বাজেট নিয়ে সাক্ষাৎকার

রাজস্ব আয় বাড়ানোই বড় পরীক্ষা

প্রকাশ : ০৬ জুন ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  যুগান্তর রিপোর্ট

নির্বাচনী বছরে নানা ধরনের কর ছাড়ে সরকারের আয়ের খাতগুলো সংকুচিত হয়ে যায়। অপরদিকে বিশেষ বিশেষ প্রকল্প অনুমোদন দেয়ায় ব্যয়ের সম্প্রসারণ নীতি অনুসরণ করতে হয়। এ কারণে এবারের বাজেটে রাজস্ব আয় বাড়ানোই বড় পরীক্ষা বা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুগান্তরের সঙ্গে আলাপকালে খ্যাতনামা দু’জন অর্থনীতিবিদ এবং এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান এসব কথা বলেছেন। তাদের কাছে প্রশ্ন ছিল এবারের বাজেটে বড় চ্যালেঞ্জ কী?

করফাঁকি রোধে জিরো টলারেন্স নীতি দরকার -ড. মোস্তাফিজ

অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, অর্থনীতির আকার অনুসারে বাজেট মোটেই বড় নয়। কিন্তু মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) বিপরীতে রাজস্ব আয়ের হার একেবারে কম। এরপর এ বছর বাজেটের আকার আরও বাড়ছে। নির্বাচনী বছরে নতুন খাত থেকে খুব বেশি কর আসবে বলে মনে হয় না। এ ক্ষেত্রে করফাঁকির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করতে হবে।

ড. মোস্তাফিজ বলেন, ২০১১ সাল থেকে বাজেট বাস্তবায়নে সমস্যা দেখা দিচ্ছে। ওই বছর থেকে যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে, তার বিপরীতে ক্রমান্বয়ে পার্থক্য বাড়ছে। আগামী বছরেও রাজস্ব আয়ে ৫০ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি থাকবে। তিনি বলেন, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায়ে সক্ষমতা আরও বাড়াতে হবে। গত অর্থবছরের ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু ১০ দশমিক ২ শতাংশ আয় হয়েছে। তিনি বলেন, চলতি বছর রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ছিল ৪৪ দশমিক ৪ শতাংশ। কিন্তু প্রথম ৬ মাসে প্রবৃদ্ধি মাত্র ১৭ দশমিক ৬ শতাংশ। ড. মোস্তাফিজ বলেন, রাজস্ব খাতে সংস্কার জরুরি। বিশেষ করে সরাসরি কর আইন, নতুন শুল্ক আইন এবং ভ্যাট আইন করতে হবে। যদিও নির্বাচনী বছরে তা সম্ভব হবে না। কিন্তু প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হবে। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে করমুক্ত আয়সীমা ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। কিন্তু মূল্যস্ফীতি বিবেচনা নিয়ে এই সীমা ৩ লাখ টাকা করা উচিত। এছাড়া বর্তমানে ন্যূনতম স্তরে করের হার ১০ শতাংশ। এই সীমা কমিয়ে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ করা উচিত। সিপিডির সম্মানিত ফেলো বলেন, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) প্রতি বছর নতুন প্রকল্প বাড়ে। চলতি অর্থবছরে ৩১১টি নতুন প্রকল্প রয়েছে। আগামী বছরে হয়তো সেটি আরও বাড়বে। কিন্তু এসব প্রকল্পে বরাদ্দের ক্ষেত্রে অত্যন্ত স্বচ্ছতা জরুরি। এসব ক্ষেত্রে আইএমইডির সুপারিশের আলোকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এছাড়া বিশ্বববাজারের কারণে আগামীতে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে। বিষয়টি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

রাজস্ব আহরণ করাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ -ড. মনসুর

পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেছেন, আগামী ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়নে লক্ষ্যমাত্রার রাজস্ব আহরণ করাই হবে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। নির্বাচনী বছর হওয়ায় এ সময় সারা দেশে অনেক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড হবে। বিশেষ করে স্থানীয় সরকারে প্রচুর বরাদ্দ যাচ্ছে, আরও যাবে। সরকারের মেগা প্রকল্পের উন্নয়ন বরাদ্দের ধারাবাহিকতা তো আছেই। এসব উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দ অর্থ সঠিকভাবে ব্যয় করা, গৃহীত প্রকল্পের সঠিক ব্যয় নির্ধারণ করা ছাড়াও সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে বরাদ্দ অর্থ সঠিক সময়ে ছাড় করাও হবে বিরাট চ্যালেঞ্জের। এছাড়া চলতি অর্থবছরে সরকারি চাকরিজীবীসহ বিভিন্ন পেশাজীবীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির দাবি বেড়েছে। এমপিওভুক্তির দাবি পূরণেও আশ্বাস দেয়া হয়েছে। এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করতে গিয়ে বেশ চাপে পড়বে, যা লক্ষ্যমাত্রার রাজস্ব আহরণ ছাড়া কোনোটারই বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না।

আগামী অর্থবছরের বাজেটকেন্দ্রিক সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করেছেন ড. মনসুর। উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণে অর্জিত সূচকগুলোর ধারাবাহিকতা ধরে রাখাকেও তিনি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন। সামষ্টিক অর্থনীতির চলমান পরিস্থিতি উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর ভিতটি দুর্বল হয়ে পড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। রফতানিতে কাক্সিক্ষত মাত্রার প্রবৃদ্ধি অর্জিত হচ্ছে না। ব্যাংকে টাকা নেই। খেলাপি ঋণ ফেরত আসছে না। উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে আসছে না। বৈদেশিক বাণিজ্যের ভারসাম্যহীন দশা। ফলে ব্যালেন্স অব পেমেন্ট নিয়ে চাপে আছে ব্যাংকিং খাত। এ পরিস্থিতিতে আগামী অর্থবছরের সম্ভাব্য চার লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকার যে বিশাল বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছে সরকার সেখানে এনবিআরের রাজস্ব ২ লাখ ৯১ হাজার কোটি টাকা এবং এনবিআরবহির্ভূত মিলে ৩ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায় এই সময়ের জন্য কঠিন কাজ। এর কারণ তুলে ধরে তিনি বলেন, নন-ট্যাক্স বাড়লেও জিডিপির অনুপাতে কর জিডিপির আওতা বাড়েনি, বরং কমেছে। এটা বাড়াতে হবে। এছাড়া ৮ শতাংশ জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে চাইলে বাড়াতে হবে রফতানি প্রবৃদ্ধি। এজন্য নীতি প্রণয়নে কোথায় গলদ তা খুঁজে বের করতে হবে। নতুন কর্মসংস্থান তৈরির ওপর দিতে হবে বিশেষ নজর। গ্যাস সংযোগ ও অবকাঠামো দুর্বলতা দূর করা এই অর্থনীতির সময়ের দাবি। ব্যবসা সংক্রান্ত খরচ কমাতে হবে। সরকারের মেগা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে। পরিবেশ সৃষ্টি করে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগে আনতে হবে গতি। এ ছাড়া ব্যাংক সংস্কারে কমিশন গঠন, সুষ্ঠুভাবে প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারি-বেসরকারি মিলে ব্যয় কমিশন গঠন, শিক্ষা খাতে কৌশল পরিবর্তন, সরকারি কর্মকর্তাদের সক্ষমতা বাড়ানোরও পরামর্শ দেন এই অর্থনীতিবিদ।

এনবিআরের প্রশাসনিক সংস্কার খুবই প্রয়োজন -গোলাম হোসেন

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম হোসেন বলেন, প্রশাসনিক সংস্কার ছাড়া রাজস্ব আয়ের বর্ধিত লক্ষ্যমাত্রা কখনই পূরণ সম্ভব নয়। তার মতে, এনবিআরের বর্তমান প্রশাসনিক কাঠামো দিয়ে অর্থমন্ত্রীর কাক্সিক্ষত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব নয়। এ জন্য সবার আগে প্রশাসনিক সংস্কার করা খুবই প্রয়োজন, যেটি অনেক আগে করা দরকার ছিল। কিন্তু সেটি করা হয়নি। সংস্কার করলে পূর্ণ সংস্কার করতে হবে। আংশিক সংস্কার করে লাভ হবে না।

গোলাম হোসেন আরও বলেন, এনবিআরের বাইরে অনেক খাতে রাজস্ব আদায়ের যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে। কিন্তু মনিটরিংয়ের কারণে আদায় সম্ভব হয় না। এ ধরনের খাত চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া উচিত। বিশেষ করে রেস্টুরেন্ট খাতে অনেক রাজস্ব ফাঁকি হয়। এ ফাঁকি রোধ করতে হলে প্রশাসনিক সংস্কার করতে হবে। গাড়ির লাইসেন্স দেয়াসহ নতুন ব্যবসা পরিচালনা করার ক্ষেত্রে কমপক্ষে দুই বছর নিয়মিত রিটার্ন দেয়া এবং আয়কর ফাইলে পর্যাপ্ত টাকা দেখানোর বাধ্যবাধকতা আরোপ করা যেতে পারে। এতে কর আদায় বহুলাংশে বাড়বে। তা না হলে শুধু টিআইএনধারীর সংখ্যা বাড়বে। কিন্তু করদাতার সংখ্যা বাড়বে না।

অন্যদিকে বিভাগীয় শহরের বাড়িওয়ালা ও পেশাজীবীদের কাছ থেকে কর আদায় কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। ঢাকার অনেক চিকিৎসক আছেন, যারা সঠিকভাবে কর দেন না। অথচ তাকে রোগী দেখাতে মাসখানেক আগে থেকে সিরিয়াল নিতে হয়। এনবিআরের চেয়ারম্যান থাকাবস্থায় চিকিৎসকদের একটি ডাটাবেজ করার চেষ্টা করেছিলাম, তখন অনেক চিকিৎসকের কর ফাঁকি ধরা পড়েছিল। শুধু চিকিৎসক নয়, প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে সব পেশাজীবীকে করের আওতায় আনা সম্ভব। আবার রাজধানীসহ বিভাগীয় শহরের অনেক বাড়িওয়ালা আছেন যারা নিয়মিত কর দেন না। পেশাজীবীরা ফ্ল্যাট কিনলেও রিটার্ন জমা দেয় না। এ ধরনের বিষয়গুলোর দিকে এনবিআরের নজরদারি বাড়াতে হবে।