ত্রাণ না পেয়ে বিপাকে মধ্যবিত্ত পরিবার
jugantor
সারা দেশে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি
ত্রাণ না পেয়ে বিপাকে মধ্যবিত্ত পরিবার

  যুগান্তর ডেস্ক  

০২ জুলাই ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

পরিবার

পূর্বাঞ্চলের সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং উত্তরাঞ্চলের কুড়িগ্রাম ও দিনাজপুরে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় বন্যা পরিস্থিতির আরও উন্নতি হতে পারে। দেশের ভেতরে ও ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে বৃষ্টির প্রকোপ কমে যাওয়ায় বিভিন্ন নদ-নদীর পানি ধীরে ধীরে কমছে। দীর্ঘদিন ধরে চলা ভয়াবহ বন্যায় দুর্গত অসহায় মানুষজনের দিন কাটছে খেয়ে না খেয়ে। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের ত্রাণ তাদের একমাত্র সম্বল হয়ে পড়েছে। ত্রাণসামগ্রী নিয়ে নিম্নআয়ের পরিবারগুলো মোটামুটি চলতে পারলেও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো চরম বিপাকে পড়েছে। চক্ষুলজ্জায় তারা হাত বাড়াতে পারছে না। পরিবার-পরিজন নিয়ে তারা খেয়ে না-খেয়ে কোনোমতে জীবনযাপন করছেন।

বন্যার পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে আশ্রয়কেন্দ্রগুলো থেকে লোকজন নিজ বাড়ি-ঘরে ফিরতে শুরু করেছে। তবে বন্যার পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে দুর্ভোগও বাড়ছে। পানিবাহিত রোগ বিশেষ করে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। আক্রান্তদের মধ্যে শিশুর সংখ্যা বেশি। এদিকে, বন্যার পানিতে ডুবে নেত্রকোনার কলমাকান্দায় এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ সম্পর্কে ব্যুরো ও প্রতিনিধিদের খবর :

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র (এফএফডব্লিউসি) জানায়, উত্তরের প্রধান নদী ব্রহ্মপুত্রের পানির উচ্চতা গত ২৪ ঘণ্টায় একই রকম ছিল। কিন্তু যমুনা নদীর পানি বেড়েছিল। আগামী ২৪ ঘণ্টায় উভয় নদীর পানি বাড়তে পারে। সংস্থাটি আরও জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের ভেতরে ভারি বৃষ্টির প্রবণতা কিছু কমেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নেত্রকোনায় ১২২ মিলিমিটার সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। সিলেটের লালাখালে ৫৩ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। ভারতের পূর্বাঞ্চলেও ভারি বৃষ্টি অব্যাহত আছে। গত ২৪ ঘণ্টায় চেরাপুঞ্জিতে ৮১ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়। পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুঁড়িতে ১০৯ ও আসামের দিব্রুগড়ে ৯৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়।

গত ২৪ ঘণ্টায় আটটি পয়েন্টে দেশের সাতটি নদ-নদীর পানি বিপৎসীমার উপরে দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এগুলো হলো- ধরলা, ব্রহ্মপুত্র, সুরমা, কুশিয়ারা, পুরাতন সুরমা, বাউলাই ও সোমেশ্বরী। এগুলোর মধ্যে কুশিয়ারার পানি সবচেয়ে বিপৎসীমার উপরে আছে। এটি বিপৎসীমার ৮৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। কানাইঘাটে সুরমা নদী বিপৎসীমার ৬৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

সিলেট : সিলেটে বন্যার পানি কমলেও দুর্ভোগ বাড়ছে। ছড়িয়ে পড়েছে পানিবাহিত রোগ। সিলেটে ১৬ জুন বন্যা শুরু হয়। দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও জেলা-উপজেলার অনেক জায়গা এখনো পানিতে নিমজ্জিত। সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলা থেকে বন্যার পানি এত ধীরগতিতে নামার বিষয়টি ভাবিয়ে তুলেছে সংশ্লিষ্টদের। দীর্ঘস্থায়ী বন্যার কবলে পড়ার পেছনে নদীর নাব্য সংকট, হাওড়ে অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ, হাওড় ভরাট হয়ে যাওয়াকে কারণ হিসাবে দেখছেন অনেকেই। এ ব্যাপারে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুর ও পরিবেশকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মুশতাক আহমদ বলেন, সাধারণত সিলেটের পানি সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার কালনী নদী দিয়ে ভৈরব হয়ে মেঘনায় গিয়ে মেশে। গত কয়েক দশকে কালনী ভরাট হয়ে পানিপ্রবাহের পথ অনেকটা রুদ্ধ হয়েছে। ভরাট হয়েছে হাওড়ও। তাই এখন বৃষ্টিপাত কমে এলেও বন্যার পানি সহজে নামছে না। হাওড়ের প্রকৃতি, পরিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্য নিয়ে কাজ করা লেখক-গবেষক পাভেল পার্থ মনে করেন, অতিবৃষ্টি ও ঢলের পানি ধরে রাখার প্রাকৃতিক জলাধারগুলো ভরাট ও দখল হয়ে যাওয়া এবং পানিপ্রবাহের স্বাভাবিক পথ রুদ্ধ হওয়ায় সিলেট অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী বন্যা দেখা দিয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী আসিফ আহমেদ বলেন, আগে হাওড়ে যেভাবে পানি নামত, এখন সেভাবে নামছে না। সুনামগঞ্জের হাওড়গুলোর যদি পানি ধারণের ক্ষমতা আগের মতো থাকত তবে সিলেটে পানি জমে থাকার সুযোগ পেত না।

ভয়াবহ বন্যার পানিতে বিভিন্ন এলাকার টিউবওয়েল ও গভীর নলকূপগুলো তলিয়ে যায়। এতে টিউবওয়েলগুলোতে বন্যার পানি ঢুকে পড়ায় সেগুলোর পানি দূষিত হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্র থেকে বাড়ি ফেরা মানুষদের অনেকে এ পানি পান করায় তারা পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। বিশেষ করে তারা ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছেন। কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। তাদের মধ্যে শিশুদের সংখ্যাই বেশি। শুক্রবার কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখা যায়, মহিলা ও শিশু ওয়ার্ডে একটি সিটও খালি নেই। রোগীদের চাপে পুরুষ ওয়ার্ডে শিশুদের ভর্তি করা হচ্ছে। পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত ২১ জনের মধ্যে শিশুর সংখ্যা ১৪ জন। উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. কামরুজ্জামান বলেন, এখানে আসা রোগীদের বেশির ভাগ ডায়রিয়ায় আক্রান্ত।

সিলেটে বন্যাদুর্গত এলাকায় সরকারি ও বেসরকারিভাবে ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত রয়েছে। শুক্রবার সিলেট ও সুনামগঞ্জের ২০০টি পরিবারের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করেছে সিলেট ব্যাটালিয়নের (৪৮ বিজিবি) সদস্যরা। গোয়াইনঘাট উপজেলার সোনারহাট বিওপির পশ্চিম জাফলং ইউনিয়নের লক্ষণছড়া, কুলনছড়া ও গাছলাওউড়া গ্রামের ১০০টি পরিবারের মধ্যে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হয়। সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার নোয়াকোট বিওপির ইসলামপুর ইউনিয়নের নিজগাঁও, বনগাঁও, নয়াবস্তি, মনিপুরিবস্তি এবং রতনপুর গ্রামে ১০০টি পরিবারের মধ্যে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হয়। আগের দিন কানাইঘাট উপজেলার জিংগাবাড়ি ইউনিয়নের দলইমাটি গ্রামে ১০০টি পরিবারের মাঝে ত্রাণ সহায়তা দেন জেলা প্রশাসক মজিবর রহমান। এ সময় উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার উপ-পরিচালক মামুনুর রশিদ, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আনোয়ার সাদাত, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুমন্ত ব্যানার্জি।

এ ছাড়া হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী ফাউন্ডেশন সিলেট জেলা শাখার সহযোগিতায় সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার দুর্গাপাশা, ছয়হারা ও হরিনগর (নবীনগর) গ্রামে ৪০০টি পরিবারের মধ্যে চাল, ডাল, তেল, ওরস্যালাইন, ওষুধসহ বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর দৌহিত্র, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ডাইরেক্ট ফ্রেশ ও এজাইল মাইন্ডস্ করপোরেশনের প্রতিষ্ঠাতা মিশাল করিম, তার স্ত্রী সাদিয়া মুসতারী ইরা, হুমায়ুন রশীদ ফাউন্ডেশন সিলেট জেলা শাখার সদস্য এইচএমএ মালিক ইমন প্রমুখ।

সুনামগঞ্জ : বৃহস্পতিবার রাতে বৃষ্টি না হওয়ায় সুরমা নদীর পানি কিছুটা কমেছে। পাউবো কর্মকর্তারা জানান, আগামী ২৪ ঘণ্টায় সুনামগঞ্জে হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে। বৃষ্টি হলে নদ-নদীর পানি কিছুটা বাড়তে পারে। তবে এতে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা নেই। তিনি বলেন, বৃষ্টি থেমে গেলে সুনামগঞ্জের বন্যা পরিস্থিতির সার্বিক উন্নতি হবে। ১৬ জুন থেকে সুনামগঞ্জে ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়। জেলার প্রতিটি উপজেলা বন্যাকবলিত হয়ে পড়ে। অসংখ্য বাড়িঘর, অফিস-আদালত, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, রাস্তাঘাট বন্যার পানিতে তলিয়ে যায়।

ছাতক (সুনামগঞ্জ) : চার দফা বন্যায় ছাতক উপজেলার প্রায় এক লাখ পরিবার পানিবন্দি। বানভাসিদের দুর্ভোগ যেন কমছেই না। সুরমা ও ব?ট নদী ভাঙনে চোখের পলকে নিঃস্ব হয়ে পড়ছে নদীতীরের মানুষ। এ অবস্থায় বানভাসিদের কাছে ঈদের আনন্দ দুঃস্বপ্নে পরিণত হচ্ছে। যেখানে জীবনই বাঁচে না, সেখানে কিসের ঈদ। সরকারের দিকে তারা তাকিয়ে আছে। পানিবন্দি মানুষের মনে ঈদের আনন্দ নেই। উপ?জেলার ১৩?টি ইউনিয়নের বেশির ভাগ মানুষ কৃষিনির্ভর। বন্যার পানিতে তাদের ধান-চালও নষ্ট হয়ে গেছে। তাদের ঈদ আনন্দ বন্যা ভাসিয়ে নিয়ে গেছে ।

দোয়ারাবাজারে তৃতীয় দফা বন্যা : উদ্বেগ উৎকণ্ঠায় বানভাসিরা

দোয়ারাবাজার (সুনামগঞ্জ) : দোয়ারাবাজারে দ্বিতীয় দফা বন্যার রেশ না কাটতেই তৃতীয় দফা বন্যা শুরু হয়েছে। সুরমা, বগুলা, মান্নারগাঁও ও দোয়ারা সদরসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের বানভাসি লাখো মানুষের দিন কাটছে আতঙ্কে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় সর্বস্ব হারানোর ভয়ে এলাকাবাসী। এরই মধ্যে উপজেলা ও জেলা সদরের সঙ্গে ইউনিয়নগুলোর সড়ক যোগাযোগ আবারও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ত্রাণসামগ্রী নিয়ে নিম্নআয়ের পরিবারগুলো মোটামুটি চলতে পারলেও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো কঠিন বিপাকে পড়েছে। চক্ষুলজ্জায় তারা হাত বাড়াতে পারছে না। লোকচক্ষুর আড়ালে পরিবার-পরিজন নিয়ে তারা খেয়ে না খেয়ে কোনোমতে জীবনযাপন করছে।

কলমাকান্দা (নেত্রকোনা) : কলমাকান্দায় বন্যার পানিতে ডুবে শিশু নুসরাত জাহানের (৩) মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার সন্ধ্যায় উপজেলার বিশাড়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। নুসরাত বিশাড়া গ্রামের সোহেল মিয়ার মেয়ে। পরিবারের সদস্যদের অজান্তে নুসরাত বাড়ির পাশে বন্যার পানিতে পড়ে যায়। বন্যার পানিতে ভাসতে দেখে তাকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

মৌলভীবাজার : হাকালুকি হাওড়ের ভুকশিমইল ইউনিয়নের বন্যার্ত মানুষের মধ্যে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দিয়েছে মৌলভীবাজারের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ‘বিলাস’। শুক্রবার দিনব্যাপী বন্যার্তদের মধ্যে খাবারসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বিলাস ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের মার্কেটিং অফিসার রানু দেব, কুলাউড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের কৃষি ও সমবায়বিষয়ক সম্পাদক ময়নুল ইসলাম সোহাগ, দৈনিক যুগান্তর মৌলভীবাজার জেলা প্রতিনিধি হোসাইন আহমদ, রিয়াজুর রহমান, বিলাস ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের স্টাফ সামাদ মিয়া, সাধন ভট্টাচার্য, মিজান মিয়া প্রমুখ।

ভূঞাপুর (টাঙ্গাইল) : ভূঞাপুরে যমুনা নদীর পানি নতুন করে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ঝিনাই ও ধলেশ্বরী নদীসহ জেলার সব নদ-নদীর পানিও বাড়ছে। নতুন করে পানি বৃদ্ধিতে বন্যার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। তবে ভয়াবহ বন্যার আশঙ্কা নেই জানিয়ে জেলা পাউবো বলছে, গত ২৪ ঘণ্টায় যমুনা নদীর পানি পোড়াবাড়ী পয়েন্টে ১০ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ৩১ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এদিকে, উপজেলার গোবিন্দাসী, গাবসারা, অর্জুনা ও নিকরাইল ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক নদীভাঙন অব্যাহত রয়েছে।

কুড়িগ্রাম : কুড়িগ্রামের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। ধরলা নদীর পানি বিপৎসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় নাগেশ্বরী, ফুলবাড়ী, কুড়িগ্রাম সদর ও উলিপুর উপজেলার অন্তত ৫০টি চরগ্রাম ও নদীসংলগ্ন গ্রামের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি ৮০ হাজার মানুষ। খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও গবাদিপশুর খাদ্য সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে। বিস্তীর্ণ এলাকার পাট, ভুট্টা, বীজতলা ও সবজিসহ ফসলের খেত প্লাবিত হয়েছে। এদিকে পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে নদীভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে। তিস্তা নদীর ১৩টি পয়েন্টে নদীভাঙন অব্যাহত রয়েছে। এর মধ্যে রাজারহাটের সরিষাবাড়ি, বুড়িরহাট, উলিপুরের অর্জুন ও বজরাসহ কয়েকটি এলাকায় শতাধিক বাড়ি ও কয়েকশ একর ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে উলিপুরের হাতিয়া ইউনিয়নের হকের চর, গুঁজিমারী, রৌমারী ও রাজীবপুরের কয়েকটি চরের মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়েছে।

সিলেটের বন্যাকবলিতদের পাশে রূপগঞ্জ প্রেস ক্লাব : রূপগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, সিলেটের বন্যাকবলিত প্রত্যন্ত অঞ্চলে অসহায়দের পাশে ত্রাণ নিয়ে হাজির হয়েছে রূপগঞ্জ প্রেস ক্লাবের ১২ সদস্যের প্রতিনিধি দল। বৃহস্পতিবার সিলেট, সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের ১১টি স্পটে এক হাজার বন্যাকবলিত পরিবারের মাঝে ত্রাণসামগ্রী ও নগদ অর্থ বিতরণ করা হয়। ত্রাণসামগ্রী বিতরণকালে উপস্থিত ছিলেন রূপগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সভাপতি লায়ন মীর আব্দুল আলীম, সাধারণ সম্পাদক হাজী খলিল সিকদার, যুগান্তরের এ হাই মিলন, সাংগঠনিক সম্পাদক রাসেল আহমেদ, সিনিয়র সাংবাদিক জিএম সহিদ প্রমুখ।

সিলেটে অসহায় মানুষের পাশে চাঁদপুরের সমাজকল্যাণ সংস্থা : চাঁদপুর প্রতিনিধি জানান, ত্রাণ সহযোগিতা নিয়ে সিলেটের বিভিন্ন অঞ্চলের বানভাসি মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে চাঁদপুরের প্রভাত সমাজকল্যাণ সংস্থা। তিন শতাধিক পরিবারের মাঝে দ্বিতীয়বারের মতো পাঁচ টন খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। শুক্রবার সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার পাঁচপাড়া হাওড়, খুর্দা, জুজমহল এবং কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার উত্তর রনিখৈল গ্রামে ত্রাণ দেওয়া হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন প্রভাত সমাজকল্যাণ সংস্থার কেন্দ্রীয় পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক আমিনুল ইসলাম মিন্টু, অর্থবিষয়ক সম্পাদক শাহাদাত হোসেন, খলিলুর রহমান, আফজাল পাটওয়ারি প্রমুখ।

সারা দেশে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি

ত্রাণ না পেয়ে বিপাকে মধ্যবিত্ত পরিবার

 যুগান্তর ডেস্ক 
০২ জুলাই ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
পরিবার
কুশিয়ারা নদীর পানিতে তলিয়ে গেছে সড়ক। বাধ্য হয়ে নৌকায় যাতায়াত বানভাসি মানুষের। দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতায় দূষিত পরিবেশে বাড়ছে রোগ। শুক্রবার সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ বাজার থেকে তোলা -যুগান্তর

পূর্বাঞ্চলের সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং উত্তরাঞ্চলের কুড়িগ্রাম ও দিনাজপুরে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় বন্যা পরিস্থিতির আরও উন্নতি হতে পারে। দেশের ভেতরে ও ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে বৃষ্টির প্রকোপ কমে যাওয়ায় বিভিন্ন নদ-নদীর পানি ধীরে ধীরে কমছে। দীর্ঘদিন ধরে চলা ভয়াবহ বন্যায় দুর্গত অসহায় মানুষজনের দিন কাটছে খেয়ে না খেয়ে। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের ত্রাণ তাদের একমাত্র সম্বল হয়ে পড়েছে। ত্রাণসামগ্রী নিয়ে নিম্নআয়ের পরিবারগুলো মোটামুটি চলতে পারলেও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো চরম বিপাকে পড়েছে। চক্ষুলজ্জায় তারা হাত বাড়াতে পারছে না। পরিবার-পরিজন নিয়ে তারা খেয়ে না-খেয়ে কোনোমতে জীবনযাপন করছেন।

বন্যার পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে আশ্রয়কেন্দ্রগুলো থেকে লোকজন নিজ বাড়ি-ঘরে ফিরতে শুরু করেছে। তবে বন্যার পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে দুর্ভোগও বাড়ছে। পানিবাহিত রোগ বিশেষ করে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। আক্রান্তদের মধ্যে শিশুর সংখ্যা বেশি। এদিকে, বন্যার পানিতে ডুবে নেত্রকোনার কলমাকান্দায় এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ সম্পর্কে ব্যুরো ও প্রতিনিধিদের খবর :

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র (এফএফডব্লিউসি) জানায়, উত্তরের প্রধান নদী ব্রহ্মপুত্রের পানির উচ্চতা গত ২৪ ঘণ্টায় একই রকম ছিল। কিন্তু যমুনা নদীর পানি বেড়েছিল। আগামী ২৪ ঘণ্টায় উভয় নদীর পানি বাড়তে পারে। সংস্থাটি আরও জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের ভেতরে ভারি বৃষ্টির প্রবণতা কিছু কমেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নেত্রকোনায় ১২২ মিলিমিটার সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। সিলেটের লালাখালে ৫৩ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। ভারতের পূর্বাঞ্চলেও ভারি বৃষ্টি অব্যাহত আছে। গত ২৪ ঘণ্টায় চেরাপুঞ্জিতে ৮১ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়। পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুঁড়িতে ১০৯ ও আসামের দিব্রুগড়ে ৯৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়।

গত ২৪ ঘণ্টায় আটটি পয়েন্টে দেশের সাতটি নদ-নদীর পানি বিপৎসীমার উপরে দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এগুলো হলো- ধরলা, ব্রহ্মপুত্র, সুরমা, কুশিয়ারা, পুরাতন সুরমা, বাউলাই ও সোমেশ্বরী। এগুলোর মধ্যে কুশিয়ারার পানি সবচেয়ে বিপৎসীমার উপরে আছে। এটি বিপৎসীমার ৮৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। কানাইঘাটে সুরমা নদী বিপৎসীমার ৬৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

সিলেট : সিলেটে বন্যার পানি কমলেও দুর্ভোগ বাড়ছে। ছড়িয়ে পড়েছে পানিবাহিত রোগ। সিলেটে ১৬ জুন বন্যা শুরু হয়। দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও জেলা-উপজেলার অনেক জায়গা এখনো পানিতে নিমজ্জিত। সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলা থেকে বন্যার পানি এত ধীরগতিতে নামার বিষয়টি ভাবিয়ে তুলেছে সংশ্লিষ্টদের। দীর্ঘস্থায়ী বন্যার কবলে পড়ার পেছনে নদীর নাব্য সংকট, হাওড়ে অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ, হাওড় ভরাট হয়ে যাওয়াকে কারণ হিসাবে দেখছেন অনেকেই। এ ব্যাপারে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুর ও পরিবেশকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মুশতাক আহমদ বলেন, সাধারণত সিলেটের পানি সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার কালনী নদী দিয়ে ভৈরব হয়ে মেঘনায় গিয়ে মেশে। গত কয়েক দশকে কালনী ভরাট হয়ে পানিপ্রবাহের পথ অনেকটা রুদ্ধ হয়েছে। ভরাট হয়েছে হাওড়ও। তাই এখন বৃষ্টিপাত কমে এলেও বন্যার পানি সহজে নামছে না। হাওড়ের প্রকৃতি, পরিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্য নিয়ে কাজ করা লেখক-গবেষক পাভেল পার্থ মনে করেন, অতিবৃষ্টি ও ঢলের পানি ধরে রাখার প্রাকৃতিক জলাধারগুলো ভরাট ও দখল হয়ে যাওয়া এবং পানিপ্রবাহের স্বাভাবিক পথ রুদ্ধ হওয়ায় সিলেট অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী বন্যা দেখা দিয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী আসিফ আহমেদ বলেন, আগে হাওড়ে যেভাবে পানি নামত, এখন সেভাবে নামছে না। সুনামগঞ্জের হাওড়গুলোর যদি পানি ধারণের ক্ষমতা আগের মতো থাকত তবে সিলেটে পানি জমে থাকার সুযোগ পেত না।

ভয়াবহ বন্যার পানিতে বিভিন্ন এলাকার টিউবওয়েল ও গভীর নলকূপগুলো তলিয়ে যায়। এতে টিউবওয়েলগুলোতে বন্যার পানি ঢুকে পড়ায় সেগুলোর পানি দূষিত হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্র থেকে বাড়ি ফেরা মানুষদের অনেকে এ পানি পান করায় তারা পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। বিশেষ করে তারা ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছেন। কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। তাদের মধ্যে শিশুদের সংখ্যাই বেশি। শুক্রবার কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখা যায়, মহিলা ও শিশু ওয়ার্ডে একটি সিটও খালি নেই। রোগীদের চাপে পুরুষ ওয়ার্ডে শিশুদের ভর্তি করা হচ্ছে। পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত ২১ জনের মধ্যে শিশুর সংখ্যা ১৪ জন। উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. কামরুজ্জামান বলেন, এখানে আসা রোগীদের বেশির ভাগ ডায়রিয়ায় আক্রান্ত।

সিলেটে বন্যাদুর্গত এলাকায় সরকারি ও বেসরকারিভাবে ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত রয়েছে। শুক্রবার সিলেট ও সুনামগঞ্জের ২০০টি পরিবারের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করেছে সিলেট ব্যাটালিয়নের (৪৮ বিজিবি) সদস্যরা। গোয়াইনঘাট উপজেলার সোনারহাট বিওপির পশ্চিম জাফলং ইউনিয়নের লক্ষণছড়া, কুলনছড়া ও গাছলাওউড়া গ্রামের ১০০টি পরিবারের মধ্যে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হয়। সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার নোয়াকোট বিওপির ইসলামপুর ইউনিয়নের নিজগাঁও, বনগাঁও, নয়াবস্তি, মনিপুরিবস্তি এবং রতনপুর গ্রামে ১০০টি পরিবারের মধ্যে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হয়। আগের দিন কানাইঘাট উপজেলার জিংগাবাড়ি ইউনিয়নের দলইমাটি গ্রামে ১০০টি পরিবারের মাঝে ত্রাণ সহায়তা দেন জেলা প্রশাসক মজিবর রহমান। এ সময় উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার উপ-পরিচালক মামুনুর রশিদ, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আনোয়ার সাদাত, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুমন্ত ব্যানার্জি।

এ ছাড়া হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী ফাউন্ডেশন সিলেট জেলা শাখার সহযোগিতায় সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার দুর্গাপাশা, ছয়হারা ও হরিনগর (নবীনগর) গ্রামে ৪০০টি পরিবারের মধ্যে চাল, ডাল, তেল, ওরস্যালাইন, ওষুধসহ বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর দৌহিত্র, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ডাইরেক্ট ফ্রেশ ও এজাইল মাইন্ডস্ করপোরেশনের প্রতিষ্ঠাতা মিশাল করিম, তার স্ত্রী সাদিয়া মুসতারী ইরা, হুমায়ুন রশীদ ফাউন্ডেশন সিলেট জেলা শাখার সদস্য এইচএমএ মালিক ইমন প্রমুখ।

সুনামগঞ্জ : বৃহস্পতিবার রাতে বৃষ্টি না হওয়ায় সুরমা নদীর পানি কিছুটা কমেছে। পাউবো কর্মকর্তারা জানান, আগামী ২৪ ঘণ্টায় সুনামগঞ্জে হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে। বৃষ্টি হলে নদ-নদীর পানি কিছুটা বাড়তে পারে। তবে এতে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা নেই। তিনি বলেন, বৃষ্টি থেমে গেলে সুনামগঞ্জের বন্যা পরিস্থিতির সার্বিক উন্নতি হবে। ১৬ জুন থেকে সুনামগঞ্জে ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়। জেলার প্রতিটি উপজেলা বন্যাকবলিত হয়ে পড়ে। অসংখ্য বাড়িঘর, অফিস-আদালত, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, রাস্তাঘাট বন্যার পানিতে তলিয়ে যায়।

ছাতক (সুনামগঞ্জ) : চার দফা বন্যায় ছাতক উপজেলার প্রায় এক লাখ পরিবার পানিবন্দি। বানভাসিদের দুর্ভোগ যেন কমছেই না। সুরমা ও ব?ট নদী ভাঙনে চোখের পলকে নিঃস্ব হয়ে পড়ছে নদীতীরের মানুষ। এ অবস্থায় বানভাসিদের কাছে ঈদের আনন্দ দুঃস্বপ্নে পরিণত হচ্ছে। যেখানে জীবনই বাঁচে না, সেখানে কিসের ঈদ। সরকারের দিকে তারা তাকিয়ে আছে। পানিবন্দি মানুষের মনে ঈদের আনন্দ নেই। উপ?জেলার ১৩?টি ইউনিয়নের বেশির ভাগ মানুষ কৃষিনির্ভর। বন্যার পানিতে তাদের ধান-চালও নষ্ট হয়ে গেছে। তাদের ঈদ আনন্দ বন্যা ভাসিয়ে নিয়ে গেছে ।

দোয়ারাবাজারে তৃতীয় দফা বন্যা : উদ্বেগ উৎকণ্ঠায় বানভাসিরা

দোয়ারাবাজার (সুনামগঞ্জ) : দোয়ারাবাজারে দ্বিতীয় দফা বন্যার রেশ না কাটতেই তৃতীয় দফা বন্যা শুরু হয়েছে। সুরমা, বগুলা, মান্নারগাঁও ও দোয়ারা সদরসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের বানভাসি লাখো মানুষের দিন কাটছে আতঙ্কে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় সর্বস্ব হারানোর ভয়ে এলাকাবাসী। এরই মধ্যে উপজেলা ও জেলা সদরের সঙ্গে ইউনিয়নগুলোর সড়ক যোগাযোগ আবারও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ত্রাণসামগ্রী নিয়ে নিম্নআয়ের পরিবারগুলো মোটামুটি চলতে পারলেও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো কঠিন বিপাকে পড়েছে। চক্ষুলজ্জায় তারা হাত বাড়াতে পারছে না। লোকচক্ষুর আড়ালে পরিবার-পরিজন নিয়ে তারা খেয়ে না খেয়ে কোনোমতে জীবনযাপন করছে।

কলমাকান্দা (নেত্রকোনা) : কলমাকান্দায় বন্যার পানিতে ডুবে শিশু নুসরাত জাহানের (৩) মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার সন্ধ্যায় উপজেলার বিশাড়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। নুসরাত বিশাড়া গ্রামের সোহেল মিয়ার মেয়ে। পরিবারের সদস্যদের অজান্তে নুসরাত বাড়ির পাশে বন্যার পানিতে পড়ে যায়। বন্যার পানিতে ভাসতে দেখে তাকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

মৌলভীবাজার : হাকালুকি হাওড়ের ভুকশিমইল ইউনিয়নের বন্যার্ত মানুষের মধ্যে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দিয়েছে মৌলভীবাজারের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ‘বিলাস’। শুক্রবার দিনব্যাপী বন্যার্তদের মধ্যে খাবারসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বিলাস ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের মার্কেটিং অফিসার রানু দেব, কুলাউড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের কৃষি ও সমবায়বিষয়ক সম্পাদক ময়নুল ইসলাম সোহাগ, দৈনিক যুগান্তর মৌলভীবাজার জেলা প্রতিনিধি হোসাইন আহমদ, রিয়াজুর রহমান, বিলাস ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের স্টাফ সামাদ মিয়া, সাধন ভট্টাচার্য, মিজান মিয়া প্রমুখ।

ভূঞাপুর (টাঙ্গাইল) : ভূঞাপুরে যমুনা নদীর পানি নতুন করে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ঝিনাই ও ধলেশ্বরী নদীসহ জেলার সব নদ-নদীর পানিও বাড়ছে। নতুন করে পানি বৃদ্ধিতে বন্যার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। তবে ভয়াবহ বন্যার আশঙ্কা নেই জানিয়ে জেলা পাউবো বলছে, গত ২৪ ঘণ্টায় যমুনা নদীর পানি পোড়াবাড়ী পয়েন্টে ১০ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ৩১ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এদিকে, উপজেলার গোবিন্দাসী, গাবসারা, অর্জুনা ও নিকরাইল ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক নদীভাঙন অব্যাহত রয়েছে।

কুড়িগ্রাম : কুড়িগ্রামের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। ধরলা নদীর পানি বিপৎসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় নাগেশ্বরী, ফুলবাড়ী, কুড়িগ্রাম সদর ও উলিপুর উপজেলার অন্তত ৫০টি চরগ্রাম ও নদীসংলগ্ন গ্রামের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি ৮০ হাজার মানুষ। খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও গবাদিপশুর খাদ্য সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে। বিস্তীর্ণ এলাকার পাট, ভুট্টা, বীজতলা ও সবজিসহ ফসলের খেত প্লাবিত হয়েছে। এদিকে পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে নদীভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে। তিস্তা নদীর ১৩টি পয়েন্টে নদীভাঙন অব্যাহত রয়েছে। এর মধ্যে রাজারহাটের সরিষাবাড়ি, বুড়িরহাট, উলিপুরের অর্জুন ও বজরাসহ কয়েকটি এলাকায় শতাধিক বাড়ি ও কয়েকশ একর ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে উলিপুরের হাতিয়া ইউনিয়নের হকের চর, গুঁজিমারী, রৌমারী ও রাজীবপুরের কয়েকটি চরের মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়েছে।

সিলেটের বন্যাকবলিতদের পাশে রূপগঞ্জ প্রেস ক্লাব : রূপগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, সিলেটের বন্যাকবলিত প্রত্যন্ত অঞ্চলে অসহায়দের পাশে ত্রাণ নিয়ে হাজির হয়েছে রূপগঞ্জ প্রেস ক্লাবের ১২ সদস্যের প্রতিনিধি দল। বৃহস্পতিবার সিলেট, সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের ১১টি স্পটে এক হাজার বন্যাকবলিত পরিবারের মাঝে ত্রাণসামগ্রী ও নগদ অর্থ বিতরণ করা হয়। ত্রাণসামগ্রী বিতরণকালে উপস্থিত ছিলেন রূপগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সভাপতি লায়ন মীর আব্দুল আলীম, সাধারণ সম্পাদক হাজী খলিল সিকদার, যুগান্তরের এ হাই মিলন, সাংগঠনিক সম্পাদক রাসেল আহমেদ, সিনিয়র সাংবাদিক জিএম সহিদ প্রমুখ।

সিলেটে অসহায় মানুষের পাশে চাঁদপুরের সমাজকল্যাণ সংস্থা : চাঁদপুর প্রতিনিধি জানান, ত্রাণ সহযোগিতা নিয়ে সিলেটের বিভিন্ন অঞ্চলের বানভাসি মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে চাঁদপুরের প্রভাত সমাজকল্যাণ সংস্থা। তিন শতাধিক পরিবারের মাঝে দ্বিতীয়বারের মতো পাঁচ টন খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। শুক্রবার সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার পাঁচপাড়া হাওড়, খুর্দা, জুজমহল এবং কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার উত্তর রনিখৈল গ্রামে ত্রাণ দেওয়া হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন প্রভাত সমাজকল্যাণ সংস্থার কেন্দ্রীয় পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক আমিনুল ইসলাম মিন্টু, অর্থবিষয়ক সম্পাদক শাহাদাত হোসেন, খলিলুর রহমান, আফজাল পাটওয়ারি প্রমুখ।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন