারা বলেন, শিক্ষক উৎপল হত্যায় জড়িত শিক্ষার্থী জিতুকে দ্রুত গ্রেফতার করতে হবে। তাকে যথাযথ শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যথায় কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের তদন্ত কমিটি গঠন : গাজীপুর প্রতিনিধি জানান, ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসকে লাঞ্ছিতের ঘটনায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। শিক্ষক লাঞ্ছনার ঘটনায় রোববার বিশ্ববিদ্যালয়ের ২২৮তম সিন্ডিকেট সভায় নিন্দা জানানো হয়। ঘটনা সরেজমিন তথ্যানুসন্ধান ও তদন্তের জন্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. মশিউর রহমান তিন সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করেছেন। কমিটিকে আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কেউ দোষী চিহ্নিত হলে তার বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তরের পরিচালক আতাউর রহমান।

শিক্ষক হত্যা ও অধ্যক্ষ লাঞ্ছিত

সারা দেশে প্রতিবাদের ঝড়

 যুগান্তর ডেস্ক 
২৯ জুন ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
সারা দেশে প্রতিবাদের ঝড়
আশুলিয়ায় শিক্ষক হত্যা ও নড়াইলে অধ্যক্ষ লাঞ্ছনার প্রতিবাদে মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের সমাবেশ -যুগান্তর

সাভারের আশুলিয়ায় শিক্ষককে পিটিয়ে হত্যা এবং নড়াইলে কলেজ অধ্যক্ষের গলায় জুতার মালা পরিয়ে দেওয়ার ঘটনায় দেশজুড়ে প্রতিবাদের ঝড় বইছে। মঙ্গলবার রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন শহর এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতিবাদ সমাবেশ হয়েছে।

এসব প্রতিবাদ সমাবেশ থেকে অপরাধীদের দ্রুত বিচারের দাবি জানানো হয়। আশুলিয়ার হাজী ইউনুস আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক উৎপল কুমার সরকারকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা ফুঁসে উঠছেন।

শিক্ষক উৎপলের হত্যাকারীকে দ্রুত গ্রেফতার ও বিচারের দাবিতে আশুলিয়ার চিত্রশাইল এলাকার বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিলসহ নানা কর্মসূচি পালন করেছেন। হত্যাকারীকে গ্রেফতারসহ ছয় দফা দাবিতে আন্দোলন করছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।

এদিকে নড়াইল সদরের মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসের গলায় জুতার মালা পরিয়ে লাঞ্ছিত করার ঘটনার ৯ দিন পর মামলা করেছে পুলিশ। মামলার পর সোমবার রাতে জড়িত সন্দেহে তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অধ্যক্ষের গলায় জুতার মালা পরানোর ঘটনায় রিট আবেদন করতে বলেছেন হাইকোর্ট।

এ সম্পর্কে ব্যুরো ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-

ঢাবি : রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে আয়োজিত প্রতিবাদ সমাবেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থী, জগন্নাথ হলের শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় সংগঠনের সদস্যরা অংশ নেন। শিক্ষক নির্যাতনের সঙ্গে জড়িতদের বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীসহ সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।

সমাবেশে জগন্নাথ হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক মিহির লাল সাহা বলেন, আমি শিক্ষক হিসাবে এখানে বক্তব্য দিচ্ছি, আমি জানি না আমি কতটুকু নিরাপদ। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েও নিরাপত্তার কথা চিন্তা করছি। কারণ আমি সনাতন ধর্মাবলম্বী। সনাতন ধর্মের প্রত্যেক শিক্ষক আজ একরকম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। সাম্প্রদায়িকতাকে শিকড় থেকে তুলে আনা না গেলে এ সমস্যার সমাধান হবে না। এ বাংলাদেশ হয় পাকিস্তান হবে, নয় আফগানিস্তান হবে-এখনই সময় এর রশি টেনে ধরা। অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। জনসম্মুখে তাদের বিচার করা উচিত। তাহলেই শিক্ষা হবে।

জগন্নাথ হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি কাজল দাস বলেন, যে প্রজন্ম শিক্ষককে জুতার মালা গলায় পরায়, যে প্রজন্ম শিক্ষককে স্টাম্প দিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলতে পারে, সে প্রজন্মের লাগাম এখনই টেনে ধরতে হবে। যে প্রজন্মের শিক্ষাদীক্ষা ও গবেষণায় দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা, সেই প্রজন্ম আজ ইয়াবার নেশায় আসক্ত হয়ে শিক্ষকদের নির্যাতনসহ বিভিন্ন অপকর্মে জড়িয়ে যাচ্ছে।

এ ঘটনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা প্রতিবাদ না জানানোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, আজ আমরা লজ্জিত। যেখানে শিক্ষকসমাজের দাঁড়ানোর কথা, সেখানে আমরা দাঁড়িয়েছি।

জগন্নাথ হল ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক অতনু বর্মণ বলেন, যে শিক্ষকরা জাতির মেরুদণ্ড, স্টাম্পের আঘাতে তাদের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে শিক্ষকরা মন খুলে পড়াতে পারেন না। মনের ভাব প্রকাশ করতে গেলে কথিত ধর্ম অবমাননার অপবাদ দিয়ে গণপিটুনি দেওয়া হয়, নতুবা জেলে যেতে হয়। এ বিষদাঁত ভেঙে দিতে হবে। যেভাবে পারি, এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে।

এদিকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে নড়াইলের কলেজ শিক্ষক স্বপন কুমার বিশ্বাসের গলায় জুতার মালা পরানোর ঘটনায় রিট আবেদন নিয়ে আসতে বলেছেন হাইকোর্ট। এ বিষয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন আদালতের নজরে আনেন আইনজীবী পূর্ণিমা জাহান। তখন হাইকোর্ট বলেন, আপনারা রিট আবেদন নিয়ে আসুন। আমরা শুনব।

পরে পূর্ণিমা জাহান গণমাধ্যমকে বলেন, আগামীকাল বৃহস্পতিবার এ ঘটনায় আমরা রিট আবেদন করব।

আশুলিয়া (ঢাকা) : শিক্ষক উৎপলকে হত্যার প্রতিবাদে আশুলিয়ার চিত্রশাইল এলাকার হাজী ইউনুস আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং এর আশপাশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেছে। উৎপল হত্যাকারী বখাটে আশরাফুল ইসলাম জিতুকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেফতারসহ ছয় দফা দাবি তুলেছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।

দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে-বখাটে জিতুকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেফতার করতে হবে, জিতুর পরিবারের পলাতক সদস্যদের আইনের আওতায় আনতে হবে, নিহতের পরিবারকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিতে হবে, স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্থানীয় ও বাইরের শিক্ষার্থীদের মধ্যকার ভেদাভেদ দূর করতে আইন প্রণয়ন করতে এবং কিশোর গ্যাং ও কিশোর অপরাধ দূর করতে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

শনিবার শিক্ষক উৎপলের ওপর হামলার ঘটনার পর থেকে হাজী ইউনুছ আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজ বন্ধ রয়েছে। রোববার উৎপলের মারা যাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে ওই প্রতিষ্ঠানের সামনে শত শত শিক্ষার্থী জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করেন। যতক্ষণ পর্যন্ত বখাটে জিতু গ্রেফতার না হবে, ততক্ষণ আন্দোলন কর্মসূচি চলবে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

হাজী ইউনুছ আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীরা জানান, উৎপল স্যার শৃঙ্খলা কমিটির সভাপতি ছিলেন। তিনি বিভিন্ন সময় শিক্ষার্থীদের নিয়মশৃঙ্খলা ভঙ্গ ও ইভটিজিংয়ের বিষয়ে বখাটেদের শাসন করতেন। কয়েকদিন আগে এক ছাত্রীকে উত্ত্যক্ত করার জন্য ওই ছাত্রকে শাসন করেছিলেন উৎপল স্যার। মঙ্গলবার সকালেও ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাসহ সর্বস্তরের মানুষ জিতুর বিচার চেয়ে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করে।

রোববার উৎপলের ভাই অসীম কুমার সরকার বাদী হয়ে আশুলিয়া থানায় জিতুসহ কয়েকজনকে আসামি করে মামলা করেছেন। ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হুমায়ুন কবির বলেন, বখাটে ছাত্রকে গ্রেফতারে অভিযান চলছে।

নড়াইল : ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসের গলায় জুতার মালা পরিয়ে লাঞ্ছিত করার ঘটনার ৯ দিন পর পুলিশ সোমবার নড়াইল সদর থানায় মামলা করেছে। উপপরিদর্শক ও মির্জাপুর ফাঁড়ির ইনচার্জ শেখ মোহাম্মদ মোরছালিন ১৭০ থেকে ১৮০ জনের নামে মামলা করেন। সোমবার রাতেই জড়িত তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মঙ্গলবার নড়াইল সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শওকত কবীর এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

গ্রেফতার ব্যক্তিরা হলেন মির্জাপুর বাজারে মোবাইল ফোন ব্যবসায়ী বখাটে শাওন মুন্সী (জুতার মালা পরানোর ভিডিওতে লাল গেঞ্জি পরা শাওনকে চিহ্নিত করা হয়েছে), মির্জাপুর মধ্যপাড়ার মনিরুল ইসলাম এবং মির্জাপুর গ্রামের সৈয়দ রিমন আলী।

এদিকে স্বপন কুমারকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশনা দিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। চলতি দায়িত্ব থেকে তাকে সরিয়ে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এ চেষ্টা করা হলে মাউশি অনুমোদন দেবে না। বিক্ষোভের মধ্যে সোমবার কমিটি গঠনের কথা জানায় মাউশি।

চট্টগ্রাম : শিক্ষক উৎপল কুমার সরকারকে হত্যায় জড়িতদের শাস্তির দাবিতে মানববন্ধনের আয়োজন করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) ৪১তম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা। উৎপল চবির রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের ৪১তম ব্যাচের ছাত্র ছিলেন।

মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১২টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শহিদ মিনার প্রাঙ্গণে এ কর্মসূচি পালিত হয়। ‘আমার ভাই পরপারে, খুনি কেন বাইরে?’ শীর্ষক প্ল্যাকার্ড হাতে অনেককে প্রতিবাদ জানাতে দেখা যায়। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।

নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. রহমান নাসির উদ্দীন বলেন, আমাদের ভেতরে যে রক্তক্ষরণ হচ্ছে তা সারা দেশের মানুষের মধ্যে না হলে এটা দুঃখজনক। এ ঘটনা ২০২২ সালে এসেও আমাদের আইয়্যামে জাহেলিয়াতের যুগকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। আমরা সভ্যতার চরম অন্ধকার একটি পর্যায়ে বসবাস করছি। যেখানে একজন ছাত্রের হাতে শিক্ষক খুন হওয়ার চিত্র দেখতে হচ্ছে। এ ঘটনাকে শুধু সাধারণ একটি অপরাধ হিসাবে বিবেচনা করলে চলবে না।

রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. ভূঁইয়া মো. মনোয়ার কবির বলেন, একজন ছাত্রের হাতে শিক্ষক হত্যার চেয়ে দুঃখজনক বিষয় আর কী হতে পারে? শিক্ষকরা হচ্ছে ছাত্রদের মাথার তাজ স্বরূপ। কিন্তু ছাত্রের হাতে যখন একজন শিক্ষক খুন হন তখন বিষয়টি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অধ্যাপক ড. এনায়েত উল্ল্যাহ পাটোয়ারী বলেন, একজন শিক্ষককে লাঞ্ছিত করা মানে জাতিকে লাঞ্ছিত করা। এর বিচার না হওয়া পর্যন্ত রাজনীতি বিজ্ঞান পরিবার কর্মসূচি চালিয়ে যাবে।

বাংলাদেশ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি (বাকবিশিস) চট্টগ্রামের পক্ষ থেকে নগরীতে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। দুপুরে নগরীর চেরাগী পাহাড় মোড়ে বাকবিশিস নেতা অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর নেতৃত্বে বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। উৎপল কুমার সরকারের হত্যাকারীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেন তারা। একইসঙ্গে নড়াইলে স্বপন কুমার বিশ্বাসকে লাঞ্ছিত করার ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান।

সিলেট : সাম্প্রদায়িক উসকানি ছড়িয়ে নড়াইলে শিক্ষক স্বপন কুমার বিশ্বাসকে নির্যাতন ও সাভারে শিক্ষক উৎপল কুমার সরকারকে হত্যার প্রতিবাদে মঙ্গলবার সিলেটে বিক্ষোভ সমাবেশ হয়েছে। সিলেট নগরের কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার চত্বরে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট সিলেট ও সম্মিলিত নাট্য পরিষদ বিক্ষোভ সমাবেশের আয়োজন করে। সমাবেশের আগে প্রতিবাদ মিছিল নগরের রিকাবিবাজার এলাকার কবি নজরুল অডিটোরিয়াম থেকে শুরু হয়ে শহিদ মিনার চত্বরে শেষ হয়।

সমাবেশে প্রবীণ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব অধ্যাপক সুনির্মল দেব মিন বলেন, সারা দেশে একটি গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প ছড়াচ্ছে। তাদের টার্গেট এখন শিক্ষাঙ্গন। দেশের নানা জায়গায় সাম্প্রদায়িক উসকানি ছড়িয়ে শিক্ষকদের অপদস্থ ও হয়রানি করা হচ্ছে। এ সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ওই বিশেষ গোষ্ঠীকে পরাজিত করতে না পারলে বাংলাদেশের মূল চেতনাই পরাজিত হবে।

সম্মিলিত নাট্য পরিষদের সভাপতি মিশফাক আহমদ মিশুর সভাপতিত্বে ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক গৌতম চক্রবর্তীর সঞ্চালনায় সমাবেশে বক্তারা অপরাধীদের অবিলম্বে গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান।

বরিশাল : অধ্যক্ষকে হেনস্তার প্রতিবাদে নগরীর অশ্বিনী কুমার হলের সামনে প্রগতিশীল নাগরিক সমাজ, বরিশালের উদ্যোগে বিক্ষোভ সমাবেশ হয়েছে। কাজল দাসের সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য দেন সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) জেলার সদস্য সচিব ডা. মনীষা চক্রবর্তী, সদস্য সন্তু মিত্র, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের কেন্দ্রীয় সদস্য বিজন সিকদার ও মহানগর শাখার সদস্য লামিয়া সাইমন, গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিলের জেলা সংগঠক হুজাইফা রহমান ও বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সংগঠক রাকিব মাহমুদ প্রমুখ।

তারা বলেন, ধারাবাহিকভাবে হিন্দু শিক্ষকদের হামলা বিরূপ প্রভাব ফেলছে। বিজ্ঞানমুখী শিক্ষা তুলে ফেলে মৌলবাদীদের কথামতো মৌলবাদকে সম্পৃক্ত করায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এদের রুখতে না পারলে সমাজে বিষবাষ্পের মতো হিংসা ও সাম্প্রদায়িক ঘৃণা ছড়িয়ে পড়বে।

নরসিংদী : শিক্ষক উৎপল কুমার সরকারকে হত্যার প্রতিবাদ ও বিচারের দাবিতে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভা করেছে নরসিংদীর পলাশ শিল্পাঞ্চল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের শিক্ষকরা। মঙ্গলবার দুপুরে কলেজের মূল ফটকের সামনে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বক্তব্য দেন সহকারী অধ্যাপক মনির হোসেন, প্রভাষক জাকারিয়া মাহমুদ, ইসমাঈল জাবিরউল্লাহ, আমিনুল হক প্রমুখ। তারা বলেন, শিক্ষক উৎপল হত্যায় জড়িত শিক্ষার্থী জিতুকে দ্রুত গ্রেফতার করতে হবে। তাকে যথাযথ শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যথায় কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের তদন্ত কমিটি গঠন : গাজীপুর প্রতিনিধি জানান, ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসকে লাঞ্ছিতের ঘটনায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। শিক্ষক লাঞ্ছনার ঘটনায় রোববার বিশ্ববিদ্যালয়ের ২২৮তম সিন্ডিকেট সভায় নিন্দা জানানো হয়। ঘটনা সরেজমিন তথ্যানুসন্ধান ও তদন্তের জন্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. মশিউর রহমান তিন সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করেছেন। কমিটিকে আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কেউ দোষী চিহ্নিত হলে তার বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তরের পরিচালক আতাউর রহমান।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন