সামগ্রিকভাবে দেখতে হবে শিক্ষক নির্যাতনের ঘটনাকে: কাজী ফারুক আহমেদ
jugantor
সামগ্রিকভাবে দেখতে হবে শিক্ষক নির্যাতনের ঘটনাকে: কাজী ফারুক আহমেদ

  যুগান্তর প্রতিবেদন  

৩০ জুন ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বর্ষীয়ান শিক্ষক নেতা অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ বলেন, যে ঘটনাগুলো ঘটেছে তা অবশ্যই নিন্দনীয়। এ ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন কিছু নয়।

ছেলের হাতে বাবা নির্যাতিত হবেন-এটা যেমন অকল্পনীয়, তেমনি শিক্ষক লাঞ্ছনা, নির্যাতন, অপমান-অপদস্থ করার ঘটনাও অভাবনীয়।

জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির এই সদস্য বলেন, শিক্ষক নির্যাতন আর লাঞ্ছনার এই ঘটনাকে সামগ্রিকভাবে দেখতে হবে। শিক্ষা ব্যবস্থায় কতগুলো ক্ষত আছে, যা দগদগে ঘায়ে পরিণত হয়েছে।

সেই ঘায়ের নেতিবাচক প্রভাবই আমরা মাঝে-মধ্যে লক্ষ্য করি। সেগুলো চিহ্নিত করে যদি আরোগ্য লাভের ব্যবস্থা করা না হয়, তাহলে এমন ঘটতেই থাকবে।

তিনি বলেন, শিক্ষার্থীকে পড়ানো-এটা স্বাভাবিক ব্যাপার। তাকে পরীক্ষায় পাশ করানো শিক্ষা হতে পারে, কিন্তু তাকে বৃহত্তর সমাজের অংশে পরিণত করতে হবে।

এজন্য শিক্ষার্থীকে যথাযথভাবে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। এই দায়িত্বটা শিক্ষকেরই। অন্যদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছেলেমেয়েরা ৬ ঘণ্টা পর্যন্ত থাকে। বাবা-মায়ের পরেই তাদের স্থান।

কোনো ছেলে বা মেয়ে সমস্যা করল কিনা, সেটা শিক্ষক দেখেন। এখন কী সমস্যা হলো বা কোন ধরনের সমস্যা-তা চিহ্নিত করতে হবে। তরুণ শ্রেণির মধ্যে নানা সমস্যাই হতে পারে।

তাদের আর আগের মতো শাসন করে পরিশুদ্ধ করা যাবে না-এ ধারণা আমাদের অনেকের মধ্যেই নেই। এখনও অনেকে বুঝে বা না বুঝে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে থাকেন।

কিন্তু এই সমস্যা সহজেই সমাধান করা যেতে পারে। তাদের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘কাউন্সিলর’ বা পরামর্শক থাকতে পারেন।

যদি স্কুলভিত্তিক নিয়োগ করা না যায়, তাহলে এলাকাভিত্তিক নিয়োগ করা যেতে পারে। এছাড়া অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের অভিজ্ঞতাও কাজে লাগানো যেতে পারে।

তিনি বলেন, একটা চরম বাস্তবতা হচ্ছে, এক সময়ে ছেলেমেয়েরা বাবা-মাকে ‘আপনি’ সম্বোধন করত। আর এখন বলে ‘তুমি’। আগে শিক্ষককে পিতৃতূল্য মনে করা হতো। আর এখন মনে করে ‘বড় ভাই’।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সমাজবিচ্ছিন্ন কিছু নয়। তাদের সমাজের এই রূপান্তরকে বুঝতে হবে। শিক্ষার্থীকে মনোবিকাশের পথ তৈরি করে দিতে হবে।

আমি আরও ৩০ বছর আগে দেখেছি যে, যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে ছাত্র-শিক্ষক মিলে একসঙ্গে সিগারেট ফুঁকছে। ওই সমাজে এই বাস্তবতাকে মেনে নিয়েছে বলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক সমস্যা বড় আকার ধারণ করে না।

তিনি আরও বলেন, একটা সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বলতে বোঝানো হতো অধ্যক্ষ বা প্রধান শিক্ষককে। আর এখন বোঝায় পরিচালনা কমিটির সভাপতিকে।

এই সমস্যা দূর করা জরুরি। শিক্ষা জাতীয়করণের কথা আসছে। জাতীয়করণ বলতে সরকারিকরণ বোঝানো হচ্ছে। এটাও একটা সমস্যা।

আবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অভিভাবককে ‘কো-পার্টিসিপেন্ট’ (সহযোগী অংশীজন) মনে করা হয় না, তাদের শুধু মাঝে-মধ্যে আমন্ত্রণ জানানো হয়।

এছাড়া আরও কিছু গতানুগতিকতার মধ্যে আমরা ঘুরপাক খাচ্ছি। যার কারণে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ছাত্রছাত্রীদের বিকাশের পথ রুদ্ধ করছি।

অধ্যক্ষ আহমেদ বলেন, এভাবে অনেক ক্ষতই আছে যা চিহ্নিত ও দূর করে শিক্ষককে চিন্তাভাবনার মাধ্যমে এগিয়ে যেতে হবে।

শিক্ষককে শিক্ষার্থীর সঙ্গে মৈত্রী স্থাপন করতে হবে। সমস্যা যেমন একদিনে তৈরি হয়নি, ধারাবাহিকভাবে হয়েছে; তেমনি উন্নতিও ধীরে ধীরে করতে হবে।

শিক্ষককে ‘জেনারেশন গ্যাপ’ (প্রজন্মের দূরত্ব) বুঝতে হবে। তাকে ছাত্রছাত্রীর মনোজগতের খবর রাখতে হবে। পরীক্ষায় পাশকে শুধু লেখাপড়া মনে না করে জীবনের পরীক্ষায় পাশের বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে।

সমাজ ও বিশ্ব পরিবর্তনের বাস্তবতাকে আমলে নিতে হবে। শিক্ষা, পাঠদান ও প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় নতুনত্ব আনতে হবে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক, ব্যবস্থাপনা কমিটি ও সমাজসহ যে বহুপাক্ষিক ব্যবস্থা আছে, তা বিবেচনায় নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। তাহলেই সমস্যা থেকে উত্তরণ সম্ভব হবে।

সামগ্রিকভাবে দেখতে হবে শিক্ষক নির্যাতনের ঘটনাকে: কাজী ফারুক আহমেদ

 যুগান্তর প্রতিবেদন 
৩০ জুন ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বর্ষীয়ান শিক্ষক নেতা অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ বলেন, যে ঘটনাগুলো ঘটেছে তা অবশ্যই নিন্দনীয়। এ ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন কিছু নয়।

ছেলের হাতে বাবা নির্যাতিত হবেন-এটা যেমন অকল্পনীয়, তেমনি শিক্ষক লাঞ্ছনা, নির্যাতন, অপমান-অপদস্থ করার ঘটনাও অভাবনীয়।

জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির এই সদস্য বলেন, শিক্ষক নির্যাতন আর লাঞ্ছনার এই ঘটনাকে সামগ্রিকভাবে দেখতে হবে। শিক্ষা ব্যবস্থায় কতগুলো ক্ষত আছে, যা দগদগে ঘায়ে পরিণত হয়েছে।

সেই ঘায়ের নেতিবাচক প্রভাবই আমরা মাঝে-মধ্যে লক্ষ্য করি। সেগুলো চিহ্নিত করে যদি আরোগ্য লাভের ব্যবস্থা করা না হয়, তাহলে এমন ঘটতেই থাকবে।

তিনি বলেন, শিক্ষার্থীকে পড়ানো-এটা স্বাভাবিক ব্যাপার। তাকে পরীক্ষায় পাশ করানো শিক্ষা হতে পারে, কিন্তু তাকে বৃহত্তর সমাজের অংশে পরিণত করতে হবে।

এজন্য শিক্ষার্থীকে যথাযথভাবে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। এই দায়িত্বটা শিক্ষকেরই। অন্যদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছেলেমেয়েরা ৬ ঘণ্টা পর্যন্ত থাকে। বাবা-মায়ের পরেই তাদের স্থান।

কোনো ছেলে বা মেয়ে সমস্যা করল কিনা, সেটা শিক্ষক দেখেন। এখন কী সমস্যা হলো বা কোন ধরনের সমস্যা-তা চিহ্নিত করতে হবে। তরুণ শ্রেণির মধ্যে নানা সমস্যাই হতে পারে।

তাদের আর আগের মতো শাসন করে পরিশুদ্ধ করা যাবে না-এ ধারণা আমাদের অনেকের মধ্যেই নেই। এখনও অনেকে বুঝে বা না বুঝে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে থাকেন।

কিন্তু এই সমস্যা সহজেই সমাধান করা যেতে পারে। তাদের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘কাউন্সিলর’ বা পরামর্শক থাকতে পারেন।

যদি স্কুলভিত্তিক নিয়োগ করা না যায়, তাহলে এলাকাভিত্তিক নিয়োগ করা যেতে পারে। এছাড়া অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের অভিজ্ঞতাও কাজে লাগানো যেতে পারে। 

তিনি বলেন, একটা চরম বাস্তবতা হচ্ছে, এক সময়ে ছেলেমেয়েরা বাবা-মাকে ‘আপনি’ সম্বোধন করত। আর এখন বলে ‘তুমি’। আগে শিক্ষককে পিতৃতূল্য মনে করা হতো। আর এখন মনে করে ‘বড় ভাই’।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সমাজবিচ্ছিন্ন কিছু নয়। তাদের সমাজের এই রূপান্তরকে বুঝতে হবে। শিক্ষার্থীকে মনোবিকাশের পথ তৈরি করে দিতে হবে।

আমি আরও ৩০ বছর আগে দেখেছি যে, যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে ছাত্র-শিক্ষক মিলে একসঙ্গে সিগারেট ফুঁকছে। ওই সমাজে এই বাস্তবতাকে মেনে নিয়েছে বলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক সমস্যা বড় আকার ধারণ করে না।

তিনি আরও বলেন, একটা সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বলতে বোঝানো হতো অধ্যক্ষ বা প্রধান শিক্ষককে। আর এখন বোঝায় পরিচালনা কমিটির সভাপতিকে।

এই সমস্যা দূর করা জরুরি। শিক্ষা জাতীয়করণের কথা আসছে। জাতীয়করণ বলতে সরকারিকরণ বোঝানো হচ্ছে। এটাও একটা সমস্যা।

আবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অভিভাবককে ‘কো-পার্টিসিপেন্ট’ (সহযোগী অংশীজন) মনে করা হয় না, তাদের শুধু মাঝে-মধ্যে আমন্ত্রণ জানানো হয়।

এছাড়া আরও কিছু গতানুগতিকতার মধ্যে আমরা ঘুরপাক খাচ্ছি। যার কারণে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ছাত্রছাত্রীদের বিকাশের পথ রুদ্ধ করছি।

অধ্যক্ষ আহমেদ বলেন, এভাবে অনেক ক্ষতই আছে যা চিহ্নিত ও দূর করে শিক্ষককে চিন্তাভাবনার মাধ্যমে এগিয়ে যেতে হবে।

শিক্ষককে শিক্ষার্থীর সঙ্গে মৈত্রী স্থাপন করতে হবে। সমস্যা যেমন একদিনে তৈরি হয়নি, ধারাবাহিকভাবে হয়েছে; তেমনি উন্নতিও ধীরে ধীরে করতে হবে।

শিক্ষককে ‘জেনারেশন গ্যাপ’ (প্রজন্মের দূরত্ব) বুঝতে হবে। তাকে ছাত্রছাত্রীর মনোজগতের খবর রাখতে হবে। পরীক্ষায় পাশকে শুধু লেখাপড়া মনে না করে জীবনের পরীক্ষায় পাশের বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে।

সমাজ ও বিশ্ব পরিবর্তনের বাস্তবতাকে আমলে নিতে হবে। শিক্ষা, পাঠদান ও প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় নতুনত্ব আনতে হবে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক, ব্যবস্থাপনা কমিটি ও সমাজসহ যে বহুপাক্ষিক ব্যবস্থা আছে, তা বিবেচনায় নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। তাহলেই সমস্যা থেকে উত্তরণ সম্ভব হবে।
 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন